আট-নয়ের দশকে যেমন অন্ধ বা বোবা-কালা শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলায় বহু ‘ব্লাইন্ড স্কুল’, ‘ডিফ অ্যান্ড ডাম্ব’ স্কুল তৈরি হয়েছিল, তেমন আজ অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারের শিশুদের জন্য ‘স্পেশাল স্কুল’। আজ, এত বছরেও, তথাকথিত সকলের জন্য যে স্কুল– সেখানে কেন এই শিশুরা পড়তে পারবে না– সে-প্রশ্ন আমরা তুলিনি। সমাজের মতো আমাদের শিক্ষার মধ্যেও ছেলে-মেয়ে, ধনী-গরিব, হিন্দু-মুসলিম, উঁচু জাত-নীচু জাত, হেটেরো-হোমো আর নর্মাল-স্পেশাল ঢুকে গেছে।
আমাদের ছোটবেলায় যে-কোনও রকম ভিন্নতা বোঝাতে একটাই শব্দ ব্যবহৃত হত– ‘অ্যাবনর্মাল’। সমৃদ্ধ যখন আমাদের স্কুলে পড়তে এল তখন সকলে– টিচার, গার্জেন, দারোয়ান, মাসি– ওই একটা শব্দেই সমৃদ্ধকে বুঝতে চেষ্টা করত। কেউ বলত, ‘এরা এমনিতে ঠান্ডা কিন্তু রেগে গেলে ডেঞ্জারাস!’; কেউ বলত ‘স্কুলে এইসব বাচ্চা ভর্তি করা মানে জ্বালাতন!’; আবার কেউ-কেউ এমনও বলত, ‘এরা বেশিদিন বাঁচে না’।
আর সমৃদ্ধ কী করত? সমৃদ্ধ একটা অপূর্ব হাসি হাসত আর কারও চোখে চোখ মেলাত না। সমৃদ্ধর মা-কে দেখতাম, আমাদের থেকে সারা বছর নোটস কালেক্ট করত। আর সব পরীক্ষাতেই কাকিমা পরীক্ষার হলে সমৃদ্ধর পাশে বসত, কেবলমাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা ছাড়া। মাধ্যমিকে সমৃদ্ধ অনুলেখক নিয়েছিল।
সমৃদ্ধর হাতের লেখা ছিল অপূর্ব, টিফিনের সময় একা একা খেলত ও। আর প্রতিটি পরীক্ষাতেই ভালোরকম পাশ করে উঠেছিল একদম মাধ্যমিক পর্যন্ত। কিন্তু ওই যে শব্দ ‘অ্যাবনর্মাল’, সেটা থেকে সমৃদ্ধর বহু বছর মুক্তি মেলেনি। তারপর একটা সময় এল যখন ‘অ্যাবনর্মাল’ শব্দ ভেঙে তৈরি হল আরও কিছু শব্দ, যেমন– ‘স্প্যাস্টিক’, ‘অটিস্টিক’, ‘ডাউন সিনড্রোম’ ইত্যাদি অনেক কিছু। ‘অ্যাবনর্মাল’ শব্দ উচ্চারণ করতে যাদের ভদ্রতায় বাঁধত তারা ওই সব শব্দগুলো বেছে নিত। সমৃদ্ধর জন্য আমরা জানলাম ‘অটিজম’ শব্দটি। অবশ্য অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডার বোঝার অনেক আগেই আমরা সমৃদ্ধকে জেনে গিয়েছিলাম।
এর অনেক পরে যখন চাকরি করছি, এক সন্ধেবেলায় সিনিয়র একজন সহকর্মীর ফোন। তিনি তাঁর বাড়িতে নয়, বাইরে দেখা করতে চাইলেন। হরিদেবপুরের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি থমথমে মুখে বলেছিলেন, ‘জানো! ডাক্তার বলছে আমার মেয়ের অটিজম হয়ে থাকতে পারে। কী হবে বলো তো? কী করে বড় করব ওকে? আমার জীবনের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল!’ একথা বলেই আমার কাঁধে হাত রেখে সেই ছ’ফুটের দশাসই চেহারার মানুষটি অসহায় শিশুর মতো হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিয়েছিলেন। আমি খুব একটা বিচলিত হইনি। কারণ, ওই যে ছোটবেলায় সমৃদ্ধ আমাদের ক্লাসমেট ছিল। তাতে তো জানতাম– অটিজম থাকলে এত দুঃখিত হবার কিছু নেই।
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডার নিয়েও কতজন লেখাপড়া করে বড় হয়। তাহলে কোন অসহায়তা আমার সহকর্মীকে চোখের জল ফেলতে বাধ্য করেছিল? সমাজে এক ঘরে হয়ে যাবার ভয়? একক লড়াইয়ের প্রস্তুতির টেনশন? আসলে এই যে একটি শিশু কারও সঙ্গে ‘কমিউনিকেট’ করতে চায় না, একঘেয়ে কাজ করতে পছন্দ করে এবং সেই ‘রিপিটেটিভ’ কাজের তাল কেটে গেলে বিরক্ত হয়, চোখে চোখ মেলায় না এবং কথা বললে কয়েকটা শব্দই ব্যবহার করে খালি– অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারের শিশু বা মানুষদের আমাদের মেনে নিতে তাই অসুবিধা হয়। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারে আক্রান্ত মানুষটি যদি নিজের মতো থাকতে চায় তাহলে আমরা কেন তার সেই অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বকে অস্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে ফেলি?
আমরা যে সমাজ গড়ে তুলেছি, খুব দুঃখজনকভাবে ভিন্নতার জায়গা সেখানে রাখিনি বললেই চলে। ভিন্নতা যতই থাকুক আমরা সেই সমাজকে একরৈখিক রাখার চেষ্টা করি। সবাই একরকম হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি– সবক্ষেত্রে সমাজ একই খাতে চলবে আমরা মনে করি। নানা রঙের সমাজ নয়, একহারা তাসের দেশ নির্মাণ আমাদের অবচেতন উদ্দেশ্য। যে-কোনও রকম প্রতিবন্ধকতাকে আমরা ‘স্পেশাল’ আখ্যা দিয়ে আমাদের থেকে আলাদা করি। আমাদের সমাজ মুখে যতই বলুক, কাজে কোনও ‘ইনক্লুসিভিটি’ দেখাতে অক্ষম। এবং বলতে দ্বিধা নেই, এ-কারণেই আজ সব ‘স্পেশাল’ স্কুলের রমরমা। একজন শিশু, যার কিছু শিখতে তুলনামূলক সময় লাগে– তার প্রতি মনোযোগ দেওয়া দরকার; কিন্তু অন্য বাচ্চারা যেসব স্কুলে পড়ে সেখানকার বি.এড শিক্ষকরা সেই শিশুকে কোনও সাহায্য করতে পারেন না– ‘স্পেশাল এডুকেটর’-এর প্রয়োজন হয়।
আট-নয়ের দশকে যেমন অন্ধ বা বোবা-কালা শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলায় বহু ‘ব্লাইন্ড স্কুল’, ‘ডিফ অ্যান্ড ডাম্ব’ স্কুল তৈরি হয়েছিল, তেমন আজ অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারের শিশুদের জন্য ‘স্পেশাল স্কুল’। আজ, এত বছরেও, তথাকথিত সকলের জন্য যে স্কুল– সেখানে কেন এই শিশুরা পড়তে পারবে না– সে-প্রশ্ন আমরা তুলিনি। সমাজের মতো আমাদের শিক্ষার মধ্যেও ছেলে-মেয়ে, ধনী-গরিব, হিন্দু-মুসলিম, উঁচু জাত-নীচু জাত, হেটেরো-হোমো আর নর্মাল-স্পেশাল ঢুকে গেছে। আমাদের ছোটবেলায় আমাদের সেই ছোট স্কুলটি সমৃদ্ধকে ভর্তি নিয়ে এবং সকলের সঙ্গে পড়ার সুযোগ দিয়ে, মাধ্যমিক পর্যন্ত তাকে নিয়ে যাওয়ার যে নীরব বিপ্লবের পথ দেখিয়েছিল– তা আরও বড় আকারে শিক্ষাক্ষেত্রে কেন চোখে পড়ল না?
আজ অটিজম অ্যাওয়ারনেস ডে। জাতিসংঘ ২০০৭ সাল থেকে ২ এপ্রিল দিনটিকে সমাজে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারে আক্রান্তদের তো বটেই, সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার এ-ধরনের মানুষদের যাঁরা পরিচর্যা করে থাকেন, তাঁদের জন্যও। আমাদের দেশে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারের শিশুদের ‘কেয়ার-গিভার’ হয়ে থাকেন প্রধানত মা-বাবারা। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভুলে গেলে চলবে না। সমীক্ষা বলে– অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারের শিশু যারা, তাদের অভিভাবকরা বহু রকম স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হন। জগদ্দল সমাজ, যে ভিন্নতা স্বীকার করে না এবং আলাদাকে ‘অপর’ করে রাখতে চায়– সেখানে অটিস্টিক একটি শিশুকে প্রতিপালন করা একটা চ্যালেঞ্জ।
কেবল প্রতিপালন নয়, তাঁদের অনুপস্থিতিতে তাঁদের সন্তানদের দায়িত্ব কারা ভাগ করে নেবে– তা নিয়েও দুশ্চিন্তা থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ মা-বাবা সেই সব চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন শুধু নয়, তাতে সাফল্যও লাভ করেন। অবশ্য দায়িত্ব অনেক বেশি আমাদের, যারা তথাকথিত ‘নর্মাল’ সমাজের মিথ নিয়ে বাঁচি। সমস্ত অজ্ঞতা সরিয়ে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারকে আমাদের বুঝতে হবে। ভিন্নতাকে সম্মান করতে হবে। শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, কাজে– সকলের অধিকার শুধু নয়, অন্তর্ভুক্তিতেও জোর দিতে হবে। পুরো সমাজটাকেই ‘স্পেশাল’ করে তুলতে হবে আমাদের।
এখন আমি যে রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরি সেখানে মাঝে মাঝে সমৃদ্ধকে দেখি ইভনিং-ওয়াক করছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করি, ‘কেমন আছিস?’ ও হাসে আর ‘ভালো’ বলে বেরিয়ে যায়। আমার সমবয়সী বন্ধু, ক্লাসমেট সমৃদ্ধ নিজের মতো করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই সহকর্মীর শিশুকন্যাটিও এখন যুবতী হয়েছে। সে আর তার মা-বাবা আজ বাংলার অটিজম অন্তর্ভুক্তি আন্দোলনের পরিচিত মুখ।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের শিল্পী-মানস কিন্তু মোরাবাদী পাহাড়ে শুধু বাড়ি বানাননি। সমগ্র পাহাড়টাই হয়ে উঠেছিল তাঁর ‘ল্যান্ড আর্ট’-এর উন্মুক্ত মি়ডিয়া। জোড়াসাঁকোর নাগরিক কোলাহলকে পিছনে ফেলে, পাহাড়ের প্রকৃতিকে তিনি সাজিয়ে নিতে চাইছেন এক অপূর্ব শিল্পকর্ম হিসেবে। তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষ উপলক্ষে ‘টেগোর হিল’ নিয়ে রোববারের বিশেষ প্রতিবেদন।