an article on desire of women by swagata dasgupta। Robbar
Robbar
  • ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চাই, কিন্তু তোমার থেকে চাই না

এই লেখার বিষয়: সেক্সুয়াল ডিজায়ার এবং কনসেন্টের বোধ। আমি আমার লেখায় মেয়েদের কামনার কথা খোলাখুলি লিখেছিলাম বলে কোনও কোনও পুরুষ-পাঠক (তাঁদের অধিকাংশ কবি) ভেবে নিয়েছিলেন ১) আমার ব্যক্তিগত জীবনে কামের চাহিদা প্রবল এবং ২) আমার সেই কামনার কথাই আমি আমার লেখায় প্রকাশ করেছি, সুতরাং ৩) তাঁরা আমার কামসঙ্গী হতেই পারেন অথবা ৪) আমার কামনাপূরণের মতো পৌরুষ তাঁদের আছে। এর মধ্যে এক নম্বরটি সত্যি। দু’-নম্বরটি বিষয়ে বলব শুধুমাত্র আমার নয়, আমার চারপাশের জীবনের কামনার কথাও আমি বলেছি। বলা বাহুল্য, তিন আর চার নম্বরটিই এক্ষেত্রে গন্ডগোলের। কিন্তু আমরা কেউ কেউ আদারওয়াইজ এত শিক্ষিত হয়েও সেই গন্ডগোলটা বুঝি না।

শেষ আপডেট: মার্চ ৮, ২০২৫, ১৮:১১   
Facebook WhatsApp Messenger

ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় থেকে আমি কবিতা লিখতে শুরু করি। কিন্তু সেটা ছিল শখের। পড়াশোনা করা অনেক বাঙালির যেমন থাকে, কবিতা লেখার শখ। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে এম. এসসি. পড়তে ঢুকে প্রায় দৈববশে আমার ঝড়ের মতো কবিতা লেখার জীবন শুরু হয়। সেইসঙ্গে আমি যে বেঁচে আছি, এই বেঁচে থাকতে থাকতে কী আমার কাজ হতে পারে তার উত্তর পাই কবিতা লেখা, যা আজ পরিবর্তিত হয়েছে লেখায় অর্থাৎ কবিতা ছাড়াও অন্যান্য লেখায়। প্রায় আমার অজান্তেই অপ্রত্যাশিতভাবে যখন আমার কবিতা-লেখক জীবন শুরু হল, স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার প্রধান বিষয় হয়ে উঠল অবদমিত কামনা, যা নিত্যজীবনের ভেতর ভেতর তরতর করে বইছে। যা মুখে আমরা স্বীকার করে উঠতে পারি না অনেক সময়েই। যতরকমভাবে সম্ভব ঢেকে রাখি। ফলে কোন গোপন চোরাপথে তা বেরিয়ে আসে, সে-ধারণা বা অভিজ্ঞতা আমাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি আছে।

এবারে যেটা হয়, তা হল এইরকম। যেহেতু আমার লেখার অন্যতম বিষয় কামনা, আমার শব্দ প্রত্যক্ষ এবং আমি একটি মেয়ে– এই ব্যাপারটা দিয়ে আমি আমার লেখালেখির ছোট্ট পরিসরে চিহ্নিত হয়ে যাই। অর্থাৎ, আমার কবি-আইডেন্টিটির প্রধান দিক হয়ে ধরা দেয় এই বিষয়টা, পাঠক-সমাজে। বলা ভালো, আমার গায়ে একটা ট্যাগ লেগে যায়। (বলাই বাহুল্য, কবিতার পাঠক-সমাজ এমনিতেই সংখ্যালঘু, তারও একটা ছোট অংশে বিষয়টা ঘটে।) আপনাদের এই গোটা ব্যাপারটাকে আমি খারাপ চোখে দেখানোর চেষ্টা করছি না। একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া বা প্রক্রিয়ার কথা বলছি, আমি যেভাবে পারসিভ করেছি। আমার অভিজ্ঞতায় কেউ কেউ আমাকে সেই ট্যাগের কারণে পছন্দ বা অপছন্দ করেছেন, কেউ ট্যাগ এবং আমার লেখালেখির কারণে, কেউ কেউ আমার লেখার কারণে। কখনও-বা কেউ ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেও করেছেন পছন্দ বা অপছন্দ। মিলিয়ে-মিশিয়ে সবরকমই আঁচ করেছি। আমার লেখার সামগ্রিক প্রতিক্রিয়ার দর্শক হিসেবে আমি বেশ মজা পেয়েছি। গর্বও অনুভব করেছি মাঝে মাঝে। সেগুলি আমার ভাবনা-চিন্তাকে নানা ছোটবড় খোরাক যুগিয়েছে।

………………………………………….

ঘটনাচক্রে তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজের কোনও একটা বারান্দায় জনাপাঁচেক কবিদের আড্ডায় শামিল ছিলাম একবার। আড্ডার মাঝে সবাই সেখানে নিজেদের কবিতাও পড়েছিল। আমাকে দেখে এক কবি তাঁর আরেক কবিবন্ধুকে কানে কানে বলেছিলেন, ‘স্তন, নিতম্ব এবং এই জাতীয় শব্দ আছে, এমন কবিতা পড়ো না।’ কবিবন্ধু তা পালন করেন। সবার শেষে আমার কবিতা পড়ার পালা এলে আমার শব্দচয়ন শুনে তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ! কানে কানে যিনি সেদিন ও-কথা বলেছিলেন সেই কবি আজ আমার সাহিত্যজগতে গুটিকয় বন্ধুদের একজন।

………………………………………….

অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না। ঘটনাচক্রে তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজের কোনও একটা বারান্দায় জনাপাঁচেক কবিদের আড্ডায় শামিল ছিলাম একবার। আড্ডার মাঝে সবাই সেখানে নিজেদের কবিতাও পড়েছিল। আমাকে দেখে এক কবি তাঁর আরেক কবিবন্ধুকে কানে কানে বলেছিলেন, ‘স্তন, নিতম্ব এবং এই জাতীয় শব্দ আছে, এমন কবিতা পড়ো না।’ কবিবন্ধু তা পালন করেন। সবার শেষে আমার কবিতা পড়ার পালা এলে আমার শব্দচয়ন শুনে তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ! কানে কানে যিনি সেদিন ও-কথা বলেছিলেন সেই কবি আজ আমার সাহিত্যজগতে গুটিকয় বন্ধুদের একজন।

এবার আসল কথায় আসি, আসল কারণ তা এই লেখার বিষয়: সেক্সুয়াল ডিজায়ার এবং কনসেন্টের বোধ। আমি আমার লেখায় মেয়েদের কামনার কথা খোলাখুলি লিখেছিলাম বলে কোনও কোনও পুরুষ-পাঠক (তাঁদের অধিকাংশ কবি) ভেবে নিয়েছিলেন ১) আমার ব্যক্তিগত জীবনে কামের চাহিদা প্রবল এবং ২) আমার সেই কামনার কথাই আমি আমার লেখায় প্রকাশ করেছি, সুতরাং ৩) তাঁরা আমার কামসঙ্গী হতেই পারেন অথবা ৪) আমার কামনাপূরণের মতো পৌরুষ তাঁদের আছে। এর মধ্যে এক নম্বরটি সত্যি। দু’-নম্বরটি বিষয়ে বলব শুধুমাত্র আমার নয়, আমার চারপাশের জীবনের কামনার কথাও আমি বলেছি। বলা বাহুল্য, তিন আর চার নম্বরটিই এক্ষেত্রে গন্ডগোলের। কিন্তু আমরা কেউ কেউ আদারওয়াইজ এত শিক্ষিত হয়েও সেই গন্ডগোলটা বুঝি না। আমি যদি আমার কামনার কথা আমার লেখায় প্রকাশ করে থাকি, তার মানে যে-কেউই এগিয়ে আসতে পারেন, তা নয়। আমাকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতে হবে। ‘আমার সম্মতি’ থাকতে হবে। না, এভাবে বলাটা ঠিক হল না। আমার মনে হয় বলা উচিত, ‘আমাদের পারস্পরিক সম্মতি’ থাকতে হবে। ব্যাপারটা ঠিক ‘আমার সম্মতি’ এবং ‘আপনার সম্মতি’ নয়, ব্যাপারটা হল ‘আমাদের পারস্পরিক সম্মতি’। ‘আমাদের পারস্পরিক সম্মতি’ একটি ইউনিট। একে ভাঙা যায় না। ‘আমার সম্মতি’ এবং ‘আপনার সম্মতি’ যোগ করলেই ‘আমাদের পারস্পরিক সম্মতি’ তৈরি হবে এমনটা না-ও হতে পারে, ব্যাপারটা ঠিক এত সরল নয়। অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় বাস্তবে এত সরলভাবে ব্যাপারটা না-ও ঘটতে পারে। মুখে সরাসরি কিছু বলে বা ঘুরিয়ে বলে বা আদৌ কিছু না বলে পারস্পরিক চোখের সংলাপ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজের স্থূল-সূক্ষ্ম যোগের মাধ্যমে তৈরি হয় ‘আমাদের পারস্পরিক সম্মতি’। এর মধ্যেই ঢুকে আছে ‘আমার সম্মতি’ এবং ‘আপনার সম্মতি’। কিন্তু গোটা ইউনিট ভেঙে সে দুটোকে আলাদা করে বের করে আনা যায় না। আমি এবং আপনি চোখ, মুখ, বা দেহের পারস্পরিক সংলাপে বুঝে নেব যে ‘আমাদের পারস্পরিক সম্মতি’ আছে। (আমি তথাকথিত বিবাহ-ব্যবস্থার কথা এক্ষেত্রে বলছি না। সেখানে পারস্পরিক সম্মতির প্রয়োজন থাকলেও সমাজ এমনভাবে বৈধ অধিকার দিয়ে দেয় যে পারস্পরিক সম্মতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।)

This may contain: a hand shaking another hand with red paint on the ground in front of blue and green background

এটা বুঝে নেওয়া কি খুব কঠিন? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে যুগে যুগে প্রেম এবং আদর এমন দাপিয়ে বেড়াত না। কিন্তু তবুও কেউ কেউ এটা বোঝেন না। যেহেতু আমার ওঠা-বসা অনেকাংশে শহুরে শিক্ষিতদের সঙ্গে, দেখেছি কোনও কোনও ডিগ্রিধারী শিক্ষিত লেখালেখি-করা মানুষও এটা বোঝেন না। বোকা বোকা এমন কাণ্ড তাঁরা করে বসেন যে কী আর বলি!
এর বাইরে স্বল্পপরিচিত বা অচেনা, আমার লেখা না-পড়া মানুষদের কনসেন্টের অভাববোধের কথা এখানে আর উল্লেখ করছি না। রাস্তা ঘাটে, বাসে-ট্রেনে, কখনো-বা ঘরে যা ঘটে থাকে। আমার মনে হয় এক্ষেত্রে ‘কনসেন্ট’ শব্দটির তাৎপর্যও খানিক আলাদা। ওপরের অনুচ্ছেদগুলিতে ‘কনসেন্ট’ শব্দটির তাৎপর্য থেকে। আর শিশু-কিশোর বয়সের মেয়েদের ওপর যৌন নিগ্রহ আর যে কোনও বয়সি মেয়েদের ধর্ষণ, বিবাহের মধ্যে ধর্ষণ আমাদের বর্তমান আলোচনার এক্তিয়ারের বাইরে পড়ে। পুরুষরাও এসব কিছুর শিকার হন কিন্তু পরিসংখ্যান অনুযায়ী তার হার অনেকটা কম।

…………………………………………..

আরও পড়ুন মৌমিতা আলম-এর লেখা: সময় হয়েছে মেয়েদের সমান অর্গাজমের দাবি করার

…………………………………………..

তবে একটা কথা উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে খুব। পাশাপাশি। সম্প্রতি উপিন্দর সিং-এর লেখা ‘এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া: কালচার অফ কন্ট্রাডিকশন’ বইটি আমি অনুবাদ করেছি। বাংলা নাম ‘প্রাচীন ভারত: দ্বন্দ্বের সংস্কৃতি’। বইটির ‘অসাম্য এবং পরিত্রাণ’ শীর্ষক অধ্যায়ে প্রাচীন ভারতে দাসত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক বলেছেন সেকালে ‘একমাত্র প্রেমের ক্ষেত্রেই দাসত্বে কোনও হীন, নেতিবাচক অর্থ ছিল না, তা ছিল প্রিয়র প্রতি সম্পূর্ণ অঙ্গীকার আর সমর্পণের প্রতীক, যখন সেই প্রিয় একজন দেবতা তখন আরও বেশি করে।’ ‘কনসেন্টের বোধ’ মহা দরকারি, এ নিয়ে কোনও সন্দেহ-ই নেই। কিন্তু তা নিয়ে উগ্রতার শিকার হয়ে প্রেমের ভেতরে যে অনন্ত সম্ভাবনা আছে, সেগুলির কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। সম্পর্কের ভেতরের ঝগড়ায় অপরপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ‘কনসেন্টের অভাব’-কে যেন হাতিয়ার না বানিয়ে তুলি। বিশেষ করে বিবাহ-আইনে সিদ্ধ নয়, বা সে-আইনের আওতায় পড়ে না এমন সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে। যুগে যুগে প্রেম এবং প্রেমের ভেতরের অনন্ত সম্ভাবনাকে বোঝার চেষ্টা একটা কাজের মতো কাজ বই কী! তাহলে হয়তো আমাদের ‘কনসেন্টের বোধ’ আরেকটু পরিষ্কার হতে পারে।

Desire of women Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on