মা ষষ্ঠী সারা বছরই আমাদের সংসারে ঘুরে ঘুরে আসেন। যদিও অরণ্য ষষ্ঠী বা জামাই ষষ্ঠীর মান্যতাই বাঙালির কাছে বেশি। প্রতি বছর শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে এই ব্রত করার নিয়ম। এছাড়াও লোটন ষষ্ঠী, চাপড়া ষষ্ঠী, দুর্গা ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী, অশোক ষষ্ঠী, নীল ষষ্ঠী– নানা মাসে নানা ব্রত বিধেয়। সারা বছরেই মা ষষ্ঠীর আসা যাওয়ার বিধি ব্যবস্থা আছে তবে বাহন বিড়ালের কথা বিশেষভাবে আছে অরণ্য ষষ্ঠীতেই। সেখানে স্বয়ং ঠাকুরকেই তাঁর বাহনের মনোকষ্ট লাঘবের ভার নিতে হয়েছিল। বাহন সবসময় সব ভার বহন করে না।
৩.
ষষ্ঠীর বাহন বিড়াল।
বিড়াল খুবই স্বাধীনচেতা প্রাণী। গায়ে গায়ে ঘেঁষে থাকে বলে যতই ‘পোষমানা’ মনে হোক না কেন, ওরা পাড়া বেড়াতেই বেশি ভালোবাসে। অবশ্য জীবনবিমা করা বিড়ালরা খুব একটা ঘরের বাইরে যায় না। চলাফেরায় বাঘা ভাব থাকার জন্য ‘বাঘের মাসি’ বলে তাকে সম্বোধন করি আমরা। তা সেই বাঘের মাসিই হল মা ষষ্ঠীর বাহন।
ষষ্ঠীদেবীর কোলে পো কাঁখে পো। কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে ভরভরন্ত মূর্তি। তা বাহনও ভাবা হয়েছে তেমন। নরম সরম, তুলতুলে, আহ্লাদী বিড়াল। ভীতিপ্রদ নয়। মা ষষ্ঠী সারা বছরই আমাদের সংসারে ঘুরে ঘুরে আসেন। যদিও অরণ্য ষষ্ঠী বা জামাই ষষ্ঠীর মান্যতাই বাঙালির কাছে বেশি। প্রতি বছর শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে এই ব্রত করার নিয়ম। এছাড়াও লোটন ষষ্ঠী, চাপড়া ষষ্ঠী, দুর্গা ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী, অশোক ষষ্ঠী, নীল ষষ্ঠী– নানা মাসে নানা ব্রত বিধেয়। সারা বছরেই মা ষষ্ঠীর আসা যাওয়ার বিধি ব্যবস্থা আছে তবে বাহন বিড়ালের কথা বিশেষভাবে আছে অরণ্য ষষ্ঠীতেই। সেখানে স্বয়ং ঠাকুরকেই তাঁর বাহনের মনোকষ্ট লাঘবের ভার নিতে হয়েছিল। বাহন সবসময় সব ভার বহন করে না।
ষষ্ঠীর ব্রত সবসময়ই সন্তান সুরক্ষার ব্রত। পিডিয়াট্রিক্স ব্যাপার স্যাপার। সেখানে বিড়াল চমৎকার মানায়। অরণ্য ষষ্ঠীর ব্রত পালনের রীতি ভারি চমৎকার! ‘নানা ফল, ৬টি পান, ৬টি সুপারি, বাঁশপাতা, হলুদে ছোপানো কাপড়ের টুকরো, নতুন ৬ গাছাসুতো, তেল-হলুদ,চিঁড়ে, খৈ ও দৈ হল উপকরণ। এবার প্রথমেই পিটুলি গোলা দিয়ে একটা কালো বুড়াল এঁকে একটা পিটুলির কঙ্কণ গড়ার নিয়ম।’
এখন কথা হল পিটুলি গোলা দিয়ে কালো বিড়াল আঁকা হবে কীভাবে? বেশ রহস্যময়। পিটুলি– অর্থাৎ জলে গোলা চালবাটা দিয়ে দাগ দিলে তা সাদা হয়ে যায় শুকিয়ে গেলে। সাদা রেখায় কালো বিড়াল আঁকা যায় নাকি? যেমন আমরা কালো রেখায় মা কালী আঁকতে গিয়ে বার বার ঠকে যাই। তাঁর সর্বাঙ্গই তো কালো। কালো বিড়ালেরও তো তাই। মজাটাই এখানে। আসলে সাদা রেখার ঘেরাটোপে যা আটকে রাখা হয়, সেই শূন্য জমিই আসলে কালো। সে কালো বিড়ালই হোক বা মা কালীই হোক। এই ইলুউশনটাই আসলে রূপের কাছাকাছি আমাদের নিয়ে যায়। ‘ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল’ আর কী। সাদা রঙের আলোর রেখায় কালো বিড়ালের ছবি। সে আবার মা ষষ্ঠীর কৃপাধন্য। চুরির অপবাদ সইতে না পেরে সে মনের দুঃখে বনে চলে যায়। আর বামুনের ছোট বউয়ের কপালে দুঃখ নেমে আসে। অপবাদ দেওয়ার কঠোর শাস্তি হিসাবে তাকে মড়া বিড়ালের গায়ে এক হাঁড়ি দই ঢেলে আবার তা জিভ দিয়ে চেটে হাঁড়িতে তুলতে হয়। তাতে খুশি হয়ে ষষ্ঠী ঠাকুর সবাইকে আদরে-সোহাগে ভরিয়ে দেন। বাহন কালো হলেই যে সে ‘ব্ল্যাক ক্যাট’ হবে তার কোনও মানে নেই। গল্পে ষষ্ঠী ঠাকুর স্বয়ং তাঁর বাহনের ‘ব্ল্যাক ক্যাট’।
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাট অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ রকমের বিড়াল আছে। তবে নানা সংস্কার বশে কালো বিড়াল একটু এড়িয়ে চলাই হয়। মিশরে কালো বিড়াল ‘শুভ’ বলেই মানা হয়। ওখানে বিড়াল দেবতা বাস্তেত-কে সুরক্ষা, সমৃদ্ধি ও উর্বরতার প্রতীক বলেই ধরা হয়। পিরামিডের ভিতরে খোদাই করা এবং মূর্তিতে বিড়ালের চিহ্ন তার জুতসই প্রমাণ। জাপানি এবং রাশিয়ানরাও বিড়াল পছন্দ করে খুব। ইঁদুর তাড়ানো তার একটা বড় কারণ বটে। জাপানি কালিতুলির বিড়ালের ছবি খুব জনপ্রিয়।
কবি, শিল্পীরা বিড়াল নিয়ে নানা কাজ করেছেন। তার আদুরে উপস্থিতি, নিঃশব্দ পদচারণা ফ্যাশন ডিজাইনারের ক্যাটওয়াকের খোরাক। রামকিঙ্করের বিড়াল প্রীতির পরিচয় আছে আলোকচিত্রে, ভাস্কর্যে।
জ্যোৎস্না ভাট ছিলেন বিশিষ্ট সেরামিক্স শিল্পী। চল্লিশ বছরেরও ওপর বরোদার মহারাজা সয়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প শিক্ষকতা করেছেন। সেরামিক্স মাধ্যমে তার প্রিয় বিষয় ছিল বিড়াল।
কত শত বিড়াল যে তিনি বানিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই! একবার তাঁর এক প্রদর্শনীর ক্যাটালগের জন্য তাঁকে বিড়াল সম্পর্কে লিখতে বলা হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন ‘…a cat is a cat is a cat’।