এই তো দু’দিন আগে একজন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক বিমানের শৌচাগারের মধ্যে বিড়ি ধরিয়ে ধরা পড়ল। কেউ বাঙালি জেনে লজ্জিত হল, কেউ মালদার জেনে মরমে মরে গেল। আমার এসব কিচ্ছু হল না জানেন, আমার লোকটার জন্য মায়া হল। একটা বোকামির জন্য লোকটার কত কিছু গেল। এই লোকটা বিমান সম্বন্ধে বোকা, কিন্তু একটা নতুন সোনার গয়নার নকশা ফুটিয়ে তুলতে হয়তো ওঁর কোনও জুড়ি নেই। আমরা কি এরকমটাই নই? কোথাও খুব চালাক, কোথাও খুব বোকা?
চারিদিকে এআই কিলবিল করছে। ঘর পরিষ্কার করার ঝাঁটা থেকে (যাঁরা দেখেননি তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই ইতিমধ্যে তা বাজারে এসে গেছে) ঝানু গোয়েন্দা– সবই নাকি এআই করে দেবে! কিন্তু পৃথিবী তো বোকা আর তাদের বোকামিতে ভরা। এই তো দু’দিন আগে একজন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক বিমানের শৌচাগারের মধ্যে বিড়ি ধরিয়ে ধরা পড়ল। কেউ বাঙালি জেনে লজ্জিত হল, কেউ মালদার জেনে মরমে মরে গেল। আমার এসব কিচ্ছু হল না জানেন, আমার লোকটার জন্য মায়া হল। একটা বোকামির জন্য লোকটার কত কিছু গেল। এই লোকটা বিমান সম্বন্ধে বোকা, কিন্তু একটা নতুন সোনার গয়নার নকশা ফুটিয়ে তুলতে হয়তো ওঁর কোনও জুড়ি নেই। আমরা কি এরকমটাই নই? কোথাও খুব চালাক, কোথাও খুব বোকা?
একবারের কথা বলি, এক প্রযোজকের সঙ্গে পাঁচতারা হোটেলে গেছি একটা ছবি নিয়ে মিটিং করতে। তিনি কলকাতার অগ্রগণ্য সব স্কুল-কলেজ থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে লস আঞ্জেলেস চলে যান। বর্তমানে সেখানে তিনি নিজের কোম্পানি চালান, যার বিশাল টার্নওভার। সিনেমার গল্প বলতে বলতে এক অভিনেতার উল্লেখ করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমি দেখলাম অত বড় অভিনেতা ইকোনমি ক্লাসে উঠছে সিঙ্গাপুর ফ্লাইটে। আর আমরা বিজনেস ক্লাস। আমি বউকে হাসতে হাসতে বললাম দেখলে কার কি অউকাত?’ আমি হতবাক হয়ে গেলাম ভদ্রলোকের কথা শুনে। এক তো শিক্ষিত বাঙালি হয়ে ‘অউকাত’ কেন ব্যবহার করতে হয়, যখন ‘যোগ্যতা’র মতো সুন্দর একটা শব্দ আছে। আর একজন শিল্পীর যোগ্যতা মাপার মাপদণ্ড উনি নির্ধারণ করছেন? এবং তা নিদেনপক্ষে বিজনেস ক্লাস। সত্যি বলতে, আমি কোনও দিন বিজনেস ক্লাসে উঠিনি। এবং তার জন্য আমার কাজের কিছু এসে গেছে বলে আমার মনে হয়নি। আমার দর্শক বা পাঠক আমার কাজের বিচার করবেন আমি প্লেনে কোন ক্লাসে যাচ্ছি, তা নিয়ে মাথাব্যথা তাঁদের নেই। কাজেই ওই জুয়েল ছাত্র ভদ্রলোক এক মুহূর্তে আমার চোখে বিশ্বগাম্বাট রূপে চিহ্নিত হলেন এবং বাকি মিটিংয়ে উনি কী বলেছেন, তা আমার কাছে অবান্তর হয়ে গেছিল। কাজেই ওই পরিযায়ী শ্রমিককে নিয়ে লজ্জিত হবেন না। এরকম বোকামিতে আমাদের সবার অংশীদারিত্ব আছে কোনও না কোনও সময়।
…………………………………….
সত্যজিৎ রায়ের অ্যাড এজেন্সির চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় ওঁর মা খুশি ছিলেন না মোটেই। কারওই হওয়ার কথা নয়, ওরকম লোভনীয় চাকরি ছেড়ে যখন টাকা জমছে, ক্যামেরা কাঁধে বেড়িয়ে পড়া এ তো আত্মহত্যার সামিল। তার ওপর গান নেই, নায়ক নায়িকা বলতে দুটো শিশু। এই উন্মাদনার কোনও রেসিপি এআই-এর কাছে থাকা সম্ভব নয়। ভবানীপুর থেকে পালিয়ে বার্লিন কাঁপাতে যে কলজে লাগে, তাকে এআই বলবে বোকামি।
……………………………………..
একবার ‘কফি উইথ করণ’-এ একটা পর্ব হয়েছিল, যাতে দিলজিৎ দোসাঞ্জ আর বাদশাহ এসেছিলেন। করণ জোহর একটার পর একটা পোশাক, সানগ্লাস তুলে তুলে দেখাচ্ছে। ওঁরা অবলীলায় বলে যাচ্ছে গুচি, ভারসাচে, দলচে অ্যান্ড গাবানা। এবার ভাবুন, আমি আমার ‘সহজ কথা’য় যদি একই পর্ব শীর্ষেন্দু স্যর এবং সঞ্জীব স্যরকে এনে করাই– কেমন লাগবে? এইবার ভাবুন দিলজিৎ আর বাদশাহকে বিশ্বসাহিত্যের বই তুলে তুলে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে– এটা কার লেখা, তখন কী হবে ভেবে দেখুন দিকিনি? তখন তো লুঙ্গি পরা শীর্ষেন্দু আর পাজামা পরা সঞ্জীব মাঠে নামবে আলতো গা-ঝাড়া দিয়ে। আসলে কী জানেন, এআই সব পারবে, কিন্তু বোকামিগুলো করতে পারবে না। আর এই বোকামিগুলোই জিতে গেছে চিরকাল। সত্যজিৎ রায়ের অ্যাড এজেন্সির চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় ওঁর মা খুশি ছিলেন না মোটেই। কারওই হওয়ার কথা নয়, ওরকম লোভনীয় চাকরি ছেড়ে যখন টাকা জমছে, ক্যামেরা কাঁধে বেড়িয়ে পড়া এ তো আত্মহত্যার শামিল! তার ওপর গান নেই, নায়ক-নায়িকা বলতে দুটো শিশু। এই উন্মাদনার কোনও রেসিপি এআই-এর কাছে থাকা সম্ভব নয়। ভবানীপুর থেকে পালিয়ে বার্লিন কাঁপাতে যে কলজে লাগে, তাকে এআই বলবে বোকামি। যে লোকটা হোটেলের রুমে বসে ভারতীয় ছবির অন্যতম ব্লকবাস্টার ‘মধুমতী’ লিখে ফেলল, সেই ঋত্বিক কোনও দিন নিজে ব্লকবাস্টারের ধার দিয়েও না গিয়ে ছবির নতুন ভাষা তৈরিতে নিজের না-খেতে পাওয়া জীবন কাটিয়ে দিল। এটা আমরাই আজও বুঝে উঠতে পারলাম না, কোন স্পর্ধায় এআই বুঝবে?
আসলে বৃষ্টি হলে মাকে খুব দরকার। মা-ই একমাত্র জানে খিচুরিতে কতটা ঘি দিতে হবে। কম দিলে হবে না,আবার বেশি দিলে মুখ মেরে যাবে। এইসব মানবিক ন্যাকামির কোনও জায়গা এআই-এর পৃথিবীতে নেই। এআই সব পারবে, কিন্তু মাসের শেষে কিছু কেনা নেই বলে হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে যে পদ তৈরি– তার এলেম এআই-এর রেসিপি বুকের মধ্যে হবে না। এগুলোই শিল্প। বিসমিল্লার সানাই তুমি চুরি করবে? বিসমিল্লার বুকে বয়ে চলা গঙ্গার হদিশ তোমায় দেবে কোন এআই? তুমি তারাভরা রাত চুরি করবে, ভ্যান গঘ-এর গমের খেত চুরি করবে ইজারা না দিয়েই, কিন্তু মানুষ আজও ওই অব্যক্ত যন্ত্রণার সামনে নতজানু হতে দৌড়বে। কারণ দিনের শেষে আমরা সবাই বোকা, এদের মতো বোকামির ধক শুধু নেই।