গোটা ভারতবর্ষ যে-বাংলার ছানাকে ‘অপবিত্র’, ‘মৃতদুগ্ধ’ বলে অচ্ছুৎ করে রেখেছিল, সেই ছানা কীভাবে দেবভোগ্য হল! অসম্ভবকে সম্ভব করলেন যে-মহাপুরুষ তিনি হলে বাংলার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।
ভারতীয় সংগীতে বিশেষত নৃত্যকলায় শ্রীচৈতন্যদেবের অবদান অপরিসীম। কৃষ্ণ-প্রেমিক, দার্শনিক, সাধক-পণ্ডিত হিসেবে শ্রীচৈতন্যদেব বিশ্ববাসীর কাছে যতখানি পরিচিত, নৃত্যশিল্পী হিসেবে সে তুলনায় একেবারেই পরিচিত নন।
শ্রীচৈতন্যের ছবির প্রসঙ্গ উঠলে যাঁর কথা না বললে অসম্পূর্ণ থাকে, তিনি শিল্পী ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার। সম্ভবত এই বিষয়ে তাঁর ছবিই সর্বাধিক। কেবল সংখ্যার প্রেক্ষিতেই নয়, ক্ষিতীন্দ্রনাথের চিত্রমালায় পরম বৈষ্ণবের যে বিনম্র ভঙ্গি ফুটেছে তা আর কারোও ছবিতে প্রকাশ পেয়েছে কিনা জানি না।
রবিঠাকুর যে-আহ্বান জানিয়েছিলেন, তা দ্বার খোলার আহ্বান। ভিতরের সেই দরজা দিয়ে স্থলে-জলে-বনতলে যে-দোল লেগেছে, তার স্পন্দন এসে লাগবে প্রতিটি হৃদয়ে। ওদিকে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় নররূপে যে-দেবশিশু আবির্ভূত হলেন তাঁর সাধন এবং জীবন যাপনের উদারনৈতিকতাকেও বাঙালি ধারণ করতে পারেনি। ভারতবর্ষের প্রথম সার্থক মানবতাবাদী নেতার রহস্যঅন্তর্ধানই তার প্রমাণ।
পদাবলি কীর্তনকে যদি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মতো একটি ক্লাস অর্থাৎ একটি শ্রেণির শ্রোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হত, তাহলে এই অবনমন ঘটত না। পদাবলির উন্নত সাহিত্য, জটিল সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি উপভোগ করতে হলে শ্রোতার যে পূর্বপ্রস্তুতি ও রসবোধ প্রয়োজন, তা সব শ্রেণির শ্রোতার ক্ষেত্রে কাম্য নয়। স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুই সাধারণ ভক্তদের সঙ্গে হরিনাম সংকীর্তন করেছেন এবং অন্তরঙ্গমণ্ডলীর সঙ্গে পদাবলির রসাস্বাদন করেছেন এমন বর্ণনা পাওয়া যায় বিভিন্ন গ্রন্থে।
‘বিহরতি হরিরিহ সরসবসন্তে…’ এইটুকু শুনে কি উঠে দাঁড়ালেন গোরা! মৃদঙ্গ মর্দলায় চারমাত্রার বোল উঠেছে, বেজেছে মঞ্জিরা, ভিতরে ভিতরে মঞ্জরীভাবে বারবার নৃত্যপর হয়ে উঠছেন গোরাচাঁদ। নীলাচলে তিনি কালা নন, রাধা।
রবিঠাকুর নোবেলটা পেয়েছিলেন বলে সর্বভারতীয় স্তরে বাংলার এখনও এত মান। নইলে কে দেখতে যাচ্ছে নজরুল, মধুসূদন, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ কী লিখেছিলেন, তাঁদের কী প্রতিভা ছিল! এঁরা প্রত্যেকেই নোবেলের যোগ্য। আমরা কোন্দল করতে গিয়ে তাঁদের ঠিকমতো তুলে ধরতে পারিনি। বাংলাদেশ ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারল, আমাদের শিলচর শহিদ হতে পারল, আর আমরা একটা মরণান্তক আন্দোলন করতে পারি না?
এই ভাষা ছাড়া আমি অস্তিত্বহীন। বাংলা ভাষা ছাড়া আমি কিচ্ছু না। যেটুকু কাজ আমি করতে পেরেছি, তা এই ভাষার জন্যই।
একটা সময় এল। একটা চাকরি জুটল। তখনও মাথায় কবিতার ভূত। কয়েক মাস চাকরি করার পর কৃত্তিবাসের একটা সংখ্যা এনে আমার বস বললেন, ‘তুমি যে কবিতা ছাপাচ্ছ বড়?’ ততদিনে টুকটাক এদিক-সেদিক নানা কাগজে, পত্রপত্রিকায় আমার কবিতা ছাপা শুরু হয়েছে। আমি তাঁকে বললাম যে, ‘হ্যাঁ, কবিতা আমি লিখি তো।’ তিনি তখন বললেন, ‘এই পত্রিকায় কাজ করলে অন্য কোথাও লেখা যাবে না।’ পত্রিকাটি ছিল খবরের পত্রিকা। তাঁকে আমি বলেছিলাম, ‘কিন্তু, আমাদের পত্রিকায় তো কবিতা ছাপা হয় না। তাহলে আমি কবিতা কোথায় ছাপাব?’ তিনি তখন বলেছিলেন, ‘এর সহজ উত্তর হল: কবিতা ছাপাবে না, কারণ তুমি এখানে চাকরি করো।’
বাংলা লেখক হিসেবে আমি অনেক বেশি ‘আমি’। বহু চেষ্টা করে শেখা ইংরেজি এখন আর বলতে বা লিখতে ইচ্ছে করে না। বাংলা ভাষা অনেক বেশি নিজের। সেখানে আমার চলাচলের স্বাধীনতা অনেক বেশি। আর ওই হিন্দি উপত্যকা তো আমার দেশই নয়!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved