

এযাবৎ শুনে এসেছি, তিনি না কি বোহেমিয়ানের চরম, নিয়মের বাঁধ ভাঙার মানুষ, অতএব– আশায় আশায় থাকি, দু’কান ভরে কবিতা শুনব আর দিন যাবে আড্ডার গতে। যথাকালে দেখা গেল সে গুড়ে বড় বড় পাথর! কবিমানুষটি যেমনই হোন, মাস্টারমশাই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ক্লাসে দেরি করার জো নেই, তিনি বেশ একটু বকুনিও দিয়ে থাকেন।
আজ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিন। এই শহরের রাখালের মৃত্যুদিন। যে রাখাল, কলকাতায় নয়, প্রয়াত হয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। স্মৃতিশক্তি-র এই লেখাটি সেই শেষদিনের শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। বসন্তের সমস্ত রং নিয়ে যিনি চলে গিয়েছিলেন ১৯৯৫ সালের, ২৩ মার্চ। শেষদিনের সে অভিজ্ঞতা, লিখেছেন তাঁর কন্যা।
বিয়ের ১০ বছরের মধ্যে, আদালতের যাচিত নির্দেশে, আমাদের বিয়ের আলো যখন নিভে গেল, তার ক’দিনের মধ্যে শক্তিদার সঙ্গে আমার দেখা। চৌরঙ্গীর কোনও পানঘরে। আমার বিচ্ছেদের ব্যথা ফুটে উঠল শক্তিদার চোখে। ঈশ্বরকে আজও বুঝিনি। কত মানুষকে কত কষ্ট দিচ্ছেন বিশ্ব জুড়ে। অথচ আমার ঠুনকো কষ্টে তাঁর চোখে জল!
‘ভালোবাসার দীঘিতে কতো করেছো অবগাহন/ পেয়েছ সুখদুঃখ আর ছলে ভোলানো দাহ’– এরকম কয়েকশ জোড়ালাইন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে সেই ছুটন্ত আবহমান বাসের টিকিট দিয়ে দিয়েছে যে বাসের নাম ‘অমরত্ব’। সেই বাস থেকে আর শক্তিকে নামানো যাবে না।
গোটা ভারতবর্ষ যে-বাংলার ছানাকে ‘অপবিত্র’, ‘মৃতদুগ্ধ’ বলে অচ্ছুৎ করে রেখেছিল, সেই ছানা কীভাবে দেবভোগ্য হল! অসম্ভবকে সম্ভব করলেন যে-মহাপুরুষ তিনি হলে বাংলার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।
ভারতীয় সংগীতে বিশেষত নৃত্যকলায় শ্রীচৈতন্যদেবের অবদান অপরিসীম। কৃষ্ণ-প্রেমিক, দার্শনিক, সাধক-পণ্ডিত হিসেবে শ্রীচৈতন্যদেব বিশ্ববাসীর কাছে যতখানি পরিচিত, নৃত্যশিল্পী হিসেবে সে তুলনায় একেবারেই পরিচিত নন।
শ্রীচৈতন্যের ছবির প্রসঙ্গ উঠলে যাঁর কথা না বললে অসম্পূর্ণ থাকে, তিনি শিল্পী ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার। সম্ভবত এই বিষয়ে তাঁর ছবিই সর্বাধিক। কেবল সংখ্যার প্রেক্ষিতেই নয়, ক্ষিতীন্দ্রনাথের চিত্রমালায় পরম বৈষ্ণবের যে বিনম্র ভঙ্গি ফুটেছে তা আর কারোও ছবিতে প্রকাশ পেয়েছে কিনা জানি না।
রবিঠাকুর যে-আহ্বান জানিয়েছিলেন, তা দ্বার খোলার আহ্বান। ভিতরের সেই দরজা দিয়ে স্থলে-জলে-বনতলে যে-দোল লেগেছে, তার স্পন্দন এসে লাগবে প্রতিটি হৃদয়ে। ওদিকে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় নররূপে যে-দেবশিশু আবির্ভূত হলেন তাঁর সাধন এবং জীবন যাপনের উদারনৈতিকতাকেও বাঙালি ধারণ করতে পারেনি। ভারতবর্ষের প্রথম সার্থক মানবতাবাদী নেতার রহস্যঅন্তর্ধানই তার প্রমাণ।
পদাবলি কীর্তনকে যদি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মতো একটি ক্লাস অর্থাৎ একটি শ্রেণির শ্রোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হত, তাহলে এই অবনমন ঘটত না। পদাবলির উন্নত সাহিত্য, জটিল সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি উপভোগ করতে হলে শ্রোতার যে পূর্বপ্রস্তুতি ও রসবোধ প্রয়োজন, তা সব শ্রেণির শ্রোতার ক্ষেত্রে কাম্য নয়। স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুই সাধারণ ভক্তদের সঙ্গে হরিনাম সংকীর্তন করেছেন এবং অন্তরঙ্গমণ্ডলীর সঙ্গে পদাবলির রসাস্বাদন করেছেন এমন বর্ণনা পাওয়া যায় বিভিন্ন গ্রন্থে।
‘বিহরতি হরিরিহ সরসবসন্তে…’ এইটুকু শুনে কি উঠে দাঁড়ালেন গোরা! মৃদঙ্গ মর্দলায় চারমাত্রার বোল উঠেছে, বেজেছে মঞ্জিরা, ভিতরে ভিতরে মঞ্জরীভাবে বারবার নৃত্যপর হয়ে উঠছেন গোরাচাঁদ। নীলাচলে তিনি কালা নন, রাধা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved