

এক বছর কিছু লিখবেন না– এই মর্মে আনন্দমেলা সম্পাদক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি চিঠি লিখেছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। চিঠিটি কোনও বিদায়পত্র নয়, কোনও ক্লান্তির বিবরণও নয়। এটি যেন এক শিল্পীর আত্মার দিকে ফিরে তাকানোর মুহূর্ত। যেন তিনি বলছেন– আমি লিখতে জানি, তাই থামতেও জানি।
বিহারের অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী মোহনলাল নিজের মৃত্যুর রিহার্সাল ও শেষকৃত্য নিজেই সেরে নিলেন! কেন এমন কাণ্ড করেছেন জিজ্ঞেস করায় তাঁর উত্তর– ‘জানতে চেয়েছিলাম মানুষ আমাকে কতটা সম্মান দেয় ও স্নেহ করে।’ তবে কি বর্তমান একাকিত্বের যুগে মানুষ স্বীকৃতি খুঁজছে, এমনকী মৃত্যুর বিনিময়েও?
যে-আড়ালের কথা শঙ্খ ঘোষ ‘নিঃশব্দের তর্জনী’তে লিখেছে, সেই আড়ালেরই আরেকটা অসম্ভব উদাহরণ হয়ে, একই বাড়িতে, প্রতিমা ঘোষ বেঁচেছিলেন।
কবিতা চর্চাকারীদের মধ্যে এক ধরনের আদিম ব্যামো রয়েছে। তা, কবিতায় ব্যবহৃত ব্যক্তিনামের খোঁজ। বাংলা কবিতায়, বহু বিখ্যাত কবিতায় নামের ব্যবহার রয়েছে। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অবনী– এ নিয়ে পাঠকের জিজ্ঞাসা গোয়েন্দাগিরির পর্যায়ে পৌঁছেছে। সত্য আর কবিতার সত্য কি এক? বাস্তবের পিন ফুটিয়ে কবিতার বুদ্বুদ ফাটিয়ে দেখার এই চেষ্টা কি কবিতার পক্ষে ক্ষতিকারক? বিশ্ব কবিতা দিবসে সে নিয়েই বিশেষ নিবন্ধ।
রবিঠাকুর নোবেলটা পেয়েছিলেন বলে সর্বভারতীয় স্তরে বাংলার এখনও এত মান। নইলে কে দেখতে যাচ্ছে নজরুল, মধুসূদন, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ কী লিখেছিলেন, তাঁদের কী প্রতিভা ছিল! এঁরা প্রত্যেকেই নোবেলের যোগ্য। আমরা কোন্দল করতে গিয়ে তাঁদের ঠিকমতো তুলে ধরতে পারিনি। বাংলাদেশ ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারল, আমাদের শিলচর শহিদ হতে পারল, আর আমরা একটা মরণান্তক আন্দোলন করতে পারি না?
বরিশালের ভূপ্রকৃতি, জলাভূমি, নদী, নিসর্গ জীবনানন্দের চেতনাজগৎ জুড়ে ছিল। তাঁর একান্ত আপন শহর। দেশ-বিভাগের বিয়োগান্ত নাটকের শুরুতেই; তৎকালীন মফস্সল শহর বরিশালের ‘সর্বানন্দ ভবন’ ছেড়ে ফিরে যান মহানগর কলকাতায়। তারপর যত দূরে গিয়েছেন, তাঁর পিছে পিছে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে গেছে বরিশাল।
শেষমেশ রাত ৯টার ঘণ্টাধ্বনি। একযোগে হাততালি। স্টল থেকে রাস্তায় নেমে আসা। চারপাশ দেখে নেওয়া, চারপাশের মধ্যে আকাশের পতনোন্মুখ চাঁদটিও পড়ে। চোখ ছলছল। হাতে হাত, জড়িয়ে ধরা। বন্ধুবান্ধব, অর্ধপরিচিত-অপরিচিতর দিকেও কয়েক পলক বাড়তি দৃষ্টি। মলিন হাসি। বারেবারে আর আসা হবে না। ওই যে অলীক বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল বইপত্রিকা, প্রকাশন– হয়তো প্রকাশন আর নেই, বন্ধুত্বও– তবুও আলিঙ্গন, তবু কিছু মায়া রয়ে গেছে।
এমন কথাই বলেছিলেন জোসেফ ব্রডস্কি। দেখা গেল বইমেলায় জ্বলজ্বল করছে এ-কথা। তৃতীয় দিন বইমেলায় গরম বেশি। প্রথম শনিবার। হল্লাও বেশি। হয়তো বিক্রিও। মেলার মাঠে ধীরে ধীরে নতুন, টাটকা বই ঢুকে পড়ছে। পাঠকেরাও আহ্লাদিত। কেউ কেউ দাম দেখে আঁতকেও উঠছেন। সব মিলিয়ে মেলা জমে উঠেছে। আজ রবিবার, কাল সাধারণতন্ত্র দিবসের ছুটি। আমাদের যদিও ছুটি নেই। বইমেলায় রোজ আমরা থাকছি। থাকছে আমাদের কড়চাও। পড়বেন কিন্তু!
শতাব্দী জুড়ে থাকা এই ময়নাতদন্তের ধারাবাহিক প্রকাশ প্রমাণ করে যে কথকতার দায় আর কবির নয়। বরং কবিতা সৌন্দর্যপ্রথার যে মাংসল প্রবর্তন সম্ভব করেছে, তাতে কবির প্রতি শর্তহীন আনুগত্য ছুড়ে ফেলে বহুগামিনী সরোজিনী ক্রমেই দাবি করেছে পাঠকের রতিমুখরতা।
আজ বুঝতে পারি, আমৃত্যু, জীবনানন্দের, এক আধুনিক শিল্পীর, তথাকথিত স্ব-বিরোধিতা আসলে যে কোনও আধুনিকের পক্ষেই মৌলিক অধিকার।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved