
বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক শিল্পীদের লেখা দু’ভাবে এসেছে আমন্ত্রণপত্রে। সরাসরি আমন্ত্রণের বয়ান (গদ্য বা পদ্যে) এবং/অথবা, তাঁদের দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া আশীর্বাণী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁর ছেলে নির্মল-এর বিয়েতে (৬ ফেব্রুয়ারি ১৯০০); কবি মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর একমাত্র কন্যার বিয়ের আমন্ত্রণপত্র লিখেছিলেন নিজেই– কবিতার আকারে। অন্যান্যদের মধ্যে আছেন: শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, প্রফুল্ল রায়, তারাপদ রায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। তবে সবার ওপরে সেই এক ও একমেবাদ্বিতীয়ম্ রবীন্দ্রনাথ।
বিশ্বকর্মা পূজোর দিন আকাশে ভাসমান ঘুড়ি পাঠায় আসন্ন দুর্গোৎসবের বার্তা। সেরকম বিয়ের আমন্ত্রণপত্র হল দু’টি প্রাণের যৌথ জীবনের সূচনায় সাক্ষী থাকার আন্তরিক আহ্বান।
বঙ্গ ও বাঙালি সংস্কৃতিতে বিয়ের আমন্ত্রণপত্রের চল ১৫০ বছরেরও আগে। তখন বিয়ে উপলক্ষে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবরা লিখতেন ছড়া, কবিতা, গান। যেমন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিবাহ উপলক্ষে রচিত ‘পরিণয় সঙ্গীত’ আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কর্তৃক মুদ্রিত হয়েছিল। এটা বাংলা ১৩০৬ সালের কথা। বিয়ের পদ্য বা কাব্য বলা যেতে পারে এদের। বিষয়টি নিয়ে বাংলায় গোটা পাঁচেক সংকলনও আছে।

বিয়ের পদ্যগুলো ছাপা হত দুবলা-পাতলা হালকা গোলাপি বা হলদে কিংবা নীলচে কাগজে। দেওয়া হত মূলত অনুষ্ঠান-বাড়িতে আগত অতিথিদের হাতে। মূল প্রবেশদ্বারে ঢোকার মুহূর্তে। বিলির দায়িত্বে থাকত বাড়ির কিশোর-কিশোরীরা। তবে অনেকে এটা ভাঁজ করে নিমন্ত্রণপত্রের খামের মধ্যেও দিতেন। একেবারে উঠে না গেলেও বর্তমানে বিবাহবাসরের কাব্যচর্যার দেখা মেলে ক্বচিৎ কদাচিৎ।
সম্পন্ন বনেদি পরিবারের তরফে নেমন্তন্ন করার সময় প্রায়শই আমন্ত্রণপত্রটি দেওয়া হত একটা পিতল বা কাঁসার থালায় ওপর রেখে। সঙ্গী হত পাশে শায়িত পান-সুপুরি। এই থালার পোশাকি নাম ছিল ‘আমন্ত্রণী থালা’। অনেক সময় এর ওপর খোদাই করে লেখা থাকত ‘বিয়ের আমন্ত্রণ’, পাত্র বা পাত্রীর নামোল্লেখপূর্বক ‘বিয়ে’ কিংবা ‘শুভ বিবাহে সাদর আমন্ত্রণ’। মুর্শিদাবাদের খাগড়ায় তৈরি হত এরকম অনুষ্ঠান বিশেষের তৈজস। পরের দিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণেই মূলত পিতলের প্রক্সি দিতে আসরে স্টেনলেস স্টিলের থালার আগমন।
করোনাকাল বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ঘরানায় আমূল বদলে এনেছে। ডিজিটাল পত্রের প্রতি ঝোঁক ক্রমশ বাড়ছে। এটা কেবল রুচির বদলের বহিঃপ্রকাশই নয়, কারও কারও যুক্তি এতে সময় ও অর্থের সাশ্রয়ও হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক পছন্দ। পাশ্চাত্য ও অবাঙালি বলয়ে চালু প্রি-ওয়েডিং শুটের স্টিল ছবি ও ভিডিওর কোলাজ জুড়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে পাঠানো আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে। বাঙালি বিয়েতে মেহেন্দি কালচারের মতন এ-ও এক উড়ে এসে জুড়ে বসা অর্বাচীন কালচার।

কোভিডের প্রভাবে এই যে বদল এবং তাকে মেনে নেওয়া, আত্মস্থ করা– এর মধ্যে রয়েছে এক অশনি সংকেত। আমন্ত্রণকারী এবং নিমন্ত্রিত উভয়ে বরণ করে নিচ্ছে কতকটা স্বেচ্ছাতেই বলব, নিঃসঙ্গতার রকমফেরকে। আমরা জ্ঞানত বা না-বুঝেই ঢুকে পড়ছি স্বেচ্ছারোপিত নিঃসীম নীরবতার মৃত্যু উপত্যকায়। এমনিতেই প্রতি অনু-পল-ক্ষণে মানুষে-মানুষে আড়েবহরে বাড়ছে দূরত্ব; সেখানে এই প্রথা মানুষকে আরও একা করে দেবে। অন্তর্জাল ও তার দোসরদের মায়ায় আচ্ছন্ন মানুষ হারাচ্ছে তার সাবেক কালের সুচারু ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে।
বিয়ের আমন্ত্রণপত্রের অন্দরমহলে ঢোকার আগে তার বাইরেটা সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক। প্রায় সকল বিয়ের চিঠিই থাকে যে আধারে সেটা একটা খাম। হ্যান্ড-মেড পেপার, পাটের থলে, ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে তৈরি খাম, কাঠের বাক্স, স্বচ্ছ অলংকৃত প্লাস্টিকের খাম প্রভৃতির জিম্মায় থাকে সুসংবাদের পত্রটি।

এই জামা বা জ্যাকেটের একটা ওয়ান লাইনারও থাকে তার পরিচিতিস্বরূপ। নমুনা: ‘শুভবিবাহ’, ‘শুভ পরিণয়’, ‘বধূবরণ’, ‘বিয়ের চিঠি’, ‘সাগ্নিক সপ্তপদী’, অমুক ও অমুকের ‘বিয়ে’, শুধুই পাত্র-পাত্রীর নাম, ‘Wedding’। একটু ব্যতিক্রমী: ‘চখা-চখীর কথা’, ‘সখা ও সখী’, ‘লায়লা-মজনু সম্বাদ’, ‘নবজীবনের বার্তা’, ‘নতুন সংসারপাতার সংবাদ’, ‘আমরা দুজনে স্বর্গ রচিব’, ‘জীবনে বসন্ত এল’, ‘এসো সুসংবাদ এসো’!
অনেক সময় খামের প্রচ্ছদে থাকে কবিতা, গান থেকে উৎকলিত লাইন; কিংবা, অজ্ঞাতনামা লেখকের ছড়া-কবিতা। কয়েকটি নমুনা পেশ করলেই মালুম হবে ব্যাপারটা। এক্ষেত্রেও বাঙালির বল-ভরসা সেই রবীন্দ্রনাথ। ‘নবজীবনের পথে মিলনের তরী/ বিধাতার আশীর্বাদ নিয়ে যাক ভরি’; ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,/ আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী’ (‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের পথের বাঁধন); কিংবা, প্রেম পর্যায়ের গান থেকে ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে’…
‘চারহাত এক হয়ে দৃঢ় হোক বন্ধন
দুটি মনের মিলন ক্ষণে রইল নিমন্ত্রণ।’
–লেখা ছিল শ্রীরামপুর (হুগলি) এবং গাজোল (মালদা) থেকে সংগৃহীত বিয়ের কার্ডে।

অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লেখার উদাহরণ:
১. ‘অনন্ত ডানায় রোদ্দুর মেঘে
ছুঁয়ে যাক ঋদ্ধ প্রণয়
যুগল মিলান্তিক সখ্যতায়’
২. ‘দুটি জীবনে হল সখ্য
আমরা সকলে নিয়েছি উভয় পক্ষ’
বিখ্যাত কবিতার অনুকরণে লেখাতেও উৎসাহের খামতি হয়নি। দ্বিজেন্দ্রলালের ‘বঙ্গ আমার জননী আমার ধাত্রী আমার আমার দেশ’ কবিতার অনুকরণে রচিত (কাটোয়া, ১৯৮৩) বিয়ের কাব্য:
“বর যখন বৌয়ের আধার বিয়ের বিষয় অনন্ত
কিসের লজ্জা, ছাড় পাবে না গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত
সাধারণে ভাবে কেমন হইবে দু’জনার কথা
হবে নাকো শেষ
হতে দাও বিয়েটা, ব্যাঙ্কক-সিঙ্গাপুর ঘুরাইব না
বাকি শখের ‘মেষ’!”
রচনার মান, বানান, ব্যাকরণ অসিদ্ধ, ছন্দের ত্রুটি ইত্যাদি সবই এখানে গৌণ। অন্তরের আহ্বান, প্রাণের টান, সৃষ্টির স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দই এখানে মুখ্য।

এছাড়া, পেয়েছি দুই মজুমদারকে– কমলকুমার ও বিনয়; জীবনানন্দ দাশ, কিটস্, শেলি, শেক্সপিয়ার প্রমুখকে। বৌভাতের আমন্ত্রণপত্রের প্রচ্ছদে (১৯৯৮, বেলঘরিয়া) ‘হ্যামলেট’ থেকে, Horatio-র প্রতি হ্যামলেট-এর উক্তি: ‘A was a Man, take him for all in all:/ I shall not look upon his like again.’ অর্থাৎ, পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে যদি মনে করো, তাহলে ওরকম মানুষ কোথাও আর একটা পাব না। ইনি রসিক বটে। তাহলে এবারের জন রীতিমতন দুঃসাহসিক: “Tis a lucky day, boy, and we’ll do good deeds on’t.” (সৌজন্যে: Winter’s Tale)।
‘বিবাহ আসলে দিল্লি কা লাড্ডু, যা করছি জেনেই করছি’– এই নির্মম ও অমোঘ স্বীকারোক্তি ঘোষিত ছিল পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির অমিয় জানার (১৯৭৮) বিয়ের কার্ডে!
আরও কিছু নমুনা: ‘কী সুর বাজে আমার প্রাণে আমি জানি, মনই জানে’; ‘জীবনের ফসল ফলাতে চলেছি আমরা দুজনে’; ‘জীবন মধুময়, নতুন আলোর সন্ধানে দুজনে’; ‘আমাদের দুটি মন, দুটি প্রাণ– কিন্তু একটাই গান।’
আলোচ্য পত্রের আধারের অলংকরণে ব্যবহৃত হতে দেখে থাকবেন: লোকশিল্পের নানান মোটিফ, ফুল-লতা-পাতার সরল কলকা, আলপনা, ডোকরা ও শোলাশিল্পের স্থিরচিত্র, রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি, ‘সহজপাঠ’ থেকে চয়িত নন্দলালের উডকাট, মধুবনী পেইন্টিং, কালীঘাটের পটচিত্র, যামিনী রায়ের ছবি, বইয়ের প্রচ্ছদ প্রভৃতি।

খাম ছাড়া বিয়ের চিঠিও হয়। তবে তারা সংখ্যালঘু। কাঠ বা পাথরের টুকরো বিশেষে যথাক্রমে রং দিয়ে ও খোদাই করে লেখা, বড় ঝিনুক বা শঙ্খের গায়ে লেখা (বর্তমানে আইনত এই উপকরণ আর ব্যবহার করা যায় না), অ্যাসিড ওয়াশড্ বটপাতায় মুদ্রিত, পোড়ামাটির ফলকের আমন্ত্রণপত্রের দেখার সুযোগ হয়েছে বা আছে এই কলমচির।
এবার আসা যাক মূল আমন্ত্রণপত্রের প্রসঙ্গে। অধিকাংশের বয়ান বাঁধা গতের। বিয়ের চিঠি কেনা হয় যে বিপণি থেকে সেখানকার কার্ড-ক্যাটালগ থেকে প্রথমে নিজস্ব রুচি ও বাজেট অনুযায়ী কার্ড পছন্দ করেন ক্রেতা। তারপর অন্যের জুতোয় পা গলানোর মতন অন্যের মুদ্রিত তথ্যের জায়গায় নিজেরটুকু বসিয়ে নিলেই হল। কেউ কেউ অবশ্য দু’-চারটে শব্দ বদলে দেন। তবে সেক্ষেত্রেও বক্তব্যের মূল কাঠামোর গুণগত মানের হেরফের হয় না বললেই চলে। আমরা বরং দু’-একটা অন্যরকম লেখার প্রয়াসের দিকে মনোযোগের নোঙর ফেলি।
১. “আমরা দু’জন জড়িয়ে পড়ছি জীবনের আনন্দে। আসছে ৬ মাঘ, রোববার, শীতমেদুর সন্ধ্যায়, হালিশহরে আমাদের বিয়ের সে অনুষ্ঠান। আপনাকে আসতেই হবে; আপনার ভালোবাসা আর আশীর্বাদের অপেক্ষায় থাকব আমরা।” আমন্ত্রণকারী স্বয়ং হবু কর্তা-গিন্নি। এই বয়ানটি ২১ জানুয়ারি ২০২৪-এর। এক কথায় নির্মেদ গদ্যে আন্তরিতার সঙ্গে মনের কথা উপস্থাপিত হয়েছে।

২. ‘বৈশাখের তাপদগ্ধ দিনান্তে আসে বারিধারার স্নিগ্ধ পরশ, প্রকৃতি জগতে নব আনন্দে জেগে ওঠার উল্লাস।’ এরপরে রয়েছে তিন লাইনে– পাত্র-পাত্রীর নাম ও অনুষ্ঠানের দিনক্ষণের উল্লেখ। তারপর, ‘আমাদের পরিবারের এই আনন্দানুষ্ঠান আপনার সাবান্ধব উপস্থিতিতে পরিপূর্ণতা লাভ করুক শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদে। ওদের জীবন সুখের হোক, হোক আনন্দের।’ (কল্যাণচক, পূর্ব মেদিনীপুর, ২০০৯)
৩. ‘আমাদের মেয়ে সাম্পানের বিয়ে উপলক্ষে আয়োজিত পরিজনসম্মিলন ও নৈশভোজে আপনাদের উপস্থিতি একান্তভাবেই কাম্য।’ (শিবপুর, হাওড়া, ২০১২)।
এই আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে ছিল ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’-এর স্রষ্টা বিশিষ্ট কবি মৃদুল দাশশুপ্ত-র লেখা ‘উটের মধুর আরব এসেছে কাছে’ শীর্ষক বিয়ের কাব্য। চিঠির সঙ্গে মানানসই মেজাজের কাগজে ছাপা হয়েছিল কবিতাটি। সেটি উদ্ধৃত করার লোভ প্রশমিত হল এখানে–
‘পুজোর পরই আবার ধুম
সাত সকালে ভাঙল ঘুম।
ছুটছি এখন এই দুকুরে
শিবপুরে সেই কইপুকুরে
আমিরশাহির আরবদেশের
হাজির হল পাত্র এসে।
দেখতে দারুন, দিব্যি গড়ন
চশমা চোখে সোনার বরণ।
সাম্পানও তো কনের সাজে
টুকটুকে গাল, ঈষৎ লাজে।
আজ আকাশে চাঁদের আলো
দ্বাদশীতে, বড়ই ভালো।
আজ খুশিতে ভাসছে জানি
কলম্বাসের জাহাজ খানি।
আজকে যেন সবার ভিতর
আরব সাগর উচ্ছ্বসিত।
এবার আমার মনের মাঝে
হাজার ঢাকের বাজনা বাজে।
চাঁদের আলোয় মৃদুল ঢাকি
ওদের মাথায় হস্ত রাখি।’

৪. কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’-এর সপ্তম সর্গ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার নজিরও আছে (২০১৭)। এর অধিকারী ছিলেন হাওড়া বালির বাসিন্দা।
আমন্ত্রণপত্রের বামদিকে থাকে পাত্র-পাত্রীর নাম, বাবা-মা-র নাম, ঠিকানা, অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ, যোগাযোগের নম্বর, পথনির্দেশ। অনেকে আলাদা একটা কাগজে সবিস্তারে বলে দেন কীভাবে গন্তব্যে নির্বিঘ্নে পৌঁছবেন আমন্ত্রিত অভ্যাগতরা। তাতে থাকে লোকাল ম্যাপ, হেল্পলাইন নম্বর, সুপরিচিত ল্যান্ডমার্ক থেকে কীসে কতক্ষণে পৌঁছবেন সেসব তথ্যাদি। এই পারিপাট্য আয়োজক পক্ষের সংবেদনশীল সুচারু মনের গঠনমূলক শিল্পসম্মত বহিঃপ্রকাশ।
গণেশ পাইন, ইন্দ্র দুগার, যুধাজিৎ দাশগুপ্ত, শুভাপ্রসন্ন, বিকাশ ভট্টাচার্য, প্রণবেশ মাইতি, বিকাশ ভট্টাচার্য, কার্টুনিস্ট অমল চক্রবর্তী প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীরা ঘনিষ্ঠজনের আবদারে সাড়া দিয়ে কিংবা, বন্ধু বিশেষের অনুরোধে এঁকেছেন বিয়ের আমন্ত্রণপত্রের জন্য। সবিনয়ে জানাই, এই সামান্য কলমচির বিয়ের কার্ডের প্রচ্ছদ ও ব্যাককভারের নকশা করেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক সময় শিল্পীর অনুমতি ছাড়াই তাঁর সৃষ্টি শ্রদ্ধায় সাদরে বরণ করে সেটি দিয়ে সাজিয়েছেন আপন বিয়ের চিঠিখানি। সৃষ্টি তখনই রসোত্তীর্ণ ও কালজয়ী যখন তা সাধারণ শিল্পপ্রেমিকের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। একথা জানেন ও মানেন শিল্পীমাত্রই। তাই হয়তো বিনা অনুমতিতে নিজের মানস-সন্তান অন্যের বিয়ের কার্ডে ব্যবহৃত হলেও এ নিয়ে কেউ আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন এমনটা আমি অন্তত শুনিনি।
উনিশ শতকের কালীঘাটের পটের ছবি দেওয়া কার্ড (আরামবাগ, ২০১২); কাংড়া পেইন্টিং, থান্কা পেইন্টিং (বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বাঙালির বিয়েতে), অজন্তার সুপরিচিত নারী ভাস্কর্য; ভাস্কর মীরা মুখোপাধ্যায়ের ভাস্কর্যের ছবি; রবি বর্মা, হুসেন, অমৃতা শেরগিল, ভ্যান গগ, পিকাসোর আঁকা ছবি, প্রকৃতির স্থিরচিত্র মূল কার্ডের প্রচ্ছদে ব্যবহারের নিদর্শন দেখে থাকবেন। এর কিছু কিছু নমুনা আছে আমার অকিঞ্চিৎকর সংগ্রহে।

বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক শিল্পীদের লেখা দু’ভাবে এসেছে আমন্ত্রণপত্রে। সরাসরি আমন্ত্রণের বয়ান (গদ্য বা পদ্যে) এবং/অথবা, তাঁদের দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া আশীর্বাণী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁর ছেলে নির্মল-এর বিয়েতে (৬ ফেব্রুয়ারি ১৯০০); কবি মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর একমাত্র কন্যার বিয়ের আমন্ত্রণপত্র লিখেছিলেন নিজেই– কবিতার আকারে।
অন্যান্যদের মধ্যে আছেন: শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, প্রফুল্ল রায়, তারাপদ রায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। তবে সবার ওপরে সেই এক ও একমেবাদ্বিতীয়ম্ রবীন্দ্রনাথ।
গুচ্ছ আশীর্বাণী নিয়ে কেতাব ছাপার একাধিক নজিরও আছে। কালের নিয়মে এদের অধিকাংশই হারিয়ে যায়। অভিজ্ঞতা বলছে খোদ কুশীলব যুগলের কাছেও সর্বদা সহজলভ্য হয় না। এর বাইরে দু’-একজন অত্যুৎসাহী ব্যতিক্রমী সংগ্রাহক যখের ধনের মতন আগলে রাখেন যখন যেমন যেটুকু পান। বাংলা বইয়ের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই ঘরানাটিই সবচেয়ে অবহেলিত।
পুস্তিকা বা ফোল্ডারের আকারে বিয়ের গানের সংকলনও পেয়েছি বিয়ের চিঠির সঙ্গে। এতে বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষায় প্রচলিত বিয়ের গানের সঙ্গে একালে রচিত গানও ছিল।
পাওয়া গেছে ‘শুভ বিবাহ পদ্ধতি’ শীর্ষক বৈদিক মতে বিয়ের মন্ত্রের সংকলন এবং সংশ্লিষ্ট রীতির চুম্বকে পরিচয়। মূল সংস্কৃতি-সহ তার বঙ্গানুবাদ।

নিজেকে নিয়ে রসিকতা, তাও আবার বিয়ের মতন হাই প্রোফাইল ম্যাচে, খুব কম জনই পারেন করতে। একটি বিয়ের মূল পত্রের উপরের দিকে লেখা ছিল (১৯৮৬):
‘সাদীর পয়লা রাতে না বশিলে বিড়াল,
হোল লাইফ বরবাদ তাবৎ পয়মাল।
তবে সমস্তই নির্ভরিছে ব্রাহ্মমুহূর্তে থাকিলে খেয়াল!’
আরেকটা কার্ডের (১৯৯১) প্রচ্ছদে হরিণের গলায় বাঁধা চেনের অপর প্রান্ত আরাম কেদারায় চক্ষু মুদে বিশ্রামরত বাঘিনীর আঁচলে বাঁধা! এখানে কে কার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অনেকসময় মূল কার্ডে নিচের দিকে লেখা থাকে: ‘…শুভকামনা ব্যতীত সকল প্রকার লৌকিকতা পরিহার্য’; কিংবা, ‘প্রীতিভোজে আপনার সবান্ধব উপস্থিতিই যথেষ্ট। দয়া করে কোনওরকম উপহার আনিবেন না।’
বিয়ের চিঠি সংস্কৃতি বা বিবাহ বাসরের কাব্যচর্চা অনেকদিন হল কলকাতা-কেন্দ্রিক আর নয়। সীমাবদ্ধ নয় বনেদি পরিবারের গণ্ডিতে। একটু-একটু করে ব্যাপারটা ছড়িয়ে পড়েছে জেলা শহর, মফস্সল শহরেও।
সাধারণভাবে মানুষের পাঠাভ্যাস কমছে। লোক ঝুঁকছে লোকালের বদলে গ্লোবালের দিকে। ইউজ অ্যান্ড থ্রো সংস্কৃতিতে আক্রান্ত আমাদের মন। আত্মঘাতী বাঙালি উদাসীন তার আপন ভাষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে। আমাদের চাওয়া + পাওয়া আজ অনেকটাই প্রভাবিত ও নির্ধারিত হয় বিজ্ঞাপনের সৌজন্যে। সব মিলিয়ে আমাদের মনের স্থিরতা ক্ষণভঙ্গুর। এক বিন্দুতে বেশিক্ষণ থাকাটা অন্যের দৃষ্টিতে অনাধুনিকতা। প্রশ্ন জাগে, প্রতিটি সত্তা, সমাজ এবং সমগ্রকে সর্বক্ষণ ঘিরে থাকা এত বহুস্তরীয় নঞর্থককে উপেক্ষা করে কীসের তাগিদে নগণ্য সংখ্যক কিছু মানুষ কার্যত বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন এরকম অবহেলিত সূক্ষ্ম সংস্কৃতিকে।

এর উত্তর একটাই: বাংলা ভাষা এবং বাঙালির সাবেকি ঐতিহ্যের প্রতি নিখাদ নাড়ির টান। যাঁরা এর পরিকল্পনা করেন, তাঁরা সৃষ্টির আনন্দে আপন খেয়ালে রচনা করেন। এটা জেনে-বুঝেই করেন যে অধিকাংশই এর কদর করবেন না; কয়েকজন সামনাসামনি একটু নেড়ে-চেড়ে দেখবেন, প্রশংসাসূচক দু’-চার কথা বলবেন সৌজন্যবশত। হাতে গোনা দু’-চারজন মনে রাখবেন, এমনকী সযত্নে সরিয়ে রাখবেন। হয়তো অন্যকেও বলবেন, দেখাবেন সানন্দে। সর্বোপরি, এক-আধজন উৎসাহিত হবেন, আরেকটু এগিয়ে উদ্যোগ নেবেন নিজের বাড়ির অনুষ্ঠানেও এমন কিছু করতে। এখানেই সার্থকতা এমন উদ্যোগের।
ঢ্যারা টানার আগে ব্ল্যাক হিউমারের মতন শোনালেও যেটা না বললেই নয়, শুধু মিলনের বার্তাবাহী দূত নয়; ক্ষেত্রবিশেষে আইনি বিচ্ছেদ কিংবা খোরপোশ আদায়ের সপক্ষে অন্যতম আনুষঙ্গিক প্রমাণ হিসেবেও কোর্টে হাজিরা দিতে হয় ‘বিয়ের চিঠি’-কে।
[প্রদর্শিত বিয়ের কার্ডগুলি লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত]
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved