Robbar

আমেরিকার মূল স্রোতে থেকেও বৈপ্লবিক ‘নিগ্রো’ অবস্থান খোয়াতে চাননি কৃষ্ণাঙ্গরা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 2, 2026 8:49 pm
  • Updated:January 2, 2026 8:49 pm  

এখানে পরিবেশ ছিল ইন্দ্রিয়জ। আর ‘ইন্দ্রিয়জ’ বলতেই শুধু মোটা দাগের কিছু শারীরিকতা ভেবে ফেললে আমি অপারগ। সালোঁর সঙ্গে সঙ্গে অভিজাত অন্দরসজ্জায় সূক্ষ্ম রুচি ও বিলাসের মেল, পর্দার কাপড় থেকে গাউনের ঘের, আসবাবের নকশা থেকে মহার্ঘ তৈজস ও কাটলারির পারিপাট্য, পারফিউম থেকে ওয়াইন, বাক্যবিন্যাস থেকে কণ্ঠস্বর প্রক্ষেপণ, বাদ্যযন্ত্র থেকে সংগীত– সবের মধ্যে নারী-পুরুষের নৈকট্যে অবশ্যই আমাদের সালোঁকে সেনসরি ইতিহাসের রসঘন অধ্যায় বলেও পড়তে হবে। তারপর হার্লেম শিল্পকে দর্পিত কৃষ্ণাঙ্গ যৌনতা ও ইরোসের নানা নান্দনিকতা দিয়ে না পড়লে এই রেনেসাঁসের সামগ্রিক উল্লাস ও স্পর্ধাকে বোঝাই যাবে না।

ঈপ্সিতা হালদার

৮.

কিন্তু ‘দ্য ডার্ক টাওয়ার’-এ হার্লেম প্রজন্মের বৌদ্ধিকতা যত বিকশিত হয়, ম্যাডাম ওয়াকারের ব্যবসা ততটা নয়। ফলে সম্পত্তি ক্রোক হতে শুরু করে। এ’লেইলা কেমন বিলাসী জীবন কাটাতেন, কেমন কেতাদুরস্ত ও উচ্চমূল্যের ছিল তাঁর পোশাক-আশাক হীরে-জহরত, এই নিয়ে লোকে কম আক্রমণ করেনি। কিন্তু তিনি ছাড়া হার্লেমের ছবিটা ভাবুন। ঘুপচি চা-কফির দোকানে নামদেও ধসাল, জয়রাম বিঠঠল পাওয়ার, রাজা ঢালে, অরুণ কাম্বলে, রামদাস আঠাওয়ালে– এই দলিত প্যান্থাররা যেমন সস্তার বিড়ি আর লিভারবিনাশক দেশি মদের ভাঁড়ে ফোয়ারা তুলতেন, সেই রকম কিছুটা হত। আমাদের শিল্প-সাহিত্যের বিপ্লব সর্বদা মার্ক্সবাদঘেঁষা বলে বিপ্লবী সাহিত্যের সালোঁনেয়ার একদম কল্পনাই করা যায় না। তাই সালোঁনেয়ার থাক, বিপ্লবের ঐ ঘুপচি চুরুট চায়ের বৈঠকে কোনও প্যান্থারিণীকে দেখতে পাচ্ছেন কি?

সে যাই হোক। গল্পের গতিতে থেকে থেকে গোঁত্তা না খেয়ে সেই ল্যাভিশ ফ্রেঞ্চ গোল্ডেন ওয়াল পেপারে মোড়া, ক্রিমসন শেড ল্যাকার টানা আসবাবে মোড়া হার্লেম সালোঁতে ফিরে যাই চলুন। সেখানে এই যে এ’লেইলা পিয়ানোর সামনে একটা স্টুলে বসে আছেন, বা ঐ যে, যে ছবিটার নিচে তাঁর কেতার দস্তখৎ– টোনি মরিসন থেকে আর দু’-এক আফ্রিকান-আমেরিকান লেখকের থেকে দাসপ্রথা নিয়ে যদি একটু জেনে নিই, বা দেখি যে সেই একই সময়ে আমেরিকার দক্ষিণের জিম ক্রো-র স্টেটগুলিতে কেমন দাসপ্রথা থেকে সবে মুক্তি পাওয়া কালো মানুদের লিঞ্চিং হয়ে চলেছিল, আর শ্বেতাঙ্গ সাধারণ মানুষরাই কেমন ঘৃণা নিয়ে সেই পিটিয়ে-পিটিয়ে মেরে ফেলে ঝুলিয়ে রাখা ক্ষতবিক্ষত কালো মৃত শরীরের চারপাশে ঘুরপাক খেয়ে আনন্দের গররা তুলছিলেন, তাহলে এই সালোঁকে আর এ’লেইলার বিলাসব্যসনকে আমাদের ‘দ্য সাবঅলটার্ন স্পিক’ বলতেই হবে। মনে রাখতেই হবে, যেমন ঐতিহাসিকরা বলেছিলেন, এ’লেইলা চ্যারিটি থেকে পার্টি দুইয়েই ছিলেন। গোষ্ঠীর মানুদের উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে সাহায্য করার যে রীতি ম্যাডাম ওয়াকার নিয়েছিলেন, এ’লেইলা তা চালু রাখেন তো বটেই; আর হার্লেমের সদস্যদের একচেটিয়া পৃষ্ঠপোষক আর কে ছিলেন, এ’লেইলা ছাড়া? 

লিঞ্চিং, ইন্ডিয়ানা

আমেরিকার অন্য শহর থেকে হার্লেম রেনেসাঁসের প্রবল টানে যে শিল্পীরা এসে পড়ছিলেন, তাঁরাও এই সালোঁয় নিয়মিত আসতেন। যেমন শিল্পী আরোন ডগলাস। হারলেম রেনেসাঁসের সামাজিকতার জায়গাই ছিল এ’লেইলার ‘দ্য ডার্ক টাওয়ার’। তবে একে যদি আবারও কৃষ্ণাঙ্গদের বড়লোকি গেটো ভাবেন, ভুল হবে। এখানে মার্কিনি তো বটেই সুইৎজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি থেকে যারা অভিবাসী হয়ে নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন, শিল্পী থেকে ইনভেস্টার, ফোটোগ্রাফার থেকে মানবাধিকার আন্দোলন কর্মী, ফরাসি ও রুশ অভিজাতরা– তাঁরা অনেকেই এ’লেইলার বিশেষ বন্ধু ছিলেন। এর মধ্যে ভিয়েনার আর্ট ডেকো আসবাব ডিজাইনার পল ফ্রাঙ্কল আর জার্মান শিল্পী উইনোল্ড রেইস ‘ডার্ক টাওয়ার’ সালোঁতে ছিলেন নিয়মিত। ১৯২৪-এ হার্লেম রেনেসাঁসের ডিন হিসেবে খ্যাত অ্যালেইন লক ‘সার্ভে গ্রাফিক’ এই মননশীল রাজনৈতিক পত্রিকার যে স্পেশাল ইস্যু সম্পাদনা করছিলেন, তার জন্য উইনোল্ড রেইসকে হার্লেম রেনেসাঁসের ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি আঁকতে দেন। উইনোল্ড রেইসের আঁকা সেই প্রতিকৃতিগুলি সেই সময়ের চরিত্রদের শৈল্পিক উপস্থাপনার আর্কাইভই শুধু হয়, প্রতিকৃতিগুলি দেখলেই বোঝা যায় তিনি কীভাবে ‘নিগ্রো’কে ছবিতে উপস্থাপনা করার স্টিরিওটাইপ ভেঙে দিয়েছিলেন। ১৯২৫-এ ‘সার্ভে গ্রাফিক’-এর স্পেশাল ইস্যু ‘Harlem: Mecca of the New Negro’-র প্রচ্ছদে ছিল হার্লেম রেনেসাঁসের অন্যতম সংগীত-ব্যক্তিত্ব রোনাল্ড হায়েস। যদিও উইনোল্ড রেইস এ’লেইলার কোনও প্রতিকৃতি এঁকেছেন বলে জানা যায় না। কিন্তু এ’লেইলা তাঁর অন্দরসজ্জার জন্য বরাত দেন পল ফ্রাঙ্কলকে। তাঁর ডিজাইন করা ‘স্কাইস্ক্রেপার বুক ক্যাবিনেট’ সালোঁর একটি দর্শনীয় বস্তু হয়ে পড়ে। এ’লেইলা এই ক্যাবিনেট থেকে তাঁর সালোঁর লোগো তৈরি করান। আমন্ত্রণপত্রে ডার্ক টাওয়ারের লোগো হিসেবে ক্যাবিনেট ছাপা থাকে। 

‘সার্ভে গ্রাফিক’-এর স্পেশাল ইস্যু ‘Harlem: Mecca of the New Negro’-র প্রচ্ছদ

তবে হার্লেমের আফ্রিকি-আমেরিকি শিল্পীদের মধ্যে অনেকেই, যেমন জেমস অগাস্টাস ভ্যানডারজি ও বেরেনিস অ্যাবট– এ’লেইলা ও তাঁর সালোঁর যে ছবি তুলে গেছেন, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ। রিচমন্ড বার্থ ও অগুস্তা সাভাজ (১৮৯২-১৯৬২) এ’লেইলার বাস্ট তৈরি করেন। যদিও এই দুই স্কাল্পটরের কাজ বহু আলোচিত, এঁদের করা অ্যালেইন লক ও অন্যান্য আইকনদের হেড স্টাডির ছবি দেখতে পেলেও এ’লেইলার বাস্টের ছবি কোথাও খুঁজে পেলাম না। ডার্ক টাওয়ারে নিয়মিত বেরেনিস অ্যাবট এর পরে প্যারিতে চলে যান এ আমরা আগের কিস্তিতেই জেনেছি। আমেরিকা ফিরে এসে আর্বান নিউ ইয়র্ক গড়ে ওঠার ইতিহাস তাঁর তোলা ছবিতে যেমনভাবে ধরা পড়েছে, তা আকর বললেই ভালো হয়। তার আগে প্যারিতে গারট্রুড স্টেন ও সালোঁ ব্যক্তিত্বরা ছিলেন তাঁর ক্যামেরার বিষয়। 

কিন্তু হার্লেম হার্লেম হার্লেম এক নিঃশ্বাসে আউড়ে গেলেও, যৌথ অস্তিত্বই এর মূল চালিকাশক্তি হলেও, ব্যক্তি-কবি-শিল্পী-নির্ভর নিজস্বতা ও স্বাতন্ত্র তো ছিলই। এর মধ্যেই একটা নতুন প্রজন্ম উঠে আসায়, সেভাবেও কথন-ভঙ্গিতে এক ধরনের বদল চলে আসে। কাউন্টি কালেন বা জোরা নেইল হার্সটনকে দিয়েই দেখি না কেন! কাউন্টি কালেনের চলনে বলনে লেখায় আত্মদীপ্ত ভাবটা হার্লেমের পরের প্রজন্মের নিজস্বতা। এঁর খানিক প্রডিজিসুলভ আত্মবিশ্বাসী আত্মবিলাসী উচ্চারণ নজরুলের কিছু কবিতা ও ভাষণের কথা মনে করিয়ে দেয়। দু বোয়া বা ল্যাংস্টন হিউজেস-এর হার্লেম দর্শন নিয়ে লেখা থেকে স্পষ্ট যে আমিত্বের জোশে ব্যক্তি কবি লেখক গোষ্ঠীর ভিত্তি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, যা হলে হার্লেম আফ্রিকি-আমেরিকি অস্তিত্বকে তার স্বকীয়তা নিয়ে তৈরি করে ওঠা যাবে না। দু বোয়া যেমন প্যান-আফ্রিকানিজমের আরেক প্রবক্তা জামাইকার নেতা মার্কাস গার্ভের নিজেকে আফ্রিকার সম্রাট বলে ঘোষণা করে মুকুট ও আলখাল্লা পরে বিরাট কার্নিভ্যাল হেন প্রসেশানের পপ্যুলিজম পথ একেবারেই রাজনীতির উপযুক্ত পথ বলে মনে করতেন না। 

দু বোয়ার মতো ল্যাংস্টন হিউজেসের কথা ছিল, অতি দুরূহ পথে আফ্রিকি ও আমেরিকি এই দুই সত্তাকেই দাবি করতে হবে। আত্মপরিচয়ের রাজনীতির সুত্রপাতেই কবিরা যদি, আমি একজন কবি– একজন নিগ্রো কবি নই– এই দাবি করেন, শিল্পীরা যদি নিজেদের শুধু শিল্পী হিসেবে দাবি করতে যান, তাহলে আফ্রিকি উত্তরাধিকার ছেড়ে তাঁরা সমসত্ত্ব ও হেজিমনিক আমেরিকি আধুনিকতায় গ্রস্ত হয়ে যেতে পারেন। ল্যাংস্টন হিউজেসের কাছে কাব্যভাষায় আফ্রিকি গায়ন ব্লুজ, নিগ্রো স্পিরিচ্যুয়াল, জ্যাজ ও আফ্রিকি জীবন ওতপ্রোত। ল্যাংস্টন হিউজেস তাঁর ‘The Negro Artist and the Racial Mountain’ প্রবন্ধে এই যে আশঙ্কার কথা বলেন, তা কাউন্টি কালেনের নাম করে সরাসরি কিছু না বললেও, দু’জনের ভাষ্যে কাব্য ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে দু’জনের আলাদা ও বিরোধী অবস্থান স্পষ্ট থাকে। ল্যাংস্টন হিউজেসের চিন্তা ছিল আমেরিকি মূল স্রোতের উচ্চারণে শামিল হতে গিয়ে, বাণিজ্যিক সাফল্যের চক্করে ‘নিগ্রো’ এই বৈপ্লবিক অবস্থানই না খুইয়ে বসেন এঁরা।

সেভাবে দেখতে গেলে দু বোয়া, অ্যালেইন লকের অবস্থান ছিল অ্যাকাডেমিক। গবেষণা, ও পেডাগজির কাঠামোয় ‘নিগ্রো’ রেসকে আমেরিকা ইয়োরোপের রেসবিদ্বেষী জ্ঞানতত্ত্ব থেকে বের করে নতুন জ্ঞানতত্ত্ব তৈরির জন্য এঁদের মতাদর্শে স্বভাবতই চিন্তনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল। ল্যাংস্টন হিউজেসের প্রযত্ন ছিল আফ্রিকি ঐতিহ্যকে কীভাবে আফ্রিকি-আমেরিকি আত্মপরিচয়ের দর্শন ও একইসঙ্গে শিল্পের ভাব ও শৈলীতে পরিণত করা যায়। নৃতাত্ত্বিক হিসেবে দু বোয়া ও অ্যালেইন লকের মনে হচ্ছিল, জোরা হার্সটন আমেরিকার দক্ষিণের স্টেটে পরিবারগুলি ঘুরে ঘুরে যে বাচন ও বচন সংগ্রহ করে আনছেন– সেগুলিতে আফ্রিকি স্বর কোনও সামাজিক প্রেক্ষিতে না দেখে, ঐতিহাসিক মাত্রায় না বুঝে, শুধু বিশুদ্ধ ফোকলোরিক। জোরার গবেষণায় আফ্রিকি চেতন স্থবির অতীতমাত্র, ঠিক যেভাবে আফ্রিকাকে দেখতে শ্বেতাঙ্গ নৃতাত্ত্বিকরা দেখতে চান। ঠিক যেভাবে আমেরিকার অ্যাকাডেমিয়া থেকে মিডিয়া ইতিহাসবিহীন আদিম আফ্রিকার যে সারল্য খুঁজে পেতে চায়, জোরা তাঁদের জন্য সেই আফ্রিকাকে খুঁজে দিয়েছেন। অন্যদিকে জোরার গবেষণা নিয়ে এই একই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ‘Their Eyes Were Watching God’ (১৯৩৭) ছেপে বেরনোর পরে ল্যাংস্টন হিউজেস তাঁর অপছন্দ জানিয়েছেন। তাঁর মনে হয়েছে, লেখাটি ঠিক বাক্যবন্ধে গেথে না উঠে ফোকসি ধাঁচের হয়ে রয়েছে, ভাঙা ভাঙা কথা, টুকরো টুকরো ইম্প্রেশান। নতুন যে এক ধরনের নাগরিকতা এই সব লেখায়, ল্যাংস্টন হিউজেস তা গ্রহণ করতে পারেননি বলেই মনে হয়। আসলে কে আদত ‘নিগ্রো’– কার তাঁর কথা কীভাবে কে বলবেন, এই নিয়ে একটি পলেমিকের চর্চা হার্লেমের অঙ্গ। 

সেই ধারায় অ্যালেইন লক থেকে রিচার্ড রাইট একইরকম জোরালো বক্তব্যে জোরার সাহিত্যের রীতির সঙ্গে অসম্মতি দেখিয়েছেন। রিচার্ড রাইট তো বলেই দিয়েছিলেন, এই লেখা ‘carries no theme, no message, no thought’, রয়েছে শুধু এক ধরনের সাদামাটা শারীরিকতা (facile sensuality)। অবশ্যই মার্ক্সবাদী সাহিত্য সমালোচকের কাছ থেকে মার্ক্সবাদী পত্রিকায় এরকম সমালোচনাই হওয়ার কথা। কিন্তু ১৯২৫-১৯৩২ কালে ল্যাংস্টন ও জোরার মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সাক্ষী এ’লেইলার সালোঁ। তাই জোরার লেখার প্রতি ল্যাংস্টনের নেতিবাচক মনোভাবের একটা আলাদা মাত্রা আছে বইকি। আমেরিকার দক্ষিণ স্টেটগুলির পরিস্থিতি নিয়ে যৌথভাবে ‘Mule Bone: A Comedy of Negro Life’ (১৯৩১) নাটকটি লিখে একসঙ্গে মঞ্চস্থ করার সময় দু’জনের মতবিরোধ তুঙ্গে ওঠে। সে নিয়ে হেনরি লুই গেটস জুনিয়ার তো আবেগের বশে বলেই দিয়েছিলেন, ‘the most notorious literary quarrel in African-American cultural history’। 

জোরার পারিবারিক সামর্থ্য ছিল না। দাসপ্রথা অবলোপের পরের চল অনুযায়ী শ্বেতাঙ্গ হিতকারীদের সাহায্য নিয়ে জোরাকে গবেষণা ও লেখা চালাতে হত। যে জোরা ল্যাংস্টনকে বলেছিলেন যে, তিনিও চান একটা সালোঁ খুলতে আর নিশ্চয়ই এ’লেইলা তাঁকে সাহায্য করবেন, সেই জোরার লেখা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একেবারে হারিয়ে যায়। হার্লেম রেনেসাঁসের যে ঘরানা তৈরি হয়, তাতে তিনি নগণ্য হয়ে যান। পাঠকরা তাঁর কথা ভুলেই যায়। এ’লেইলার মৃত্যুর পরে অবিচ্যুয়ারি লেখেন ল্যাংস্টন। ১১ হাজার মানুষ আসেন তাঁকে শেষবার দেখতে, আর শেষকৃত্যের সার্ভিসে আসেন হাজার। আর যে জোরা ল্যাংস্টনকে লিখেছিলেন যে, যে আফ্রিকি-আমেরিকি মানুষ সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন, তাঁদের জন্য আলাদা একটি সেমেট্রি করা হোক, যাতে পরের প্রজন্ম তাঁদের খুঁজে পায় সেখান এসে, সেই জোরা ফলকহীন কবরে কোনও একটা কোনায় নামহীন হয়ে পড়ে রইলেন। শেষ জীবনে জোরার হাতে কোনও টাকাকড়ি ছিল না। 

এ’লেইলার মৃত্যুর পরে ল্যাংস্টনের লেখা অবিচ্যুয়ারি, ১৯৩১

তিনি সেইভাবেই বিস্মৃত হয়ে থাকতেন আর তিনি মাটির সঙ্গে মিশে যেতে যেতে তাঁকে বাদ দিয়েই উপর্যুপরি লেখা হয়ে যেতে থাকত হার্লেমের ইতিহাস, যদি না শেষ অবধি লেখক প্রাবন্ধিক নারীবাদী আন্দোলনে শামিল অ্যালিস ওয়াকার আমাদের মায়েদের হৃত বাগানের সন্ধানে বেরতেন। তাঁর প্রবন্ধ “In Search of Our Mothers’ Garden” (১৯৭৪)-এ অ্যালিস ওয়াকার বললেন যে, মা মাতামতী পিতামহী ঠাকুমা দিদিমা তস্য তস্য মায়েরা আসলে শিল্পী। তাঁদের জীবনে শ্রমে গায়নে কথনে হাঁটায় যে জীবন রয়েছে সেই-ই গোষ্ঠীর উত্তরাধিকার। এক নারী থেকে অন্য নারী, এক প্রজন্মের নারীদের থেকে অন্য প্রজন্মের নারীদের কাছে বয়ে আসা স্মৃতি, অবচেতনে ধারণ করা ভঙ্গিমা ও স্বর, ও শ্রমসাধ্যতা– এই সবই সচেতনে জেনে জীবনে ও শিল্পে পুনর্বার রচিত করা কর্তব্য, এ অ্যালিস বললেন। তিনি সেই আটের দশকে আমেরিকার নারীবাদে নতুন কৃষ্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বাঁক এনে নাম দিলেন উওম্যানিজম। বললেন, ‘A womanist is a woman who loves other women, sexually and/or nonsexually. Appreciates and prefers women’s culture, women’s emotional flexibility (values tears as natural counterbalance of laughter), and women’s strength. Sometimes loves individual men, sexually and/or nonsexually. Committed to survival and wholeness of entire people, male and female. Not a separatist, except periodically, for health.’

ল্যাংস্টন এবং জোরা

এই উওম্যানিজমে, পূর্বনারীদের সন্ধানে অ্যালিস জোরার সব লেখাকে খুঁজে বের করলেন, নতুন করে পড়লেন, পড়ালেন। তিনি যখন সেমেত্রির অন্ধকার আগাছা ভরা এক কোনায় নামহীন পড়ে থাকা জোরার গ্রেভ আবিষ্কার করলেন, তাঁর মনে কী পরিমাণে আলোড়ন হয়েছিল, তা আমরা এত দূর থেকেও অনুমান করতে পারি। ১৯৪০-এর দশকের শেষদিক থেকে ক্রমে হারিয়ে যাওয়া জোরাকে অ্যালিস ওয়াকার জোরা নেইল হার্সটনের অসীম মহিমায় ফিরিয়ে আনলেন আটের দশকে। জোরা হয়ে উঠলেন হার্লেম প্রজন্মের ক্ল্যাসিক একটি দৃষ্টান্ত। Ms. পত্রিকায় ছাপা তাঁর ‘In Search of Zora Neale Hurston’ (1975) প্রবন্ধে অ্যালিস ওয়াকার বললেন, ‘I recognized her immediately as someone I wanted to meet. I wanted to hear her voice, the voice that spoke directly and firmly from herself and from her people.’ আমাদের জন্য অ্যালিস ওয়াকার হয়ে উঠলেন জোরা নেইল হার্সটনের কিউরেটর, তাঁর রচনার কিউরেটর। সেই থেকে ওয়াকার জোরা নেইল হার্সটন আফ্রিকি-আমেরিকি লেখকদের পাঠ তালিকায় অগ্রগণ্য। সাহিত্যের নারীবাদী আলোচনায় অবশ্যম্ভাবী। ইউনিভার্সিটির শুরুর দিকে জোরা রিডার ‘I love myself when I am laughing and then again when I am looking mean and impressive’ এই বইটা হাতে এসে পড়ায় আমরা একেবারে স্তম্ভিত হয়ে যাইনি? মলাটে তাঁর হেসে ওঠা ছবির মধ্যে এক ধরনের অভূতপূর্ব স্মার্টনেস আর সেলফলাভ আমাদের কী পরিমাণে অনুপ্রাণিত করেছিল, তা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। এখনও কি আমরা নিজেরা জায়গায় জায়গায় খানিক হেয় বোধ করলে এই বইটির নাম একবার মনে মনে আউড়ে নিই না? 

জোরা রিডার ‘I love myself when I am laughing and then again when I am looking mean and impressive’

এইখানে সালোঁ যাত্রা আপাতত থামিয়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার আছে আমাদের। আমরা খেয়াল করতে করতে গেছি যে, সালোঁ শুধু অভিজাত মহিলাদের বিলাসচক্র ছিল না কখনও। যখন সমাজে লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না, প্রতিষ্ঠানে শামিল হওয়ার বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার অধিকার ছিল না, ভোটাধিকার ছিল না, লেডিরা কীভাবে সালোঁতে তাঁদের বুদ্ধিচর্চার সুযোগ করে নিয়েছিলেন। যখন তাঁদের আদৌ কী সৃজনশীলতা আছে এইটা জানার কোনও উপায় ছিল না, মেটানোর পথ ছিল না, কীভাবে তাঁরা নিজেরাই সব হোতাদের নিজেদের চারপাশে ডেকে নিয়ে সৃজনশীলতার তৃষ্ণা মেটাতেন, সে বারবার ফিরে গিয়ে আরও অনেক বিশদে খুঁজে দেখার ও পড়ার প্রয়োজন। এটা মননশীলতার ইতিহাসের একটা চাপা পড়া অন্য দিক। 

আবারও এইভাবে বলতে গিয়ে আমি কিন্তু সালোঁকে শুধু বুদ্ধি ও মননের পরিসর বলে একরৈখিক ও কেঠো সিরিয়াস করে ফেলতে চাইছি না। আগেও উল্লেখ করেছি, এখন ফিরে বলতে চাই যে, অবশ্যই এখানে পরিবেশ ছিল ইন্দ্রিয়জ। আর ‘ইন্দ্রিয়জ’ বলতেই শুধু মোটা দাগের কিছু শারীরিকতা ভেবে ফেললে আমি অপারগ। সালোঁর সঙ্গে সঙ্গে অভিজাত অন্দরসজ্জায় সূক্ষ্ম রুচি ও বিলাসের মেল, পর্দার কাপড় থেকে গাউনের ঘের, আসবাবের নকশা থেকে মহার্ঘ তৈজস ও কাটলারির পারিপাট্য, পারফিউম থেকে ওয়াইন, বাক্যবিন্যাস থেকে কণ্ঠস্বর প্রক্ষেপণ, বাদ্যযন্ত্র থেকে সংগীত– সবের মধ্যে নারী-পুরুষের নৈকট্যে অবশ্যই আমাদের সালোঁকে সেনসরি ইতিহাসের রসঘন অধ্যায় বলেও পড়তে হবে। তারপর হার্লেম শিল্পকে দর্পিত কৃষ্ণাঙ্গ যৌনতা ও ইরোসের নানা নান্দনিকতা দিয়ে না পড়লে এই রেনেসাঁসের সামগ্রিক উল্লাস ও স্পর্ধাকে বোঝাই যাবে না। তবে একদিকে জ্যাজ ব্লুজ সংগীত, থিয়েটার হল, প্রকাশনা, অন্যদিকে নাইট ক্লাবগুলিতে ক্যাবারের ভিন্ন ভিন্ন নান্দনিকতা ও সামাজিকতা, শিল্পে সরাসরি দ্রোহ না থাকলেও অন্তর্লীন ছাঁচভাঙার প্রবণতার আলোচনা, আমরা সালোঁ সাপেক্ষে এই যাত্রায় মুলতুবি রাখলাম। এই আলোচনাও বাকি রাখলাম যে, হার্লেমের প্রতিবেশ যেমন কৃষ্ণাঙ্গ রেনেসাঁসের ছিল, তেমনই হারলেম ছিল কৃষ্ণাঙ্গ শ্বেতাঙ্গ নির্বিশেষে, স্ট্রেট-গে-লেসবিয়ান-বাইসেক্সুয়াল নির্বিশেষে মার্কিন তরুণ প্রজন্মের বোহেমিয়ান বেচে থাকা ও স্ট্রিট ফ্যাশানের ‘কুল’ আখড়া। প্রতিষ্ঠানের বাইরে। প্রতিষ্ঠান ভাঙার জন্য। 

ডার্ক ম্যাডোনা, নিউ নিগ্রো ইলাসট্রেশন
দ্য ব্রাউন ম্যাডোনা, নিউ নিগ্রো-র ইলাসট্রেশন

এখানে সালোঁয় আমরা খুঁজে পেতে চাইলাম একটা নারী পরম্পরা। তা শেষে এ’লেইলা ওয়াকার থেকে অ্যালিস ওয়াকারে আসতে পেরে আমাদের যাত্রাটা সুবিধের হল। কারণ আমাদের জন্য অ্যালিস ওয়াকার বলে দিয়ে গেলেন: ‘We are a people. A people do not throw their geniuses away. And if they are thrown away, it is our duty as artists and as witnesses for the future to collect them again for the sake of our children, and, if necessary, bone by bone.’ (In Search of Our Mother’s Gardens)। 

… পড়ুন চিন্তামহল-এর অন্যান্য লেখা …

পর্ব ১: চলতি পরিবার ধারণার বাইরের মেয়েদের বেঁচে থাকার জমকালো মঞ্চ প্যারির সালোঁ

পর্ব ২: এনসাইক্লোপিডিয়ার বিপুল কাজ জিন জুলির সালোঁতেই রমরম করে চলতে শুরু করেছিল

পর্ব ৩: মাদাম জারমেইনের বই-ই ইতিহাসে প্রথম, যার পাণ্ডুলিপি নষ্ট করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল শাসক

পর্ব ৪: মাতিস আর পিকাসোর ইগোর লড়াই

পর্ব ৫: মহিলা-চালিত স্ট্রিট বুকশপ থেকে পাবলিক লাইব্রেরি

পর্ব ৬: সালোঁ-র ইতিহাস কৃষ্ণাঙ্গদের ব্রাত্য করে রাখেনি

পর্ব ৭: বর্ণবৈষম্যের আমেরিকায় সাদা-কালোর মিশ্র একটা শহরতলি