Robbar

সিনেমা নিজেও ভাবে ও ভাবায়, জানান দেয় বেলা তারের সিনেমা-দর্শন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 13, 2026 12:12 pm
  • Updated:January 13, 2026 12:12 pm  

তারের ছবির বৈশিষ্ট্যই হয়ে ওঠে লম্বা, জটিল শট, একেকটার দৈর্ঘ্য কোথাও কোথাও কয়েক মিনিট; একই শটে আড়াআড়ি অনেক কিছু ঘটে যায়, বা কখনও কখনও কিছুই ঘটে না, যেন সময়ের নিরন্তর বয়ে চলাই সেই শটের একমাত্র উপজীব্য, দর্শক যেন এক নিমজ্জনের সাধ পান, তার অভিজ্ঞতায় যেন ছবির পরিচালক বাধা না হয়ে দাঁড়ান, এরকমই যেন অভিলাষ তারের। কোনও কোনও সমালোচক একে সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘টেম্পরাল রিয়ালিজম’ বলে। তারের মত ছিল যে, যতক্ষণ না এটা হবে, ততক্ষণ সময় নিতে পারেন তিনি। নিয়ে যাবেন। ক্যামেরা স্থিতু থাকবে। বৃষ্টি হতে থাকবে। মদ্যপান চলতে থাকবে। রাস্তা বহমান থাকবে। যে কেউ হয়তো এক নাগাড়ে চেয়ে থাকবেন একটা বিশালাকায় মৃত তিমির চোখের দিকে। ঠিক যেমন তিমিটিও মরা কিন্তু খোলা চোখ নিয়ে চেয়ে থাকবে তার দিকে।

সায়নদেব চৌধুরী

২০১১-তে বেলা তার সিনেমা থেকে অবসর নিয়েছিলেন। হ্যাঁ, অবসর। কারণ? ‘আমার যা বলার ছিল বলা হয়ে গেছে’। খুব বেশি কথার মানুষ তার কোনওকালেই নয়। তাই অবসর নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দেননি। কিন্তু সরেও আসেননি। এ সপ্তাহের শুরুতে, ৭০ বছর বয়সে, মৃত্যু অবধি আরও ১৫ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি।

বেলা তার

অবসরের পর ইনস্টলেশন করেছেন। আর্ট প্রজেক্ট করেছেন। সিনেমা স্কুলে পড়িয়েছেন। কিন্তু অবসর ভাঙেননি। তারের এই অবস্থানকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলা যেতেই পারে। কিন্তু যে কোনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তেরই একটা সামাজিক দিক থাকে। সেই সূত্র ধরে যা জিজ্ঞাস্য হয়ে ওঠে, তা শিল্পীর অবসর সংক্রান্ত। সাধারণভাবে যাদের কর্মক্ষেত্র বা কর্মক্ষম পূর্বনির্ধারিত, তারাই অবসর নেন। যেমন চাকরিজীবী বা খেলোয়ার। ব্যবসায়ী ভার ছেড়ে দেন পরবর্তী প্রজন্মকে। কিন্তু শিল্পীর অবসর তো ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর মতো। আরও বড় প্রশ্ন, ঠিক কখন শিল্পী বুঝতে পারেন যে, তার সব কথা বলা হয়ে গেছে? এটা কি আত্মতৃপ্তি না আত্মসংযম? না কি যে কোনও শিল্পীই বুঝতে পারেন যে, সদা-ক্ষয়িষ্ণু এই পৃথিবীতে তাঁদের শৈল্পিক বাসনার আসল পূর্ণতাই সমাপ্তিকে অভিষঙ্গ করে?

বেলা তারের সিনেমা দেখলেই বোঝা যাবে যে, শেষের সম্ভাবনাটাই তার-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল। তার-কে তুলনা করা হয় তারকোভস্কি বা ম্যাক্স ওফালস-এর ছবির সঙ্গে। তার ক্যামেরা যেন এক চলমান অশরীরী, যার চোখ অনায়াসে ব্যাপ্ত করে দেয় পর্দার সময়ক্রম ও স্থানের ব্যবহার। আবার একইসঙ্গে সেই ক্যামেরা যেন মনে করিয়ে দেয়, এক ক্ষমতাধর উপস্থিতিকে, সর্বক্ষণ যে কি না জানিয়ে দিয়ে থাকে যে, মুহূর্ত মাত্রই ভঙ্গুর, সময় মাত্রই সীমিত, স্থান মাত্রই পরিবর্তনশীল। তাই সর্বদাই এক্সটিঙ্কশন শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বেলা তারের ছবির দিকে।

‘তুরিন হর্স’ ছবির একটি দৃশ্য

ভিক্টর ওবান নামক ট্রাম্প-ভক্ত ফ্যাসিস্ট নেতার শাসনাধীন বর্তমান হাঙ্গেরি বিচলিত, বিরক্ত করত বেলা তার-কে। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত হাঙ্গেরির লিবারেল-জগৎ। যেমন বুদাপেস্টের মেয়র ও হাঙ্গেরির বিরোধী দলনেতা জর্জলি কারাকসনি বলেছেন যে, বেলা তার ছিলেন তাঁর জানা সর্বাধিক স্বাধীন ব্যক্তি, সারাজীবন যিনি একটাই সত্তার জন্য লড়েছেন: মানুষের ডিগনিটি বা মর্যাদা।

১৯৭৯-এর ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ দিয়ে শুরু। ২২ বছর পর ২০১১-এর ‘তুরিন হর্স’ দিয়ে শেষ। এর মধ্যে সাতটা ছবি। প্রত্যেক বছর ছবি করতেন না। যেমন, ১৯৮৮ থেকে ২০০০ অবধি করেছেন মাত্র তিনটি ছবি। মোটামুটি এই সময় থেকেই বেলা তারের ছবির মুক্তি ছিল একটা ইভেন্ট। এমির কুস্তুরিকা, থিও এঞ্জেলোপোলোস তো বটেই, তার পরবর্তী দশকে আলমোদোভার, ওং কার ওয়াই ও কিয়ারোস্তামির সঙ্গেও আর্ট-হাউস সিনেমার বিশ্ববন্দিত কাপ্তেন হয়ে উঠলেন তার। সঙ্গে লাজলো ক্রাজনাহরকাইয়ের আশ্চর্য লেখনী।

‘ফ্যামিলি নেস্ট’ ছবির একটি দৃশ্য

‘তুরিন হর্স’ ছাড়া তাঁর সেরা তিন ছবি ধরা হয় ‘ড্যামনেশন’ (১৯৮৮), ‘স্যাট্যানট্যাঙ্গো’ (১৯৯৪) ও ‘ওয়ার্কমেইস্টের হারমনি’ (২০০০)। বলা হয়, তাই চারটে ছবিতেই সবচেয়ে বিশুদ্ধভাবে ধরা পড়ে তারের অনন্য স্টাইল: মুচমুচে গল্প বলার থেকেও যে ‘ফর্ম’-এর মূলে ছিল ছবির ক্রম, স্থান ও আবহ-কে সরাসরি দর্শকের নাড়ির মধ্যে চালনা করে দেওয়া, যাতে থিয়েটারের অন্ধকার হলে বসে দর্শকের সঙ্গে ছবির চরিত্রের কোনও ফারাক না থাকে, পর্দার সূক্ষ্মতম অনুরণনও যাতে সঞ্চারিত হয় দর্শকের মধ্যে।

‘তুরিন হর্স’ ছবির একটি দৃশ্য

তারের ছবির বৈশিষ্ট্যই হয়ে ওঠে লম্বা, জটিল শট, একেকটার দৈর্ঘ্য কোথাও কোথাও কয়েক মিনিট; একই শটে আড়াআড়ি অনেক কিছু ঘটে যায়, বা কখনও কখনও কিছুই ঘটে না, যেন সময়ের নিরন্তর বয়ে চলাই সেই শটের একমাত্র উপজীব্য, দর্শক যেন এক নিমজ্জনের সাধ পান, তার অভিজ্ঞতায় যেন ছবির পরিচালক বাধা না হয়ে দাঁড়ান, এরকমই যেন অভিলাষ তারের। কোনও কোনও সমালোচক একে সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘টেম্পরাল রিয়ালিজম’ বলে। তারের মত ছিল যে, যতক্ষণ না এটা হবে, ততক্ষণ সময় নিতে পারেন তিনি। নিয়ে যাবেন। ক্যামেরা স্থিতু থাকবে। বৃষ্টি হতে থাকবে। মদ্যপান চলতে থাকবে। রাস্তা বহমান থাকবে। যে কেউ হয়তো এক নাগাড়ে চেয়ে থাকবেন একটা বিশালাকায় মৃত তিমির চোখের দিকে। ঠিক যেমন তিমিটিও মরা কিন্তু খোলা চোখ নিয়ে চেয়ে থাকবে তার দিকে।

বেলা তারের কাজের একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেতে হলে ‘হার্ভার্ড ফিল্ম আর্কাইভ’-এর দিকে তাকানো যেতে পারে। সাদা-কালো ছবিতে, লম্বা শটের সঙ্গে যুক্ত হয়– “a hypnotic rhythm and enigmatic stories (which are) imbued with a sense of impending doom. In each film Tarr pushes these unmistakable qualities to a seemingly insurmountable extreme, giving way to the mesmerizing monumentality of his audacious seven-and-a-half-hour epic Sátántangó and the stark minimalism of his brilliant summary work The Turin Horse, Tarr’s latest and declared last film.”

ক্রাজনাহরকাইয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘স্যাট্যানট্যাঙ্গো’ (১৯৯৪) ছিল ৪৫০ মিনিটের ছবি। উপন্যাসটির মূল সময়ক্রম দিন তিনেকের, কিন্তু তারের মনে হয়, যে অন্তকালের কথা উপন্যাসটিতে বলা হয়েছে তাকে চটজলদি দু’-ঘণ্টায় সেরে ফেললে উপন্যাসটির অন্তরে, তার গহ্বরে প্রবেশ করা যাবে না। কমিউনিজম-উত্তর হাঙ্গেরির প্রান্তিক মানুষের বিক্ষিপ্ত, তারছেঁড়া দৈনন্দিন জীবনই ছিল টারের ‘মিউস’। ক্রাজনাহরকাইয়ের উপাখ্যানে সেটাই পেলেন তিনি। কমিউনিজমের পতন অর্থে টেলস-এর হারিয়ে যাওয়া, সমাজের, মানুষের, সময়ের পদক্ষেপে আগামীর কোনও বার্তা না থাকা। এটাকেই অন্তকালের সূচনা হিসাবে দেখেছেন ক্রাজনাহরকাই আর তাঁর সূত্র ধরে তার। তাই অন্তকালের এগিয়ে আসাটাকে গ্রানুলার বা অণুবীক্ষক সময়ের পরিমাপে ধরায় সচেষ্ট হন তার, সরিয়ে রাখেন চলতি সিনেমার কিছু অভ্যাসগত ব্যাকরণ। এর ফল হল যে ‘স্লো সিনেমা’ মুভমেন্ট– যা ছিল একই সঙ্গে একটি পরীক্ষা ও অভ্যাস নির্ধারিত, সত্বরনির্মিত, ‘ফাস্ট ফুড’ সম সহজপাচ্য সিনেমার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ– তার আইকনিক ছবি হয়ে উঠল ‘স্যাট্যানট্যাঙ্গো’।

এ-প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, ওই সময়ে হাঙ্গারির বাইরে ক্রাজনাহরকাই ছিলেন একেবারে অচেনা। বেলা তারের ছবির সূত্রেই তাঁর বিশ্ব পরিচিতি প্রাপ্তি। সেই ক্রাজনাহরকাই ক্রমে অনূদিত হলেন, বিশ্বময় পরিচিতি লাভ করলেন ও স্যাট্যানট্যাঙ্গো-পরবর্তী আরও কিছু অবাক করে দেওয়া উপন্যাস। শেষে ২০২৫ সালে পেলেন নোবেল পুরস্কার। বেলা তার ছাড়া ক্রাজনাহরকাইয়ের এই পরিসমাপ্তি আদৌ হত কি না, বলা মুশকিল। তাই সেই বছর শেষ করতে না করতেই দীর্ঘ রোগভোগের পর বেলা তারের মৃত্যু যেন তাঁর ও ক্রাজনাহরকাইয়ের কাহিনিকে এক আশ্চর্য সমাপতন দিল।

‘স্যাট্যানট্যাঙ্গো’ ছবির একটি দৃশ্য

শেষ করা যাক, তারের ছবির এক একনিষ্ঠ দর্শকের জবানবন্দি দিয়ে। ‘ফ্রন্টলাইন’ পত্রিকার সাংবাদিক ও অন্যতম সম্পাদক জিনোয় জোসে পি লিখেছেন, দেখার অভিজ্ঞতা। “I watched Sátántangó a decade ago. The experience defies description. Tarr’s long takes– some lasting 10, 12, 15 minutes without a cut– forced a tectonic shift in how attention functioned in me. You stopped waiting for something to happen and began noticing what was already there: the texture of rain on stone, the particular quality of light in a bar where hope had gone to die, the way a human face in extended close-up reveals not personality but something closer to geology. The silences were structural, load-bearing. In them, you heard the film thinking.”

সিনেমা শুধু ভাবা প্র্যাকটিস করতে যে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, তাই নয়, সিনেমা যে নিজেও ভাবে, ভাবতে পারে, ভাবার ক্ষমতা রাখে তাই যেন বারবার জানান দিয়ে যায় বেলা তারের সিনেমা। পৃথিবী যখন শুধুই গতির দাস, চারপাশের সবকিছুই যখন শুধুই হঠকারি হুলুস্থুল, তখন জুলে ভার্নের গল্পের মতো পৃথিবীর গহীন অন্তরে, অস্তিত্বের সুপ্ত গর্ভগৃহে যেন হানা দিত বেলা তারের ছবি।