Robbar

যে বই হাতে অদ্রীশ বর্ধনের কথা মনে পড়ে যায়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 15, 2026 8:06 pm
  • Updated:January 15, 2026 8:06 pm  

কল্পকাহিনিকে কি আজকের বাংলা বাজার পাত্তা দেয়? এরই ফাঁকে স্পেকুলেটিভ ফিকশনের নামে কিছু ‘অশ্বডিম্ব’ প্রসব করে বিষয়টি আরও ঘেঁটে দিয়েছেন কেউ কেউ। তবে কল্পনার আশ্চর্য জগতে ভাসতে যিনি চান, তিনি থোড়াই কলেজ স্ট্রিটের এই অশ্লীল রাজনীতিকে পাত্তা দেবেন! কল্পকাহিনির এক অসামান্য শাখা ‘ফিউটারিস্টিক নভেল’ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় লেখা হচ্ছে তবু। সুমিত বর্ধন বা আরও কেউ কেউ লিখেছেন। এবার হাতে এল এই বই– ‘মহাশূন্যে সিন্দআবাদ’। 

বিশ্বদীপ দে

‘ইমাজিনেটিভ ফিকশন, ইট ট্রেইনস পিপল টু বি অ্যাওয়ার দ্যাট দেয়ার আর আদার ওয়েজ টু ডু থিংস অ্যান্ড আদার ওয়েজ টু বি… দ্যাট দেয়ার ইজ নট জাস্ট ওয়ান সিভিলাইজেশন অ্যান্ড ইট ইজ গুড অ্যান্ড ইট ইজ টু দ্য ওয়ে উই হ্যাভ টু বি।’ প্রবল খ্যাতনামা লেখিকা উরসুলা লেগুইন এই কথাগুলি বলেছিলেন তাঁকে নিয়ে তৈরি ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস অফ উরসুলা লেগুইন’ নামের একটি তথ্যচিত্রে। সদ্য প্রকাশিত একটি বাংলা বই পড়তে পড়তে সেই কথাগুলি নতুন করে মনে পড়ল। উরসুলা কথিত ‘ইমাজিনেটিভ ফিকশন‌’ বাংলা ভাষায় যে লেখা হয়নি, তা নয়। ১০০ বছরেরও ঢের বেশি সময় আগে ত্রৈলোক্যনাথ ‘লুল্লু’র মতো লেখা লিখেছেন। ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো লাগে অবন ঠাকুরের ‘ভূতপতরীর দেশে’। উদাহরণ আরও রয়েছে। কিন্তু এমন কল্পকাহিনিকে কি আজকের বাংলা বাজার পাত্তা দেয়? এরই ফাঁকে স্পেকুলেটিভ ফিকশনের নামে কিছু ‘অশ্বডিম্ব’ প্রসব করে বিষয়টি আরও ঘেঁটে দিয়েছেন কেউ কেউ।

তবে কল্পনার আশ্চর্য জগতে ভাসতে যিনি চান, তিনি থোড়াই কলেজ স্ট্রিটের এই অশ্লীল রাজনীতিকে পাত্তা দেবেন! কল্পকাহিনির এক অসামান্য শাখা ‘ফিউটারিস্টিক নভেল’ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় লেখা হচ্ছে তবু। সুমিত বর্ধন বা আরও কেউ কেউ লিখেছেন। এবার হাতে এল এই বই– ‘মহাশূন্যে সিন্দআবাদ’। সঙ্গে ট্যাগলাইন ‘একটি প্রায় অবৈজ্ঞানিক ও দূরকল্পী আজিব-দাস্তান’।

উরসুলার কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছি। লেখিকা সুমিতা বীথি আরও দু’জনের সঙ্গে বইটি উৎসর্গ করেছেন কিংবদন্তি মার্কিন সাহিত্যিককে। আসলে এই কাহিনির নেপথ্যেও রয়ে গিয়েছে উরসুলার কল্পদৃষ্টির অনুপ্রেরণা (গ্রন্থের একেবারে শেষে তাঁর ‘লেফট হ্যান্ড অফ ডার্কনেস’ বইটির অনুপ্রেরণায় একটি কবিতা বা দোহাও যুক্ত করেছেন সুমিতা)। পড়তে পড়তে বোঝা যায়, চট করে বাজারে আরও একটি ‘হট কচৌরি’ উৎপাদনের মন নিয়ে আখ্যানে ডুব দেননি তিনি। তাই তৈরি করতে পেরেছেন একটি নিজস্ব জগৎ! ‘প্রস্তাবনা’ অংশে জানিয়ে দিয়েছেন ‘১৯৭২ থেকে আজ ২০২৫, এত দিন লেগে গেল নিজস্ব কল্প-দুনিয়ার হদিশ খুঁজে তার দরজার চাবি আরও কিছু মানুষের হাতে তুলে দিতে’।

এ এক এমন সময়ের কথা, যখন আমাদের এই নীল রঙের গ্রহটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। তবে তা নিষ্প্রাণ নয়! আসলে একটি গ্রহ ভেঙে তৈরি হয়েছে এক গ্রহাণুবলয়। সূর্যের চারদিকে একই কক্ষপথে ঘুরছে পৃথিবীর ২৭টি টুকরো। আর সেখানে তখনও বয়ে চলেছে প্রাণের প্রবাহ। এই নতুন পৃথিবীমালায় সবই তো নতুন। সিন্দআবাদ সিন্দ নামের এক ‘বালা’ (নারী) এই কাহিনির প্রোটাগনিস্ট। ‘পিতরবাক’ ভাষা থেকে পাঠকদের সুবিধার্থেই (!) না কি পৃথিবীর ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে আখ্যানটি। বইয়ের শুরুতেই পাঠক হাতে পাবেন সেই পিতরবাক ভাষার এক শব্দভাণ্ডার। যাতে পরবর্তী অংশে অচেনা শব্দ পেলেই একবার মিলিয়ে নিতে পারেন। যেমন, ‘উবালা’ অর্থে পুরুষ, ‘উবানি’ হল শিশ্ন, ‘উবাস’ মানে শিক্ষার্থী, ‘উবিনক’ শব্দটির অর্থ মানুষ! এমন বহু…

এই বলয়গ্রহের নতুন নাম ‘উরবা’। সেখানে বসবাসকারী বুদ্ধিমান দোপেয়ে প্রাণীদের নাম ‘উবিনক’। আগেই বলেছি এর অর্থ তারা আমাদের, মানুষেরই উত্তরসূরি। এই গ্রহে উবালা (পুরুষ), শাসক ‘উবিন’-এর মতোই ‘বালা’-রাও রয়েছে। কিন্তু তারা ‘নইখা’-র (অপবিত্র রক্ত) অভিশাপে অভিশপ্ত! সিন্দআবাদ সিন্দ এই গ্রহাণুবলয়ের একমাত্র কবি। ‘দোহা’ রচনা করে সে। একদিন সে মহাশূন্যে পাড়ি দেয়। তারপর…

বাকিটা তোলা থাক পাঠকের জন্য। কাহিনিতে নারীবাদের ছোঁয়া অবশ্যই রয়েছে। পরম ব্রহ্ম ‘দারা-উবি’ সতর্ক করেছিল‌েন, ‘যে ভুলের জন্য নীল গ্রহ হারিয়ে গেল, সেই ভুল যেন কখনও না হয়। তোমরা সজাগ থেকো, সটান থেকো, সরল থেকো।’ কিন্তু সেকথা ভবিষ্যমানবের মাথায় রাখেনি। এই পৃথিবীরই ধর্ম, পুরাণ, ইতিহাস ঘেঁটে তৈরি হয়েছে এক নতুন পুরাণ। যার ছত্রে ছত্রে ডিসটোপিয়া। ফলে পাঠককে যেতে হয় এক দমবন্ধ অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে। কাহিনির গতি কিছুটা শ্লথ। যাকে ‘স্লো বার্নিং’ বলে, অনেকটা তেমনই। কিন্তু সুতোয় বাঁধা কাহিনি কখনও ছিটকে যায় না নিজস্ব কক্ষপথ থেকে। পড়তে পড়তে পাঠক সেই গতি ও আনকোরা শব্দগুলির সঙ্গে নৈকট্য করে ফেলবে।
বইটির ছাপা, কাগজ, বাঁধাই ‘রাবণ’-এর অন্যান্য বইয়ের মতোই ঝকঝকে। হিয়া মুখোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ চমৎকার। লেখিকা প্রস্তাবনা অংশে জানিয়েছেন, অদ্রীশ বর্ধন সম্পাদিত ‘ফ্যান্টাস্টিক’-কে স্মরণে রেখেই নির্মিত হয়েছে প্রচ্ছদ। সত্যিই তাই, বইটি হাতে নিয়ে কল্পবিজ্ঞানের সেই কিংবদন্তি পুরুষটিকে মনে পড়ে যায়। অদ্রীশ চেয়েছিলেন বাংলা কল্পকাহিনি এক নতুন মাত্রা পাক। এই বই সেই ইচ্ছেকে শ্রদ্ধা জানায়। একদম নতুন কিছুর জন্য পাঠককে প্রস্তুত করতে থাকে।

কাহিনিটি কিন্তু শেষ হয়নি। বরং তা এক নতুন শুরুর কাছে পৌঁছে থমকে আছে। বলা যায় অপেক্ষা করছে। একটি সবেগে নিক্ষিপ্ত তির এরপর কোনদিকে পাড়ি দেবে আমাদের জানা নেই। কিন্তু আশা করাই যায়, একটি নয়, পরবর্তী কয়েক খণ্ডের মধ্যে দিয়ে এক বিরাট কাহিনি ক্যানভাস রচনার পরিকল্পনা রয়েছে সুমিতার। আমরা অপেক্ষা করব।