
দু’জনের একসঙ্গে খেলার হিসেবটি কীরকম? দেশের জার্সি পরে দু’জনে খেলেছেন মোট ২৩টি ম্যাচ, একটাও হারেননি, জয় ১৭টিতে, ড্র ছ’টি ম্যাচে। এই ২৩টি ম্যাচে ব্রাজিল করেছিল ৪৮টি গোল, যার ভেতর ৩৩টিতে দুজনের কারও না কারও গোল বা অ্যাসিস্ট রয়েছে। রোমারিও নিজে করেছেন ১৮টি, বেবেতো ১৫টি। এবং সরাসরি একে অপরের পাস থেকে গোল ৮টি, বেবেতোর পাস থেকে পাঁচটি গোল রোমারিও-র, রোমারিওর পাস থেকে বেবেতো করেছেন তিনটি গোল। ব্যক্তিগত স্কোরশিটে বেবেতো দেশের হয়ে ৭৫টি ম্যাচে করেছেন ৩৯ গোল, খেলেছেন ’৯০, ’৯৪ এবং ’৯৮ বিশ্বকাপ, অন্যদিকে রোমারিও ৭০ ম্যাচে ৫৫টি গোল করেছেন, বিশ্বকাপের সাক্ষর শুধুমাত্র আমেরিকা ’৯৪।
৫.
৯ জুলাই, ১৯৯৪। ব্রাজিল বনাম নেদারল্যান্ড। কোয়ার্টার-ফাইনাল। টেক্সাসের ডালাসের কটন বোল স্টেডিয়ামে ৬৩ মিনিটে ডাচদের অক্ষমণীয় ভুল। বক্সের সামনে বেবেতো। পায়ের ঝটকায় ডিফেন্ডার, শেষে গোলরক্ষক এড ডি গচিকে টপকে তিনকাঠি। বক্সের একদিকে গিয়ে সিগনেচার বেবি রকিং সেলিব্রেশন। স্ত্রী ডেনিসে ডি অলিভিয়েরার গর্ভে তৃতীয় সন্তান ম্যাথিউস দু’দিন আগেই জন্মেছে। পিতা বেবেতো। দু’ হাতের কল্পিত দোলনা। এইটুকু পর্যন্ত ঠিক ছিল। ডানদিকে ঠিক একই ভঙ্গিতে সঙ্গীর অনুকরণ করলেন মাজিনহা। এবং বাঁদিকে রোমারিও। বেবেতো আনন্দে পাগল হয়ে জড়িয়ে ধরলেন রোমারিওকে। দীর্ঘ মনকষাকষি, রাইভ্যালরি একটি দৃশ্যেই উধাও। প্রাণের বন্ধুর সিলমোহর সেদিন, সেই মুহূর্তেই।

হোসে রবার্তো গামা ডি অলিভিয়েরা। ওরফে বেবেতো। ’৬৪-র ১৬ ফেব্রুয়ারি সালভাদোর অঞ্চলে জন্ম। গোটা জীবনজুড়ে সাদামাটা, শান্ত, একান্তই ধার্মিক। পূর্বসূরি জিকো থেকে উত্তরসূরি কাকার লেগ্যাসি, মাঝখানে বেবেতো। তিনজনেই একরকম, অনেকটাই। অন্যদিকে বছর দুয়েকের ছোট রোমারিও ডিসুজা ফারিয়ার জন্ম ২৯ জানুয়ারি, ’৬৬-তে, রিও-য়। দারিদ্র, অসম্ভব দারিদ্র ছোট থেকেই। স্বভাব? সতীর্থর ঠিক বিপরীত। গ্যারিঞ্চা, সক্রেটিসদের মেজাজকে আদর্শ মানা রোমারিও নিজেও একরোখা, অবাধ্য, বোহেমিয়ান। রোমারিও নিজেই বলছেন– ‘আমরা দুজন আলাদা মানুষ। বেবেতো ফ্যামিলি ম্যান, ঘরে থাকতে পছন্দ করে। আর আমি রাস্তার বেড়ালের মতো’। হ্যাঁ, রোমারিও নিজেকে স্ট্রিট ক্যাট-ই বলেছিলেন। এই দু’জন আলাদা মানুষ ’৯৪-এর আমেরিকা পর্বের পর গ্রহের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্ট্রাইকার জুটি কীভাবে হয়ে গেল? কীভাবে কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেরা বলে দিলেন, ‘দে আর মাতাদোর্স, কিলার্স ইনসাইড দ্য পেনাল্টি এরিয়া’?

সেই ’৯৪। খরা, খরা এবং শেষমেশ বৃষ্টি-নিঃশ্বাস। তবে তার অনেক আগে ছোট্ট করে ড্রেস-রিহার্সাল ’৮৮-র সিওল অলিম্পিক, দু’জনে মিলে ছ’ ম্যাচে নয় গোল, যদিও ফাইনালে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার কাছে হেরে সোনা এল না। এল ’৮৯-এর কোপায়। ৬ গোল করে কোপা-টপার বেবেতো। ফাইনালে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে মাজিনহার পাস থেকে ৪৯ মিনিটে জালে ঠেলে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে নায়ক রোমারিও। গ্যালারিতে উদ্দাম ছুটে জড়িয়ে ধরেছিলেন বেবেতোকে। ’৭০-এর পর কোনও ট্রফি পেল সেলেসাওরা। রূপকথার শুরু সেখান থেকেই। মাঝে ইতালিয়া ’৯০-এ কোচ লাজারোনির সঙ্গে বচসা এবং দলগঠন নিয়ে একের পর এক প্রশ্নচিহ্ন। কারেকা-মুলার না রোমারিও-বেবেতো? বেবেতো নিজেই ধোঁয়াশায়। গোড়ালি চোট থেকে ফিরে আসা আধাফিট রোমারিওর জন্য চিন্তা– বেবেতো লাজারোনিকে বলেই দিলেন এভাবে জুটি জমবে না। কাপের দ্বিতীয় ম্যাচে বেবেতোকে শেষ কয়েক মিনিট আগে নামানোর পর কোচ-স্ট্রাইকার সংঘাত চরমে। স্কটল্যান্ড ম্যাচের আগে ট্রেনিংয়ে জি কার্লোসের সঙ্গে সংঘর্ষে হাঁটুতে জোরালো আঘাত বেবেতোর, স্কটল্যান্ড ম্যাচে বাইরে। শেষ ষোলোয় রাইভ্যাল দল। মিসফিট, আত্মবিশ্বাসহীন ব্রাজিলকে মারাদোনা-ক্যানিজিয়া বোঝাপড়ার কাছে মাথা নত করে ছিটকে যেতে হল। ’৯২। কোচ আলবার্তো পেরেরার সঙ্গে সংঘাতে দল থেকে নির্বাসিত রোমারিও। খেলেননি ’৯৪ বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং ম্যাচগুলিতে। এদিকে দল ক্রমশ হাসপাতাল হয়ে যাচ্ছে। কারেকা, মুলার বসে পড়ছেন চোটে। ভয়, ভয় আর ভয়। ’৯৪-এ আমেরিকা যাবে তো ক্যানারি-ইয়েলো শার্ট? সামনে টানা চার ম্যাচ অপরাজিত থাকা এনজো ফ্রান্সিসকোলিদের উরুগুয়ে। মারাকানা স্টেডিয়াম। ’৫০-এর ফাইনালের অভিশপ্ত স্মৃতি। জিততেই হবে ব্রাজিলকে। কোচ পেরেরা বেবেতোকে ডাকলেন– ‘কী করব বলো’। বেবেতোর উত্তর ছিল– ‘কল বাইজিনহো’। হ্যাঁ, ঠিক এটাই বলেছিলেন বেবেতো। বাইজিনহো, অর্থাৎ ডাকনামে রোমারিও। বাধ্য হয়ে জেদ থেকে সরলেন পেরেরা। পরিণতি? ৭২ মিনিটে জরগিনহোর পাস ধরে বেবেতোর ক্রস থেকে নেওয়া হেডার এবং ৮১ মিনিটে মাউরো সিলভার ক্রস থেকে ফিনিশিং– ২-০, নিজের স্কোরশিট এবং ২৭ বছরের ‘বাইজিনহো’র পুনরুত্থান।

’৯৪। দলের দশ নম্বর জার্সির ক্যাপ্টেন রাই গ্রুপ লিগের পর চোট পেলে জার্সি বদল হয়ে চলে গেল রোমারিওর শরীরে। ম্যাজিক টেন ম্যাজিক দেখাতে শুরু করেছিল অবশ্য শুরু থেকেই। ২-০-র রাশিয়া ম্যাচে ২৬ মিনিটে কর্নার থেকে রোমারিও-র গোল। কর্নারটি করেছিলেন কে? সমাপতনে সেই বেবেতো। পরের ম্যাচে জুটির পা থেকে একের পর এক তিনকাঠি। ক্যামেরুনকে ৩-০-য় উড়িয়ে দিল ব্রাজিল। দুঙ্গার পাস থেকে ৩৯ মিনিটে রোমারিও স্কোরশিট শুরু করার পর সেই রোমারিওর অ্যাসিস্ট থেকে ৭৩ মিনিটে দলের দ্বিতীয় গোল করেছিলেন বেবেতো। তৃতীয় ম্যাচে সুইডেন-ম্যাচ ড্র। কিছুটা আত্মতুষ্টি, কিছুটা গা-ছাড়া ভাব, কিছুটা দুরন্ত সুইডিশ গতি। যদিও ৪৭ মিনিটে দলের একমাত্র গোল প্রায় একার কৃতিত্বে সিগনেচার টো-পোক শট থেকে সেই রোমারিও-র। দ্বিতীয় রাউন্ডে সামনে হোস্ট চনমনে আমেরিকা। আগের দিন স্নানঘরে হাউ হাউ কাঁদছিলেন লিওনার্দো। ‘ছিটকে যাব না তো? পারব তো?’ দেখতে পেয়েছিলেন বেবেতো। বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘জিতব এবং আমি গোল করব; ম্যাচের ফল ১-০। বেবেতো কথা রেখেছিলেন। ৭২ মিনিটে দুরন্ত ডান পা। কার অ্যাসিস্ট? রোমারিও। এবং এরপরেই ওই কোয়ার্টার-ফাইনাল, নেদারল্যান্ড ম্যাচ। যে কথার প্রসঙ্গে শুরুতেই এসেছিলাম। ওই বেবিরকিং গোলের আগে ৫৩ মিনিটে নিজে অ্যাসিস্ট করেছিলেন বেবেতো। তিনকাঠিতে ঢোকালেন রোমারিও। ৮১ মিনিটে ব্রাঙ্কোর গোলার মতো ফ্রিকিকে থ্রিলার ৩-২ ম্যাচে শেষ হাসি, স্বস্তি জুটির। বন্ধু ব্রাঙ্কোর প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা বারবার বলে এসেছেন দু’জনেই। সেমিতে আবার সুইডেন। গ্রুপলিগের কষ্টার্জিত ড্র এখানেও প্রায় রিপ্লে। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত গোল নেই। ৮০ মিনিটে জরগিনহোর একটা থ্রু, নিখুঁত ফলো-আপে অলৌকিক হেডার দিয়ে ’৯৪-এর স্কোরশিট শেষ রোমারিও-র। ফাইনাল। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনার রোজ বোল স্টেডিয়াম। ১৭ জুলাই, ১৯৯৪। ফুঁ দিলে গোল হয় এমন দূরত্ব থেকে আশ্চর্য সব মিস দেখে জুটির শেষ জড়িয়ে ধরা আদৌ কি দেখতে পাবে পৃথিবী? সন্দেহ তৈরি হচ্ছিল। টাইব্রেকার ইতালিয়ান ব্লান্ডার। অবশ্য ভুলের শুরু ব্রাজিলীয় পা দিয়েই। প্রথম পেনাল্টি বেবেতোর নেওয়ার কথা ছিল, সিদ্ধান্ত বদলে নিলেন মারসিও স্যান্টোস, এবং মিস। দলের তিনটে সফল পেনাল্টির দ্বিতীয়টি বন্ধু রোমারিওর। বারেসি, মাসারো, এবং বাজ্জিও– তিন তিনটে ইতালীয় ভুল না হলে দলের শেষ এবং থ্রিলার পেনাল্টি নেবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাত নম্বর জার্সির নায়ক। প্রয়োজন হল না। তার আগেই উদ্দাম নাচ। দুই বন্ধুর কামারাদেরিতে সোনার ছাপ। ’৯৪-আমেরিকার রং ব্রাজিল, ব্রাজিল, ব্রাজিল। দলের প্রায় সবার প্রেরণা প্রয়াত আয়ারটন সেনাকে ট্রিবিউট।

জুটির সফর কিন্তু ’৯৪ দিয়েই শেষ হয়নি। ’৯৭। কোপায় তিনটে, কনফেডারেশন কাপে সাতটি– দলের ট্রফির পাশাপাশি রোমারিওর স্কোরশিট অব্যাহত ছিল। তিনকাঠিতে না ছোঁয়ালেও বেশ কিছু গোলের নেপথ্যে ছিলেন বেবেতোও। পরের বছর যদিও ভাঙনের বছর। কোচ মারিও জাগালোর বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ প্রিয় সতীর্থ, নিজের সাত নম্বর জার্সি বদলে বন্ধুর দশ নম্বর পরে আরেকবার চেষ্টা করেছিলেন বেবেতো। সব ঠিকঠাক চলছিল। গ্রুপ-লিগের মরক্কো, নরওয়ে এবং কোয়ার্টার-ফাইনালের থ্রিলার ডেনমার্ক ম্যাচ– নিজের গোল-স্কোরিং ফর্মে নিখুঁত ছিলেন বেবেতো। শুধু ফাইনালটা হল না। অভিশপ্ত, অসম্ভব অভিশপ্ত একটা দিন। দুই বন্ধুর মোট বিশ্বকাপ গোল ৬, একা ’৯৪-তেই স্কোরশিট রোমারিওর, অন্যদিকে ’৯৪, ’৯৮ মিলিয়ে তিনবার করে তিনকাঠির স্বাদ পেয়েছিলেন বেবেতোও।

দু’জনের একসঙ্গে খেলার হিসেবটি কীরকম? দেশের জার্সি পরে দু’জনে খেলেছেন মোট ২৩টি ম্যাচ, একটাও হারেননি, জয় ১৭টিতে, ড্র ছ’টি ম্যাচে। এই ২৩টি ম্যাচে ব্রাজিল করেছিল ৪৮টি গোল, যার ভেতর ৩৩টিতে দুজনের কারও না কারও গোল বা অ্যাসিস্ট রয়েছে। রোমারিও নিজে করেছেন ১৮টি, বেবেতো ১৫টি। এবং সরাসরি একে অপরের পাস থেকে গোল ৮টি, বেবেতোর পাস থেকে পাঁচটি গোল রোমারিও-র, রোমারিওর পাস থেকে বেবেতো করেছেন তিনটি গোল। ব্যক্তিগত স্কোরশিটে বেবেতো দেশের হয়ে ৭৫টি ম্যাচে করেছেন ৩৯ গোল, খেলেছেন ’৯০, ’৯৪ এবং ’৯৮ বিশ্বকাপ, অন্যদিকে রোমারিও ৭০ ম্যাচে ৫৫টি গোল করেছেন, বিশ্বকাপের সাক্ষর শুধুমাত্র আমেরিকা ’৯৪।

কিন্তু বরফ গলার ইতিহাস? রাইভ্যালরি? জুটির শীর্ষে পৌছনোর গল্পে সেই মোচড়টা না বললে অনেক কিছু অব্যক্ত থাকবে যে! ক্লাব ভিত্তোরিওতে কেরিয়ার শুরু করে ’৮৩-তে সিনিয়র ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোতে এলেন বেবেতো। জাতীয় দলে ডাক ’৮৫-তে। অন্যদিকে রোমারিওর প্রথম সিনিয়র ক্লাবদল ভাস্কো দ্য গামা, অর্থাৎ সেই ফ্ল্যামেঙ্গোর প্রতিদ্বন্দ্বী। রাইভ্যালরির ইতিহাস শুরু থেকেই। দু’জনেই শারীরিকভাবে তেমন শক্তিশালী না হলেও বেবেতোর অ্যাসিস্টিং পাওয়ার এবং গোল চেনার ক্ষমতা, সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি রোমারিওর ম্যাজিক গোলের সামনে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা এবং গতি। জাতীয় দলে রোমারিও এলেন দু বছর পর, অর্থাৎ ’৮৭-তে। দেশের হয়ে বেবেতোর নড়বড়ে শুরুর কন্ট্রাস্ট দাপুটে অভিষেক করা রোমারিও। রাইভ্যালরি এভাবেই বাড়ছিল। সঙ্গে এলো ফ্ল্যামেঙ্গো-ভাস্কো দ্বৈরথ। স্টেট লিগে রোমারিওর ভাস্কোর ট্রফি পাওয়ার বদলা ছিল ন্যাশনাল লিগে শেষ ম্যাচে সেই ভাস্কোকে হারিয়েই বেবেতোর ফ্ল্যমেঙ্গোর লিগ জয়। ঠিক এইসময় সিওল অলিম্পিকের পর পালাবদল। ক্লাব বদল। রোমারিও চলে গেলেন ইউরোপে, ভাস্কো ছেড়ে ডাচ লিগে পিএসভি আইন্দোভেনে। বেবেতোর চমক ছিল ফ্ল্যামেঙ্গো ছেড়ে রাইভ্যাল ভাস্কোয় যোগ দেওয়া। নতুন ক্লাবে দুজনেরই দাপট, মাঝে চোট আঘাত এবং জাতীয় দলের নিষ্প্রভ পারফর্মেন্স। ’৯২-তে বেবেতো স্পেনে। ডিপোর্টিভো লা করুনায়। সঙ্গে দেশের সতীর্থ মাউরো সিলভা। প্রথম মরশুমেই ২৯ গোল করে পিচিচি ট্রফি। আশ্চর্য সমাপতনে ডাচ ক্লাব পিএসভি ছেড়ে ক্রুয়েফের ‘ড্রিম টিম’ বার্সায় এলেন রোমারিও। প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরমে পৌঁছল। দেশের সতীর্থ, একসাথে গলা জড়ানো বেবেতোকে রেফারির সঙ্গে তর্কাতর্কি, বায়নাক্কা স্বভাবের জন্য পর্তুগীজ ভাষায় ‘ক্যারাও’ বলে ব্যঙ্গ করলেন রোমারিও, ক্যারাও অর্থাৎ ‘ক্রাইবেবি’। এই ‘ক্রাইবেবি’ ট্যাগ খেলা ছাড়ার শেষদিন পর্যন্ত যায়নি বেবেতো’র। লিগের শেষ ম্যাচে শেষ সময়ে পেনাল্টি পাওয়া এবং নিজে সেই পেনাল্টি নিতে পিছপা হয়ে শেষমেশ সতীর্থের নেওয়া সেই পেনাল্টি মিসেই লিগ চলে যায় বার্সায়, দেওয়ালে পিঠ থেকে যায় বেবেতোর। এবং এই সময়ে জাতীয় দলে টার্ন-অ্যারাউন্ড। কোচ পেরেরার সঙ্গে সরাসরি তর্কাতর্কিতে দল থেকে বাদ রোমারিও। পরিণতিতে শ্রীহীন, ছন্নছাড়া ব্রাজিল। এবং শেষে সেই ঐতিহাসিক উরুগুয়ে-ম্যাচ। বেবেতো সবকিছু ভুলে কোচকে বললেন, বাইজিনহোকে ডাকুন। বাইজিনহো অর্থাৎ রোমারিও এলেন, দেখলেন, গোল করলেন। রেষারেষি কি কাটল? নাহ। ’৯৪ আমেরিকার বিমানযাত্রার ঠিক আগে প্রেস কনফারেন্সে রোমারিও বলে দিলেন, বিমানে বেবেতোর পাশের সিটে বসবেন না তিনি। গোটা পৃথিবী ধরে নিল ’৯৪-এও ট্রফি আসছে না ব্রাজিলে, এই জুটি কিভাবে মাঠে একসঙ্গে খেলবে! এই বিদ্বেষ নিয়ে? এবং এই সময়েই ব্যক্তিগত জীবনে প্রায় একইরকম দু’টি দুর্ঘটনা, সমাপতন। বেবেতোর স্ত্রী গর্ভবতী ডেনিসে এবং ভাই উইলসনকে গাড়ির ভেতর ছিনতাই ও অপহরণের চেষ্টা করল দু’জন গানম্যান, যদিও অক্ষত থাকলেন দু’জনেই। ঠিক এইসময়ই রিও থেকে পিতা এডভেয়ার সুজা ডি ফারিয়াকে অপহরণ করে নিয়ে গেল দুষ্কৃতীরা, বিশাল অঙ্কের টাকার দাবি এবং পরিণতিতে এক সপ্তাহ পর পুলিশি তৎপরতায় অক্ষতভাবে ফিরলেন মানুষটি, স্বস্তি ফিরল সন্তান রোমারিওর। ব্যক্তিগত জীবনে এই সমাপতন কি থামিয়ে দিল রেষারেষি? কারণ ’৯৪-এর সেই বিমানযাত্রার পরবর্তী আর কোনও সমস্যার উল্লেখ পাওয়া গেল না। শুরুতেই রাশিয়া ম্যাচ এবং জুটির ম্যাজিক। শেষে বন্ধুত্বের তীব্রতম সাক্ষর দ্বিতীয় রাউন্ডের নক-আউট আমেরিকা ম্যাচে বেবেতোর গোলের পর রোমারিওকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে গভীর আশ্লেষে জড়িয়ে ধরা, এবং সেই কোয়ার্টার ফাইনাল, নেদারল্যান্ড ম্যাচ এবং বেবি রকিং। গ্যালারি চিৎকার করল রো-রো শব্দে। ৩০ বছর পর বেবেতো এক সাক্ষাৎকারে পেলে-গ্যারিঞ্চার প্রতি শ্রদ্ধা নিয়েও বললেন, ‘আমি এবং রোমারিও ফুটবলের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ডাবল অ্যাক্ট।’
………….. পড়ুন জুটি কলামের অন্যান্য পর্ব ……………
পর্ব ৪ : বিতর্কিত, বর্ণময় আটাত্তরের আর্জেন্টিনার জোড়া ফলা
পর্ব ৩ : পায়ে লেখা যৌথ-কবিতা
পর্ব ২ : অমরত্বের জাল কাঁপানো এক চিরকালের বন্ধুত্ব
পর্ব ১ : পাশে থাকা, পাসে থাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved