Robbar

‘অমানুষ’ ছবি দেখে উচ্ছ্বসিত দর্শকরা শক্তি সামন্তকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 6, 2026 5:24 pm
  • Updated:February 6, 2026 7:05 pm  

‘অমানুষ’ (বাংলা) মুক্তির দিনে বাবা ভীষণ নার্ভাস ছিলেন। তাঁর মনে বারবারই এই প্রশ্ন উঠছিল– হিন্দি ছবির ধাঁচে তৈরি একটি বাংলা ছবি বাঙালি দর্শক কীভাবে গ্রহণ করবেন? বাবা এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে তিনি অডিটোরিয়ামে বসে ছবিটি দেখতে পারেননি; প্রজেকশন রুমের দরজার পিপহোল দিয়ে পুরো ছবি দেখেছিলেন। কিন্তু কোথা থেকে যেন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে বাবা প্রজেকশন রুমেই আছেন। মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় ৯০০ জন দর্শক স্লোগান দিতে দিতে প্রজেকশন রুমের দিকে ছুটে আসেন– ‘শক্তি সামন্ত জিন্দাবাদ! শক্তি সামন্ত জিন্দাবাদ!’

অসীম সামন্ত

সাতের দশকের শুরুর দিক– সম্ভবত ১৯৭১। বাংলায় তখন নকশাল আন্দোলন তুঙ্গে! একদিন সকালে বম্বেতে (অধুনা মুম্বই) আমাদের বাড়িতে হঠাৎই তিন-চারজন পুলিশ এসে হাজির। বাবাকে (শক্তি সামন্ত) তাঁরা জানান যে, ওঁদের মধ্যে দু’জন কলকাতা থেকে এসেছেন। পুলিশের কাছে নিশ্চিত খবর ছিল– উত্তম কুমার, হেমন্ত কুমার ও শক্তি সামন্ত নকশালদের ‘হিট লিস্ট’-এ রয়েছেন। এই তিনজন খ্যাতনামা চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তখন বাংলায় অসম্ভব জনপ্রিয়। নকশালদের ধারণা ছিল, এই তিনজনকে খতম করতে পারলে একদিকে যেমন তারা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করবে, তেমনই গোটা দেশকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিতে পারবে।

এরপরই তড়িঘড়ি আমাদের বাড়ির বাইরে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। উত্তমকুমারকে বলা হয় কলকাতা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে থাকার জন্য, কারণ তৎকালীন পরিস্থিতিতে কলকাতায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সহজ হবে না বলে পুলিশের ধারণা ছিল।

রাজেশ খন্না, শক্তি সামন্ত এবং উত্তম কুমার

উত্তমকুমার প্রায় অবিলম্বেই মুম্বইয়ে এসে থাকতে শুরু করেন। সেই থেকেই আমার বাবা ও উত্তমদার মধ্যে এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সূচনা হয়। প্রায়ই সন্ধেবেলায় দু’জনের দেখা হত–পানাহার ও নৈশভোজে। একদিন সন্ধ্যায় উত্তমদা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “শক্তিদা, আপনার কি মনে হয়, আমার আর কোনও দিন হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ হবে? আমার প্রথম হিন্দি ছবি ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ফ্লপ হয়েছিল। ছবিটা খারাপ ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি তো তেমন খারাপ অভিনয় করিনি!” শুনে বাবা বলেন, “উত্তমবাবু, আপনি একজন অসাধারণ অভিনেতা, তার উপর দেখতে এমন সুদর্শন। আপনার আর সুযোগ মিলবে না– এ কী করে হয়! আমি নিজেই আপনাকে নিয়ে একটি হিন্দি ছবি বানাব। তবে একটা শর্ত আছে– ছবিটা দ্বিভাষিক হবে, হিন্দি ও বাংলা– দু’টি ভাষাতেই একসঙ্গে।” উত্তমদা এতে দারুণ খুশি হন এবং সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতি দেন। এই ছবির হাত ধরেই শুরু হয় হিন্দি–বাংলা দ্বিভাষিক ছবি তৈরির একটি নতুন ধারা।

‘অমানুষ’ ছবিতে উত্তম কুমার

শক্তিপদ রাজগুরুর লেখা একটি উপন্যাস (‘নয়া বসত’) পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন বাবা। বিশেষত চরিত্রায়ণ ও লোকেশনের বর্ণনা তাঁর অসাধারণ লেগেছিল। ততদিনে, ১৯৭৩ সাল এসে গিয়েছে, ইন্দিরা গান্ধিও কড়া হাতে নকশাল আন্দোলন কার্যত দমন করতে সমর্থ হয়েছেন।

সময়টা ছিল এক্কেবারে আদর্শ। একদিন বাবা আর শক্তিপদ রাজগুরু দু’জনে একযোগে রওনা দিলেন, মোটরবোটে করে উপন্যাসে বর্ণিত স্থানগুলি সরেজমিনে দেখে আসতে। চার-পাঁচ ঘণ্টা নৌকা চলার পর গন্তব্যে পৌঁছনোর সময় এসে যায়। কিন্তু গোটা যাত্রাপথে বাবার চোখে পড়ার মতো কোনও রোমাঞ্চকর দৃশ্যই ধরা দিল না। যতদূর চোখ যায় দু’পাশে শুধু নদী আর জলাজমি– উপন্যাসে পড়া বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিলই খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। একসময় থাকতে না পেরে শক্তিপদবাবুকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি নিশ্চিত, বইয়ে যে জায়গার কথা লিখেছেন, সেটাই এই অঞ্চল?” শক্তিপদ রাজগুরু বলেন, “হ্যাঁ।” আরও খানিকক্ষণ চারদিক দেখলেন তাঁরা, তবু বাবার চোখে বিশেষ কিছু ধরা পড়ল না। তিনি ভীষণ মুষড়ে পড়লেন। ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, সূর্য অস্ত যাচ্ছে। নদীর তীরে থাকার মতো কোনও ভদ্রস্থ জায়গা না থাকায় তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, রাতটা নৌকাতেই কাটাবেন। জলে হাঙর, ডাঙায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার– এতেও রক্ষে নেই, তার উপর সুগ্রীব দোসর– ঝাঁক ঝাঁক দৈত্যাকার মশা! সেই মশারা সারা রাত ধরে বাবা আর শক্তিপদকে রীতিমতো অভ্যর্থনা জানাল। এক মুহূর্তের জন্যও বাবা দু’চোখের পাতা এক করতে পারলেন না– সারারাত জেগেই কাটল। ভোরের আলো ফুটল। আর তারপরেই ঘটল সেই ম্যাজিক! আকাশের রং ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল, আর সেই আশ্চর্য বর্ণীল দৃশ্য দেখে বাবা মোহিত হয়ে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন– সেই জায়গাতেই তিনি ছবির শুটিং করবেন।

শক্তি সামন্ত, শুটিং-এ

ঘন জঙ্গলের মধ্যে– যেখানে দু’-একটি কাঁচা মাটির কুঁড়েঘর ছাড়া কিছুই ছিল না– রাতারাতি সেখানে ১২০ জনের একটি শুটিং ইউনিটের থাকার ব্যবস্থা করে ফেললেন বাবা! পশ্চিমি ধাঁচের ফ্লাশ-সহ শৌচালয়, একটি বড় রান্নাঘর, সারাক্ষণ বিজলি বাতি চালু রাখার জন্য তিনটি জেনারেটর, আলাদা ডাইনিং স্পেস– সব মিলিয়ে একেবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ সেটআপ। এই ব্যবস্থাপনাটাই আবার ছবির বেশ কিছু দৃশ্যের লোকেশন সেট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।

টানা ৪০ দিনের শুটিং অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। পরে ছবির ইনডোর ও কিছু আউটডোর সিকোয়েন্স মুম্বইয়ের নটরাজ স্টুডিওতে তোলা হয়। মোটর লঞ্চে ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’ গানটির শেষ অংশে বাবার ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই একই ভোরের আলো– যে আলো তিনি প্রথম দেখেছিলেন রেকি-র সময়, জঙ্গলের নদীপথে। সিনেমার প্রতিটি শো-তে, সেই দৃশ্য পর্দায় ভেসে উঠলে দর্শক হাততালিতে ফেটে পড়তেন। শুধু বাংলা সংস্করণেই নয়, ‘অমানুষ’-এর হিন্দি ভার্সনের শো-তেও দেখা গিয়েছিল একই প্রতিক্রিয়া।

‘অমানুষ’ শুধু বাংলায় নয়, হিন্দিতেও সারা ভারত ও বিদেশে বিপুল সাফল্য পায়। ১৯৭৫ সালে হিন্দি সংস্করণটি ছিল বছরের একাদশতম সর্বোচ্চ আয়কারী ছবি– স্বল্প বাজেটের ছবি হিসেবে যা নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ সাফল্য। আর বাংলা সংস্করণ? সেটি আজও সর্বকালের সর্বোচ্চ বাণিজ্যসফল বাংলা ছবি হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৪-’৭৫ সালে ছবিটি এক কোটিরও বেশি ব্যবসা করেছিল। গুগলে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ১৯৭৪ সালের এক কোটি টাকার মূল্য এখন প্রায় ৭০ কোটি টাকা! অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও হালের কোনও বাংলা ছবির সর্বোচ্চ ব্যবসা মোটামুটি ৪৫ কোটির আশপাশেই ঘোরাফেরা করেছে।

‘অমানুষ’ (বাংলা) মুক্তির দিনে বাবা ভীষণ নার্ভাস ছিলেন। তাঁর মনে বারবারই এই প্রশ্ন উঠছিল– হিন্দি ছবির ধাঁচে তৈরি একটি বাংলা ছবি বাঙালি দর্শক কীভাবে গ্রহণ করবেন? এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে অডিটোরিয়ামে বসে ছবিটি দেখতে পারেননি; প্রজেকশন রুমের দরজার পিপহোল দিয়ে পুরো ছবি দেখেছিলেন। কিন্তু কোথা থেকে যেন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে বাবা প্রজেকশন রুমেই আছেন। মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় ৯০০ জন দর্শক স্লোগান দিতে দিতে প্রজেকশন রুমের দিকে ছুটে আসেন– ‘শক্তি সামন্ত জিন্দাবাদ! শক্তি সামন্ত জিন্দাবাদ!’

‘অমানুষ’ ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর ও উত্তম কুমার

তাঁরা বাবাকে ঘিরে ধরে ছবির জন্য অকুণ্ঠ প্রশংসা ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন। উচ্ছ্বাসের ঝোঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে ঘোরাতে থাকেন। অনেকক্ষণ পরে তাঁকে নামানো হয় এ শর্তে যে, তিনি প্রতি বছর তাঁদের জন্য অন্তত একটি করে এমন ছবি বানাবেন। আনন্দে বাবার চোখে জল এসে গিয়েছিল। ‘আরাধনা’, ‘কাটি পতঙ্গ’, ‘অমর প্রেম’-এর মতো একের পর এক সুপারহিট দেওয়ার পরেও তিনি এমন আবেগঘন জনসম্মান কখনও পাননি। এটা ওঁর কাছে একেবারেই অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা।

‘অমানুষ’-এর পর বাবা ‘আনন্দ আশ্রম’, ‘অনুসন্ধান’, ‘অন্যায় অবিচার’, ‘অন্ধ বিচার’– এমন একাধিক ছবি বানান। বাংলায় সবক’টিই খুব সফল হলেও, তাদের হিন্দি সংস্করণ তেমন বড় হিট হয়ে ওঠেনি। এখন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, ‘অমানুষ’-এর পর তাঁর গল্প নির্বাচনের ঝোঁকটা ছিল বেশি করে বাঙালি দর্শকদের কথা ভেবে। সেই কারণেই ওঁর পরবর্তী ছবিগুলি হিন্দিতে আর অতটা সুপারহিট হয়ে উঠতে পারেনি।