
কলকাতা বইমেলা ২০২৬। ঘুরে-ফিরে দেখা। ইতিউতি স্টলে ঢুঁ। মাইকে চিৎকার। বিস্মিত বালক-বালিকার মুখ। বইয়ের গন্ধভরপুর। নানা কারুকাজ। নতুন বই-পুরনো বই। পুরনো প্রিন্টের বই, যাহ ফক্কা, দেরি করে এলে মিস! সইসাবুদ, লেখক পাকড়াও, পাঠক পাকড়াও! প্রথম দিন কেমন গেল? জানাচ্ছে রোববার ডিজিটাল। জানাবে রোজ। বইমেলার কড়চায়।
শীত তুমুল কসরত দেখিয়ে শেষমেশ যখন ক্লান্ত, সেই সময়টাই বইমেলা গজিয়ে ওঠে কলকাতায়। পৌষের যা যা করার ছিল, সম্ভবত চুকেবুকে গিয়েছে। এখন মাঘে মাঘে কত বেলা হল, দেখার সময়। শুধু হায়, বইমেলা এলি বাবা, এমন মাসান্তে কেন, মাস শুরুর সপ্তাহখানা বাগালে কি বিক্কিরি আরেকটু বাড়ত না! তাও আশা, ঘোর নিন্দুক বাঙালির চোখে বইমেলাধুলো দিয়ে এবারও গতবারের তুলনায় বাড়বাড়ন্ত হবে। হয়তো বিক্রিবাটাও, হয়তো ভিড়ভাট্টাও।

উদ্বোধনের দিন, কাঁচা মেলায় ঢুকে প্রথমেই ‘খবর’ মিলল স্বপ্নময় চক্রবর্তী জীবনকৃতি সম্মান পেয়েছেন এইবার। গল্পপ্পেয়ে-উপন্যাসপেয়ে বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে এ বড় পাওনা। স্বপ্নময় চক্রবর্তী, বেশ কিছুকাল চোখের অসুখে ভুগছিলেন। লিখতেও সমস্যা হচ্ছিল বেশ। প্রায় না-লিখেই দিন কাটছিল তাঁর– জানিয়েছিলেন আমাদের। এই সুখবরের পাশাপাশি তাঁর সুস্থতা কামনা করি। তিনি ফের লেখায় ফিরুন।
শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তি, খানিক মেলার ফ্লেভার মেশালে দাঁড়ায়– স্টল কি তোমার কোনও ব্যথা বোঝে? বোঝে বইকি, নইলে এত স্টলে স্টলে ভিড় কীসের! যদিও হাঁকডাক চলল উদ্বোধনের দিন। মেলা এখনও পুরোদস্তুর সেজে ওঠেনি। ধর তক্তা, মার পেরেক– কাণ্ডকারখানা চলছে। ফ্লেক্স যাচ্ছে, ব্যানার লাগানো হচ্ছে। হঠাৎ রাস্তায় দেখি নেতাজি দণ্ডায়মান, তিনি ফিরে এসেছেন– খেয়াল হতেই দেখি না– কাট আউট!

এদিকে আর্জেন্টিনা এবারের থিম কান্ট্রি। মেলার দুটো গেটও আর্জেন্টাইন স্থাপত্যের আদলে গড়া। এদিকে আবার উত্তমকুমার এই বছরই সেঞ্চুরি করেছেন। তাঁকে নিয়েও চলছে প্রদর্শনী! মেলার মাইকে ঘোষণা চলছে বারবারই। উদ্বোধনের দিন, বইমেলায় খানিক হাওয়া-বাতাস খেলা করছে। খুনসুটি, প্রেম, বই কেনা, স্বল্পাহার, এমনকী, ঝগড়াঝাঁটিও প্রত্যক্ষ করা গেল। কিন্তু সেই সমস্ত দৃশ্যকে হার মানিয়ে দিল এক বৃদ্ধা, সঙ্গে দুই শিশু। ছোটদের বাংলা কমিকসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। দুই শিশু উজ্জ্বল, অধৈর্য। পরের পাতায় কী ঘটছে, সে নিয়ে। লিট্ল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের কাছে, এক হিন্দিভাষী মহিলা, সঙ্গে দুই সন্তান নিয়ে যদিও বেকায়দায় পড়েছেন উদ্বোধনের দিন এসে! তিনি চিলড্রেনস কর্নার খুঁজে পাচ্ছেন না। এদিকে তাঁর এক ছেলে ক্রমাগত বলে চলেছে, ‘ইতনা বেঙ্গলি বুকস!’ পশ্চিমবঙ্গে বাংলা বইয়ের ভিড় দেখে যে চমকায়, সে সত্যিই শিশুসুলভ।

দে’জ পাবলিশিং নানা পত্রপত্রিকার লোগো দিয়ে বাইরের মোড়কটা সাজালেও, আসল চমক দে’জ-এর গায়ের গলিতে। কলেজ স্ট্রিটের অগ্রগণ্য প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তাদের ছবি, এই প্রথম একসঙ্গে! বাংলা বইয়ের ইতিহাসের পক্ষ থেকে তাঁরা এরকম ‘ট্রিবিউট’ বহু আগেই পেতে পারতেন। শুভঙ্কর দে, জানালেন, তাঁদের ছবি ও তথ্য জোগাড় করতে যথেষ্টই কালঘাম ছুটেছে। বাঙালি যে ইতিহাসবিস্মৃত জাতি, সে তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই!

বইমেলার আগে আগে, ছাপাখানায় যে বিপত্তি দেখা যাবে, সে নিয়ে আর সন্দেহ কী! অনেক প্রকাশকের ভুরুই কুঁচকে। উদ্বোধনের দিনই কয়েকজন খসড়া খাতা-র তন্ময় দাশগুপ্তকে পাকড়াও করেছে, ‘‘কই নতুন বইপত্তর, সুশোভন অধিকারীর ‘ছবিঠাকুর’ই বা কই!’’ প্রকাশকের জবাব, ‘‘আসছে, আর ক’দিন।’’ প্রকাশ্যে, ফেসবুকে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে ‘প্রতিক্ষণ’, তাঁদের সমস্ত বই এই প্রথমবার বইমেলার শুরুর দিন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না তাই। সম্প্রতিই প্রতিক্ষণের স্বজনবিয়োগ ঘটেছে। বিলের টেবিলে দেখা গেল, স্বপ্না দেবের স্মরণপুস্তিকাটি। যা কোনওভাবেই বিক্রির জন্য নয়। যাদবপুরে স্বপ্না দেবের স্মরণসভার দিন, তা প্রকাশিত হয়েছিল। স্মরণ পুস্তিকাটি বাংলা পত্রিকা সম্পাদনা ও সাংবাদিকতার ইতিহাস কীরকম গৌরবময় ছিল, তার নিপুণ উদাহরণ। শুধু, পুস্তিকার পিছনের পাতায় একটি বাক্য, পাঠককে সন্দেহগ্রস্ত করে তোলে। তা হল: ‘প্রচ্ছদের ছবিটি সুমন সেনগুপ্ত এঁকেছেন’। স্মরণপুস্তিকার ওই ছবি ‘আঁকা’ বলে মনে হয় না, তা স্বপ্না দেবের ফোটোগ্রাফের সামান্য ডিজিটাল কারুকার্য। ‘আজকাল’-এর স্টলে গিয়ে জানে গেল– এবারের মিনিবুক এখনও ছেপে আসেনি। ফলে বহু পাঠকই বিফলমনোরথ হয়ে স্বগৃহে, স্বমেসে, স্বহোস্টেলে!

ও হ্যাঁ, বইমেলা উপলক্ষে রোববার.ইন-এর দুটো ‘স্পেশাল’ ঘোষণা রয়েছে। এক, সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়, রোজদিনই একটি করে ‘কাকতালীয়’ রোববারের পাঠকদের জন্য আঁকছেন। বইমেলার দিনগুলোয়, প্রত্যেক দিন তা দেখতে পাবেন আমাদের ফেসবুক পেজে ও এই কড়চার সিরিজে। এছাড়া, একদল পাঠক দেখেছি, বইমেলায় খাবার কেন বিক্রি হবে, সে নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। বইয়ের সঙ্গে খাদ্যের যে খুব ধুন্ধুমার সম্পর্ক ছিল, এমনটা তো মনে হয় না। তাছাড়া, বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসেন। তাঁদের জন্য যথোপযুক্ত খাবার ব্যবস্থা না-থাকলে মেলা চলবে কী করে। শুধু ক্রেতাদের কথা ধরলে ভুল হবে, বইমেলায় প্রকাশক, বইকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, পুলিশ, স্টলের কারিগর ছাড়াও বহু মানুষ নিযুক্ত থাকেন এই আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলায়। তাঁদের ক্ষুধা নিবারণের জন্যও কি খাবারের স্টল চক্ষুলজ্জাকর? যদি কেউ অনেক বই কিনে, এমনকী, একটি বইও যদি না কিনে বইমেলায় ঘুরেফিরে– ভিড়ের স্বাদ নিয়ে একটু ফিশফ্রাই খেতে চান, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? বইমেলার অর্থনীতিতে বিরিয়ানি-ফিশফ্রাইয়ের অবদানও কিছু কম নয় কিন্তু! এই মেলার শেষ সাত দিন রোববার.ইন মিলিয়ে-মিশিয়ে দেবে বাংলা বই ও খাবারকে! কী উপায়ে? বাংলা ভাষায় লেখা নানা ‘উপাদেয়’ খাবারের বই ফিরে পড়ে। খাবার ও বই মিলিয়ে ‘খাবারের বই’-ই আমাদের এবারের বিষয়!

গতবারই বইমেলায় খোলা চত্বরে শিল্পীদের বসা, তাঁদের শিল্পউপাদান বিক্রি করা বন্ধ করে দেওয়া হয় । এবার সে বসার জায়গাটিও নেই। বাঁশের বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেড়ার গায়ে নানা বিজ্ঞাপন। কলকাতা বইমেলা, কিছু বছর আগেও, শুধুমাত্র বই বিক্রির মাঠ ছিল না। লিট্ল ম্যাগাজিন চত্বরের বাইরে, একটুকরো ঘাসজমিতে বসে কবিতা পড়া, গান, আড্ডা– এইসব হত যথেষ্টই। রাস্তার ওপারে ছড়িয়ে থাকত, নানা হস্তশিল্পের ঠেক। বইমেলার চরিত্রের মধ্যেই এই স্বাদ ছিল। তা কতদূর পাওয়া যাবে এবার, আগামী কয়েক দিনে নিশ্চয়ই টের পাওয়া যাবে। সময়ের সঙ্গে নানা বদল আসে, তবু কিছু জিনিস আঁকড়ে রাখা ভালো, তাই না?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved