Robbar

মালিককে গিয়ে বল, ‘ব‌ইমেলা’ এসেছে!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 24, 2026 3:13 pm
  • Updated:January 24, 2026 7:13 pm  
Day 2 International Kolkata Book Fair Boi Mela 2026 | Robbar

মেলার দ্বিতীয় দিন। তায় সরস্বতী পুজো। দুয়ের যুগলবন্দিতেই কি উইক-এন্ডে ব‌ইমেলা জমজমাট? উত্তর খুঁজতে আপনাকে ফেলুদা হতে হবে না। কারণ, যে মেলায় এক‌ই সময়, এক‌ই মঞ্চে হাজির থাকেন অঞ্জন দত্ত, অনির্বাণ ভট্টাচার্যর মতো ব্যক্তিত্ব, সেখানে ভিড় তো জমবেই। বইমেলার কড়চা। জানাচ্ছে রোববার ডিজিটাল। জানাবে রোজ।

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

ন্যাড়া বেলতলায় যায় একবার‌ই। বারবার যায় না। বাঙালি‌ ব‌ইমেলা যায় বারবার, একবারে তার আশ মেটে না। পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই ভোলেননি, কলকাতায় গেল মাসে মেসিকে নিয়ে কী কাণ্ডটাই না ঘটে ছিল! লণ্ডভণ্ড সল্টলেক স্টেডিয়াম, ভাঙা চেয়ার, ছেঁড়া জাল। অথচ ব‌ইমেলায় আর্জেন্টিনার প্যাভিলিয়ন দেখুন, ফটফটে নীল-সাদায় ধোপদুরস্ত, চেনা ভিড়। অবাক চোখের আনাগোনায় এবারের ব‌ইমেলার থিম-কান্ট্রির ডেরা সরগরম, দ্বিতীয় দিনেই। তবে কথায় কথায় আছে, সাবধানের মার নেই। সেই মারপ্যাঁচের ছক কষেই আর্জেন্টিনাকে ঘিরে রেখেছে সাদা পোশাকের কলকাতা পুলিশ। দেখলে‌ই বুঝতে পারবেন, কড়া ডিফেন্স, মাছি গলবে না। আর যাই হোক, যুবভারতীর মতো সেমসাইড গোল খেতে তাঁরা রাজি নন।

মেলার দ্বিতীয় দিন। তায় সরস্বতী পুজো। দুয়ের যুগলবন্দিতেই কি উইক-এন্ডে ব‌ইমেলা জমজমাট? উত্তর খুঁজতে আপনাকে ফেলুদা হতে হবে না। কারণ, যে মেলায় এক‌ই সময়, এক‌ই মঞ্চে হাজির থাকেন অঞ্জন দত্ত, অনির্বাণ ভট্টাচার্যর মতো ব্যক্তিত্ব, সেখানে ভিড় তো জমবেই। ভরসন্ধেয় ব‌ইমেলার এসবিআই অডিটোরিয়ামে দারুণ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল দে’জ পাবলিশিং। দিনকয়েক আগে প্রকাশিত হয়েছে অঞ্জন দত্তের নতুন ব‌ই ‘অঞ্জন নিয়ে’। আর এদিন অভিনেতা-পরিচালক অনির্বাণের ‘কারুবাসনায়’, আর দেবতোষ দাশের ‘বিন্দুবিসর্গ’। লেখক অনির্বাণ অবশ্য তার আগে দে’জ-এর স্টলের সামনে বসে গুণমুগ্ধদের স‌ই বিলিয়েছেন। ব‌ই, স‌ই আর ছবি নেওয়ার হিড়িকে তখন সেখানে পা রাখা দায়! ফাজিল দর্শকদের কেউ কেউ সেই হ‌ইহট্ট দেখে টিপ্পনি কাটলেন, ‘মালিককে গিয়ে বল, খোকা এসেছে!’

এসবি‌আই অডিটোরিয়ামে তখন ‘অঞ্জন নিয়ে’ থেকে পড়ে শোনাচ্ছিলেন বরুণ চন্দ। অঞ্জন দত্ত গানে গানে এক কালে কথা দিয়েছিলেন, ‘রঞ্জনা, আমি আর আসব না।’ তবে রঞ্জনা না থাকলেও তাঁর পাশে রঞ্জন ছিলেন, মানে, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। রবি ঠাকুরকে এ-যাত্রাতেও ছাড় দেননি ‘কাঠখোদাই’-এর লেখক। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে‌ই বাঙালির প্রাণের ঠাকুরের অস্বস্তি বাড়ালেন। বললেন, ‘আত্মজীবনীতে সব সত্যি-কথা লেখা যায় না। রবীন্দ্রনা‌থও পারেননি।’

পেরেছেন শুধু একজনই। তিনি উত্তমকুমার। শতবর্ষে মহানায়ককে ঘিরে আলাদা সমারোহ ব‌ইমেলায়। তাঁর গ্ল্যামারাস কাট আউটের পাশে দাঁড়িয়ে অকাতরে ছবি তুলছে আট থেকে আশি। পিছিয়ে নেই ঋত্বিক ঘটক‌ও। সেলফিতে মজে থাকা বং-দের ক্রমাগত তিনি ভাবাচ্ছেন। বুঝিয়ে দিচ্ছেন, এ যাত্রায় তিনি অন্তত ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নন। গতকাল লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের কাছে এক হিন্দিভাষী মহিলা তার দুই সন্তান নিয়ে বেকায়দায় পড়েছিলেন! চিলড্রেনস কর্নার খুঁজতে থাকা সেই মহিলার এক সন্তানকে আমরা বলতে শুনেছিলাম, ‘ইতনা বেঙ্গলি বুকস!’ ‘বাংলাপক্ষ’-এর স্টলের সামনে জটলা দেখে নতুন করে তা মনে পড়ল। পাশেই ‘ভয়েস অফ ওয়ার্ল্ড’-এর স্টল। নামমাহাত্ম্যে চমৎকার সহাবস্থান। সরস্বতী পুজোর আবহে ব‌ইমেলা, উল্টোটাও। দুয়ের সহাবস্থান‌ও কম চমকপ্রদ নয়। বিকেল গড়াতেই প্রেমিক-প্রেমিকার ভিড়। হাসিঠাট্টা, খোশগল্পে ব‌ইমেলা জমাটি আসর। তার মাঝেই নজর কাড়ল পিতা-পুত্রের জটিল অঙ্ক! ‘দীপ প্রকাশন’-এর সামনে দাঁড়িয়ে এক স্নেহবৎসল বাবা ছেলেকে বোঝাচ্ছিলেন, বাজেট মেপে আজ কোন কোন ব‌ই কেনা হবে। বছর ১৫-র ছেলের অবশ্য তাতে কান দিতে নারাজ। তার গন্তব্য ‘দীপ’-এর ব‌ইয়ের ভাণ্ডার। ‘দেব সাহিত্য কুটীর’-এর ভিতর‌ও এমন‌ই দৃশ্য। প্রায় গোটা দশেক ব‌ই নিয়ে বিলিং কাউন্টারের দিকে আগুয়ান মেয়েকে থামিয়ে তার মা-র ধমক, ‘আগে একটা ব‌ই পড়ে শেষ করে দেখা, তারপর বাকিগুলো কিনে দেব।’ ব‌ইমেলায় কেবলি এমন দৃশ্যের জন্ম হয়।

সকলেই জানেন, ব‌ইমেলার পেটের ভিতর একটা খাদ্যমেলা আছে। নাক-সিঁটকানো যাঁদের মজ্জাগত, তাঁরা ব্যাপারটাকে ভালো চোখে দেখেন না। বাঙালি পেট-রোগা জাত, সেই বদনামকে শিরোধার্য করেই হয়তো। তবে মার্কশিট বলছে, ব‌ইমেলার চেয়ে আপাতত এক গোলে এগিয়ে ‘খাদ্যমেলা’। ব‌ইমেলার বিরাট চত্বর কয়েক রাউন্ডে চষে ফেললে পেটে ইঁদুর-ছুঁচো নয়, ডাইনোসর ডন-বৈঠক দেবে! দিচ্ছেও। তাই ম‌ওকা বুঝে মেলার জনতা একহাতে ব‌ইয়ের ঝোলা সামলাচ্ছে, অন্যহাতে প্যাটিস কিংবা নবদ্বীপের লালদ‌ই।

শিল্পী: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘শিশু সাহিত্য সংসদ’ গতবছর পা দিয়েছে ৭৫-এ। তাদের ক্যাচলাইন বেশ নজরকাড়া – ‘আর‌ও ব‌ই কিনুন’। কিন্তু ছোটবড় অনেক প্রকাশনা গুছিয়ে বসলে‌ও ব‌ইমেলার ফিনিশিং টাচ এখন বাকি, হুঁ, ৪৮ ঘণ্টা পরে‌ও। ইতিউতি বেশ কিছু স্টলেই হাতুড়ির ঠুকঠাক চলছে‌ই। চলছে স্টল গোছানো। পছন্দের ব‌ই না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে ‘ব‌ইপোকা’দের। ফলে ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। ব‌ইকর্মীরা অবশ্য আশ্বস্ত করছেন, বলছেন‌ও, রবিবার থেকে সব ব‌ই পাওয়া যাবে। অত‌এব, রাই ধৈর্যং, রহু ধৈর্যং। সবে তো কলির সন্ধে।

মেলা হবে!