Robbar

পানীয় সংবাদ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 30, 2026 8:30 pm
  • Updated:January 30, 2026 9:00 pm  
an article about the historical books on alcohol by Rittik Mallik

মদ নিয়ে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে অজস্র বইয়ের নাম করা যায়। বইমেলার মাঠেই হয়তো পেয়ে যাবেন বেশ কিছু বই। তারপর যখন আপনি ছোটখাটো কোনও শারীরিক সমস্যার জন্য ভর্তি থাকবেন হসপিটালে, বা যখন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে মদ আপনার জীবন থেকে কিংবা ধরুন যখন আপনার হাতের কাছে নেই কোনও পানীয়, তখন ধীরে ধীরে চুমুক দিন এই সব বইয়ের পাতায়। চেষ্টা করুন দ্রুত সুস্থ হতে আর এই বিষয়ে আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে পাস্তুরের সেই অমোঘ উক্তি: ‘A bottle of wine contains more philosophy than all the books in the world.’

ঋত্বিক মল্লিক

হুইস্কিতে ‘e’ থাকা বা না-থাকা যে কোনও দেশের অহমিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে, সে-কথা জানতে পেরেছিলাম বেশ অনেক বছর আগের এক শীতকালে। দার্জিলিং ম্যালের তীব্র হাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে ঢুকে পড়েছিলাম অক্সফোর্ড বুক স্টলে আর সেখানেই চোখে পড়ে যায় একটা কালো লম্বাটে বাক্স, যার ওপরে সোনালি হরফে লেখা ‘হুইস্কি’ (‘e’ ছাড়া)। কনকনে ঠান্ডার যে জিনিসটা গ্লাসের মধ্যে পেলে প্রাণ জুড়িয়ে যেত, সেই আক্ষেপ নিয়ে, বই ভেবেই হাতে তুলে নিলাম বাক্সটা। ভেতরে মদ ছিল না বটে, তবে ছিল একখান চমৎকার ‘হিপ ফ্লাস্ক’, আর ছোট্ট একটি বই, যেখানে খবর আছে দেশবিদেশের নানা হুইস্কির। ভাবখানা যেন এইরকম, এই বিচিত্র সম্ভারের মধ্যে থেকে বেছে নিন মনপসন্দ পানীয়, ঢেলে নিন ফ্লাস্কের মধ্যে, রেখে দিন হিপ পকেটে আর খেতে থাকুন জীবনের প্রতিটি অবসরে। সেই বইয়েরই একটা অংশে চোখে পড়ল, ওই একটিমাত্র জায়গায় হুইস্কিতে ‘e’ আছে, অথচ বাকি বইটায় নেই। সামান্য কৌতূহল থেকে জড়িয়ে পড়লাম ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ে। মদ বানানোর নিরিখে, স্কটল্যান্ডের থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র করতেই নাকি আয়ারল্যান্ডের এই কৌশল, স্কচ হুইস্কির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মারক হিসেবে আইরিশ হুইস্কি নিজের শরীরে ধারণ করল এই সামান্য দ্বিতীয় স্বরধ্বনিকে। তারপর যখন আইরিশ অভিবাসীরা পৌঁছল আমেরিকায়, তখন আইরিশ হুইস্কির আদলে আমেরিকার হুইস্কিতেও চলে এল সেই দ্বিতীয় স্বরধ্বনি।

হিপ ফ্লাস্ক

মদের স্বাদ বইয়ে মেটাতে গিয়ে মনে হল, সারা পৃথিবীতে যেমন অসংখ্য বিচিত্র মদিরার সন্ধান পাওয়া যায়, প্রায় তাল মিলিয়ে এই নিয়ে বইয়ের সংখ্যাও অগুনতি। যেমন ধরুন, চিকিৎসক, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ এবং দার্শনিক আরনল্ড অফ ভিল্লেনোভা (১২৩৫-১৩১১) লিখেছিলেন এমন এক বই, যার নামই হল ‘দ্য আর্লিয়েস্ট প্রিন্টেড বুক অন ওয়াইন’। যদি আপনি মদের ইতিহাস নিয়ে জানতে চান, তাহলে রেড ফিলিপ-এর লেখা কিংবা ইয়ান গেটলি-র লেখা ‘কালচারাল হিস্ট্রি অফ অ্যালকোহল’ পড়ে দেখতে পারেন। তবে ইতিহাসের পাতায় যদি মাতালের মতো হারিয়ে যেতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্য পিছিয়ে যেতে হবে বছর পঞ্চাশ– অ্যালিস ফ্লেমিং-এর বইয়ের নামটিই বড়ো মধুর, ‘অ্যালকোহল: দ্য ডিলাইটফুল পয়জন: আ হিস্ট্রি’। ভারতের প্রেক্ষিতে দু’টি বইয়ের কথা বলতে পারি, ধীরেন্দ্রনাথ ঝা সম্পাদিত প্রাচীন ভারতের মদ্যপ্রস্তুত এবং মদ্যপান নিয়ে ‘ড্রিংক অফ ইমমর্টালিটি’ আর মগনদীপ সিংহের ‘দ্য ইন্ডিয়ান স্পিরিট’।

 

বাংলায় লেখা মদের বই অবশ্য কিছুটা লাভ-হেট সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল। ইংরেজদের হাত ধরে বা তাদের অনুসরণ করতে গিয়েই মদ্যপানের ‘নবজাগরণ’ ঘটে। এই নিয়ে সাময়িক পত্রপত্রিকায়, নাটকে, প্রহসনে, প্রবন্ধে মদকে ঘিরে নৈতিক অবক্ষয়ের কথা উঠে আসতে থাকে। খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে মদ্যপানের যোগাযোগ এই ধারণাকে আরও পুষ্ট করে তোলে। এদিকে রামমোহন রায় থেকে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা রাজনারায়ণ বসু পরিমিত মদ্যপানের পক্ষে ছিলেন এবং যদি একটি তালিকা করা যায় যে সেই সময়ের পানাসক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের, তাহলে সে তালিকার দৈর্ঘ্য নিতান্ত ছোট হবে না। কিন্তু মদ নিয়ে লেখা বইয়ের মধ্যে মদ্যপানবিরোধী বইয়ের কথাই বেশি মনে আসে। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয় টেকচাঁদ ঠাকুরের লেখা ‘মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়’। ১৮৮৮ সালে ‘কলিকাতা আশাদলের জনৈক সভ্য কর্ত্তৃক প্রণীত ও প্রকাশিত’ হল ‘সুরাপান বা বিষপান’ বইটি। এই বইয়ের উৎসর্গপত্রটি উল্লেখ করার মতো। শ্রীজ্ঞানচন্দ্র বসাক এই বইটি উৎসর্গ করেছেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই; সেখানে লিখেছেন: “ইহা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, আজকাল অনেক কৃতবিদ্য হিন্দুনামধারী ব্যক্তি মদ্যপান প্রভৃতি হিন্দ্যশাস্ত্রনিষিদ্ধ পাপে লিপ্ত থাকিয়াও কোন প্রকার সামাজিক শাসনে দণ্ডিত হইতেছেন না… তাঁহারা আপনার অকপট ধর্ম্মসাধনা ও যথার্থ সাধুজীবন স্মরণ করিয়া, সুরাপান প্রভৃতি পাপাচরণ থেকে বিরত থাকুন, এবং অকপট অন্তঃকরণে ধর্ম্ম-নিয়ম পালন করিতে যত্ন করুন, এই উদ্দেশে আমার এই ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি আপনার পবিত্র নামে উৎসর্গ করিলাম।” এইরকম আরও কয়েকটি বইয়ের কথা বলা যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভুবনেশ্বর মিত্রের লেখা ‘মদিরা’ (১২৮৭ বঙ্গাব্দ), গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মাদক সেবনের অবৈধতা ও অনিষ্টকারিতা’ (১৮৬৫), জ্ঞানধন বিদ্যালঙ্কারের ‘সুধা না গরল’ ইত্যাদি। চোখের সামনে মদের বোতল রাখতে যদি আপনি কুণ্ঠিত বোধ করেন, তাহলে বোতলের মতো দেখতে বই শ্রীশরচ্চন্দ্র পণ্ডিতের ‘বোতল পুরাণ’কে (১৩৩২ বজ্ঞাব্দ) অনায়াসেই সাজিয়ে রাখতে পারেন।

উনিশ শতকের কলকাতার মদ্যপান নিয়ে হাল আমলের দু’টি বইয়ের কথা বলতেই হয়। ২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয় পিনাকী বিশ্বাসের ‘কলিকাতার মদ্যপান: সেকাল ও একাল’ (খড়ি প্রকাশনী)– এই বইয়ে রয়েছে পাঞ্চ হাউস থেকে ট্যাভার্নের জমানা, ক্লাব-বার থেকে খালাসিটোলা-বারদুয়ারি। ঋত্বিক ঘটক থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কমলকুমার থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়রা। এই বইয়ের ‘সাহিত্যে বোতলবাজি’ অধ্যায়টি পড়তে পড়তে মনে পড়ল প্রায় সমসময় প্রকাশিত অলিভিয়া লয়িং-এর লেখা ‘দ্য ট্রিপ টু ইকো স্প্রিং: অন রাইটারস অ্যান্ড ড্রিংকিং’ বইটির কথা। আরেকটি বই হল, রক্তিম সুর-এর ‘বাঙালির মদ্যপান: উনিশ শতকের বিতর্ক’। হয়তো গোটা বই নয়, তবু বাংলু বা বাংলা মদ নিয়ে সুস্নাত চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘বাংলা আমার’ (যা সংকলিত হয়েছে ‘শুঁড়ির সাক্ষী’, ২০২০ বইয়ে) বেশ ঝাঁঝালো ‘বেঙ্গল টাইগার’-এর মতোই। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল ও অনার্য তাপস সম্পাদিত ‘নুনেতে ভাতেতে’ (৩), সতু বদ্যি-র ‘নেশার চক্রব্যূহ’, বারীন ঘোষাল সম্পাদিত ‘খালাসিটোলা’, গোরা রায়ের ‘পাঁইট পুরাণ’ নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল সংযোজন। তারাপদ রায় তো আছেনই। তবে বাংলা ভাষায় লেখা মদের এনসাইক্লোপেডিয়া বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তা হল প্রসাদরঞ্জন রায়ের ‘পুরনো কলকাতার মদ্যপান’। নাম দেখে বিভ্রান্ত হবেন না, গোটা মদের ভুবনকেই পেয়ে যাবেন এই বইয়ে।

ভিন্ন রূপে আবার এসেছে ফিরিয়া উনিশ শতকের সেই মদ্যপাননিবারণকারীরা। কোলেস্টেরল বা লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এলডিএল) বা ফ্যাটি লিভার-এর মতো এইরকম কিছু হল তাদের নতুন নাম। এরা সারাক্ষণ চোখ রাঙিয়ে চলেছে, সময়বিশেষে এবং ব্যক্তিবিশেষে আক্রমণ শানাচ্ছে মদিরাসক্তদের ওপর। এদের ভয় পেয়ে যাঁরা মদ খাচ্ছেন না বা লুকিয়ে খাচ্ছেন তাঁদের জন্য অব্যর্থ ওষুধ হচ্ছে ফ্র্যাঙ্ক কুপার-এর লেখা বই ‘কোলেস্টেরল অ্যান্ড দ্য ফ্রেঞ্চ প্যারাডক্স’। এই বই দেখাচ্ছে যে, আমেরিকানদের তুলনায় ফরাসিরা অনেক বেশি ওয়াইন এমনকী, পর্ক, বিফ চিজ, মাখন খাওয়া সত্ত্বেও হার্টের সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের এই রিপোর্ট আমেরিকার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হওয়ার পর আমেরিকায় ওয়াইন খাওয়ার দু’-বছরে ৪৪% বেড়ে যায়। ফরাসিরা সাধারণত ব্যায়াম করে কম, সিগারেট খায় বেশি, ভুঁড়ি থাকে আবশ্যিক অঙ্গের মতো। এই হল ওয়াইনের ম্যাজিক।

মদ যে কত বড় ম্যাজিশিয়ান, তা যে-কোনও পানশালায় গেলেই টের পাওয়া যায়। প্রায় নিভে আসা আলোর নিচে দু’-তিন পেগ গলা দিয়ে নামলে দেখা যায় যাবতীয় ভিন্ন মত, এক মতে পরিণত হয়েছে, এমনকী, যারা একই মতাবলম্বী, তাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে যত মত আর তত পথের আভাস। যে বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা, ঈষৎ টলায়মান অবস্থায় তাকেই জড়িয়ে ধরে চোখের জলে কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে পানশালা থেকে। শত্রুকে বশে আনার এমন সহজ সুলভ সমাধান আর কোথায় পাওয়া যাবে! তবে এই বিষয়ে মহোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন নেপোলিয়নের শ্যাম্পেনতুতো বন্ধু জাঁ রেমি মোয়েত। এই মোয়েতরা ছিল শ্যাম্পেন প্রস্তুতকারক। প্রতি যুদ্ধের আগে নেপোলিয়ন নাকি এই মোয়েত কোম্পানি থেকে শ্যাম্পেন সংগ্রহ করতেন। পরে নেপোলিয়ন এলবাতে যখন নির্বাসিত হন, তখন রাশিয়ান ফৌজ মোয়েতদের কোম্পানি অবরোধ করে এবং ছয় লক্ষ বোতল শ্যাম্পেন লুঠ করে নিয়ে যায়। মোয়েত নাকি এই ভয়ংকর আর্থিক ক্ষতিতে এতটুকু বিচলিত হননি, শুধু বলেছিলেন, ‘আজ যারা লুঠ করে আমাকে পথে বসিয়েছে, দেশে ফিরে এর স্বাদ কিছুতেই ভুলতে পারবে না, ওরাই আমার বিক্রি বহু গুণে বাড়িয়ে দেবে।’ ঘটল ঠিক তাই– শ্যাম্পেনের সমঝদার হয়ে উঠল নেপোলিয়নের শত্রুরাই!

মদ নিয়ে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে অজস্র বইয়ের নাম করা যায়। বইমেলার মাঠেই হয়তো পেয়ে যাবেন বেশ কিছু বই। তারপর যখন আপনি ছোটখাটো কোনও শারীরিক সমস্যার জন্য ভর্তি থাকবেন হসপিটালে, বা যখন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে মদ আপনার জীবন থেকে কিংবা ধরুন যখন আপনার হাতের কাছে নেই কোনও পানীয়, তখন ধীরে ধীরে চুমুক দিন এই সব বইয়ের পাতায়। চেষ্টা করুন দ্রুত সুস্থ হতে আর এই বিষয়ে আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে পাস্তুরের সেই অমোঘ উক্তি: ‘A bottle of wine contains more philosophy than all the books in the world.’ দুধের স্বাদ ঘোলে মিটলেও মদের স্বাদ বইয়ে মেটে না, একটি প্রসিদ্ধ মদকোম্পানির বিজ্ঞাপনের মতো, মদের স্বাদ সবচেয়ে উপাদেয় হবে যখন বসবেন তিন বন্ধু– আপনি, গ্লাসে মদিরা আর হাতে মদ নিয়ে লেখা কোনও বই!