
শ্রম ও কারখানা পরিদর্শন সংবিধান অনুযায়ী, আংশিকভাবে রাজ্যের অধিকারভুক্ত বিষয়। কেন্দ্রীয় সরকার এই সুযোগে প্রায়ই বলে থাকে, আইন প্রয়োগ রাজ্যের দায়িত্ব। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে কেন্দ্র সহজেই দায় রাজ্যের ঘাড়ে চাপাতে পারে। কঠোর কেন্দ্রীয় আইন আনলে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ থাকত না। তাই কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন নীতি অনুসরণ করছে, যেখানে আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ বাধ্যতামূলক নয়, আর তদারকি কার্যত দুর্বল।
ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে মাসোহারা দেওয়া হবে। সেই পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার খরচ বহন করবে সংস্থা। এইরকম আরও অনুদানের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। যেমনটা হয়ে আসছে বহু যুগ ধরেই। সমাজমাধ্যমের যুগে এসবের সঙ্গে একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে হয়। হ্যাঁ, ন্যারেটিভ। যে ন্যারেটিভে গোটা ঘটনার দায় অন্য কারও-র ওপরে চাপানো হবে। অন্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে। তাই হয়েছে। ইতিমধ্যে সেই বেসরকারী খাদ্য প্রস্তুত সংস্থা নিজেদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাঁচানোর সবরকম চেষ্টা করছে। যে কোনও বহুজাতিক সংস্থার-ই তাই করার কথা। এমনটাই হয়ে আসছে। হয়তো এমনটা ভবিষ্যতেও ঘটবে। কারণ, এটাই তো প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার বৃত্তে এইরকম ঘটনার পরিণতি এরকম ভাবেই হয়। যে পরিবার তাদের একমাত্র রোজগেরে সদস্যকে হারাল, তারা কী নিয়ে বাঁচবে? যে শরীরগুলো ঝলসে গেল আগুনের লেলিহান শিখায়, যে শরীরগুলো নিমেষে ছাই হয়ে গেল, যে স্বপ্নগুলো ডানা মেলার আগেই উড়ে গেল নিরুদ্দেশে, সেইসব কিছুর কি কোনও ক্ষতিপূরণ হতে পারে? জীবনের মূল্য কি অর্থ দিয়েই বিচার হয়? বহুযুগ ধরেই মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থকেই বিচার করা হয়। কিন্তু সঠিক পরিকাঠামোর হিসেব কেউ চায় না। সবাই সেই এক ভুল বারবার করে। বারবার অগ্নিকাণ্ড, মৃত্যু, শ্রমিক আইন, জীবনবিমা না-করা, আইন না-মেনে দাহ্য পদার্থ মজুত রাখা ইত্যাদি বিষয় বারবার উঠে এলেও, পরিকাঠামোগত ত্রুটি এবং আইনের ফাঁক রয়েই যায়।

ঠিক কতজন শ্রমিক ঝলসে গিয়েছেন, সেই হিসেব এখনও স্পষ্ট নয়। কেটে গিয়েছে অনেক রাত। বেড়েছে নিখোঁজের তালিকা। থানার বাইরে ভিড় করছেন পরিজনরা। দায়ের হচ্ছে নিখোঁজ অভিযোগ। কলকাতার বুকে একটি বেসরকারি খাদ্য সংস্থার গুদামে যখন ভয়াবহ অগিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল, তখন শহর গভীর ঘুমে। নিমেষে ঝলসে গেল কত প্রাণ! কলকাতায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শুধু একটি কারখানা বা গুদাম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়, এটি ভারতের শ্রম আইন ও শ্রমিক সুরক্ষার বাস্তব অবস্থার এক নির্মম চিত্র।
গভীর রাতে, যখন অধিকাংশ শহর ঘুমিয়ে, তখন বহু শ্রমিক সেই কারখানার ভেতরেই ঘুমোচ্ছিলেন। আইন অনুযায়ী, তাঁদের সেখানে থাকারই কথা নয়। আগুন লাগার পর পালানোর পথ ছিল না, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না জরুরি নির্গমন পথ। ফলে শ্রমিকদের পুড়ে মরতে হয়েছে, কেউ কেউ এখনও নিখোঁজ, কেউ অচেনা লাশে পরিণত হয়েছে। Factories Act, 1948–এর ৩৮ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, প্রতিটি কারখানায় আগুন লাগার সম্ভাবনা মাথায় রেখে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিরাপদ ভাবে একাধিক বেরনোর রাস্তা এবং জরুরি অবস্থায় শ্রমিকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকা বাধ্যতামূলক। শুধু যন্ত্র বসালেই দায় শেষ হয় না, সেগুলি কার্যকর রাখার জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করাও আইনসিদ্ধ কর্তব্য। কলকাতার ওই কারখানায় এই মৌলিক শর্তগুলির কোনওটাই বাস্তবে ছিল না বলেই প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসছে। আরও গুরুতর বিষয় হল, কারখানা বা গুদামের ভেতর শ্রমিকদের রাত কাটানো। কোনও শিল্প প্রতিষ্ঠানকে শ্রমিক আবাস হিসেবে ব্যবহার করতে হলে আলাদা অনুমোদন, স্বাস্থ্যবিধি, অগ্নি-নিরাপত্তা ও বসবাসযোগ্যতার মান পূরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, বহু কারখানায় শ্রমিকদের কাজের জায়গাতেই ঘুমোতে বাধ্য করা হয়। এই প্রবণতা শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি শ্রমিককে মানুষ নয়, সংরক্ষণযোগ্য যন্ত্র হিসেবে দেখার মানসিকতার প্রতিফলন।
২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার যে ‘Occupational Safety, Health and Working Conditions Code’ এনেছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এই কোডের সঙ্গে বাস্তবে বহু ফারাক রয়েছে। শ্রমিক সুরক্ষার বদলে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির তাগিদে নিরাপত্তা প্রশ্নটি পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ড দেখিয়ে দিল, আইন সংস্কার কাগজে যতই আধুনিক হোক, প্রয়োগ দুর্বল হলে তার মূল্য দিতে হয় শ্রমিকের জীবন দিয়ে।

সাধারণত কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলে, সরকারিভাবে কিছু আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। Employees’ Compensation Act, 1923 অনুযায়ী, কর্মরত অবস্থায় শ্রমিকের মৃত্যু হলে মালিকপক্ষ আইনত ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। প্রশ্ন হল, এই ঘটনায় কারখানার মালিক বা দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? নাকি সব দায় ধুয়েমুছে যাবে কয়েক লাখ টাকার ঘোষণায়? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রমিকের মৃত্যু রাষ্ট্রীয় সহানুভূতির খবরে পরিণত হয়, আইনি বিচারের পর্যায়ে পৌঁছয় না। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। কেন্দ্র শ্রম আইন সংস্কার করেছে, রাজ্য প্রশাসন লাইসেন্স ও পরিদর্শনের দায়িত্বে আছে, স্থানীয় পুরসভা বিল্ডিং প্ল্যান দেখে অনুমোদন করে, অগ্নিনির্বাপণ দপ্তর আলাদা নিয়ম মানে। ফলে এই দপ্তরভিত্তিক দায় ভাগাভাগির মধ্যে শেষ পর্যন্ত কেউই সম্পূর্ণ দায় নেয় না।
এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়, শ্রম আইন শুধু বইয়ের পাতা নয়, এটি মানুষের জীবনের সুরক্ষা চুক্তি। সেই চুক্তি যখন বারবার ভাঙা হয়, তখন আগুন শুধু কাঠামো পোড়ায় না, পুড়িয়ে দেয় রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ববোধকেও। শ্রমিকের জীবন যদি সত্যিই মূল্যবান হয়, তবে এই ঘটনার বিচার কেবল তদন্ত রিপোর্টে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আইন প্রয়োগ, দায় নির্ধারণ এবং শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে একমাত্র প্রকৃত শ্রদ্ধা।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই শ্রমিকরা ছিলেন অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক কিংবা সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক শ্রম ব্যবস্থার অংশ। ফলে তাঁদের কোনও জীবনবিমা ছিল না, কিংবা থাকলেও তা ছিল ন্যূনতম। ভারতের শ্রম বাস্তবতায় আজও বিপুল সংখ্যক শ্রমিক বিমা সুরক্ষার বাইরে। আইন অনুযায়ী, সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য জীবনবিমা বা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে বহু কারখানা ও গুদামে শ্রমিকদের কোনও লিখিত নিয়োগপত্রই দেওয়া হয় না, ফলে বিমা তো দূরের কথা, তাদের অস্তিত্বই সরকারি নথিতে ধরা পড়ে না। এই অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কাই প্রকট। অর্থাৎ, শ্রমিক বেঁচে থাকতে যেমন অদৃশ্য, মরার পরেও তেমনই পরিসংখ্যানের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি। রাষ্ট্র যদি সত্যিই শ্রমিক কল্যাণের কথা বলে, তবে জীবনবিমাকে ঐচ্ছিক সুবিধা হিসেবে নয়, কর্মসংস্থানের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে দেখা উচিত।

ভারতে কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঠিক কতজন শ্রমিক মারা যান, তার আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি সংখ্যা প্রকাশিত হয় না। তবে শ্রম মন্ত্রকের অধীন ‘DGFASLI’ (Directorate General of Factory Advice Service & Labour Institutes) করা রিপোর্ট থেকে একটি বাস্তবসম্মত ছবি পাওয়া যায়। ওই তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কারখানাগুলিতে প্রতি বছর গড়ে ১,০০০–১,২০০ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় মারা যান। এই মৃত্যুগুলির মধ্যে আগুন, বিস্ফোরণ, গ্যাস লিক ও দাহ্য পদার্থজনিত দুর্ঘটনা একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। বাস্তবে প্রতি বছর কয়েকশো শ্রমিক কারখানায় আগুন ও তাপজনিত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন। দেশের বিপুল অনানুষ্ঠানিক শিল্প ও গুদামভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা, যেখানে শ্রমিকদের কোনও নথিভুক্ত পরিচয় নেই, সেখানে এই সংখ্যা যে আরও অনেক বেশি। ফলে কারখানার আগুনে শ্রমিক মৃত্যু ভারতের ক্ষেত্রে কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং এটি একটি নিয়মিত, কাঠামোগত এবং দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত বাস্তবতা।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কেন্দ্রের শ্রমনীতি ক্রমশ ব্যবসা সহজ করার ধারণাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শিল্প ও কর্পোরেট বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য শ্রম আইনকে শিথিল করা হয়েছে, পরিদর্শন ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়েছে এবং মালিকপক্ষের উপর শাস্তিমূলক চাপ কমানো হয়েছে। এই সুবিধার ফলে অগ্নিনিরাপত্তা বা জীবন সুরক্ষার মতো বিষয়গুলি কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা না হয়ে শুধু নির্দেশিকায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

শ্রম ও কারখানা পরিদর্শন সংবিধান অনুযায়ী, আংশিকভাবে রাজ্যের অধিকারভুক্ত বিষয়। কেন্দ্রীয় সরকার এই সুযোগে প্রায়ই বলে থাকে, আইন প্রয়োগ রাজ্যের দায়িত্ব। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে কেন্দ্র সহজেই দায় রাজ্যের ঘাড়ে চাপাতে পারে। কঠোর কেন্দ্রীয় আইন আনলে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ থাকত না। তাই কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন নীতি অনুসরণ করছে, যেখানে আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ বাধ্যতামূলক নয়, আর তদারকি কার্যত দুর্বল। সমীক্ষা বলছে, দেশের অধিকাংশ শ্রমিক কাজ করেন গুদাম, ছোট কারখানা বা অঘোষিত শিল্পক্ষেত্রে, যেখানে সরকারি নথিভুক্তি নেই। কঠোর অগ্নিনিরাপত্তা বা জীবনবিমা আইন মানে এই শ্রমিকদের স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের সুরক্ষার দায় রাষ্ট্রের কাঁধে নেওয়া। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সেই দায় নিতে কেন্দ্রীয় সরকার আগ্রহী নয়। ফলে শ্রমিকরা থেকে যান আইনের বাইরে, আর তাদের মৃত্যু পরিণত হয় পরিসংখ্যানের বাইরের ঘটনায়।
এই অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট একদিন জমা পড়বে। ক্ষতিপূরণের টাকাও একদিন শেষ হয়ে যাবে। ব্র্যান্ড ভ্যালু হয়তো ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হবে। কিন্তু যে পরিবারগুলো তাদের একমাত্র রোজগেরে সদস্যকে হারাল, তাদের জীবনের শূন্যস্থান কি কোনওদিন পূরণ হবে? শ্রমিকের জীবন যদি সত্যিই মূল্যবান হয়, তবে প্রশ্নটা আজও থেকে যায়, পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের আগেই কি আমরা কিছু বদলাতে পারব, নাকি আবারও সবকিছু প্রক্রিয়ার নামে মেনে নেব?
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন আদিত্য ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved