
যখন চারিদিকে এই ঘৃণার পরিবেশ, যখন আমাদের চেনা শহরেও চিকেন প্যাটিস বিক্রি করার অপরাধে হেনস্তা হতে হচ্ছে, যখন একটি কলকাতার বিখ্যাত রেস্তরাঁতে একজন মুসলমান বেয়ারাকে, একটি অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তাঁর ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ শুনতে হচ্ছে তখন উত্তরাখণ্ডের ‘মহম্মদ দীপক’ যেন রূপকথার চরিত্র হিসেবে সামনে আসছেন।
প্রচ্ছদ: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
আমাদের দেশের উত্তরে ‘উত্তরাখণ্ড’ বলে একটা চমৎকার রাজ্য আছে। পাহাড়ে মোড়া সে-রাজ্যের সরকার বর্তমানে কিছু খারাপ, ঝগড়ুটে লোকের হাতে। কিন্তু উত্তরাখণ্ডে এই মুহূর্তে তাঁরা আলোচিত নয়। একমাত্র আলোচিত মানুষ, আলোকিত মানুষ– ‘মহম্মদ দীপক’! ওই রাজ্যের কোটদ্বার শহরের বাজারে একজন বয়স্ক মুসলমান দোকানির একটা জামাকাপড়ের দোকান ছিল। তিনি বেচতেন বাচ্চাদের ইশকুলের পোশাক। দোকানের নাম ছিল ‘বাবা’ শপ। একদিন সকালে বজরং দলের কিছু লোকেরা এসে তাঁকে বলে, ‘‘মুসলমান লোক দোকানের নাম ‘বাবা’ শপ রাখতে পারবে না।’’ নাম নাকি পাল্টাতে হবে। ‘বাবা’ বলে নাকি ওরা ওদের ঈশ্বরকে ডাকে।

মাসখানেক ধরে বারবার তাঁরা দোকানিকে উত্যক্ত করছিল। হঠাৎ নাম বদলালে যে ব্যবসার সমস্যা হবে– একথা তারা বুঝতেই চাইছিল না। শেষে একদিন বেদম ঝামেলা পাকাল তারা। তখন এক তাগড়াই চেহারার ভালো মানুষ রুখে দাঁড়ালেন। তিনি জিম চালান, গায়ে খুব জোর। লোকে তাঁকে ‘দীপক কুমার’ বলে চেনে। মুসলমান দোকানিকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর ওই বজরং দলের গুন্ডাদের সঙ্গে হাতাহাতির জোগাড়। তাঁকে নাম জিজ্ঞেস করতে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘মহম্মদ দীপক’। মুসলমান নাম। কিন্তু এটা তো তাঁর আসল নাম নয়! তিনি তো হিন্দু– দীপক কুমার। তিনি নিজের এই নাম বলেছিলেন, কারণ তাঁর ধর্ম, যা কি না হিন্দুধর্মই, তাঁকে আর্তর সঙ্গে একাত্ম হতে শিখিয়েছে। সেই দিন থেকেই ‘মহম্মদ দীপক’ সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সেদিন চলে গেলেও পরের দিন পুলিশি প্রহরায় বজরং দলের গুন্ডারা আবার এসে দীপক কুমারের জিমের সামনে ঝামেলা শুরু করে। বাধা দিতে গিয়ে তিনি গ্রেফতার হলেন। বর্তমানে ছাড়া পেয়েছেন। যদিও তাঁর নামে পুলিশে অভিযোগ জমা পড়েছে– কিন্তু তিনি ভয় পাননি। উল্টে সামাজিক মাধ্যমে এসে বলেছেন, তিনি কোনও অন্যায় করেননি। তিনি একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন এবং ভারতবাসী হিসেবে তাঁর প্রধান কর্তব্য পালন করেছেন।
দীপক কুমার যা বলেছেন, তা আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জরুরি একটি বার্তা– যখন ঘৃণা-বিদ্বেষের আবহাওয়া দূষিত করে চলেছে আমাদের দেশকে। ‘আমি হিন্দু নই, মুসলিম নই, শিখ নই, খ্রিস্টানও নই। প্রথমত, আমি একজন মানুষ। কারণ মৃত্যুর পর আমাকে ঈশ্বর এবং মানবতার কাছে জবাবদিহি করতে হবে, কোনও ধর্মের কাছে নয়।’ অন্য সংখ্যালঘু মানুষদের আড়াল করাই তো একজন সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব হওয়া উচিত। সেই শিক্ষাই তিনি আমাদের দিলেন। ওই ভিডিও বার্তায় তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি আপনাদেরকে, আমার ভাইবোন ও বন্ধুদের বলতে চাই যে, আমাদের দেশের ভালোবাসা ও স্নেহ প্রয়োজন, ঘৃণা নয়। আপনারা যত খুশি ঘৃণা ছড়াতে পারেন; তা থামানোর কোনও উপায় নেই। কিন্তু ভালোবাসা ছড়ানোটা অনেক বড় ব্যাপার।’

ভিডিওটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দীপককে এক্স, ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুকে দক্ষিণপন্থী সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। তাঁর পাবলিক প্রোফাইলগুলো আপত্তিকর মন্তব্যে ভরে গিয়েছে। একই সঙ্গে, অনেক ব্যবহারকারী তাঁর অবস্থানের জন্য সমর্থন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। দেশের লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি এই ‘মহম্মদ দীপক’কের এই কাজকে সমর্থন করে তাঁর এক্স হ্যান্ডেল লিখেছেন, ‘উত্তরাখণ্ডের দীপক ভারতের নায়ক’। তিনি আরও লিখেছেন, ‘সংঘ পরিবার ইচ্ছাকৃতভাবে দেশজুড়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষ ছড়াচ্ছে যাতে ভারত বিভক্ত থাকে এবং কিছু ব্যক্তি ভয়ের মাধ্যমে শাসন চালিয়ে যেতে পারে।’
রাহুল গান্ধীর একথার মধ্য দিয়ে ঘটনাটির রাজনৈতিক মাত্রাও বেড়েছে। আর বাড়বে না কেন, যেখানে বিভিন্ন রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে, ভারতে ঘৃণার চাষ এই কেন্দ্রীয় সরকারের সময়ে ঊর্ধ্বমুখী। একটি মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর মতে, ২০২৪ সালে ভারতে দেশটির ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা ‘বিস্ময়করভাবে’ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁদের রিপোর্ট বলছে, এই উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ক্ষমতাশালী ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (বিজেপি) এবং বৃহত্তর হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আদর্শগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গত ২০২৪ সালের ভারতের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লোকসভা নির্বাচনের সময় সমালোচক এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের মেরুকরণের করার লক্ষ্যে নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন জনসভাগুলোতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মুসলমানদেরকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি করেন যে, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস যদি জয়ী হয়, তবে তারা দেশের সম্পদ মুসলমানদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করবে।

বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিৎকার ভারতের ২২ কোটিরও বেশি মুসলিম জনসংখ্যাকে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ঘৃণামূলক মন্তব্যের ঘটনা ২০২৩ সালে ৬৬৮টি ছিল, যা ২০২৪ সালে ১,১৬৫টিতে পৌঁছেছে, যা বিস্ময়করভাবে ৭৪.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ তাঁদের রিপোর্টে লিখেছে, ঘৃণামূলক মন্তব্যে ৯৮.৫ শতাংশই মুসলমানদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছিল। এর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ঘটনা বিজেপি বা তার সঙ্গীদের দ্বারা শাসিত রাজ্যগুলিতে ঘটেছে। আজকে ২০২৬ সালে যদি হিসেব করা যায়, তাহলে তা নিশ্চিত বেড়েছে বলেই বিশ্বাস। প্রতিটি মুসলমান মানুষ আতঙ্কে দিন কাটান রোজ, আবার কোনও আইন এনে তাঁদের হয়রানি করা হবে না তো? সারা দেশে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, তিনি বাংলাভাষী মুসলমান, অর্থাৎ ‘মিঁয়া’দের কষ্ট দিতে চান।

যখন চারিদিকে এই ঘৃণার পরিবেশ, যখন আমাদের চেনা শহরেও চিকেন প্যাটিস বিক্রি করার অপরাধে হেনস্তা হতে হচ্ছে, যখন একটি কলকাতার বিখ্যাত রেস্তরাঁতে একজন মুসলমান বেয়ারাকে, একটি অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তাঁর ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ শুনতে হচ্ছে তখন উত্তরাখণ্ডের ‘মহম্মদ দীপক’ যেন রূপকথার চরিত্র হিসেবে সামনে আসছেন। তবু আশা জাগে, দীপকের মতো মানুষ আছে বলেই। এই ঘটনার কথা অবশ্যই পরের প্রজন্মের মানুষদের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত। ‘মহম্মদ দীপক’ আমাদের বোঝালেন, আমাদের এই দেশটা অসম্ভব সুন্দর, পাহাড়-নদী-মানুষের হৃদয়ও বিশাল। তবুও এখানে আছে অন্ধকার, সেই অন্ধকারে কোনও নিরাপত্তা নেই। এই অন্ধকারে ভয় ছাড়া কিছু নেই সংখ্যালঘুদের জন্য। তবু আমরা লড়ব, ভালোবাসব, এক হব, ঐক্য ও ভালবাসার দেশ গড়ব। কারণ, এ দেশ সত্যিই আমাদের প্রত্যেকের– তোমার, আমার, আমাদের।
আমাদের বড় হওয়ার সময়ে দূরদর্শনে প্রচারিত হওয়া সেই শিল্পী, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদদের উপস্থিতিতে সেই গান যেন ‘মহম্মদ দীপক’ আবার নতুন করে গেয়ে উঠলেন– ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা/তো সুর বনে হামারা।’
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved