
মহিলা বিজ্ঞানীদের এই নতুন তালিকায় প্রথমেই রয়েছে নোবেল পুরস্কার বিজেতা পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ মারি কুরি-র (১৮৬৭-১৯৩৪) নাম। অন্যান্যদের মধ্যে আছেন বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ সোফি জারমা (১৭৭৬-১৮৩১), ধাত্রীবিদ্যাবিশারদ অঁজেলিক দিউ ক্যুদরে (১৭১৪-১৭৯৪), পদার্থবিদ ও গণিতবিদ ইভন শোকে ব্রুয়া (১৯২৩-২০২৫) প্রমুখ।
জানেন কি, প্যারিসের বিখ্যাত ইফেল টাওয়ারের গায়ে খোদিত আছে ৭২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম, সেই ১৮৮৯ সাল থেকেই? তাঁরা কিন্তু সকলেই পুরুষ। এই টাওয়ার নির্মাণে যেসব মহিলারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের কারও নাম পর্যন্ত নেই!
ইফেল টাওয়ার। প্যারিসের অন্যতম আকর্ষণগুলির মধ্যে একটি, নির্মিত হয়েছিল ১৮৮৭ থেকে ১৮৮৯-এর মধ্যে। ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীকে মনে রাখতে লৌহ নির্মিত টাওয়ারটি তৈরি করেন গুস্তাভ ইফেল। প্যারিসবাসী আদর করে এর নাম দিয়েছেন, ‘লা দাম দ্য ফ্যার’ বা লৌহমানবী। টাওয়ারটি ৩৩০ মিটার বা ১০৮৩ ফুট উচ্চ যা কি না প্যারিসের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু। টাওয়ারে আগন্তুকদের জন্য তিনটি তলা রয়েছে। প্রথম দু’টি তলায় রেস্টুরেন্ট এবং ৯০৬ ফুট উচ্চ তৃতীয় তলাটি প্যারিস শহরের দৃশ্য পাখির চোখে দেখার জন্য। পুরোটা উঠতে ছ’শো সিঁড়ি ভাঙতে হয়। টাওয়ারের ডিজাইনটি তৈরি করেন দুই ইঞ্জিনিয়ার মরিস কোয়েকলা এবং এমিল নুগুইয়ে। ১৯৯১ সালে ইফেল টাওয়ারকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

শেষপর্যন্ত। হ্যাঁ, শেষপর্যন্ত তাঁদের চার বছরের লড়াইটা জিতেই গেল লাসোসিয়াসিও ফাম এ সিয়ঁস (উইমেন অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন)। এবারে প্যারিসের ইফেল টাওয়ারে খোদিত ৭২ জন নামী পুরুষের নামের পাশে থাকবে ৭২ জন বিশিষ্ট নারীর নামও।
এতদিন প্যারিসের ইফেল টাওয়ারের প্রথম ব্যালকনির নিচে স্বর্ণাক্ষরে ৭২ জন বিশিষ্ট পুরুষ বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার এবং শিল্পপতির নাম জ্বলজ্বল করত। যার মধ্যে ইফেল টাওয়ার প্রণেতা গুস্তাভ ইফেল-এর নিজের নামও ছিল। বিজ্ঞানীদের মধ্যে নাম রয়েছে বিশিষ্ট রসায়নবিদ অন্তোয়ান ল্যভোয়াজিয়ে (১৭৪৩-১৭৯৪), অঙ্ক ও পদার্থবিদ অন্ধ্রে মারি অঁপেয়ার (১৭৭৫-১৮৩৬), পদার্থবিদ শার্ল অগাস্তা কুলো (১৭৩৬-১৮০৬) প্রমুখের। অথচ টাওয়ার নির্মাণে থিয়োরি অফ ইলাস্টিসিটির কাজটির জন্য বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ সোফি জারমা-এর নামটাই বাদ গিয়েছিল স্রেফ নারী হওয়ার জন্যই।

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে গুস্তাভ ইফেল স্বয়ং এই খোদাইয়ের কাজটি করিয়ে যান। ৬০ সেমি বা ২৪ ইঞ্চি দীর্ঘ অক্ষরে সজ্জিত সেইসব নামগুলি বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় নতুন করে রং করা হয় এবং ১৯৮৬-’৮৭ সালে রেস্টোর করে সোসিয়েতে ন্যুভেল দেক্সপ্লোয়াতাসিও দ্য লা ত্যুর ইফেল কোম্পানি। ২০১০-১১ সালে আবার করে রং করিয়ে অক্ষরগুলির সোনা রঙে রেস্টোর করা হয়।
এবারে বিশিষ্ট পুরুষদের পাশে একই ঔজ্জ্বল্যে থাকবে ৭২ জন স্বনামধন্য মহিলা বিজ্ঞানীর নামও। এ বছর ২৬ জানুয়ারি এই ৭২ জন বিজ্ঞানীর নাম সর্বসমক্ষে এনে প্রস্তাব জানাল ইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষ এসইটিই এবং উওমেন অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাসোশিয়েশন। বিজ্ঞানীদের তালিকাটি অ্যাকাদেমি অফ সায়েন্স, টেকনোলজি এবং মেডিসিন-এর কাছে জমা দেওয়া হবে। প্যারিস শহরের তরফে একটি প্রেস রিলিজে একথা জানানো হয়। সব ঠিকঠাক থাকলে আর কিছুদিন বাদেই খোদাইয়ের কাজ শুরুও হয়ে যাবে।
মহিলা বিজ্ঞানীদের এই নতুন তালিকায় প্রথমেই রয়েছে নোবেল পুরস্কার বিজেতা পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ মারি কুরি-র (১৮৬৭-১৯৩৪) নাম। অন্যান্যদের মধ্যে আছেন বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ সোফি জারমা (১৭৭৬-১৮৩১), ধাত্রীবিদ্যাবিশারদ অঁজেলিক দিউ ক্যুদরে (১৭১৪-১৭৯৪), পদার্থবিদ ও গণিতবিদ ইভন শোকে ব্রুয়া (১৯২৩-২০২৫) প্রমুখ।

তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিজ্ঞানী থেকে ডাক্তার কিংবা শিল্পী, শুধুমাত্র মহিলা বলে নিজের গুণের কদর পাননি এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম নয়। ফরাসি গণিতবিদ সোফি জারমা-এর মতো খ্যাতনামা ফরাসি ভাস্কর অগুস্ত রদাঁর বান্ধবী ভাস্কর ক্যামি ক্লদেল অথবা পুরুষের ছদ্মবেশে ডাক্তারি করে যাওয়া ব্রিটিশ সার্জেন জেমস ব্যারি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারেন। ব্রিটিশ রসায়নবিদ রোজালিন ফ্রাঙ্কলিন, অস্ট্রিয়ান-সুইডিশ পদার্থবিদ লিজে মেইতনার, চিনা-আমেরিকান পদার্থবিদ শিয়েন শিয়ুং য়ু প্রমুখের মতো আরও কত মহিলা বিজ্ঞানীই তো স্বীকৃতি পাননি সারাজীবনে। এই ৭২ জন মহিলা বিজ্ঞানীর তালিকায় সোফি জারমা বাদে তাঁরা আরও কতজন স্থান পেলেন সেটাও দেখার।
প্যারিসের মেয়র অ্যান ইদালগো এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই বালিকারা ইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার, গণিতবিদ, রসায়নবিদ, জীববিজ্ঞানী, কম্পিউটার বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, পদার্থবিদ, মহাকাশবিদ অথবা পরিবেশবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved