
এই যে ‘বলো অন্যভাবে’, তার চাহিদা কিংবা কদর তো বহু পুরোনো। প্রেমের চিঠি দেওয়া-নেওয়ার যুগে ভালো বাংলা লিখতে-পারা নির্ভরযোগ্য বন্ধুকে জোগাড় করে অথবা ঘুষ দিয়ে এক্সক্লুসিভ ভাষায় চিঠি লিখিয়ে নেওয়ার চল তাই বরাবরই ছিল। কিন্তু এ যুগের দাবিতে শুধু অন্যভাবে বলাটুকুই শেষ কথা নয়। যত অস্পষ্টতা আর আবছা ইঙ্গিতে বলা যায় ততই ভালো। প্রায় না-বলা বাণীর কুয়াশা দিয়ে বলাটুকুকে যত বেশি ঢেকে দেওয়া যায়, ততই ভালো। প্রত্যক্ষ জানান দেওয়ার সহজ রীতরকমকে অস্বীকার করে যত অপ্রত্যক্ষে, যত ইশারায় বুঝিয়ে দেওয়া যায়, ততই ভালো। কিন্তু সবার চাইতে ভালো, ‘ডগ-হুইসল’, বা এমনভাবে বলা, যাতে শুধু যার যা বোঝার সে ঠিক বুঝবে, লক্ষ্যে গিয়ে তির বিঁধবে, কিন্তু বাকি বিশ্বসংসারে কেউ বুঝবে না কিছুই!
সেবারে বেশ একটু শোরগোল পড়ল আমাদের ফেমাজীয় বন্ধুবৃত্তে। সকাল-বিকেল-সন্ধে, যখনই ফেসবুক খুলছি, জনৈক বন্ধুর ছবি ভেসে উঠছে নিউজ ফিডে। বছর সাত-আট-দশ-বারোর সব পুরনো ছবি, সেসব ছবিতে তাকে চেনা তো প্রায় যায়ই না, উপরন্তু ছেলেমানুষি কাঁচা হাসি আর ঈষৎ অপ্রস্তুত অপরিপক্কতায় ভরপুর সেইসব দিনের সাজ আর ভঙ্গিমা। কিন্তু এতদিন পরে এসব ছবি স্মৃতিপট থেকে টেনে বের করে আনলই বা কে? প্রত্যেকটা ছবির নিচের কমেন্ট সেকশনেই দেখা মিলল উত্তরের। বন্ধুর প্রেমিকটি, সেও আমাদেরই আর-এক দুষ্টুবুদ্ধিধারী বন্ধু, প্রত্যেকটা ছবির তলায় সেঁটে দিয়ে গেছে পাঁচটা করে ফুটন্ত লাল হৃদয়। আর তাতেই বহু যুগের অতল থেকে আবার দৃশ্যপটে এসে হাজির হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া ছবিগুলো। সোশাল মিডিয়ার ভাষায় একেই বলে ‘বাম্প’ করানো। তা সেবার খুব একচোট হাসাহাসি, চোখ ঠারাঠারি, এক বন্ধুর গাঢ় অনুরাগে ভরা নির্দোষ এসব উত্যক্ত করা, আর অন্যজনের ছদ্মকপট রাগ– সব মিলে যেতে দেখলাম। প্রেমিক-প্রেমিকার এই ঘুড়ি-লাটাই জীবনের অন্যতম অভিজ্ঞান হয়ে রইল ওই ফোটোবাম্পিং। আমরা যারা জানতাম, কিংবা জানতাম না ওদের মিষ্টি সিক্রেটখানি, সবাই বুঝে ফেললাম, দু’-দিকের জলেই তরঙ্গ উঠেছে।

ফেসবুকে অবশ্য সম্পর্ক, অসম্পর্ক, নতুন সম্পর্ক, পুরনো সম্পর্ক, বিবাহিত সম্পর্ক, একাধিক সম্পর্ক, মুক্ত সম্পর্ক– চাইলে সবই ঘোষণা করে জানান দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কোনও ইন-বিল্ট সেটিংসে ঠিক করে দেওয়া অপশনের ধারকাছ ওরা মাড়াল না সেবার। নিজেদের বেছে নেওয়া কায়দায়, প্রায় কিছুই না বলেই, সব কিছুই বলে দিল, স্রেফ একটা ছোট্ট ‘ফোটোবাম্পিং’ দিয়ে। প্রেমের ভাষার এই আনকোরা সংযোজনটি কোনও ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাকরণ না মেনেও ফুল মার্কস আদায় করে নিল এখানেই। আজকের প্রেমের ভাষায় কিন্তু এই অনিয়মটাই নিয়ম। প্রেমের প্রকাশ-ভঙ্গিমায় যেখানে অভিনবত্ব যত বেশি, যার রকম যত নতুন এবং অচেনা, তার প্রেমের কথা শোনা যাবে তত সজোরে। চাই কী, প্রেমের বয়ানখানি শেয়ারিত হতে হতে ভাইরালও হয়ে যেতে পারে! ট্রেন্ড না-মানার ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে না-চাইতেই নতুন একখানি ট্রেন্ডও কতবার এইভাবেই শুরু হয়ে গেছে!
প্রেমে-থাকা মেয়েরা অনেকেই যেমন প্রেমিকের তুলে-দেওয়া ছবির ক্যাপশনে লিখে রাখে, ‘পারমানেন্ট ক্যামেরাম্যানের তুলে দেওয়া ছবি’। মায়াকাড়া প্রেমিকেরা আবার ভালোবাসার মেয়েটির ছবিতে আলগোছে লিখে যায় ‘যার টানে বাড়ি ফেরা, তাড়াতাড়ি’। এক অসামান্য প্রেমের ইজাহার যেমন দেখেছিলাম এক বিখ্যাত ফোটোগ্রাফারের তোলা ছবিতে। বিয়ের বার্ষিকীর এক দিনে একটি ভিন্টেজ দেওয়ালঘড়ির ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমরা দুজন’। সে ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে আছে, দুই কাঁটা একাকার।

আসলে এই যে ‘বলো অন্যভাবে’, তার চাহিদা কিংবা কদর তো বহু পুরোনো। প্রেমের চিঠি দেওয়া-নেওয়ার যুগে ভালো বাংলা লিখতে-পারা নির্ভরযোগ্য বন্ধুকে জোগাড় করে অথবা ঘুষ দিয়ে এক্সক্লুসিভ ভাষায় চিঠি লিখিয়ে নেওয়ার চল তাই বরাবরই ছিল। কিন্তু এ যুগের দাবিতে শুধু অন্যভাবে বলাটুকুই শেষ কথা নয়। যত অস্পষ্টতা আর আবছা ইঙ্গিতে বলা যায় ততই ভালো। প্রায় না-বলা বাণীর কুয়াশা দিয়ে বলাটুকুকে যত বেশি ঢেকে দেওয়া যায়, ততই ভালো। প্রত্যক্ষ জানান দেওয়ার সহজ রীতরকমকে অস্বীকার করে যত অপ্রত্যক্ষে, যত ইশারায় বুঝিয়ে দেওয়া যায়, ততই ভালো। কিন্তু সবার চাইতে ভালো, ‘ডগ-হুইসল’, বা এমনভাবে বলা, যাতে শুধু যার যা বোঝার সে ঠিক বুঝবে, লক্ষ্যে গিয়ে তির বিঁধবে, কিন্তু বাকি বিশ্বসংসারে কেউ বুঝবে না কিছুই! সম্পূর্ণা আর বাসবদত্তার গল্পটা যেমন। সম্পূর্ণা ছিল আমার বন্ধু, আর বাসবদত্তা আমার বন্ধু শান্তনুর পাড়াতুতো বন্ধু, বহু দিনের। গত বছর বইমেলায় আমার আর শান্তনুর যখন দেখা হয়, তখন তাঁরাও সঙ্গে ছিলেন। তা সেদিন নাকি সম্পূর্ণার হাত জুড়ে ছিল পিনাকী ঠাকুরের কবিতার বই– ‘অঙ্কে যত শূন্য পেলে’ আর ‘চুম্বনের ক্ষত’। সেদিন আমরা জনা ছয়েক বন্ধু মিলে দমকা হাওয়ার মতো একঝলক তুমুল আড্ডা দিয়েছিলাম মিনিট তিরিশ। দিন দুয়েক পরে, সম্পূর্ণাকে পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্টেড হওয়ার পর বাসবদত্তা নাকি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছিল, ‘তেমন মেয়েকেই ভালোবাসতে পারি, পিনাকী ঠাকুরের কবিতা যে এখনও পড়ে!’ ব্যাস, সম্পূর্ণা আর যায় কোথায়!

বাসবদত্তার এই প্রেম জানান দেওয়ার ধরনটা আসলে ‘আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে’ টাইপ। কিন্তু জীবনানন্দ না-হয় লক্ষ্য করলেন, কিন্তু সেই উদ্দিষ্ট ‘তুমি’টি কি লক্ষ করল? শুধু সকলের অজান্তে, একজনেরই বোঝার মতো করে সাবটেক্সট গড়ে প্রেমের দস্তখত করে দিলেই তো আর হল না! সেই বয়ানখানি যাতে সে পড়ে, তার চোখে পড়ে, সেই বন্দোবস্তটুকুও তো করা চাই! সোশাল মিডিয়ায় নিশ্চুপে যেমন একে অন্যকে মাপাও যায়, তেমনই জানান দেওয়ারও নানা কায়দাকানুন রয়েছে। ধরুন একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম ফোনটা হাতে নিয়েই দেখলেন কোনও একটি সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে আপনার কাছে খানচল্লিশ নোটিফিকেশন এসে জমা হয়েছে। হয়তো এমন কোনও নতুন ‘অ্যাক্টিভিটি’ আপনি তার আগে করেননি, যার জেরে অত নড়াচড়া পড়তে পারে আপনার সামগ্রিক ফেসবুক বৃত্তে। ফলে আপনি অত্যন্ত অবাক হবেন, হয়তো একটু ঘাবড়াবেনও। আর তারপর অ্যাপের নোটিফিকেশন খোলামাত্রই অবধারিত দেখবেন, কোনও একজন এসে পরপর যেখানে আপনার যত ছবি কিংবা পোস্ট দেখেছে, সবই ‘লাইক’ করতে করতে গেছেন। অর্থাৎ, তিনি আছেন, তিনি এসেছিলেন, তিনি সব দেখেছেন, ভালোবেসেছেন এবং এখন চলে গেছেন। নিজের ভালো-লাগাটি অশব্দে জানান দেওয়ার এই রীতিটিকে কমজোরি ভাবার ভুল ভুলেও করবেন না। নোটিফিকেশনের ঠেলায় কোনওদিন যদি জেরবার হতে হতে এই অলক্ষে নোটিফিকেশন-তির ছুড়ে-যাওয়া শব্দবেধী এক্সপার্টদের কাছে গড় করতে না হয়, তাহলে অন্তত খানদশেক লাইকাদির পরেই হয় তিনি যা চাইছেন (যথেষ্ট পাত্তা অথবা প্রশ্রয়), সেটি দেওয়ার মতো হলে তাঁকে হয় দেবেন, আর নয়তো পত্রপাঠ বিদেয় (ব্লক) দেবেন। এর অন্যথায় ভোগান্তি হয় কি না, আপনার সাহস থাকলে সেসব পরীক্ষার ল্যাবে গিয়ে আপনি অ্যাপ্রন পরে তৈরি হোন গে যান, আমার লেখাকে পরে দুষবেন না যেন।

আসলে, নানা ছলে ‘ভালো লাগছে’ কিংবা ‘ভালোবাসছি’ বলার আগের ধাপে রয়ে যায় এই সব আধফোটা ইঙ্গিত। সরাসরি বলে এক লহমায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় এড়াতে এসব পদ্ধতির জুড়ি যেমন মেলা ভার, তেমনই আবার আমার যাকে ভালো লাগছে, তারও মনে কিঞ্চিৎ দোলা জেগেছে কি না, তা বুঝতে হলেও এ একেবারে অব্যর্থ দাওয়াই। তবে এসব টোটকা কিন্তু সবই একদম স্ট্রিক্টলি ওয়ান-শট। অর্থাৎ, একবারই চান্স নেওয়া যাবে, তাতে লেগে গেলে ভাগ্য ভালো। নইলে প্রতিদিন লক্ষকোটি লাইক আর কমেন্টের ভিড়ে যার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিলেন, এবার তার রীতিমতো কুদৃষ্টির বলি হওয়া থেকে কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না! তাই চাঁদমারি ছুঁতে না পারলে ওপথে বারবার হাঁটা বারণ! নইলে কিন্তু উল্টো ফল ফলবে, আর নানারকম রেস্ট্রিকশন চেপে বসবে সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের ওপরে।
সোশাল মিডিয়া যখন প্রথম প্রথম ধরা দিচ্ছিল আমাদের হাঁড়ির খবর পরস্পরের কাছে উজাড় করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে, তখন কিন্তু প্রেমের ভাষায় এই লুকোচুরি না-করাটাই ছিল দস্তুর, ছিল ফ্যাশন। পঞ্চাশের দশকে মার্কিন কলেজগুলোতে নাকি ‘কলেজ নিউজপেপার’ নামে একটা স্পেশাল ‘ইনক্যাম্পাস বুলেটিন এডিশন’ বের করার পরম্পরাই ছিল, যেখানে কাপলরা লিখিত ঘোষণা করতেন, কে কার সঙ্গে সম্পর্কে জড়াচ্ছেন! প্রায় এরই প্রতিফলন আমরা দেখেছিলাম ফেসবুকের ‘রিলেশনশিপ স্টেটাস’-এর মধ্যে, যা ছিল এই সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটির গোড়ার দিকের অন্যতম জনপ্রিয় ফিচার। প্রতিটি পুরনো নতুন বন্ধু সে-যুগে একে অন্যকে মেপে নিত, তার প্রোফাইলের রিলেশনশিপ স্টেটাস দেখে। হবু প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালো করে যাচাই করে নিত সিট ফাঁকা আছে কি না, আবার প্রেম কবুল করার পর নিজের নিজের সিট পাকা হল কি না, সে হিসেবও দেখে নিত সম্পর্কের ঘোষণা দিয়ে। এই প্রবণতা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল যে, পরস্পরের প্রতি প্রেম প্রকাশ করার ভাষার মধ্যে রীতিমতো শিং বাগিয়ে গুঁতিয়ে ঢুকে পড়ছিল এই রিলেশনশিপ স্টেটাসের শব্দগুলো। ফেসবুকে চালু হওয়ার ঠিক তিন বছরের মাথায় যেমন ‘আরবান ডিকশনারি’তে পাকাপাকি নিজের জায়গা করে নিল “ইট’স কমপ্লিকেটেড” শব্দবন্ধটি। ভুলেও ভাববেন না, এর মানে খুব জটিল বা দুর্বোধ্য কিছু। সোজা কথায় এর মানে, বক্তার প্রেমজীবন অতি রঙিন, বহুসমাগমে উজ্জ্বল এবং অবশ্যই, এসব পা ফসকানো দুষ্টুমির লাইসেন্স অন্যের চোখের সামনে এমনি এমনি নিশ্চয়ই নাচানো হচ্ছে না!

তবে, এসব করে বড়জোর পছন্দের মানুষের চোখে পড়া যায়, কিন্তু প্রেম জানান দিতে হলে কিছু নীরবতা আজও লাগে। নৈর্ব্যক্তিক স্টাইল তো বাইরের সিংদরোজা মাত্র, ভেতরঘরের চাবি খুলতে গেলে কিন্তু আজও সেই ব্যক্তিগত উচ্চারণ ছাড়া গতি নেই। অনেকদিন আগে মনে পড়ে যেমন, প্রথম প্রেমটা নষ্ট হওয়ার বছর দেড়েক পরের কথা। এক দ্বৈত পাহাড়সফরের কিছু একেলা ছবি ছেড়েছিলাম নিজের দেয়ালে, তার একটি ছবিতে জলযাত্রার ক্যাপশনে উৎপলকুমার বসু ধার করে লেখা ছিল ‘স্বপ্নে পাওয়া আঙুল স্পর্শ করি জলের অধিকারে’। অচিরেই অতিপ্রিয় এক বন্ধুর কমেন্ট ভেসে এসেছিল, ‘পোড়ামুখী দু-চোখের বিষ’! ওই যে বলেছিলাম, যার বোঝার, সে ঠিকই বোঝে!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved