

দিন বদলাচ্ছে। সুড়সুড় করে ঢুকে পড়ছে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’। খুব শিগগির হয়তো এসে পড়বে: “PranamPay: Respect More, Earn More!” মুক্তবাজার থেকে ভক্ত সাজার অর্থনীতি! প্রণামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে স্ক্র্যাচ কার্ড আর ক্যাশব্যাক– ‘পাশের পাড়ার খিটখিটে করালী জ্যাঠাকে প্রণাম করলেই ১০০% পর্যন্ত ক্যাশব্যাক জেতার সুযোগ!’ কিন্তু তার আগে পর্যন্ত প্রণামীর অর্থনীতি আমাদের নির্দয়ভাবে মনে করাতে থাকবে– সব অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিখাদ বাজারের নিয়মে চলে না, আর কোনও সামাজিক সম্পর্কই সম্পূর্ণ স্বার্থহীন নয়।
প্রচ্ছদের ছবি: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতের অর্থনীতি বোঝার জন্য বিজ্ঞ পণ্ডিতেরা সাধারণত কতগুলো গালভরা খটমটে বিষয় নিয়ে মাথা ঘামান– জিডিপি, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান, রাজস্ব ঘাটতি, রেপো রেট, সেনসেক্স আর লাল শালুতে মোড়া কেন্দ্রীয় বাজেট। কিন্তু এই দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক বিশাল সিংহভাগ ঘটে এইসব রাজকীয় পরিসংখ্যানের আলোকবৃত্তের বাইরে, চটিজুতো আর পাপোষের ধুলোখেলায়।
যেমন ধরুন:
–বিয়ের বাড়িতে প্রীতি-উপহারের নামে খামে টাকা গুঁজে দেওয়া
–অঙ্কে লেটার পেলে দূর সম্পর্কের মামার স্পনসরশিপ
–জয়েন্টে চান্স পাবই পাব স্বপ্ন দেখিয়ে মাকে পটিয়ে বাবার পকেট সাফাই
এবং সর্বশেষে শাশ্বত পুরোনতুন সামাজিক লেনদেন– যেখানে একটি শিশু স্থান-কাল-পাত্র বুঝে মাথা নিচু করামাত্র কয়েক সেকেন্ড পর তার হাতে নগদ টাকা চলে আসে।
শেষোক্ত ঘটনাটি দীর্ঘদিন গবেষকদের নজর এড়িয়ে গিয়েছে এবং অবশ্যই শিশুর পকেট! আশ্চর্য সেই ক্যাশফ্লো– কোনও লাইসেন্স লাগে না, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিষ্প্রয়োজন এবং যার পরিমাপে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আজও কোনও সূচক আবিষ্কার করতে পারেনি। অথচ প্রতি বছর এতে কোটি কোটি টাকার হাতবদল ঘটে, ঘটেছে, কতদিন ঘটবে জানা নেই, তবে পুজোপাব্বনে এই সমান্তরাল অর্থনীতি জিওল মাছের ন্যায় ছটফটায়মান! কিন্তু লেনদেনের সময়টা ততই নিশ্চুপ, শান্তির– কোনও চুক্তি সই হয় না, ক্রেডিট স্কোর যাচাই করা হয় না, আয়কর দফতরও সম্পূর্ণ অন্ধকারে। অর্থের উৎস কখনও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর পাতলুন, কখনও অফিস-ফেরতা পিসির ফুলো মানিব্যাগ, কখনও-বা গৃহিণীর সিন্দুক। পুরো অপারেশনটি ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে– প্রথমে সুবিধাভোগী নিঃশব্দে এগিয়ে যায়, একটি সংক্ষিপ্ত শারীরিক ক্রিয়া (মেরুদণ্ড ও হাঁটুর যৌথ ‘নমন’) সম্পন্ন হয়, আর সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যমান হয় অর্থনৈতিক ফলাফল: কখনও দশ, কখনও কুড়ি, কখনও বা পাঁচশোর নোট!
গবেষকরা প্রথমে ভেবেছিলেন এ স্রেফ পারিবারিক আচরণ। কিন্তু ফিল্ড-ওয়ার্কে দেখা গেল, প্রতিবার একই কায়দায় মাথা নোয়ানোর (পড়ুন: বিনম্র নয়নে, পদধূলি দ্বারা মস্তকমণ্ডিত অবগাহন) পরেই হুড়মুড়িয়ে নগদ ঢুকছে। আর ভারতে কাকতালীয় ঘটনা বারবার ঘটলেই তো তদন্ত কমিটি অবধারিত! গঠিত হল: ‘Intergenerational Informal Cash Transfer Investigation Committee (IICTIC)’। আর সম্প্রতি, এই তদন্তধারায়– সদ্যপ্রয়াত প্রবীণ ঐতিহাসিক সুমিত সরকারের দক্ষিণ কলকাতার পুরনো বাড়ির ঘুণধরা বইয়ের আলমারি থেকে উদ্ধার হল একতাড়া খাকি মোড়কের দলিল। ধূলিমলিন কভার খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ! সবার ওপরে টাইপরাইটারে ছাপা একখানা পুরোদস্তুর গবেষণাপত্রর হার্ড বাউন্ড খসড়া:
প্রথম পাতায় বড় বড় করে লেখা–
‘The Economics of Reputation: A Preliminary Study of Ritual Capital, Seasonal Cash Transfers and Childhood Consumerism’
তারপর পাতার পিছনে লেখক ও গবেষণা সংক্রান্ত ইত্যাকার, সব মিলিয়ে যার নিপাট বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায়–
শিরোনাম: ‘সম্মান বেচাকেনার অর্থশাস্ত্র: ভক্তিমূলক পুঁজি, মরশুমি নগদ খয়রাত ও শৈশবকালীন খদ্দেরগিরির একখানা প্রাথমিক পোস্টমর্টেম’
গবেষক: অর্থলোলুপ শৈশব ফেলে আসা এক প্রাক্তন শিশু
প্রতিষ্ঠান: শৈশবকালীন অর্থশাস্ত্র সংক্রান্ত উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্র
অর্থায়ন: দুধে-ভাতে শৈশব থেকে আঠারোর সাবালকত্ব– এই সুদীর্ঘ কালপর্বে বড়দের শ্রীচরণে মাথা ঠুকে সংগৃহীত নিজস্ব প্রণামী পুঁজি দ্বারা স্ব-উদ্বুদ্ধ ও স্ব-পোষিত।
পাতা ওলটানো মাত্রই নথির পাতায় গবেষকশ্রেণির ঘুম উড়িয়ে দেওয়া একখানা দুর্লভ স্ট্যাটিস্টিক্যাল সার্ভে টেবিল! বৈজ্ঞানিক মেথডোলজিতে ফাঁস বাঙালির পারিবারিক অর্থনীতির উলঙ্গ সত্য:
সূচক পর্যবেক্ষিত ফলাফল
প্রতি প্রণামে রথের মেলায় গড় নগদ প্রাপ্তি ১০ টাকা
ইদে/ পুজোয়/ ক্রিসমাসে গড় নগদ প্রাপ্তি ৩০ টাকা
প্রণাম করার পর টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা ৫৯.৬%
টাকা না পেলে অভিমানের সম্ভাবনা ৮৪.১%
শুধু আশীর্বাদ পাওয়ার সম্ভাবনা ৯১%
প্রণামীর টাকা মায়ের হস্তগত হওয়ার সম্ভাবনা ৮৩%
বাবার কাছ থেকে খরচের হিসাব চাওয়ার সম্ভাবনা ৪১.৩%
‘আশীর্বাদ’-এর সঠিক বানান মনে রাখার ক্ষমতা ০.০১%

শিবরামীয় চোখে দেখলে এ নিছক কদমবুসি নয়, এক্কেরে ‘পদানত পুঁজি’! কোনও আধ্যাত্মিক ভক্তি নয়, একদম সোজাসাপটা ‘ক্যাশ-অন-ডেলিভারি’ চুক্তি। কপাল দিয়ে চটিজুতো-ঘষা ধুলো তোলো, আর বিনিময়ে পকেটস্থ করো নগদ নারায়ণ। উল্টোদিকে বড়দের কাছে এটা আত্মসম্মান কেনার পাইকারি বাজার। যে মেসোমশাই সারা বছর অফিসে বসের সামনে মেরুদণ্ডহীন কেঁচো হয়ে কাটান, তিনিও বিজয়ার সন্ধেয় ড্রয়িংরুমের গদিতে ঠ্যাং তুলে বসে থাকেন স্রেফ দশ টাকার একগাছা কড়কড়ে নোটে নিজের খয়ে যাওয়া পুরুষসিংহ ভাবমূর্তি রিচার্জ করতে। ‘বেঁচে থাকো, মানুষের মতো মানুষ হও’– এই অমূল্য প্রবচনটি আসলে সেই ট্রানজ্যাকশনের আধ্যাত্মিক ট্যাক্স-ইনভয়েস মাত্র– যা ছোটদের স্মৃতি থেকে সমীক্ষা অনুযায়ী মুহূর্তেই উবে যায়, কিন্তু কার কাছ থেকে কত কড়কড়ে নোট খসেছিল, সেই লেজার বুক মস্তিষ্কে অক্ষত থাকে আজীবন।
কিন্তু আসল চমক এই দলিলের পরিশিষ্টে। উদ্ধার হয়েছে একাধিক ডায়েরির ছেঁড়া পাতা– বিশ্বের তাবড় অর্থনীতিবিদদের শৈশবের গোপন দিনলিপির খসড়া! তাঁরা কোনও শেয়ার বাজার বা শিল্পবিপ্লব দেখে যে তত্ত্ব বানাননি; বড়দের পা ছুঁয়ে ছিবড়ে হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই মানবসভ্যতার দায়ভার নিয়েছেন ও উস্তমফুস্তম করেছেন, তা পাঠ করার পর আর সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। পাঠকের সুবিধার্থে সেগুলি বাংলায় রাখা হল–
স্কটল্যান্ডের স্যাঁতসেঁতে বৈঠকখানায় বসে কিশোর অ্যাডাম স্মিথ-এর নোট, সাল ১৭৩৮। তারিখ অস্পষ্ট:
“কাকার দয়ার ওপর ভরসা করে ভাইপোর হাতে ডেসার্ট ওঠে না, ওঠে কাকার নিজের সামাজিক প্রেস্টিজ বাঁচানোর ধান্দায়। যখন আমি আঙ্কেল জেমসের পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি, তখন কোনও ‘invisible hand’ থাকে না– থাকে কেবল এক invisible, স্বার্থপর দর-কষাকষি।”
১৮৩৪ সালে প্যারিসের এক খসড়ায় কার্ল মার্কসের ফুটনোট! প্রকট ফুটে উঠেছে খাঁটি শ্রেণিদ্বন্দ্ব:
“আজ পর্যন্ত মানব পরিবারের ইতিহাস হল এক অন্তহীন আন্তঃপ্রজন্মীয় শ্রেণিদ্বন্দ্বের ইতিহাস। আরামকেদারায় জেঁকে বসা বুর্জোয়া জ্যাঠামশাইরা ‘চরণধূলি’ নামক উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন করে নিজেদের প্রেস্টিজ বাড়ায়, আর সর্বহারা ভাইপোরা হাঁটু গেড়ে ধুলো সংগ্রহ করে চরম শোষণের শিকার হয়। বিশ্বের খুচরোহারা শিশুরা এক হও! হাঁটুর কালশিটে ছাড়া তোমাদের হারানোর কিছু নেই, আর জেতার জন্য পড়ে রয়েছে গুলিসোডা আর কারেন্ট নুনের দোকান!”
কিশোর কেইন্সের খসড়াটি পড়লে বোঝা যায়, মহামন্দা কাটাতে তিনি আসলে প্রণামীকেই মডেল করেছিলেন:
‘অর্থনীতি যখন স্থবির, বয়স্কদের পকেটে লিকুইডিটি বা নগদ টাকা তখন বন্দি– বন্ধুরা। গণহারে চরণস্পর্শ সেই টাকার বেগ বাড়িয়ে দেবেই, নিমেষে যা রূপ নেবে নন্টে-ফন্টে কমিকস ও কালাখাট্টার একচেটিয়া বাজারে।’ অর্থাৎ একদম সপাট aggregate demand! বুঝতে পারছেন তো, সবকিছুর নেপথ্যে আছে শৈশব!
এই কেইনসীয় বিশ্লেষণের জেরেই তদন্ত কমিটি এক অভিনব তাত্ত্বিক টুল প্রস্তাব করেছে:
Pranami Multiplier (PM) = মোট প্রাপ্ত প্রণামী/ সফল প্রণামের সংখ্যা
কিন্তু এই গাণিতিক হিসাবে এক মারাত্মক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, শিশুর কাছে দশ টাকা আর পাঁচশো টাকার মার্জিনাল ইউটিলিটি সমান নয়। ফলে গবেষকদের আরও নিখুঁত সূচক খাড়া করতে হয়েছে–
Gross Childhood Pleasure (GCP)
এই GCP নির্ভর করে কেবল নগদ পরিমাণের ওপর নয়; বরং চুইংগামের সম্ভাবনা, বন্ধুদের সামনে সাময়িক অর্থনৈতিক দাপট এবং সর্বোপরি অভিভাবক কর্তৃক তহবিল লুঠ হওয়ার আশঙ্কার ওপর। সমীকরণ বলছে, শিশুর GCP তখনই শিখরে পৌঁছয়, যখন চারটি বিরল মহাজাগতিক শর্ত একসঙ্গে মেলে:
১. বাড়িতে উৎসবের দিনে একঝাঁক বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয় এবং সে পকেট ভরে টাকা পায়;
২. মা-বাবা কমিশন কেটে তা বাজেয়াপ্ত করেন না;
৩. পাড়ার স্টেশনারি দোকানের কাকু কোনওভাবেই বাবার পরিচিত হন না;
৪. এবং কোনও জ্ঞানপাপী জ্যাঠা বিষাদময় মুখে বলে ওঠেন না– ‘টাকাটা জমিয়ে রাখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।’
এই চতুর্থ শর্তটিই সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ, শিশুছোকরার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন সার্বভৌম অর্থনৈতিক অঞ্চল– যেখানে ভবিষ্যতের কোনও সস্তা সঞ্চয় প্রকল্পের চেয়ে বর্তমানের একরদ্দি বটতলা বইয়ের জিডিপি বহুগুণ বেশি!

এমনকী, শান্তিনিকেতনের লাল মাটির দেশ থেকে সদ্য তরুণ অমর্ত্য সেনের পাওয়া চিরকুটে দেখা যাচ্ছে তাঁর ‘capability’ ও ‘entitlement’ তত্ত্বের মূল উৎস:
“কে বলেছে প্রণামী কোনও নগদ লেনদেন, মাই ফুট! এ হল ‘approach to capability’। বয়োজ্যেষ্ঠদের পায়ে হাত দেওয়ার আসল উদ্দেশ্য কত টাকা ঢুকল তা নয়; প্রশ্ন হল সেই টাকায় মেলায় গিয়ে ঘুগনি আর লাটাই-ঘুড়ি কেনার সক্ষমতা তৈরি হল কি না। জ্যাঠামশাই একখানা দশ টাকার নোট দিলেন, অথচ পিসিমণি পাশ থেকে ছোঁ মেরে বলে উঠলেন– ‘টাকাটা তোর মায়ের কাছে জমা থাক’– তখনই ঘটে গেল মারাত্মক ‘entitlement failure’ বা অধিকারের চরম বিপর্যয়! প্রণামীর বাজারে আসল দুর্ভিক্ষ নগদের অভাবে হয় না, ঘটে বড়দের যৌথ চক্রান্ত ও অগণতান্ত্রিক বণ্টনে।”
অথচ আশ্চর্য এই যে, একটি শিশু যখন বড়দের পায়ে হাত দেয়, তখন সে ঘুণাক্ষরেও জানে না যে সে এক অতি-প্রাচীন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত লভ্যাংশভোগী শেয়ারহোল্ডার। সে বোঝে না, তার এই ক্ষুদ্র ক্যাশফ্লো পাড়ার এগরোলের স্টলে হঠাৎ বিপুল সামগ্রিক চাহিদা তৈরি করে দেশের জিডিপির চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে। সে কেবল জানে– আজ উৎসব, বাড়িতে আত্মীয়, আর একটু পরেই কোনও এক মেসোমশাই পকেট হাতড়ে বলবেন: ‘এই নে, রাখ।’
এই সংক্ষিপ্ত ‘রাখ’ শব্দটির ভেতরেই ঘুমিয়ে আছে ভারতের গোটা ইনফর্মাল ইকোনমির এক অপার্থিব সরলতা। এখানে কোনও দীর্ঘ সরকারি আবেদনপত্র নেই, নেই নীতি আয়োগের মূল্যায়ন। কেবল একটি সম্পর্ক, একখানা নমিত শিরদাঁড়া, একঝাঁক বায়বীয় আশীর্বাদ আর একখানা সচল নোট।
দিন বদলাচ্ছে। সুড়সুড় করে ঢুকে পড়ছে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’। খুব শিগগির হয়তো এসে পড়বে: “PranamPay: Respect More, Earn More!” মুক্তবাজার থেকে ভক্ত সাজার অর্থনীতি! প্রণামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে স্ক্র্যাচ কার্ড আর ক্যাশব্যাক– ‘পাশের পাড়ার খিটখিটে করালী জ্যাঠাকে প্রণাম করলেই ১০০% পর্যন্ত ক্যাশব্যাক জেতার সুযোগ!’ কিন্তু তার আগে পর্যন্ত প্রণামীর অর্থনীতি আমাদের নির্দয়ভাবে মনে করাতে থাকবে– সব অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিখাদ বাজারের নিয়মে চলে না, আর কোনও সামাজিক সম্পর্কই সম্পূর্ণ স্বার্থহীন নয়।
আর এখানেই ফুটে ওঠে ভারতীয় গণতন্ত্রের এক চরম রাজনৈতিক প্রহসন। প্রণামীর ময়দানে শিশুরা কিন্তু দেশের প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারদের চেয়েও অনেক বেশি শ্রেণি-সচেতন। পা ছুঁয়েও পকেট থেকে নোট না বেরলে তারা সটান নিজ মনে অনাস্থা প্রস্তাব আনে: ‘টাকা দিলে না তো? পরের বছর আর টিকিটি পাবে না, দেখে নিও!’ হিমশীতল ট্রেড ইউনিয়ন বয়কট! অথচ দেশের ভোটারদের দেখুন– তাঁদের হাতে বুথফেরত সেই চরম ক্ষমতা, অর্থাৎ ‘নেতাদের ঘাড়ধাক্কা দেওয়ার অধিকার’ মজুত থাকা সত্ত্বেও পাঁচ বছর পর ইভিএমের সামনে দাঁড়ালেই তাঁদের গণ-স্মৃতিলোপ ঘটে। শাসকরা পাঁচ বছর ধরে আশীর্বাদ নামক ফাঁপা প্রতিশ্রুতির ধুলো উড়িয়ে যান, আর আমজনতা সেই চরণের সামনে বারবার গদগদ হয়ে মাথা ঠুকে বাড়ি ফেরে– বিনিময়ে?
এই পদধূলির liquidity crisis বা ফাঁকিবাজি বাংলা সাহিত্যও এড়িয়ে যেতে পারেনি। দিনটা ছিল মহালয়ার এক সকাল। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আগের রাতেই চাইবাসা থেকে কোনওক্রমে বিগত ট্রেনের টিকিটে দূরপাল্লার ট্রাকে চড়ে ফিরেছেন। দুই সন্তান তাতার ও তিতির এসে ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে থাকা বাবাকে নিষ্ঠাভরে প্রণাম করে স্বভাবসিদ্ধ কায়দায় হাত পাতল। সামনে পুজোসংখ্যা আর গুলিসোডার রঙিন হাতছানি, তুঙ্গে consumer demand! কিন্তু, কবির ততদিনে পকেট গড়ের মাঠ, উদাস চোখে পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে সন্তানদের কচি হাতের তালুতে গুঁজে দিলেন নোটসম দু’টি কাগজ।

ছোট্ট তাতার ও তিতির শারদআলোয় এসে দেখল– হায় রে পোড়া কপাল! বাবার রাজকোষ থেকে বেরিয়েছে রাজত্বহীন একজোড়া ছেঁড়া ধুলধুলি, সম্পূর্ণ অচল টাকা! পাড়ার কার্তিক ময়রা যা দিয়ে আধখানা নকুলদানাও দেবে না!
মুখ নিমেষে চুন। অভিমানে মেঘমল্লার। পায়ের ধুলোর মতো পরম আধ্যাত্মিক ইনপুটের বিনিময়ে কি না অচল নোটের আউটপুট? এই পদধূলির তারল্য শূন্য! বাবাকবির চরণযুগল সর্বৈব ইনভ্যালিড। যে হাত নিষ্পাপ সন্তানদের অচল নোট দিয়ে ধোঁকা দিল, সে-হাতে তো স্নেহের কণিকামাত্র অবশিষ্ট নেই। অগত্যা মা মীনাক্ষীর কাছে গিয়ে নালিশ। তারপর যা হয়। মাতৃপক্ষে ন্যুব্জ কবি নিদারুণ অপরাধবোধ আর মহুয়ার ভারসাম্যহীনতায় সেই রাতেই সাদা কাগজ টেনে লিখে ফেললেন কবিতা, নিজের পা হাত গোটা শরীরকে পোড়ানোর আকুতি! ধরতে পারছেন না?
‘ও চিরপ্রণম্য অগ্নি, আমাকে পোড়াও
প্রথমে পোড়াও ঐ পা দুটি যা চলচ্ছক্তিহীন,
তারপর যে-হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই।’
মহাজাগতিক কবিতার নেপথ্যে যে অর্থনৈতিক ইতিহাস জড়িয়ে থাকতে পারে, ভাবতে পেরেছিলেন মশাই! কিন্তু এটুকু ভাবনা পরিষ্কার, প্রণামী স্রেফ টাকা নয়। যুগপৎ ঘুষ নয় অথচ ইনসেন্টিভ; মজুরি নয় অথচ পেমেন্ট; ভিক্ষা নয় অথচ হাত পাতা; কর নয় অথচ বাৎসরিক রিটার্নের মতো বাধ্যতামূলক; এবং এমন এক ভালোবাসা– যার নির্দিষ্ট ডিনোমিনেশন আছে। শিশু চায় তরল নগদ, প্রবীণ চান সস্তা সম্মান। এবং চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি হল– উভয় পক্ষই আড়ালে অপরপক্ষকে আদ্যোপান্ত মেটিরিয়ালিস্টিক বা বস্তুবাদী মনে করে। এটাই পরিবার। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে বড়রা আজও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন– আমাদের সময় আমরা কেবল ভক্তিভরে প্রণাম করতাম, কিছু আশা করতাম না। এই ঐতিহাসিক দাবিটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে যাচাই করা অসম্ভব। অতএব, এফিডেভিট ছাড়াই ইতিহাস তাঁদের পক্ষে। তবে আজকের শিশুকে ‘লোভী’ বলে কাঠগড়ায় তোলার আগে একটু আয়নাতালি জরুরি। প্রণামীর সবচেয়ে বড় প্রহসন এখানেই। শ্রদ্ধাকে নগদের সঙ্গে দশকের পর দশক শক্ত করে বেঁধে রেখে আজ হঠাৎ বুড়ো বয়সে হা-হুতাশ করে অবাক হচ্ছেন– সন্তান কেবল নগদটাই মনে রাখল, শ্রদ্ধাটা ভুলে গেল? আপনারাই তো আশীর্বাদের সঙ্গে ক্যাশব্যাক স্কিম চালু করেছিলাম; আর এখন কাস্টোমার কেবল অফারটাই মনে রেখেছে বলে কোম্পানির ডিরেক্টররা রক্তচাপ বাড়াচ্ছেন! অতএব, আবিষ্কৃত পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী ‘প্রণামী অর্থনীতি’-র প্রধানতম স্বতঃসিদ্ধ সূত্রটি যা দাঁড়াল:
আশীর্বাদ অমূল্য– এবং ঠিক এই কারণেই তার সঙ্গে নগদ টাকা গুঁজে দেওয়া বাধ্যতামূলক!
ঢিপ! এবার মাল ছাড়ুন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved