

সতীন্দ্র ভৌমিকের অপ্রকাশিত ডায়রি। কে সতীন্দ্র ভৌমিক? হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে কী সম্পর্ক তাঁর? কী সম্পর্ক বিশ্বভারতীর সঙ্গে? ওঁর ডায়রির পাতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে, ওঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন দময়ন্তী দাশগুপ্ত।
সতীন্দ্র ভৌমিক– নামটা প্রথম শুনি আমার মা, কথাসাহিত্যিক আলপনা ঘোষের কাছে। সে কাহিনির কিছুটা ইতিবাচক ছিল আর অনেকটাই নেতিবাচক। আসলে গল্পটা শুনতে শুরু করি তারও আগে। একেবারেই ছেলেবেলায়। মায়ের এক বান্ধবীর গল্প। সচ্ছল পরিবারের মেয়েটির বিবাহ হয় দমদমের এক উদ্বাস্তু কলোনির মাটির বাড়িতে। সেখানে মাটির ঘর লেপা, রান্না করা, ব্রাহ্মণ নয় বলে শাশুড়ির ছোঁয়াছুঁয়ির আচারবিচার, তারই মধ্যে ছেলে আনন্দ-র জন্ম, তার একরত্তি ছেলেবেলার কত গল্প! এভাবেই বেশ কয়েক বছর কেটে যায়। মাঝেমাঝে যখন রূপনারায়ণপুর থেকে মাইথন-কল্যাণেশ্বরী বেড়াতে যেতাম, তখন মা পুজো দিত সেই ‘আনন্দদাদা’-র নামে। কখনও-বা শুধু পুজো দেওয়ার জন্যই আলাদা যেত। অথচ আমাদের বাড়িতে কোনওদিন যে পুজোআচ্চার খুব চল ছিল, এমনটা নয়। তবে তখনও ঠাকুর একেবারে তাকে উঠে যায়নি, যা ক্রমশ হয়েছিল আমাদের বড়বেলায়। তবে সে তো অন্য কথা।

বছর ১৩ বয়সে একদিন জানতে পারলাম, আসলে মায়ের ওই বন্ধুটি মা নিজেই, আনন্দদাদা আমাদেরই বড় দাদা। তার বাবার নাম সতীন্দ্র ভৌমিক। প্রাথমিকভাবে মা-আঁকড়ানো আমি এই ঘটনাটা সেই অল্পবয়সে ভালোভাবে নিতে পারিনি। এমনকী, আনন্দদাদার জেঠতুতো দাদা শমীন্দ্র ভৌমিক আর তার এক বন্ধু যখন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসে আমাদের মাকে ক্রমাগত ‘ছোট মা’ ‘ছোট মা’ বলে ডেকে যাচ্ছিল, তখন আমার ভয়ানক রাগ হচ্ছিল। এতকাল মা কেবল আমাদের দুই ভাইবোনের ছিল। সে পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলাম, কারণ ছোট বলে মায়ের ওপর আমার জোরটাই চিরকাল বেশি। সেইখানে আমাদের মা ক্রমশ বিশ্বজনের মা হয়ে উঠছে সেটা মেনে নেওয়াটা ছেলেবেলায় আমার কাছে খুব কষ্টদায়ক হয়েছিল। তবে বছর ১৫ বয়সে যখন আনন্দ দাদা আমাদের বাড়িতে এসেছিল ততদিনে আমার মনোভাব অনেকটাই বদলে গিয়েছে। বরং ফাউ একটা বড় দাদা পাওয়ায় খুশিই হয়েছিলাম। যদিও তখনই সে বেশ অসুস্থ। ‘স্কিজোফ্রেনিয়া’ হয়েছে বলে শুনেছিলাম।
এরপর মাঝখানে অনেক বছর কেটে গিয়েছে। মায়ের ছেলেবেলার গল্পের মতোই সহজ ভঙ্গিমায় মা আমাদের প্রথম বিবাহের সেই বান্ধবনগর কলোনির দৈনন্দিনতার গল্প বলেছে, আমিও অনায়াসে শুনেছি। মায়ের মুখেই শুনেছি জলপাইগুড়িতে থাকতেই নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে তার যুক্ত হওয়ার কথা। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে আন্দোলনের সহকর্মীদের জন্য ‘বিপ্লবী চা’ আর ‘বিপ্লবী রুটি’ বানানোর পাশাপাশি চিরকুট পাচার করার কথা। বিভিন্ন সহকর্মীদের বান্ধবনগরের বাড়িতে আসার এবং থেকে যাওয়ার কথা। পাশাপাশি সাহিত্যিক সন্দীপন-শক্তি-সুনীলের গল্প, যখন তাঁরা লেখক-কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেননি। হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সতীন্দ্র ভৌমিকের যুক্ত হওয়া এবং পরবর্তীকালে সরে আসার কাহিনিও শুনেছিলাম মায়ের মুখেই।
উচ্চ মাধ্যমিকের পর তখন কলকাতার কলেজে পড়ছি। হস্টেলে থাকি। জানতে পারলাম যে, আনন্দ দাদার বাবা মারা গিয়েছেন, আর সে-ও খুব অসুস্থ, কোথাও ভর্তি আছে। এরপরে সে বাড়ি ফিরলে মা প্রায় মাসখানেক তার কাছে গিয়ে থেকেছিল। সেই সময়ের গল্পও শুনেছি। মায়ের রেখে আসা বই আর ফেলে আসা তানপুরার গল্প। মা আসলে কিছুই নিয়ে আসেনি ওই বাড়ি থেকে, এমনকী, বিয়ের গয়নাগুলো পর্যন্ত না। কিন্তু অনেক পরে জানতে পারি, সেবারে আনন্দদাদার কাছে গিয়ে থাকার সময় মা সতীন্দ্র ভৌমিকের একটি ডায়েরি নিয়ে আসে। সতীন্দ্র ভৌমিক দীর্ঘকাল ডায়েরি লিখতেন, মায়ের মুখে শুনেছি লিখতেনও খুব ভালো। কিছুটা অস্থিরমতি ছিলেন। খানিক না কি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোও তাঁকে লেগেছিল মায়ের।

মায়ের মেয়ে হিসেবে বা লেখক হিসেবে তার লেখালেখি নিয়ে চিরকাল আগ্রহ থাকলেও এবং তার ব্যক্তিগততর অধিকাংশ কথা জানলেও তা নিয়ে কোনও কৌতূহল হয়নি কোনওদিন। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা-মায়ের অধিকাংশ বইয়ের আর মায়ের যাবতীয় লেখালেখি, চিঠিপত্র, ডায়েরির সঙ্গে সতীন্দ্র ভৌমিকের এই ডায়েরিটিও আমার হাতে আসে। সেটাকে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখি।
মা থাকতেই তার সুবাদে সতীন্দ্র ভৌমিকের দুই ভাইপো শমীন্দ্র ভৌমিক ও দ্বিজেন্দ্র ভৌমিকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। রাজুদাদা, মানে শমীন্দ্র ভৌমিক আমার প্রথম বড় কাজ ‘অবলা বসুর ভ্রমণকথা’ নির্মাণে অনেক সাহায্য করেছিল। উত্তরকালে দ্বিজুদাদা অর্থাৎ দ্বিজেন্দ্র ভৌমিকের সঙ্গেও আমার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়, মায়ের মৃত্যুর পর আরওই। দ্বিজুদাদার পত্রিকা ‘স্বরান্তর’-এ বার দুয়েক লেখাও প্রকাশিত হয়েছে। কিছুদিন আগে দ্বিজুদাদা তার একটি অপ্রকাশিত বড় লেখার পাণ্ডুলিপি পড়তে দিল। লেখাটি তার কাকা সতীন্দ্র ভৌমিককে নিয়ে, নামোল্লেখ না করেই। পড়ে বেশ চমকে উঠলাম। দ্বিজুদাদার লেখার মুনশিয়ানায় তো বটেই, তার চেয়েও বেশি যাঁকে নিয়ে লেখা সেই সতীন্দ্র ভৌমিকের জীবন এবং যাপনের কাহিনি জেনে। যার ভিত্তি মূলত দ্বিজুদাদার স্মৃতি, তার কাকার লেখালেখি এবং দ্বিজুদাদার কাছে থাকা তাঁর একটি ডায়েরি। আর এই লেখাটাই আমার ব্যক্তিসত্তার ওপরে লেখকসত্তাকে জাগিয়ে দিল। আলমারি থেকে বের করে আনলাম মায়ের কাছে থাকা সতীন্দ্র ভৌমিকের সেই ডায়েরিটি। খানিক আলগোছেই পড়তে শুরু করেছিলাম। তখনও জানতাম না, কী চমক অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য! কিন্তু পাতা উল্টোতেই নড়েচড়ে বসলাম।

ডায়েরির নাম– আমার জার্নাল। শুরু হচ্ছে ১৯৬৩ সালে। সময়কাল ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত। ডায়েরির শুরুতে একটি চিঠির অংশ। তার নিচে অন্য কালিতে মায়ের হাতের লেখায় লেখা রয়েছে, এইটে আমার লেখা চিঠি। তলায় নাম সই, আলপনা। দ্বিতীয় পাতায় আরও একটি চিঠি। পড়ে বুঝলাম সেটি মাকে লেখা তাঁর একটি চিঠির কপি। যে চিঠিটি তিনি সাধু ভাষায় লিখেছেন এবং বর্ণনা করেছেন কমলকুমার মজুমদারের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের কথা। এককথায় অনবদ্য একটি বর্ণনা। যার শেষে লেখা: না দেখিলেই ভালো হইত।

এরপর একের পর এক অধ্যায়। প্রতিটি অধ্যায়ের আলাদা আলাদা নাম। কোথাও তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘এষণা’-র কথা, কোথাও হাংরি
আন্দোলনের প্রতি বীতশ্রদ্ধতা, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সে বন্ধু সন্দীপন, শৈলেশ্বর-শক্তি থেকে দেবেশ রায় এবং চেনা-অচেনা আরও অনেকেই। আবার লেখক বা সম্পাদকদের আলোচনা অথবা সমালোচনাও রয়েছে ওরই মধ্যে। দৈনন্দিনতার টুকরো, রেডিওতে ক্রিকেট খেলা শোনা, অফিসের জটিলতা অথবা সংসারের তুচ্ছতা যেমন তাতে বাদ পড়েনি, তেমনই রয়েছে নাগরিক কলকাতার বর্ণনা থেকে গ্রামের প্রকৃতির উদারতার কথা। রয়েছে আত্মবিশ্লেষণ, আত্ম-অন্বেষণ থেকে আত্মসমালোচনা। কাউকেই রেয়াত করেননি তিনি, নিজেকে তো নয়ই। পুরো ডায়েরি পড়া শেষ হয়নি এখনও। হয়তো-বা বাকি আছে আরও অনেক চমকই।
ইতিমধ্যে দ্বিজুদাদা, রাজুদাদা– দু’জনের সঙ্গেই কথা হয়েছে। তাদের বলেছি এই ডায়েরির কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াটা জরুরি। সময়ের এক অখণ্ড দলিল হিসেবে। ডায়েরির অনেক পাতা তিনি নিজেই ছিঁড়ে ফেলেছেন। তবু তাও যা আছে সে-ও কম নয়। জানতে পারি, এরকম একাধিক ডায়েরি ছিল। যার দু’-তিনটি ওদের কাছেই আছে, বাকি সব হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু মনে প্রথম যে প্রশ্ন জাগে তা হল, পাঠক এই প্রশ্ন তুলবেন না তো, কে এই সতীন্দ্র ভৌমিক? তাই তাঁর একটা অফিসিয়াল পরিচয় চেয়ে নিলাম দ্বিজুদাদার কাছে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, লেখাই শেষপর্যন্ত একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয়। ব্যক্তিমানুষটি অতিরিক্ত।

সতীন্দ্র ভৌমিক ১৯৫৫ সালে বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগে যোগদান করেন। বিশ্বভারতীতে দীর্ঘ ৩৬ বৎসরের কর্মজীবনে গ্রন্থনবিভাগের মুখ্য প্রুফ পাঠক, শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর গবেষণা প্রকাশন বিভাগের অধীক্ষক এবং রবীন্দ্রভবনে রবীন্দ্রচর্চা প্রকল্পের বিশেষ কৃত্যাধারিকের দায়িত্ব যোগ্যতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। তিনি ছিলেন একজন উৎসাহী ও অত্যন্ত প্রাণবান পুরুষ। একসময় প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন– বামপন্থী রাজনীতি। ক্রমে বাম থেকে আরও বামে, কিছুকাল প্রবলভাবে রাজনীতি-ক্ষেত্রে বিচরণের পর, সম্ভবত তাঁর পক্ষে এর নিরর্থকতা উপলব্ধি করে, প্রত্যক্ষ রাজনীতির সংস্রব ত্যাগ করেন। একই কারণে, এবং বিশেষত যখন নিজেদেরই ভিতর বিরোধ ও অবিশ্বাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে, ‘হাংরি জেনারেশন’-এর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ তিনি ছিন্ন করে দেন; যদিও ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল আমৃত্যু।
তাঁর কবিতা-রচনা-চর্চার সূত্রপাত প্রথম যৌবনে। কবিতা রচনার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের অন্য ক্ষেত্রেও ক্রমশ প্রবেশ করেন। বিচিত্র কর্মের স্বভাবগত নেশায় তিনি একসময় শান্তিনিকেতনে দুঃস্থ মানুষের সেবার জন্য হোমিওপ্যাথি বিদ্যার ডিগ্রিলাভ করে নিয়মিত চর্চাও শুরু করে দেন তাঁর এবং চিকিৎসক-খ্যাতিও লাভ করেন।
কর্মজীবনের নানা পর্বে কয়েকটি সাময়িক পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য: এষণা, সমীপেষু, রাঢ়ভূমি (যুগ্মভাবে), রবীন্দ্রবীক্ষা।

সতীন্দ্র ভৌমিকের প্রবল ব্যক্তিত্ব ছিল। ছিল নির্ভীকতা। নিজের অভিমত ও বিশ্বাস জোরের সঙ্গে প্রকাশ করায় কুণ্ঠিত হতেন না, সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা সত্ত্বেও অপ্রিয় সত্যভাষণে অটল থাকতেন। ফলে জীবনে অনেক ক্ষতি বহন করতে হয়েছে, কখনও কখনও মিত্রভেদ ঘটেনি এমনও নয়। কিন্তু তাঁর চরিত্রে সততা, সংবেদনশীলতা, কর্মনিষ্ঠা, উদ্যম, আন্তরিকতা, কৌতুকপ্রিয়তা, সাহিত্যপ্রীতি এমন কয়েকটি আকর্ষক গুণের সমাবেশ ছিল, যার দরুন সহৃদয় ব্যক্তি মাত্রই তাতে আকৃষ্ট হতেন।
হাস্যোচ্ছল, মজলিশি এই মানুষটি ১৯৯৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নিজেই নিজের জীবনের ইতি টেনে দেন।
মনে পড়ে যায়, ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই ‘প্রহত প্রহর’ থেকে নেওয়া তাঁর ‘বোধ’ কবিতার কয়েকটি লাইন–
আমি এক গেলাস তরল অন্ধকার গিলে ফেলেছি।
চিবিয়ে চিবিয়ে এতদিন ধরে
ত্রিশটি পদ্মফুলের অন্ধকার, চিবিয়ে চিবিয়ে
তরল অন্ধকার ক্লান্ত হয়েছি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved