যোগেনের ছবি দেখতে দেখতে মনে হয়, মানুষ কখনও কোথাও সম্পূর্ণভাবে বাস করে না; তারা সব সময়েই অসম্পূর্ণ, উদ্বিগ্ন এবং বিচ্ছিন্ন। তিনি যেন ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে একজন ‘Post-Partition Biopolitics’-এর শিল্পী। কারণ দেশভাগের পর ভারতীয় সমাজে নাগরিক পরিচয়, উদ্বাস্তু-অবস্থা, বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা যে নতুন দেহ-রাজনীতি তৈরি করেছে, সেই দেহ-রাজনীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম দৃশ্যভাষা নির্মাণ করেছেন যোগেন চৌধুরী। তিনি তো দেশভাগের ইতিহাস আঁকেননি; তিনি দেশভাগ-পরবর্তী মানুষের শরীর এঁকেছেন।
সব সময়েই দেখি যোগেন চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা অনায়াসে হাত পাতি প্রচলিত শিল্প-সমালোচনার একটি বড়সড় সীমাবদ্ধতা কাছে। সেই সীমাবদ্ধতাটি হল তাঁকে ‘রেখার শিল্পী’, ‘বিকৃত শরীরের শিল্পী’ অথবা ‘দেশভাগ-স্মৃতির শিল্পী’ হিসেবে পাঠ করার প্রবণতা। কিন্তু যদি একটু কনটেম্পোরারি লেন্সে তাঁর ছবিকে পড়তে চেষ্টা করা যায়, যেখানে সমকালীন শিল্পতত্ত্ব, মিশেল ফুকো, জিল দ্যল্যোজ, জুলিয়া ক্রিস্টিভা কিংবা পোস্ট-কলোনিয়াল নন্দনতত্ত্বের কথাবার্তা আসা-যাওয়া করে– সেখানে হয়তো দেখা যাবে যে, এই শিল্পী আসলে ভারতীয় শিল্পে ‘শরীরকে জ্ঞানের ক্ষেত্র’ মানে ‘body as site of knowledge’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। একথা বারবার তাঁর ছবি দেখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে। প্রশ্ন জাগে তাঁর ছবির কেন্দ্রে যে শরীর উপস্থিত হয়, তা কি শুধুই শরীর না কি ইতিহাস, রাষ্ট্র, যৌনতা, ক্ষমতা, উদ্বাস্তু-অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক মানসিকতারই এক চলতে থাকা দৃশ্যমান রূপ? অর্থাৎ যোগেন চৌধুরীর শিল্পভাষা কি আমাদের মানবদেহকে বাস্তবতার প্রতিরূপ হিসেবে না পড়ে, বাস্তবতার উৎপাদক ক্ষেত্র হিসেবে কোনও ভাবে পড়তে শেখায়?

আধুনিক ভারতীয় শিল্পের কাছে সবসময়েই একটি বড় প্রশ্ন ছিল ঔপনিবেশিকতার পরে ভারতীয় শিল্পীরা কীভাবে বা কী কী উপায়ে তাঁদের শিল্প নির্মাণের নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করবেন? এম এফ হুসেন, এফ এন সুজা, অথবা ত্যয়েব মেহতার মতো শিল্পীরা তাঁদের নিজেদের মতো করে এই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন চেহারার উত্তর দিয়েছিলেন। কিন্তু যোগেন চৌধুরীর উত্তরের মাত্রাটি ছিল আরও সূক্ষ্ম তারে বাঁধা। তিনি পশ্চিমা আধুনিকতার বিমূর্ততাকে যেমন গ্রহণ করেননি, আবার এদেশের জাতীয়তাবাদী ভারতীয়তাকেও পুনরাবৃত্তি করেননি। পরিবর্তে তিনি এমন এক দেহভাষা নির্মাণ করেছেন– যা দেশজ এবং আন্তর্জাতিক, লোকজ এবং আধুনিক, ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক সবকিছুকে একসঙ্গে যেন ধারণ করে আছে। তাঁর শরীর নির্মাণের মধ্যে চলে আসা মর্মান্তিক বিকৃতি আমাদের পিকাসোর রূপ বিকৃতির কথা যেমন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে; আবার তাঁর ছবির রেখা আমাদের কালীঘাট পটের ক্যালিগ্রাফিক রৈখিকতার চলনের কথাও একইসঙ্গে মনে করিয়ে দিতে পারে। সেই সঙ্গে আবার উদ্বাস্তু-চেতনার মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাতের এক নতুন নন্দনতাত্ত্বিক সংশ্লেষ তৈরির শিল্পী হিসেবেও আমাদের তাঁকে মনে রাখতে হয়।

তাঁর বিখ্যাত ‘অবিচ্ছিন্ন রেখা’কে সাধারণত প্রযুক্তিগত দক্ষতার নিদর্শন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় ঠিকই, কিন্তু আজ একথা স্পষ্ট যে, এই রেখা তাঁর নিজের একটি দার্শনিক অবস্থান। ছবিতে শরীরকে শুধুমাত্র একটি স্থির এবং সুসংহত সত্তা হিসেবে দেখানোর বদলে যোগেন চৌধুরী রেখার দাপটে শরীরকে দেখার সেই ধারণাকেই ভেঙে দিতে চান। তাঁর রেখাকে কখনও স্থির হতে দেখা যায় না। পরিবর্তে দেখা যায় রেখা যেন দেহের ভেতর দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, স্ফীত হয়, সংকুচিত হয়, আবার কেঁপে কেঁপে ওঠে। ফলে তাঁর ছবির শরীর একটি স্থিতিশীল পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব না করে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল সত্তার প্রতীক হয়ে উঠতে চায়। স্বভাবতই তাঁর ছবিতে দেহ কোনও সমাপ্ত রূপ না থেকে হয়ে উঠতে চেয়েছে এক চলমান প্রক্রিয়া। এই কারণেই আজ হয়তো তাঁর রেখাকে আর নিছক ‘লাইন’ হিসেবে না দেখে গঠনের ‘অস্তিত্বের সন্ধান’ হিসেবে পড়ে নেওয়াটা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

মিশেল ফুঁকো বলেছিলেন, ক্ষমতার স্বভাব হল সবসময় শরীরের উপর কাজ করে যাওয়া। রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজ, পরিবার থেকে শুরু করে নৈতিকতা, ধর্ম থেকে যৌনতা সবকিছুই যেন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। করে। এই ভাবনা থেকে যোগেন চৌধুরীর কাজকে দেখলে বোঝা যায় যে, তাঁর বিকৃত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আসলে ক্ষমতার আরেকটি পিঠের দৃশ্যমান চিহ্ন। তাঁর চরিত্রদের শরীর প্রায়ই বহন করে অস্বাভাবিক স্ফীতি, বক্রতা, চাপা যন্ত্রণা বা অসামান্য ক্ষত। এগুলি কোনও একক ঘটনার প্রতীক নয়; বরং আধুনিক ভারতীয় সমাজে মানুষের মানসিক ও সামাজিক বন্দিদশার চিহ্ন। তাঁর মানবমূর্তিগুলি যেন এক অদৃশ্য রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত নাগরিক-দেহ।

আবার একইভাবে মনে হয়, যোগেনের শিল্পে দেশভাগ কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উঠে আসে না। উঠে আসে একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা হিসেবে। সেই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাও ধরা থাকে তাঁর শরীরের রূপায়নে। তাই উদ্বাস্তু-অভিজ্ঞতা তাঁর ছবিতে ট্রেন, সীমান্ত বা শরণার্থী শিবিরের দৃশ্যে প্রকাশিত হয়নি। পরিবর্তে তাঁর এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান উচ্চারিত হয়েছে চিত্রিত শরীরের ভিতরকার অস্থিরতায়। ছবিতে উপস্থাপিত শরীরগুলি যেন নিজের ভেতরেই নির্বাসিত। এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর ‘এক্সাইল’ তত্ত্বে ঠিক যেভাবে বলেছিলেন নির্বাসন কোনও একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয় বরং একটি অস্তিত্বগত অবস্থা। যোগেনের ছবি দেখতে দেখতেও ঠিক সেরকম। যেখানে মানুষ কখনও কোথাও সম্পূর্ণভাবে বাস করে না; তারা সব সময়েই অসম্পূর্ণ, উদ্বিগ্ন এবং বিচ্ছিন্ন। তাই কখনও কখনও মনে হয় যোগেন চৌধুরীকে ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে একজন ‘Post-Partition Biopolitics’-এর শিল্পী হিসেবেও দেখা যেতে পারে। কারণ দেশভাগের পর ভারতীয় সমাজে নাগরিক পরিচয়, উদ্বাস্তু-অবস্থা, বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা যে নতুন দেহ-রাজনীতি তৈরি করেছে, সেই দেহ-রাজনীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম দৃশ্যভাষা নির্মাণ করেছেন যোগেন চৌধুরী। তিনি তো দেশভাগের ইতিহাস আঁকেননি; তিনি দেশভাগ-পরবর্তী মানুষের শরীর এঁকেছেন। এই পার্থক্যটি চোখে পড়ার মতো। এখানে দেশভাগের ইতিহাস ঘটনায় নয়, শারীরিক ও মানসিক রূপান্তরে দৃশ্যমান হয়েছে।

এই সূত্র ধরেই তাঁর ক্রস-হ্যাচিং বা ঘন জালিকারেখাও যেন নতুন কথা বলতে চেয়েছে। হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে এই জালিকা রেখা টেক্সচার বা ভলিউম নির্মাণের কৌশল হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই ক্রস-হ্যাচিং কি কেবলই একটি কৌশল না কি এই ঘন রেখাজাল আসলে ‘স্মৃতি’-র গঠনপ্রণালীর দৃশ্যরূপ। স্মৃতি তো কখনও সরল নয়; তার মধ্যে পুনরাবৃত্তি, আড়াল, চাপা পড়া এবং প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া কাজ করে। যোগেনের ক্রস-হ্যাচিং দেহকে ঠিক এমনভাবেই আবৃত করেছে, তা দেখে যেন মনে হয়– স্মৃতি, শরীরের ওপর বারবার নিজের ছাপ রেখে চলে গিয়েছে। ফলে তাঁর শরীর শুধু দেখার বিষয় নয় এখানে শরীরকে পড়তে বা পাঠ নিতে হয়।

এই পাঠ একইভাবে তাঁর চিত্রের নারীদের নতুনভাবে পড়ার প্রয়োজন বোধ করায়। প্রচলিত ভারতীয় শিল্পে নারী হয় দেবী, নয়তো সৌন্দর্যের আধার। কিন্তু যোগেনের নারী উভয় পরিচয়কেই অস্বীকার করে নির্মিত হয়েছে। তাদের শরীর কামুক, কিন্তু একযোগে অস্বস্তিকরও; আকর্ষণীয়, কিন্তু সহজে ভোগযোগ্য এমনও তো নয়। এই অসামান্য দ্বৈততা আমাদের বুলগেরিয়ার ফরাসি লেখিকা জুলিয়া ক্রিস্টিভারের ‘abjection’ ধারণার কথা মনে করিয়ে দিতে চায়। কারণ যোগেন চৌধুরীর নির্মিত শরীরে একইসঙ্গে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ সমান্তরালভাবে কাজ করে। তাই তাঁর নারীদেহ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির জন্য কোনও নিরাপদ ক্ষেত্র না হয়ে বরং একটি জটিল মানসিক অঞ্চলও হয়ে ওঠে।

এই কারণেই সমকালীন ভারতীয় শিল্পে তাঁর গুরুত্ব অমলিন থাকবে চিরকাল। কারণ তিনি আমাদের এমন এক শিল্পভাষা দিয়েছেন– যা পরিচয়ের সংকট, উদ্বাস্তু অবস্থা, শরীরের রাজনীতি, যৌনতা, স্মৃতি এবং ক্ষমতার প্রশ্নকে একইসঙ্গে ধারণ করতে পারে। তাঁর কাজ শুধুমাত্র যে একটি নন্দনতাত্ত্বিক দৃশ্য– তা নয়, বলা যেতে পারে, চিন্তার ক্ষেত্রও বটে। আধুনিক ভারতীয় শিল্পের ইতিহাস যদি কখনও ‘শরীরের ইতিহাস’ হিসেবে পুনর্লিখিত হয়, তবে যোগেন চৌধুরী সেখানে শুধু একজন বিশিষ্ট চিত্রকর হিসেবে বিবেচিত হবেন না, ভাবী প্রজন্মের কাছে তিনি শরীরকে ইতিহাসের ভাষায় রূপান্তরিত করার এক বিরল তাত্ত্বিক শিল্পী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved