inspirational story of Joya Mitra’s blind friend। Robbar
Robbar
  • ১২ কার্তিক ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৩০ অক্টোবর ২০২৬

আলোর পথযাত্রী

চমৎকার অভিনেতা সৌরভ। মানুষ হিসেবে আরও চমৎকার। ‘ব্লাইন্ড অপেরা’ নাট্যগোষ্ঠী, ‘অন্য দেশ’ গোষ্ঠীর বহু নাটকে ওর দুরন্ত অভিনয় এখনও অনেক দর্শকের মনে আছে। আমি কখনও ওকে জিজ্ঞেস করিনি, ঠিক কেমনভাবে ও এই নতুন পৃথিবীতে মানিয়ে নিল। আসলে জিজ্ঞেস করতে আমার সাহস হয়নি। কিন্তু এটা ঠিক যে, সৌরভের মধ্যে আত্মকরুণা দেখিনি কখনও। সৌরভকে দেখেছি বরং কত রকমের, কত মানুষের কাছে অপরিহার্য হয়ে থাকতে।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ১৭:৫৫   
Facebook WhatsApp Messenger

২০.

সৌরভের সঙ্গে দেখা না হলে আমার কোনওদিন জানাই হত না যে, ‘টকিং লিফট’ কত দরকারি একটা জিনিস। যাঁরা চোখে দেখতে পান না, তাঁদের কি কাজ থাকে না কোনও অফিসে-ইশকুলে, কোনও বহুতলে, যেখানে স্বয়ংক্রিয় লিফট ব্যবহার করতে হয়? কী করে তবে তাঁরা সঠিক তলায় নামবেন? অথচ লিফটের এই সামান্য উন্নতিটুকুর ব্যাপারে আমরা কত উদাসীন থাকি। সহজে ভুলেই থাকি, আমাদের অনেক বন্ধু-পরিচিত বা সহসামাজিকদের অস্তিত্বের কথা।

আমার চেয়ে যাঁরা একটুও অন্যরকম, তাঁদের সুবিধা-অসুবিধার কথা, তাঁদের নিজস্ব ধরনের কথা আমাদের মনে থাকে না। সৌরভ আমাকে যে কত কিছু শিখিয়েছে, তার আর ইয়ত্তা নেই! ও গত ২০ বছর ধরে আমার বন্ধু। ওর পৃথিবীটা আমার পৃথিবীর থেকে শুরুতে অনেকটা আলাদা ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে ও আমাকে সেই পৃথিবীর অনেক নিয়ম শিখিয়েছে। আমরা একে অন্যের পৃথিবীতে যেতে পারি না সত্যি, কিন্তু অন্য জীবনকে জানতে, ভালোবাসতে তো সহজেই পারি। সৌরভ আমার সেই খুব ভালোবাসার বন্ধুদের একজন।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

সৌরভ অন্ধ। ছোটবেলায়, ১০-১১ বছর বয়স পর্যন্ত, ও পৃথিবীকে দেখেছিল। তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকার এসে সেই পুরনো পৃথিবী ঢেকে দেয়। ওর বাবা-মা অনেক চেষ্টা, অনেক চিকিৎসা করিয়েছিলেন ওকে আলোতে ফিরিয়ে আনার জন্য। কাজ হয়নি। কিন্তু আমি যখন থেকে সৌরভকে দেখেছি, ওর মধ্যে আলোর পৃথিবীর জন্য কোনও তীব্র আকাঙ্ক্ষা– যা ওকে হতাশ, দুঃখী বা মনমরা করে রাখবে– সেরকম দেখিনি। কখনও কখনও হঠাৎ হয়তো এক চিলতে দৃশ্য ও দেখতে পায়… যেমন একদিন আমরা মেট্রো করে যাচ্ছিলাম, নেমে হাঁটার সময় সৌরভ আমাকে বলল, ‘জানো, আজ আমি হঠাৎ তোমার চোখের পাশ থেকে গাল পর্যন্ত একবার দেখতে পেয়েছি!’

আমি কখনও ওকে জিজ্ঞেস করিনি, ঠিক কেমনভাবে ও এই নতুন পৃথিবীতে মানিয়ে নিল। জিজ্ঞেস করতে আমার সাহস হয়নি। কিন্তু এটা ঠিক যে, সৌরভের মধ্যে আত্মকরুণা দেখিনি কখনও। সৌরভকে দেখেছি বরং কত রকমের মানুষের কাছে অপরিহার্য হয়ে থাকতে। ওর সঙ্গে, ওর নিজের পৃথিবীর মধ্যে আমরা একসঙ্গে ঘুরেছি। সেই ঘোরার নিয়ম শিখেছি। সেই ভাগাভাগির মধ্যে আনন্দ পেয়েছি। ওর নিজের বন্ধুরা কখনও সৌরভকে মুখে বলে সতর্ক করে না। তাদের সঙ্গে ওর স্পর্শের বোঝাপড়া এত সাবলীল যে, হাতে একটা হালকা চাপমাত্রই ও বুঝতে পারে, সামনে পা ফেলার সময়ে সতর্ক হওয়ার কথা। আবার আমরা কেউ দেখতে পাওয়ার অনেক আগে একটা ফাঁকা রাস্তায় ও বলে, ‘সরে এসো, ট্রাক আসছে!’ গাড়িটা আসে তারপর। বহুবার হয়েছে এরকম।

না-দেখা ভাষা আরও অনেক আছে।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

একবার কয়েকজন মিলে বীরভূমের একটা গ্রামে হেলথ ক্যাম্প করতে যাওয়া হয়েছিল। সারাদিন পাথর খাদানে কাজ করা আদিবাসী মেয়েপুরুষরা দলে দলে আসছিল আর বলছিল, কীভাবে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাদের টিবির ওষুধ ‘ডট’ (DOT) খাওয়ানো হয়। দু’মাস ওষুধ খাওয়ার পর তাদের স্পুটাম টেস্ট অর্থাৎ কফ-থুতু পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, টিবির জীবাণু আর নেই। সকলেই অভিযোগ করছিলেন, “টিবির জীবাণু কেনে রইবে, আমাদের ত’ টিবি হয় নাই! হয়েছে পাথরভাঙা মিহি বালি গলায় বুকে গিয়ে হাঁপের আর কাশির অসুখ– যেটা লিখবার মানা আছে। তার অসুধ তো হয় নাই!”

তখনও ‘সিলিকোসিস’ নামের প্রাণঘাতী অসুখটি রোগীর প্রেসক্রিপশনে লেখার অলিখিত নিষেধ ছিল, সহজবোধ্য কারণে। ‘অকুপেশনাল হ্যাজার্ড’ বা জীবিকাজনিত অসুখের চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব আইনত মালিকপক্ষের নেওয়ার কথা। তো, সেই স্বাস্থ্য শিবিরে দিনভর কাটানোর পর, তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া মিটে গেলে, সৌরভ আর আমি গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে বেরই। হালকা জ্যোৎস্নায় কিছু কিছু গাছপালার নিচ দিয়ে ধুলোমাটির পথ। ঘুমন্ত গ্রামের এক জায়গা দিয়ে চলতে চলতে সৌরভ বলল, ‘এদের বাড়ি আজ সোডা দিয়ে কাপড় কাচতে বসিয়েছে। এখনও কাপড়গুলো গরম আছে।’ একটুখানি গিয়ে আবার, ‘এদের বাড়ি গরু আছে গো।’ এরকমভাবে কাঁঠালপাতার গন্ধ, মুরগির গন্ধ, কুয়োপাড়ের গন্ধ– দেখতে না-পাওয়া গ্রামটির একটা স্পষ্ট ছবি আমারও সামনে ফুটে উঠছিল।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

কেবল গন্ধের ইশারা নয়, সমাজের নানা স্তরের সম্পর্ক, যা আমরা, সৌরভের ভাষায় ‘সাইটেড’ লোকেরা খেয়াল করতে পারি না, তারও কিছু কিছু। প্রথমদিকে বড্ড ভয় করত– কী করে বাড়ি পৌঁছবে, কী করে আসবে, ভেবে। আমাদের তখন একটা আড্ডা দেওয়ার বাগান ছিল সুকিয়া স্ট্রিটের ভিতরে একটা প্রায় ভেঙে-পড়া বাড়িতে। সেটাকে দেখতে একটা পত্রিকা অফিসের মতো। ‘ব্লাইন্ড অপেরা’ নাটকের রিহার্সাল হত সেখানে। ঝর্ণা নামের একটি ক্ষীণতনু মেয়ে আসত দু’টি ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে। সেই ২০০৬-’০৭ সালে সৌরভ শিখিয়েছিল, ‘অত দুশ্চিন্তা কোরো না। রাস্তায় কেউ না কেউ ঠিক সাহায্য করে। খেয়াল করে দেখো, অন্ধ কেউ চট করে স্ট্রিট এক্সিডেন্টে পড়ে না। কেউ না কেউ ঠিক রাস্তা পার করিয়ে দেয়। বাস থেকে ঠিক স্টপেজে নামার হদিসও থাকে। কলকাতার সব বাস স্টপেজের গন্ধ আলাদা আলাদা। কোথাও নর্দমার গন্ধ, কোথাও বাজারের গন্ধ, ভাতের হোটেল, চানাচুর কারখানার গন্ধ, গুটকা, কচুরির গন্ধ– তুমি সেগুলো পাও না বলে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়।’ আবার দু’-তিন বছর আগে একদিন বলেছিল, ‘বাস স্টপের গন্ধগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এখন বেশিরভাগ পাড়ায় খুব লোহার ছড়ের গন্ধ আর সিমেন্টের।’

চমৎকার অভিনেতা সৌরভ। ‘ব্লাইন্ড অপেরা’ নাট্যগোষ্ঠী, ‘অন্য দেশ’ গোষ্ঠীর বহু নাটকে ওর দুরন্ত অভিনয় এখনও অনেক দর্শকের মনে আছে। এখন নিজের কাজে, একটু অসুস্থ বাবাকে নিয়ে একলার সংসারে সময় কমে যাচ্ছে। একক নাটক করে এখন। আমন্ত্রণ পেলে যায়। গল্প শোনে, শোনে নানা পাঠক্রম। সেখানে ওর নিয়মিত সাহিত্যচর্চা। আর, যে ছেলেটি ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত নিজের আপনজনদের কাছ থেকেও বারেবারে শুনেছে, ‘তোকে নিয়েই চিন্তা। তুই তো নিজে কিছুই পারবি না।’ আজ মাঝে মাঝেই তার কোম্পানি তাকে নানা জায়গায় আমন্ত্রণ করে নিয়ে যায় নতুনদের আত্মবিশ্বাস শেখানোর জন্য যে, কেমনভাবে নিজের একটা বাধাকে ধীরে ধীরে নিজের শক্তি হিসেবে তৈরি করে নিতে হয়।

……………………

পড়ুন ধুলোমাটির মুখ-এর অন্যান্য লেখা

……………………

Blind Opera Blind school Blind World Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on