Robbar

ডাকবাংলোর নিঝুম দিনরাত্রি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 15, 2026 7:38 pm
  • Updated:February 15, 2026 7:38 pm  

ডাকবাংলো মানেই কি কেবল তথ্য ও শুষ্ক ইতিহাসের ধারাবিবরণী? লেখক নিজেই আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, ‘ডাকবাংলোর ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রয়োজনীয়তা– সমস্ত কেজো তথ্যকে একত্রিত করলেও আরও একটি আঙ্গিক ছোঁয়া বাকি থেকে যায়, তা হল ডাকবাংলোর মজার গল্পকাহিনি।’ আর এই গল্পকাহিনির হাত ধরেই এসে পড়ে ‘ডাকবাংলোর বিদেহী বাসিন্দা’-দের কথা। সূচিপত্র ওলটালেই পাঠকের চোখে পড়বে ‘ডাকবাংলোর ইতিহাস’ থেকে ‘ব্রিটিশদের চোখে ডাকবাংলো’-র মতো অধ্যায় বিভাজন।

বিশ্বদীপ দে

অন্ধকার বৃষ্টির রাতে একা একা বিছানায় শুয়েছিলেন রুডিয়ার্ড কিপলিং। আচমকাই কানে ভেসে এল ঠক ঠক শব্দ। কিপলিং সাহেব বুঝলেন, সেই শব্দ আসছে পাশের ঘর থেকে। অথচ ঘরটি তালাবন্ধ! এরপর রহস্য আর রোমাঞ্চ যে বৃষ্টিস্নাত সেই রাতের বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে আমাদের মানে পাঠকের মনের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়, সে তো বলাই বাহুল্য। পরে অবশ্য দেখা যায়, সবই নেংটি ইঁদুরের কীর্তি! কিন্তু অন্ধকার, শীতল পাহাড়ি এলাকায় রাতে বৃষ্টি হলে যদি গল্পের প্রধান চরিত্র এসে ওঠে কোনও ডাকবাংলোয়, আমরা জানি এরপর কী ঘটতে পারে। সে গল্প হোক বা স্মৃতিকথা। এভাবেই আমাদের মনের ভিতরে ডাকবাংলো একটা জায়গা করে নিয়েছে সেই কবে থেকেই! নিজেরা রাত কাটাই বা না-কাটাই ডাকবাংলোর একটা ঝাপসা ছবি আমাদের স্মৃতিতে জমা করে রেখেছে বহু রেডিও নাটক বা বইয়ে পড়া কাহিনিরা। অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের ‘ব্রিটিশ ভারতে ডাকবাংলো’ বইটা হাতে নিলে তাই আগ্রহ জাগবেই। অন্তত বাংলায় এই বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক কালে বোধহয় একটা আস্ত বই লেখা হয়নি। সেখানেই এই বইয়ের অভিনবত্ব। ব্রিটিশ ভারত মানেই একটা ফেলে আসা সময়। আর সেই সময়ের এক অমোঘ মাইলফলক যে ডাকবাংলো, তাতে সন্দেহ নেই! সুতরাং… ইতিহাস, নস্ট্যালজিয়া ও রোম্যান্সের প্রতি আগ্রহকে সঙ্গে নিয়ে এই বইয়ের পাতা ওলটানো যেতেই পারে।

রুডিয়ার্ড কিপলিং

এদেশে ব্রিটিশরা ডাকব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই ডাকবাংলোর প্রচলন হয়। সেই ইতিহাস, ইতিহাস ছুঁয়ে থাকা মানুষ, স্মৃতি নিয়েই এই বই। যদিও লেখক লিখছেন ‘রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ প্রাথমিক ভূমিকা থাকলেও, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা সম্ভব যে ডাকবাংলোর মূল লক্ষ্য যদি ডাক হরকরাদের যাত্রাকালীন বিশ্রাম হয়ে থাকে, তবে সেই পরম্পরা কিন্তু ব্রিটিশদের ভারতে আসার অনেক আগে থাকতেই প্রচলিত ছিল।’ আর এই প্রসঙ্গেই এসে পড়েছে ছত্র বা ধর্মশালার কথাও, যেখানে তীর্থযাত্রী বা অন্য কোনও পথিকও রাত কাটানোর একটা নিরাপদ আশ্রয় পেত। যাই হোক, ‘ব্রিটিশদের হাত ধরে দেশের বিভিন্ন অংশে, সে সমতলেই হোক কি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, সব জায়গায় ডাক হাউস বা ডাকবাংলোগুলি উনবিংশ শতকে যে গড়ে উঠেছিল, তা ছিল এক নতুন যুগের সূচনা।’ নথিভুক্ত ঐতিহাসিক তথ্যের উল্লেখ করে লেখক জানিয়েছেন, ১৮৪০-এ প্রথম ডাকবাংলোর দেখা মেলে এদেশে। আর ক্রমেই ‘ডাকবাংলো ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের কাছে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রয়োজনীয় নির্মাণ হয়ে দাঁড়ায়।’ এবং ‘তথ্যের হিসেবে জানা যায়, শুধুমাত্র হিমাচল প্রদেশেই আড়াইশ থেকে সাড়ে তিনশটি ডাকবাংলো নির্মিত হয়েছিল।’

লেখার টেবিলে নিমগ্ন রাস্কিন বন্ড

কিন্তু ডাকবাংলো মানেই কি কেবল তথ্য ও শুষ্ক ইতিহাসের ধারাবিবরণী? লেখক নিজেই আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, ‘ডাকবাংলোর ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রয়োজনীয়তা– সমস্ত কেজো তথ্যকে একত্রিত করলেও আরও একটি আঙ্গিক ছোঁয়া বাকি থেকে যায়, তা হল ডাকবাংলোর মজার গল্পকাহিনি।’ আর এই গল্পকাহিনির হাত ধরেই এসে পড়ে ‘ডাকবাংলোর বিদেহী বাসিন্দা’-দের কথা। আসলে এই বইটি লেখার সময় অভিষেক সবচেয়ে আগে যেটা করতে পেরেছেন, তা হল বিষয়বস্তুর বিন্যাস। তাই সূচিপত্র ওলটালেই পাঠকের চোখে পড়বে ‘ডাকবাংলোর ইতিহাস’ থেকে ‘ব্রিটিশদের চোখে ডাকবাংলো’-র মতো অধ্যায় বিভাজন। এবং সেখানে ইতিহাসের সঙ্গে প্রচলিত মিথ, গল্পকাহিনি সব কিছুই আশ্রয় পেয়েছে। একটি পরিচিত মিম মনে পড়ছিল, যেখানে ভূতের গল্পে ডাকবাংলো মানেই চৌকিদার এসে মাংস আর রুটি বানিয়ে দেয়। তারপরই অবধারিত ভাবে এসে পড়ে ভূত! এই বইতেও মুরগির মাংস যে ডাকবাংলোর খানাপিনার ক্ষেত্রে এক অনিবার্য ও জনপ্রিয় পদ ছিল তা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। একই ভাবে উল্লেখিত ‘বিদেহী’ প্রসঙ্গও। কিপলিংয়ের কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। রয়েছে রাস্কিন বন্ডও। আসলে ডাকবাংলো মানেই ছমছমে নিবিড়তা, তার সঙ্গে হাত ধরাধরি করেই বোধহয় রহস্যের কুয়াশা এমনিই জন্ম নিত। লেখক মনে করিয়ে দিচ্ছেন ‘বিদেশের মাটিতে থাকতে বাধ্য হওয়া মানুষগুলো’র কথাও। অচেনা পরিবেশ, বিদেশ-বিভুঁই, রোগবালাই মিলেমিশে এক গুমরে ওঠা মন তাই বোধহয় দেখতে পেত বিদেহীদের। তবে লেখক কেবল এই ব্যাখ্যার দিকে যাননি। পাঠক যা চান, অর্থাৎ ডাকবাংলোকে ঘিরে থাকা ভূতের গল্প, সেসবও শুনিয়েছেন।


একই ভাবে এসেছে ডাকবাংলোর খানসামা ও ভৃত্যদের কথা, মেমসাহেবদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ডাকবাংলো এবং অবশ্যই খানাপিনার বিবরণ। পাশাপাশি ‘রাজনীতি ও বিদ্রোহ দমনে ডাকবাংলো’ অধ্যায়টির কথাও আলাদা করে বলতেই হয়। ডাকবাংলো ও মহাবিদ্রোহের সম্পর্ক যে কতটা অবিচ্ছেদ্য তা জানা যায়। আবার ১৯২২ সালে আহমেদাবাদের সার্কিট হাউসের সেন্ট্রাল হলই হয়ে উঠেছিল অস্থায়ী কোর্টরুম। সেখানে বিচার হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীর! সেখানে গান্ধীকে একবার দেখার জন্য সাধারণ মানুষের কৌতূহল উপচে পড়ছিল। এই সব ইতিহাসও চোখের সামনে ফুটে উঠতে থাকে।

ব্রিটিশ ডাকবাংলো

বইয়ের শেষ অধ্যায় ‘ডাকবাংলোর বর্তমান অবস্থা’। যা পড়তে পড়তে জানা যায় সেদিনের ডাকবাংলো কীভাবে পরবর্তীতে বনবাংলো কিংবা পরিদর্শন বাংলোয় পরিবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ সবটা শেষ হয়ে যায়নি। অবলুপ্তির বাধা কাটিয়ে অনেক ডাকবাংলো টিকেও গিয়েছে। কিন্তু যা টিকে থাকেনি তা হল সময়। সময় হারিয়ে যায়। হারানোই তার নিয়ম। সেই ব্রিটিশ আমল, পরাধীন দেশ, ডাকবাংলোর গা ছমছমে পরিবেশকে স্পর্শ করার আর উপায় নেই। কিন্তু বইয়ের অক্ষরেরা তা পারে। সেখানে চোখ বোলালে ঝরে পড়তে থাকে হারানো সময়, ডাকবাংলোর শরীরে লেগে থাকা ইতিহাসের হৃদস্পন্দন।
বইটির এক অন্যতম আকর্ষণ অলংকরণ। অনেক ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকী, দুই পাতা জোড়া ছবিও রয়েছে। দু’-একটা ছাড়া বানান ভুল সেভাবে চোখে পড়ে না। ভালো ছাপা, প্রচ্ছদটিও চমৎকার। সব মিলিয়ে ‘ব্রিটিশ ভারতে ডাকবাংলো’ এই মুহূর্তে কলেজ স্ট্রিটের নন ফিকশনের জমজমাট জগতে নিজস্ব স্থান করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, একথা বলাই যায়।

ব্রিটিশ ভারতে ডাকবাংলো
অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
ক্রমশ
৫৫০্‌