Robbar

বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 28, 2026 8:38 pm
  • Updated:February 28, 2026 8:38 pm  

ছোটবেলা হোক বা বুড়োবেলা, আমাদের সবারই বিভিন্ন ধরনের আঠার সঙ্গে একটা মাখামাখি সম্পর্ক আছেই। মনে পড়ছে, ঘুড়ি বানানোর জন্যই আমরা অন্তত এক ডজন আঠার ব্যবহার করতাম। বেল, তেতুঁল, গাব ইত্যাদি কিছু ফল থেকে নিয়েছি আঠা। কিছু গাছের গা থেকে বেরত আঠা। তাছাড়া তৈরি করা আঠার উপকরণ হিসেবে তেতুঁল বিচি, চালের গুঁড়ো, আটা-ময়দা তো ছিলই। আর ছিল বড়দের– গোবর, মাটি ইত্যাদি নানান জিনিস দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি, উঠোন বা দেয়াল চিত্রিত করার কাজে নানা আঠা আর বাঁধনি। 

সমীর মণ্ডল

২৩.

কিছুদিন আগে আমার স্টুডিওর ছাদ থেকে বিরাট অংশের সিমেন্ট খসে পড়ে বইপত্র, শিল্প-সরঞ্জাম, কাচ সমেত ফ্রেমে বাঁধানো ছবি সব একেবারে ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। সিমেন্ট ধুলোবালি সরিয়ে, কাচের টুকরো ইত্যাদি পরিষ্কার করে জায়গাটাকে মোটামুটি একটা ভদ্রস্থ অবস্থায় আনতে বেশ ধকল গেল। মন খারাপ সামলে একটা থিতু অবস্থায় পৌঁছে রাজমিস্ত্রি ডেকে ছাতের মেরামতির কাজ শুরু হল। ছাতের ভাঙা অংশে যা যা করণীয় করে, বালি-সিমেন্ট মিশিয়ে একটা মশলা বানিয়ে নিচ থেকে ছুড়ে ছুড়ে ওই জায়গাটা ঢেকে ফেলল খানিকটা মোটা করে। তারপরে আর এক বিপত্তি। পরের দিন সকালবেলা কাজের লোকরা এসে দেখল সমস্তই ঝুরঝুর করে নিচে পড়ে গেছে। এই দ্বিতীয় ধাক্কায় মাথায় হাত। অতএব আজকাল আমরা সবাই যা করি তাই করলাম। মানে, বুকে টিশটিশ ব্যথা করতেই সোজা কার্ডিওলজিস্ট কিংবা মাথাব্যথা করলে যেমন এক্কেবারে নিউরোলজিস্টের কাছে চলে যাই, তেমন। 

আমার এক সময়ের সহকর্মী, সায়েন্স সিটি-তে কাজ করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দেবোপমকে ফোন লাগালাম কলকাতায়। জিজ্ঞেস করলাম, এই সিমেন্ট-বালি জল দিয়ে গুলে দেওয়ালে লাগালে, কেন ধরে থাকে আর কেনই বা পড়ে যায় সে বিষয়ে একটু জ্ঞান দাও তো। ও যা বলল তাতে দেখলাম রাজমিস্ত্রিরা যা করেছ তা একই। ভাঙা জায়গাটাকে প্রথমে পরিষ্কার করে, ঘষে-মেজে, ঠুকে ঠুকে একটু অসমান করে রাখতে হবে, সমান জায়গায় না কি সিমেন্ট ধরবে না। তারপরে পিওর সিমেন্টের একটা ঘোল বানিয়ে সেটাকে ছিটিয়ে-ছিটিয়ে বা ব্রাশ দিয়ে জায়গাটায় লাগিয়ে সেটা শুকোবার আগেই সিমেন্ট-বালির মশলাটা লাগাতে হবে। একটা রেশিও বলল। সেগুলো লাগানোর পরে ঠিকমতো পরিষ্কার জল দিয়ে কিয়োরিং করতে হবে। সেটাই নাকি আসল। শুনলাম।

শিল্পী: সমীর মণ্ডল

ছাত মেরামত ব্যাপারটা মিটেছে কি মেটেনি এমন সময় বন্ধু অতুল দোদিয়া-র একটা ফোন পেলাম। অতুল আমাদের সমসাময়িক মুম্বাইয়ের একজন প্রখ্যাত শিল্পী। তখন জলরঙে ছবি আঁকছে। তো জলরঙের কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ ফোনে একটা প্রশ্ন করে বসল, যেমন আমাকে মাঝেমধ্যে অনেকেই করে। যেহেতু মোটামুটি ৫০ বছর ধরে একটি মিডিয়াম অর্থাৎ জলরঙে কাজ করি, তাই এর সম্পর্কে কোনও সমস্যায় প্রশ্ন আসতেই পারে। জগতের যে কোনও কাজেই সরঞ্জামের একটা ঝামেলা থাকেই। অতুলের অস্বস্তিটা কী, না কাগজ ভিজিয়ে কাজ করতে গিয়ে অগোছালো শুকোনোর ফলে বিশাল মাপের কাগজে নানা ভাবে ঢেউ খেলা অবস্থায় কুঁচকে যাচ্ছে। সত্যিই একটা অস্বস্তির কারণ। তাই প্রশ্ন, এই কাগজ এখন আমি সোজা করব কী করে? 

অন্যান্য শিল্পীদের কাছ থেকে আমার কাছে যেসব মজার প্রশ্ন আসে তার দু’-একটা নমুনাও শুনুন। পেনসিলে একটু চেপে কাজ করতে গিয়ে কাগজে যে গর্ত হয়ে যাচ্ছে জলরং করার সময় সে গর্তে রং জমে গিয়ে, সেই পেনসিলের দাগটা ভালো করে ইরেজ করার পরেও রং ধরে নিচ্ছে, এটা থেকে রেহাই পাবো কী করে? একবার প্রশ্ন এল, রঙের টিউবটা বেশ কিছুদিন ব্যবহার না করার ফলে তার ক্যাপটা এমন এঁটে আছে যে, গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়েও খুলতে পারছি না। ডাইনে বাঁয়ে ঘোরাচ্ছি কিন্তু ছিপি খুলছে না, খুলব কী করে? কিংবা জলরঙের নতুন টিউব, টিপছি যখন প্রথমে স্বচ্ছ খানিকটা ঘন তরল পদার্থ বেরিয়ে আসছে, তারপরে রং বেরচ্ছে। এই তরল পদার্থটাকে নিয়ে কী করব? ফেলে দিয়ে রং ব্যবহার করব, না রঙের সঙ্গে মিশিয়ে নেব। ঠিক যেন কাতলা মাছের কালিয়া, দেখা গেল, বাটিতে মাছের ঝোলের পাশ দিয়ে বেশ খানিকটা সোনালি রঙের তেল বেরিয়ে আসছে। এখন ওই তেলটাকে বাদ দিয়ে খাব নাকি ওই তেলটা দিয়েই ভাত মাখব? এমন অসংখ্য প্রশ্ন। রং প্রথমে যখন লাগাচ্ছি ঝলমলে, শুকিয়ে গেলে কেন ম্যাড়মেড়ে? রঙের উপরে রং লাগাচ্ছি কাদা হয়ে যাচ্ছে, ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে কেন? কাগজ বেশি রং চুষে নিচ্ছে, উপরে বেশি থাকছে না কেন?

প্রসঙ্গত মহারাষ্ট্রের একটি আইকনিক ভারতীয় স্টেশনারি কোম্পানি, ‘ক্যামলিন’-এর কর্ত্রী, মিসেস রজনী ডান্ডেকার আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মাঝেমধ্যে ডাক পড়ত। ভারতে ক্যামলিন তার শিল্পসামগ্রী সরবরাহের জন্য প্রসিদ্ধ। আমার ডাক পড়ত দুটো কারণে। প্রথমত পশ্চিম ভারতে ওদের যে শিল্প প্রতিযোগিতার আয়োজন হত, তার শিল্পী এবং শিল্পকর্ম নির্বাচন ইত্যাদির কাজ করার জন্য। বেশ বড়সড় সে ব্যবস্থা। সারা ভারতের বাছাই করা ছাত্র-শিক্ষকের একটা দলকে পাঠানো হতো ইউরোপীয় শিল্প সংগ্রহালয়গুলো দেখার জন্য। দ্বিতীয়ত জলরং, টিউব-বন্দি হওয়ার আগে তার চারিত্রিক দিক অর্থাৎ গ্রাইন্ডিং-এর ফলে রঙের কণা, আঠার ভাগ ইত্যাদি মনোমত হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে আমাদের কাছ থেকে মতামত চাইতেন মিসেস ডান্ডেকার।

ছোটবেলা হোক বা বুড়োবেলা, আমাদের সবারই বিভিন্ন ধরনের আঠার সঙ্গে একটা মাখামাখি সম্পর্ক আছেই। মনে পড়ছে, ঘুড়ি বানানোর জন্যই আমরা অন্তত এক ডজন আঠার ব্যবহার করতাম। বেল, তেতুঁল, গাব ইত্যাদি কিছু ফল থেকে নিয়েছি আঠা। আমাদের ছোটবেলায় বল ফল বলে একটা স্থানীয় ফল ছিল। বড় গাছে আঙুরের মতো সাইজের ছোট ফল। পুষ্ট ফলের মধ্যেটা পুরোপুরি সুন্দর স্বচ্ছ আঠায় ভরা। কিছু গাছের গা থেকে বেরত আঠা। তাছাড়া তৈরি করা আঠার উপকরণ হিসেবে তেতুঁল বিচি, চালের গুঁড়ো, আটা-ময়দা তো ছিলই। আর ছিল বড়দের– গোবর, মাটি ইত্যাদি নানান জিনিস দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি, উঠোন বা দেয়াল চিত্রিত করার কাজে নানা আঠা আর বাঁধনি। ছিল মাটির তৈরি জিনিসপত্র থেকে শুরু করে কাঠের, ধাতুর আসবাবপত্র তৈরিতে কত রকমের বাঁধনের ব্যবস্থা।

বেঁধে থাকার মতো, বেঁধে রাখার মতো জিনিসের খোঁজ মানুষের প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই। সেই প্রস্তর ও ব্রোঞ্জ যুগেও। আঠার ব্যবহার কখনও তাদের অস্ত্রশস্ত্রে, কখনও বাসস্থান নির্মাণে, কখনও শিকারে, আবার কখনও শিল্পকলায়। পাহাড়ে পাহাড়ে, দেওয়ালে দেওয়ালে। গুহাচিত্রকে দেওয়ালে ধরে রাখতে এবং সেটাকে টেকসই করতে আঠার ভূমিকা সাংঘাতিক।

দেওয়াল চিত্রনের আঠার স্তর

লেখায় চিত্রকলা এসে পড়েই। এ আমার দুর্বলতা। আর সেইসঙ্গে এসে পড়ে প্রিয় মাধ্যম, জলরং। রঙের সঙ্গে আরও একটা জিনিসের কথা এখানে উল্লেখ করতেই হয়, সেটা হল কাগজ। সব রকমের কাগজে ফাইবার বা আঁশ ধরে রাখার জন্য একটা আঠার প্রয়োজন হয়। আর জলরঙের জন্য হাতে তৈরি বিশেষ কাগজটিতে আঠার দু’রকম ব্যবহার। কাগজের আঁশগুলোকে ধরে রাখার একরকম আর দ্বিতীয়টা, কাগজের উপরিতলের একদিকে আরও একবার আঠার আস্তরণ। সেই আঠা নিয়ন্ত্রণ করে জলকে, অর্থাৎ কতটা কাগজ নেবে আর কতটা উপর থেকে শুকোবে। কাগজের এই ব্যবহার একান্তই আঠার দৌলতে। যা কিছু বলছি তার সবটা আমাদের আর্ট কলেজে শিখিনি। জীবনে চলার পথে কত না শিখছি। এই আঠার যে আস্তরণের কথা বললাম, সেটার উপরে নির্ভর করে ছবি আঁকার কাগজটির উল্টো সোজা দিক। এটাও বোধহয় অনেকেরই এখনও জানার প্রয়োজন পড়ে না। বুঝবেন কীভাবে? কাগজ কোম্পানির নামের জলছাপ যেদিকে সোজা পড়তে পারবেন সেটাই সোজা দিক।

পৃথিবীর প্রাচীনতম মাধ্যম, জলরঙের কথায় কত দূর পিছিয়ে যেতে হয় আমাদের। মনের মত রঙের পাথরটি কুড়িয়ে এনে জল দিয়ে পাথরে ঘষা, চন্দন বাটা। দেওয়ালে দেওয়ালে আলেপ, আলেখ্য। তারপর যেই না জল শুকোল, হাত বোলাতেই ঝুরঝুর করে ঝরে গিয়ে পণ্ড হল সমস্ত মেহনত। কত কী না করতে হয়েছে রঙের কণাকে ছবির পটে ধরে রাখার জন্য। ব্যবহার করা হয়েছে পশুর চর্বি, দুধ, মধু মায় থুতু পর্যন্ত। পরবর্তীকালে পরখ করা হয়েছে কত না গাছের রস, পাতার রস, ফলের আঠা, বীজের আঠা।

এখন জলরঙে পিগমেন্টের পরম্পরাগত ধারক, বাহক আঠার নাম, ‘গাম অ্যারাবিক’। যা বাইন্ডার তো বটেই, রঙের উজ্জ্বলতা এবং স্বচ্ছতা বাড়াতেও তার জুড়ি নেই। ধরে রাখা, বেঁধে রাখা একদিকে, অন্যদিকে স্বচ্ছন্দে বয়ে নিয়ে যাওয়া। রঙের কণার সমান বিস্তার ও বিন্যাসের বাহন এই আরবি আঠা। তা না হলে পিগমেন্টের কণাগুলো, যা আসলে আলাদা রঙের আলাদা ওজনের পাথরের টুকরো, তা থিতিয়ে যেত যখন তখন, যেখানে সেখানে। তুলির দাপটে ছত্রভঙ্গ হত তারা, কাজ পণ্ড করত। আমাদের শরীরের পাইপলাইনে রক্তের প্রবাহে শ্বেত কণিকা আর লোহিত কণিকারা যেমন জলে ভেসে যায়, সে জল একা জল নয়। তেমনি কাগজের গায়ের খাঁজে রঙের দানারা অযথা যাতে সেঁধিয়ে না যায় তার প্রহরার কাজটিও করে জলে মিশে যাওয়া এই গাম অ্যারাবিক।

গাম অ্যারাবিক

‘গাম অ্যারাবিক’। নামটা প্রথম শুনে মনে হয়েছিল, সেটা খায় না মাথায় দেয়? বাস্তবে সেটা কিন্তু খায়। খাবারে ব্যবহার হচ্ছে সেই প্রস্তর যুগ থেকে। তা প্রায় ৭০ হাজার বছর আগের কথা। এখন এটি সস, আইসক্রিম, দুগ্ধজাত খাবার, স্যুপ এবং বেক্‌ড খাবারগুলোতে ঘন ও মসৃণ টেক্সচার তৈরি করতে নিয়মিত ব্যবহার হয়। আবার মাথায় মাখাও হত সেই মিশরীয় সভ্যতায়, শুষ্ক মাথার আর্দ্রতা বজায় রেখে চুলের স্বাস্থ্যরক্ষা আর জৌলুষ বাড়ানোর কাজে। এহেন মহামূল্যবান বস্তুটি কী? আসলে বাবলা জাতীয় এক গাছের আঠা এই গাম অ্যারাবিক। 

বস্তুটির নামকরণের গল্পটাও রূপকথার মতো লাগে আমার। আরবের বাণিজ্য বন্দর দিয়ে নানা দেশে এর যাতায়াত বলে নাম হয়ে গেল, গাম অ্যারাবিক। আরবি আঠা। সরল, নিষ্পাপ, নির্বিষ যে বস্তুটি এতকাল খাদ্যে, পানীয়ে, ওষুধে দিয়েছে আনন্দ, সে আমাদের প্রাণসখা। পদার্থটি এককালে মিশরীয় রমণীর মাথা ঠান্ডা রেখে চুলের পরম যত্ন নিয়েছে, সে তো আরবি বিলাস; আর জলরঙের বেলায় জল শুকিয়ে রঙের কণার গায়ে কাচের মতো আবরণে যে দিচ্ছে বাড়তি ঔজ্জ্বল্য, তার কদরই আলাদা।

গাম অ্যারাবিক (গুড়ো)

আঠা কীভাবে কাজ করে, আর কেন তা কখনও ব্যর্থ হয়, এই প্রশ্নগুলো যদি আপনাকে ভাবিয়ে থাকে, তাহলে জানবেন, আপনি এ বিষয়ে একা নন। প্রাচীনকাল থেকেই এই প্রশ্ন পৃথিবীর সেরা সব মগজকে ব্যস্ত করে রেখেছে। শত শত বছর পেরিয়েও বিজ্ঞানীরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি, কীভাবে আঠালো পদার্থ এক জিনিসকে আরেকটির সঙ্গে আটকে রাখে। আপনিও কি কখনও ভেবে দেখেছেন, আঠা কেন নিজের টিউবের দেওয়ালের গায়ে লেগে জুড়ে থাকে না? এ নিয়ে অবশ্য বিজ্ঞানীদের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও ধারণার কোনও অভাব নেই।

বিজ্ঞান এলে আমাদের বিজ্ঞান মিউজিয়ামের কথা তো আসবেই। বলতে গেলে শতাধিক আঠার ব্যবহার দেখলাম নিজের চোখে সেখানকার কর্মজীবনে। এই মিউজিয়ামেই আমার যতটুকু বিজ্ঞান বোঝা, নিজের মতো তাকে উপভোগ করা। বুঝেছি– কাগজে-কাগজে, কাঠে-কাগজে, চামড়ায়-কাচে। কাচে-প্লাস্টিকে, প্লাস্টিকে-প্লাস্টিকে, প্লাস্টিকে-ধাতুতে, কাঁসায়-পিতলে, পিতলে-অ্যালুমিনিয়ামে একইভাবে বন্ধনের ব্যবস্থা নেই। সবারই চরিত্র আলাদা, সবাইকে ধরে রাখার আলাদা সংগ্রাম। তাই ভিন্ন ভিন্ন আঠার আয়োজন, নানা রকমের আবিষ্কার। 

ধাতু জোড়া দেওয়ার আঠা

লোহা, জল, পাথর, প্লাস্টিক, এমনকী আমাদের শরীর– আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেসব বস্তু দেখি, সবই গঠিত অসংখ্য পরমাণু দিয়ে। পরমাণু একত্রিত হয়ে অণু, আর এই সংযুক্তির পেছনে কাজ করে মৌলিক বল ও শক্তির বিনিময়। বস্তুর দৃঢ়তা, রঙ, গলন, গঠন, তাপ পরিবাহিতা, সবকিছু নির্ধারিত হয় এই অণু-পরমাণুর বন্ধনের প্রকৃতি দ্বারা। অণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস, যেখানে জোট বেঁধে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন। নিউক্লিয়াসের চারপাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে, যেন প্রহরীর মতো ঘোরে, ইলেকট্রন। এই ইলেকট্রনই প্রতিবেশী অণুর ইলেকট্রনের হাতে হাত ধরে, কখনও ভাগাভাগি করে অথবা নিজেকে সমর্পণ করে সৃষ্টি করে রাসায়নিক বন্ধন।

এই যে বল, সেটাকে ফোর্স বলুন বা গায়ের জোর, আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে জোর করে শক্তি দিয়ে বেঁধে রেখেছে বলেই আমরা টিকে আছি। মনে পড়ছে একবার সমুদ্রের তলায় নেমেছিলাম দলবল মিলে রঙিন মাছ আর কোরাল দেখতে। জলের তলায় আমাদের রাখা হয়েছিল সবাইকে হাতে হাতে ধরে। তা না হলে আমরা জলের গভীরে ওজনহীনতার জন্য ভেসে যেতাম, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তাম। আর এই জোর করে বেঁধে রাখা হয়েছে বলেই না মহাবিশ্বে আমরা টিকে আছি। যদি বয়কট করতাম এই শক্তিকে, এই বলকে, তাহলে আমরা হারিয়ে যেতাম, ছড়িয়ে যেতাম চারিদিকে। এমনকী আমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ টুকরো টুকরো হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে যেত, মিশে যেত অণুতে কণাতে মহাশূন্যে। তার চেয়ে–

‘আয় আরো হাতে হাত রেখে
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’

কবির কথা মেনে, চলুন আমরা বরং বন্ধনকে সংহতি অর্থে নিই। স্বীকার করি, ঐক্যের বন্ধনেই আমাদের দৃঢ়তা, বিচ্ছেদে আমরা ভঙ্গুর।

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন

পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প

পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?