
ক্রুয়েফের দেশের হয়ে ৪৮ ম্যাচে ৩৩ গোল– গোটা কেরিয়ারে নিজে স্কোরশিটে থাকলে দেশকে কোনওদিন হারতে দেখেননি ক্রুয়েফ। পাশাপাশি দেশের হয়ে নিসকেন্সের ৪৯ ম্যাচে ১৭ গোলের পরিসংখ্যান। অবশ্য সেই হল্যান্ডকে তিনকাঠি দিয়ে মাপা যাবে না। সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড নামেই, আসলে গোটা মাঠ জুড়ে দাপটে খেলা ক্রুয়েফ, দীর্ঘ পায়ের ব্যবহার, আচমকা, অবিশ্বাস্য টার্ম, নেতৃত্ব, নিখুঁত প্রেসিশন– সতীর্থ ক্রুয়েফ এবং টোটাল ফুটবল প্রসঙ্গে আয়াক্স ডিফেন্ডার ব্যারি হুলশফ বলছেন, ‘the thing we discussed the whole time. Cruyff always talked about where to run and where to stand, and when not to move.’ এবং এই ফুটবলেই সোনালি চুলের নিসকেন্সের যোগ্য সঙ্গত।
৭ জুলাই, ১৯৭৪-এর মিউনিখের সেই অলিম্পিয়া স্টেডিয়াম (অলিম্পিয়াস্টেডিয়ন)। ৭৫,২০০ মানুষ। পাশেই ছোট টিলার ওপরেও ম্যাচ দেখতে কাতারে কাতারে মুখ। ’৭০-এর সোনার কেরিয়ার শেষ করে ম্যাচ দেখতে গ্যালারিতে পেলে। শুরুর বাঁশির পর টানা ১৫টা ডাচ পাস এবং জোহান ক্রুয়েফ!
সেন্ট্রাল সার্কেল থেকে একটা ক্রুয়েফোচিত সোলো রান। ঠিক তিনকাঠির আগে উলি হোনেসের বাধ্যতামূলক ফাউল। সামান্যতম দেরি না করে ব্রিটিশ রেফারি জ্যাক টেলরের পেনাল্টির বাঁশি। জোহান নিসকেন্সের পা। এদিকে, নিসকেন্স প্রাক্-বিশ্বকাপ হল্যান্ডে একেবারেই নিশ্চিত পেনাল্টি-টেকার নন। একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচে স্পটকিক স্পেশালিস্ট জেরি মুহরার প্রথম পেনাল্টি মিস করেছিলেন, ঠিক পরেই দ্বিতীয় পেনাল্টি পেলে মুহরার জোহানকে নিতে অনুরোধ করলেন। সেই শুরু। তারপর বিশ্বকাপে বুলগেরিয়া ম্যাচে জোড়া স্পটকিক। সেই নিসকেন্স এতদিনে দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী। অথচ সেই মানুষটিই ফাইনালের ওই ২ মিনিটের পেনাল্টি নেওয়ার আগে কিছুটা যেন স্নায়ুর সমস্যার থরোথরো। সিদ্ধান্তহীনতায় কাঁপছেন! বাঁ-দিকে মারবেন বলে স্থির করে হঠাৎ শট নেওয়ার আগে সিদ্ধান্ত বদলে ডান দিকে প্লেস করতে চেষ্টা করলেন। সেপ মায়ারের বিশ্বাসযোগ্য চোখ বিশ্বাসঘাতকতা করল। মায়ার ঝাঁপালেন বাঁ-দিকে। ডানদিকে মারতে গিয়ে কিছুটা দুর্ঘটনায় মাঝখান দিয়ে বল ঠেললেন নিসকেন্স। ইনসাইড নেট ছুঁল। রূপকথার শুরু, শেষ। দুই জোহানের যৌথ রাস্তার মাইলস্টোন।

জোহান জ্যাকব নিসকেন্স। ১৯৫১-র ১৫ সেপ্টেম্বর উত্তর হল্যান্ডের হিমস্টেডে জন্ম। বিষাক্ত এক পারিবারিক স্পেস, আসলে স্পেসের অভাব। নিঃশ্বাসের অভাব। বাবা-মায়ের ডিভোর্স। দীর্ঘদিন তস্য ঘরে জায়গা না পেয়ে করিডরে শুয়ে ঘুমনো অ্যাথলেটিক জোহান নিসকেন্স বাড়ির বাইরে পা রাখলেই রাজা। যেকোনও খেলা হোক, বল পায়ে পড়ুক বা জিমন্যাস্টিক এরিনা, ছোট্ট নিসকেন্স স্কুল থেকেই কাঁপাচ্ছেন। অন্যদিকে, জোহান ক্রুয়েফ বছর চারেক আগে পৃথিবীতে এসেছেন। ২৫ এপ্রিল, ১৯৪৭, আমস্টারডাম। আয়াক্স আমস্টারডাম স্টেডিয়ামের ঢিলছোড়া দূরে ওয়ার্কিং-ক্লাস ছোট্ট পরিবার। নিসকেন্সের বিপরীতে অনেকটাই ভালোবাসার আবহ। বাবা হারমানাসের ফুটবল-প্রেমে, ছেলে জোহানের পিতৃ-লেগ্যাসি। অবশ্য ঠিক বছর বারোর ভিতর ৪৫ ছোঁয়া বাবার ফেটাল হার্ট অ্যাটাক। আয়াক্স স্টেডিয়ামে ক্লিনার মা পেট্রোনেলা কী করবেন এভাবে? একা?
২০১৫-র একটি তথ্যচিত্রে জোহান বলছেন, ‘I was born shortly after the war, though, and was taught not to just accept anything.’

আগে, পরে এভাবেই কষ্ট, আচমকা আঘাত, কিছুতেই মেনে না-নাওয়া জেদ, কমলা পতাকা এবং ‘দ্য বিউটিফুল গেম’– দুই জোহান বাড়ছিলেন আলাদা আলাদা। ’৬৮ থেকে ’৭০ অবধি রেসিং ক্লাব হিমস্টেডের রাইট ব্যাক ১৯ বছরের জোহান নিসকেন্স ’৭০-’৭১-এ গেলেন সেই আয়াক্সে। কোচ রিনাস মিশেলের উত্তরসূরি স্টেফেন কোভাক্সের চোখ চকচক করে উঠল। একটা বছর খেললেন রাইট ব্যাকে। নাহ্, কোভাক্স আর পারলেন না। বললেন, ‘তুমি সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে এসো।’ একটা কথা। ওটুকুই। জোহান মানিয়ে নিলেন অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। ’৭০ থেকে ’৭৪ পর্যন্ত আয়াক্স। ’৭১-এর ফাইনালে প্যানাথানিকোস, ’৭২ ও ’৭৩-এ দু’-দু’বার ইন্টার মিলান– পরপর তিনবার ইউরোপিয়ান কাপ আয়াক্সের। এবং এই আয়াক্সেই ঘরের ছেলে ক্রুয়েফ বড় হচ্ছেন, মানাচ্ছেন মিশেলের টোটাল ফুটবলের ড্রিমটার্মে।
’৬৪-তেই ১৭ বছরের ক্রুয়েফের ক্লাবে পা। এবং এই ক্রুয়েফ-নিসকেন্স অর্থাৎ, দুই জোহানের যৌথ ম্যাজিক-ফিল্ড কোচ স্টিফেন কোভ্যাক্সের আয়াক্স। সিগনেচার ১৪ নম্বরের ক্রুয়েফের পাশে ৭ নম্বর জার্সির তরুণ নিসকেন্স। ক্রুয়েফের ছায়ায় বেড়ে ওঠার হীনম্মন্যতা? রসিক নিসকেন্স বলছেন, “I don’t mind being the second greatest player in the world.”

’৭০ থেকে ’৭৩ অবধি ক্রুয়েফ-নিসকেন্স একসঙ্গে খেললেন আয়াক্সে, সেখানে থেকে মেন্টর রিনাস মিশেলস প্রিয় ছাত্রকে টেনে আনলেন বার্সেলোনায়। ’৭৪-এ বন্ধুর রাস্তায় নিসকেন্স নিজে। ’৭৫ পর্যন্ত বার্সার মিশেলস-ক্রুয়েফ-নিসকেন্স ট্রায়ো।

টোটাল ফুটবল। পাস, পাস এবং পাস। কোচ রিনাস মিশেলস আয়াক্সে ছিলেন ’৬৫ থেকেই। তার ঠিক আগের বছর পাশের পাড়ার ক্রুয়েফ এসেছিলেন ক্লাবে। বছর আঠারোর জোহানের সঙ্গে মেন্টর রিনাসের বোঝাপড়া, টোটাল ফুটবলের আক্ষরিক ভিত্তিপ্রস্তর ’৬৫ থেকেই। ’৭১ অবধি মিশেলস আয়াক্সে থাকলেন। আয়াক্স ছেড়ে ‘৭৫ পর্যন্ত বার্সায়। মাঝে বছরখানেকের জন্য আয়াক্সে গিয়ে আবার দু’-বছরের জন্য বার্সায় সাইন। ক্লাব ছেড়েও উত্তরসূরিদের ভিতর রেখে গিয়েছেন নিজস্ব ড্রিম-গেম, প্রেসিং ফুটবল, পাস, পাস এবং পাস। এবং পাশে দুই জোহান। সঙ্গে জাতীয় স্তরে মায়াবী ডাচ ফুটবল এবং অলৌকিক এক ছোটগল্পের মতো ১৯৭৪-এর বিশ্বকাপ। সব হয়েও হইল না শেষ…।

’৭৪ মানেই কি অপ্রাপ্তি? ট্রফিহীনতাই সবকিছু? সেই মুহূর্তগুলো? পাসগুলো? এক একটা করে ম্যাচ ধরে এগনো, ক্রমশ ওপরে ওঠা, দুই জোহানের একে অন্যকে হাতের তালুর মতো চেনা এবং পাশে গ্যারিঞ্চার মতো বাঁকা পায়ের ক্ষমতা নিয়ে ম্যাজিক দেখানো সেইসময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘মিডফিল্ড-জেনারেল’ উইম ভ্যান হ্যানাজেম, লেফট উইঙ্গার-ফরোয়ার্ড রব রেনসেনব্রিঙ্ক, রাইট উইঙ্গার জনি রেপের মতো মুখকে পাওয়া– এসব মূল্যহীন?
’৭৪-এর সেই একের পর এক ম্যাচ উত্তরণ। আন্তর্জাতিক ফুটবল মঞ্চে তেমন কোনও ঐতিহ্য না-থাকা হল্যান্ড প্রাক্-বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ৪ গোলে এবং নরওয়েকে ৯ গোলে হারাল, শেষ ম্যাচে হ্যাটট্রিক সেই নিসকেন্সের। ২৭ মার্চ ট্রফির প্রথম ম্যাচে নামল দু’বারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে। রেপের জোড়া গোলে ম্যাচ ২-০। পরের সুইডেন ম্যাচে হঠাৎ স্বভাববিরুদ্ধ হোঁচটকে ব্যতিক্রম ধরা যাতে পারে, কারণ তার পরের ম্যাচেই নিসকেন্সের জোড়া পেনাল্টিতে বুলগেরিয়াকে ৪-১-এ উড়িয়ে দেওয়া। অবশ্য সেই গোলশূন্য সুইডেন ম্যাচেই ঘনঘন সিগনেচার ক্রুয়েফ টার্ন দেখিয়ে বিশ্বকে স্তম্ভিত করা শুরু। দ্বিতীয় লিগে সেই একই ফর্মে এবার ক্রুয়েফের জোড়া গোল। ৪-০-এর ওদিকে আর্জেন্টিনা। ২-০-র পূর্ব জার্মানি ম্যাচে ৭ মিনিটে প্রথম গোল নিসকেন্সের। ঠিক পরেই ব্রাজিল ম্যাচ। ক্রুয়েফের নিজের কথায়, ‘truest example of total football’ ছিল ওই ২-০ ম্যাচ। ৫০ মিনিটে জালে ঢোকালেন নিসকেন্স, ১৫ মিনিট পরে দ্বিতীয় গোল ক্রুয়েফের। দুই জোহানের যৌথ স্কোরশিটে ’৭৪-এর সার্থকতম প্ল্যাটফর্ম সেই ব্রাজিল ম্যাচ। ক্রুয়েফের ১৪ নম্বর জার্সির সামান্য দূরত্বে যেন আঠার মতো জায়গা তৈরি করতে করতে এগিয়ে যাওয়া ১৩ নম্বরের নিসকেন্স। আশ্চর্য এটাই, নিসকেন্স কিন্তু পুরো ম্যাচ খেলতে পারলেন না। ব্রাজিল-অধিনায়ক ম্যারিনহো পেরেজের জঘন্য একটি পাঞ্চ, খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছাড়লেন নিসকেন্স। প্লট টুইস্ট এখানেই, এই ম্যারিনহোই ’৭৪-এ ক্রুয়েফ-নিসকেন্সের বার্সিলোনায় এলেন। সমস্ত তিক্ততা ভুলেই…।

ফাইনাল। যেখানে থেকে লেখার শুরু। অলিম্পিয়াস্টেডিয়নের ওই দু’-মিনিটের ডাচ উচ্ছ্বাস, মুগ্ধতা খেলার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে দিচ্ছে হেলমুট শোনের দল, জায়গা পাচ্ছেন বেকেনবাওয়ার-উলি হোনেস-ওভার্যাথরা। ক্রুয়েফকে ম্যান-মার্ক করে কার্যত নিস্প্রভ করে রাখলেন ‘দ্য টেরিয়ার’ বার্টি ভোগৎস। ২৫ মিনিটে পেনাল্টিতেই ১-১ করলেন পল ব্রেইটনার। ৪৩ মিনিটে মুলারের ২-১। ম্যাজিকাল ক্রুয়েফ-টার্ন, মিডফিল্ড লিডার ভ্যান হ্যানাজেম, টুর্নামেন্টে ৫ গোল করা নিসকেন্স, ৪ গোলে সঙ্গত দেওয়া জনি রেপ– কেউ পারলেন না ট্রফি আনতে। ফাইনালে ডাচ স্বপ্নহীনতার সেই শুরু। বছর চারেক পরের ফাইনাল বা দশকের পর দশক জুড়ে খেলার ধরন বহুগুণ বদলালেও সেই ট্র্যাজিক লেগ্যাসি চলছেই। এখনও…।

কিন্তু দুই জোহানের গল্প? মেন্টর মিশেলের সঙ্গে অবিশ্বাস্য বোঝাপড়া? ক্রুয়েফের দেশের হয়ে ৪৮ ম্যাচে ৩৩ গোল– গোটা কেরিয়ারে নিজে স্কোরশিটে থাকলে দেশকে কোনওদিন হারতে দেখেননি ক্রুয়েফ। পাশাপাশি দেশের হয়ে নিসকেন্সের ৪৯ ম্যাচে ১৭ গোলের পরিসংখ্যান। অবশ্য সেই হল্যান্ডকে তিনকাঠি দিয়ে মাপা যাবে না। সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড নামেই, আসলে গোটা মাঠ জুড়ে দাপটে খেলা ক্রুয়েফ, দীর্ঘ পায়ের ব্যবহার, আচমকা, অবিশ্বাস্য টার্ম, নেতৃত্ব, নিখুঁত প্রেসিশন– সতীর্থ ক্রুয়েফ এবং টোটাল ফুটবল প্রসঙ্গে আয়াক্স ডিফেন্ডার ব্যারি হুলশফ বলছেন, ‘the thing we discussed the whole time. Cruyff always talked about where to run and where to stand, and when not to move.’ এবং এই ফুটবলেই সোনালি চুলের নিসকেন্সের যোগ্য সঙ্গত।
প্রেসিং ফুটবল, বরফ-শীতল মাথা, জলপাই রঙের চোখে পাখির মতো দৃষ্টি, ট্যাকল, দৌড়, স্ট্যামিনা এবং শিল্প-সুষমার সঙ্গে প্রয়োজনে শারীরিক শক্তির ব্যবহার, নিসকেন্স প্রসঙ্গে আয়াক্সের সহকারী কোচ ববি হার্মসের সিগনেচার শব্দবন্ধ– ‘like a Kamikez pilot’। আয়াক্সে সতীর্থ জ্যাক স্টুয়ার্ট বলছেন, ‘He could play for two in midfield…’

এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, ’৭৪-এর আগে-পরে দুই জোহানের চিরকালীন বন্ধুত্ব। বার্সায় ডাকনাম– ‘জোহান সেগোন’ বা ‘জোহান দ্য সেকেন্ড’ শুনেও বিন্দুমাত্র কষ্ট না-পেয়ে নিজের খেলাটুকু খেলে ফিরে আসা নিসকেন্স বলছেন– ‘When I walk onto the field, i always want to the field and get the ball – I am not concerned abour myself.’
দেশে, ক্লাবে ক্রুয়েফের খেলার স্পেস তৈরি করার জন্য দরকার ছিল একটা নিসকেন্সের। ফুটবল-গ্রহে জুটির সিগনেচার টার্ম হয়ে গিয়েছিল ‘Yin and Yang’. বন্ধু ক্রুয়েফ সম্পর্কে বলছেন, ‘ও আমাকে খেলতে খেলতে বলত, জোহান, তুমি আরও ডিপে খেলো, বলত বল সামনে বেড়াও, এখানে ফাঁক তৈরি হচ্ছে, ভরাও জোহান, ভরাও’।

সেই জোহান দেশ, ক্লাব যেখানে গিয়েছেন বন্ধুকে পাশে চেয়েছেন, পেয়েছেন। ফাইনালে খালি হাতে ফিরেও দেশকে দিয়েছেন আশ্চর্য সুন্দর ফুটবল। দল ফেরার দিন আমস্টারডাম শিপল এয়ারপোর্টে লাখ লাখ মুখ, লেডস্টেপ্লিন স্কোয়ারে জনসমুদ্র। ট্রফি আসেনি তো কী!
’৭৭-এ জাতীয় দল থেকে সরে এসেছেন ক্রুয়েফ। বার্সা ছেড়ে লস অ্যাঞ্জেলস অ্যাজটেকে গিয়েছেন ’৭৮-এ, পরের বছর বন্ধু-বিহীন ক্লাব ছেড়ে আরেক মার্কিন ক্লাব নিউ ইয়র্ক কসমস গেছেন নিসকেন্সও। অ্যালকোহল, অসংযত জীবন, কোকেন, জুয়া– ফুটবল ক্রমশ সরে গিয়েছে নিসকেন্সের জীবন থেকে। এবং এর মাঝেই ’৭৮ আর সেই ‘৭৮ মানেই ফুটবল-স্বৈরতন্ত্র বিতর্ক। ক্রুয়েফের আচমকা জাতীয় দল ছাড়ার পেছনেও কি ডিক্টেটর আর্জেন্টিনায় যাওয়ার অনীহা? নিসকেন্সরা গেলেন, দ্বিতীয় জোহান খেললেন প্রিয় বন্ধু, প্রথম জোহানকে ছাড়া। কোচের সিটে মিশেলের উত্তরসূরি আর্নেস্ট হ্যাপেল। সেই এক, অলৌকিক প্রেসিং ফুটবল, অফসাইড ট্র্যাপ। আবার ফাইনাল। পুনরাবৃত্তি। নিসকেন্সরা তাও হেসেই বাড়ি ফিরেছেন, সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘Beauty was our legacy’। আর কিছু পাননি। পরে কোচিং কেরিয়ারে ক্রুয়েফ বার্সার ড্রিম টিমের হয়ে স্বপ্ন ছুঁয়েছেন, নিসকেন্স তখনও দ্বিতীয় সারিতেই।

৪৫ ছোঁয়া পিতার মারণ হৃদরোগের লেগ্যাসি ধরা ছেলে ক্রুয়েফও ৪৫ ছুঁয়েই আশ্চর্য সমাপতনে পেয়েছেন প্রায় মারণ একটি হার্ট অ্যাটাক। ফিরেছেন সেখান থেকেই। শেষমেশ ২০১৬-র ২৪ মার্চ ৬৯ ছুঁয়ে চেন-স্মোকার ক্রুয়েফ চলে গিয়েছেন অবধারিত লাং ক্যানসারে। বছর আটেক বাদে, ২০২৪-এর ৬ অক্টোবর আলজেরিয়ায় একটি কোচিং প্রোজেক্ট চলাকালীন আকস্মিক বুকে ব্যথায় চলে গিয়েছেন বছর ৭৩-এর নিসকেন্সও।
হল্যান্ড থেকে নেদারল্যান্ড হয়েছে দেশ। খেলা মিশেলস-হ্যাপেলদের প্রেসিং ফুটবল থেকে সরে বদলে গিয়েছে অনেকটাই। শুধু থেকে গিয়েছে, আশ্চর্য প্রতীয়মান হয়ে থেকে গিয়েছে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত কিংবদন্তি সাংবাদিক-লেখক জোনাথন উইলসনের সেই কথাগুলো– ‘Total football needed Cruyff, but it also needed Neeskens…’।
………….. পড়ুন জুটি কলামের অন্যান্য পর্ব ……………
পর্ব ৬: পেলে-গ্যারিঞ্চা, অপরাজেয় ইতিহাস
পর্ব ৫: চিরশত্রু থেকে শ্রেষ্ঠ জুটি
পর্ব ৪: বিতর্কিত, বর্ণময় আটাত্তরের আর্জেন্টিনার জোড়া ফলা
পর্ব ৩: পায়ে লেখা যৌথ-কবিতা
পর্ব ২: অমরত্বের জাল কাঁপানো এক চিরকালের বন্ধুত্ব
পর্ব ১: পাশে থাকা, পাসে থাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved