Robbar

অগ্রন্থিত শক্তির শক্তি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 9, 2026 3:01 pm
  • Updated:March 9, 2026 3:01 pm  

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে সবাইকে তাজ্জব করে দিয়ে হাজির হয়েছিলেন ‘অগ্রন্থিত’ এক ‘শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়’! কবিতা নয়, কবি স্বয়ং। কারণ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন তাঁর ‘আমি’র আর কোনও অস্তিত্ব নেই, বিবরণ নেই, সত্তাভেদ নেই, একমাত্র তাঁর কবিতা ছাড়া। তিনি নিজেই দীর্ঘ এক কবিতা। অগ্রন্থিত। কখন ওই খ‌্যাপা ঘোড়ার টানে ‘গ্রন্থ’ কথাটা থেকে সরে গিয়ে দেখা দিচ্ছে এক ‘গ্রন্থিহীন’ শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়। কোথা থেকে যে সে এল, কোথায় যে সে উন্মাদ ছুটেছে! কোনও চিহ্ন নেই। শুধু পিছন ফিরলেই চাবুক। নিজেকে সম্পূর্ণ করে বুঝতে নিজেকেই খেয়ে ফেলার বল্গাহীন মরণ ঝাঁপই তো তাঁর কবিতা। সারাজীবন অগ্রন্থিত কে আর বলতে পারে: ‘আপন বাড়িটি খুঁজছি পাই যদি। ছিলো তো বাপের।’

সুমন্ত মুখোপাধ্যায়

১৬.

ঘোড়াটা সম্পূর্ণ উন্মাদ। লাফিয়ে উঠেছে সবুজ এক শূন্যে। ওই মুহূর্তে, পায়ের তলায় জমি নেই। মাথার উপর আকাশ নেই। দিগন্তরেখাটিও গায়েব। কোনও দিকনির্দেশও নেই কোত্থাও! কোনদিকে যাবে ও? যাবে কি? নিজেরই ভেতর থেকে লাফ দিয়ে উঠে নিজেকেই যেন গ্রাস করবে। লেজের শিখাও যেন আগুন-ধরা। সেই আগুন খেতে চাইছে মাথা থেকে পা। পা থেকে মাথা। আত্মগ্রাসী উন্মাদনা। লাফ দিয়ে ওঠা এক মুহূর্ত। তার ঠিক ওপরেই সাদা হরফে লেখা: অগ্রন্থিত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়। না, কবিতা কথাটা নেই কোথাও। কারণ শক্তি চট্টোপাধ‌্যায় মানেই তো কবিতা। যেমন একেবারে গোড়ার দিকে লেখা তাঁর এই কবিতাটি:
আমি পথ ধরে হাঁটি
তুমি আসো তার পিছু পিছু
পরিষ্কার ছুরির মতো তোমার তেজের স্পর্শ পিঠে নাচে
কে কার পিছু নিয়েছে? কবিতাই কি? না, এক আততায়ী আমি!

এইখানেই অবাক হয়ে তাঁর পাঠক সেদিন দেখেছিল শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের নতুন এক পরিচয়। ‘অগ্রন্থিত’ কথাটার অর্থ সব্বার জানা, ‘যা বইতে নেই’। আগে কোনও বইয়ের পাতায় পাওয়া যাবে না এদের। কী পাওয়া যাবে না? কবিতা? গদ‌্য? উপন‌্যাস?– এইখানেই আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে সবাইকে তাজ্জব করে দিয়ে হাজির হয়েছিলেন ‘অগ্রন্থিত’ এক ‘শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়’! কবিতা নয়, কবি স্বয়ং। কারণ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন তাঁর ‘আমি’র আর কোনও অস্তিত্ব নেই, বিবরণ নেই, সত্তাভেদ নেই, একমাত্র তাঁর কবিতা ছাড়া। তিনি নিজেই দীর্ঘ এক কবিতা। অগ্রন্থিত। কখন ওই খ‌্যাপা ঘোড়ার টানে ‘গ্রন্থ’ কথাটা থেকে সরে গিয়ে দেখা দিচ্ছে এক ‘গ্রন্থিহীন’ শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়। কোথা থেকে যে সে এল, কোথায় যে সে উন্মাদ ছুটেছে! কোনও চিহ্ন নেই। শুধু পিছন ফিরলেই চাবুক। নিজেকে সম্পূর্ণ করে বুঝতে নিজেকেই খেয়ে ফেলার বল্গাহীন মরণ ঝাঁপই তো তাঁর কবিতা। সারাজীবন অগ্রন্থিত কে আর বলতে পারে: ‘আপন বাড়িটি খুঁজছি পাই যদি। ছিলো তো বাপের।’

প্রচ্ছদ: প্রকাশ কর্মকার

ওই কবিতাই তাঁর ঘরবাড়ি। উড়ে যাওয়া এই তুলোবীজ– কবিতা, আধার-আধেয় তফাত নেই কোনও। এইসব কথা যেন আবার নতুন করে বলতে হল তাঁকে। যে যাই বলুক, তাঁর কবিতা বইগুলো তিনি তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ নিজের নিয়মে, সারাজীবন। বিশাল এক সমুদ্র থেকে যেন এক-একটি সুরের বিভঙ্গে তিনি তুলে আনতেন কবিতা। তাই একই কবিতা অনেক সময় এসে পড়ত দু’-তিনটি বইয়ে। একে ‘অন‌্যমস্কতা’ সবসময় বলা যাবে না। একটিই কবিতার উপর নানাদিক থেকে আলো পড়তে পারে যদি তারা ভিন্ন সূত্রে সংকলিত হয়। একই সময়ে লেখা নানারকমের কবিতা তাই একই বইয়ে রাখতেন না শক্তি। কিন্তু ১৯৯০ সালে তাঁর নিজের কবিতা-ধারণার এক সম্পূর্ণ পরিচয় তিনি হাজির করলেন জীবনের প্রান্তসীমায়। এই পরিচয় তাঁকে আনতে হল, অভিমানে, যন্ত্রণায়। যার কারণ অনেকখানি তিনি নিজেই। ‘অগ্রন্থিত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়’– পড়বার আগে সেদিনের সেই পরিস্থিতিটা একটু মনে করা চাই।

১৯৮৭ সাল নাগাদ শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের কবিতার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ বইটির বিষাদ সেই ১৩-১৪ বছরেই আমাকে টান দিয়েছিল। তবে শুধু ওই লতাগুল্মে আঁকড়ে ধরা পা-ই নয়, আরও কারণ ছিল শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের দিকে যাওয়ার। ১৯৮৮ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়: শক্তি-সুনীল দোহার। সঙ্গে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ‌্যায়। পত্রিকার প্রচ্ছদেও ওঁদের ছবি আঁকা ছিল সাদা জমির উপর। বুঝি-না-বুঝি সেই সাক্ষাৎকার আমি পড়ে ফেলি। খুব যে জটিল কোনও কথা বলছিলেন তাঁরা, এমন নয়। শুধু ১৪ বছরের কিশোরের পক্ষে তার পরিপ্রেক্ষিতটা বোঝা সেদিন সম্ভব ছিল না। বোঝার উপায় ছিল না, আঘাতটা কোথায় কতখানি লাগতে পারে। শক্তি বলছেন, আজকাল যারা কবিতা লেখে, তারা ছন্দ জানে না। অবজ্ঞা ভরে বলছেন, তাঁদের এড়াতে অনেকে গদ্যে আশ্রয় নিল। কোনও কাজ করতে পারে না, তাই হয়তো লেখে। আর তিনি ‘কবি’ যদি না-হয়েও থাকেন ‘কারিগর’ তো হয়েছেন, সায় দিচ্ছেন বন্ধু, সুনীল। কখনও বা মনে করিয়ে দিচ্ছেন দু’-তিনজনের নাম, যারা সত্যিকারের কবি। বাংলা কবিতা সম্বন্ধে ধারণাহীন এক কিশোর জানতে পারছে নতুন জগতের কথা– কবিতার জগৎ। জানছে– কে কবি, কে কবি নয়, কাকে বলে ‘কবিত্ব’ আর কাকেই বা বলে অকবিতা। সম্পূর্ণ পরিপ্রেক্ষিতহীন সেই জানা এখনও আমার মনে আছে। মনে আছে, আমার ছোটবেলার একমাত্র লম্বা বন্ধু ভাস্কর চক্রবর্তীর ব‌্যথিত মুখ, আমারই প্রশ্নের উত্তরে। মনে আছে কী আক্রমণাত্মক সেই ভঙ্গি! আর কত সাবধানে সমস্ত বিষটাই প্রায় তুলে দেওয়া হল শক্তির গলায়। শক্তি চূড়ান্ত অন‌্যায় করেছিলেন। কবিতা লেখার রাজনীতি আর একান্ত লুকিয়ে থাকা যে দলমতের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, সেদিন তার সঙ্গে ওই ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’-র কোনও মিল ছিল না। আজ যদি দেখি, সেই আটের দশকে লেখা তাঁর বইগুলো ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’, ‘কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছে’, ‘কক্সবাজারে সন্ধ‌্যা’, ‘ও চিরপ্রণম‌্য অগ্নি’ কিংবা ‘বিষের মধ্যে সমস্ত শোক’– একফোঁটা বিষও কি খুঁজে পাওয়া যাবে? শুধু শ্রান্তি, বিষাদ আর জেগে ওঠার ঐকান্তিক ইচ্ছেটুকুই দেখতে পাব আমরা। নিজের অজান্তেই যে এক ধারাবাহিত শেষের কথা বলছেন তিনি। যেভাবে সকলে বলে, যে ধারাবাহিক তাঁর মনঃপূত নয়। আর এতদিন পরে এ-ও বুঝতে পারি শেষ ১০-১২ বছর তাঁর লেখা কবি মহলেও মনের জিনিস ছিল না। ছিল নিজের লেখারই পুনর্লিখিত অভ‌্যাসের অভিযোগ। শুধু তাই? তিনি নিজেই লিখছেন:
‘জীবন যাপনে কিছু ঢিলে ঢালা ভাব এসে গেছে।
চেতনার ক্ষিপ্র কাজ এখন তেমন ক্ষিপ্র নয়।’
কখনও বা:
‘কবি হয়ে দাঁড়াবার আর কোনও সাধ নেই মনে।
শেষ হয়ে গেছে লোকটা, এও শুনে লাগে না আঁচড়
গায়ে, সব শুনে শুই পাশ ফিরে সম্ভ্রান্ত বিশ্রামে।’

নিজের ভেতর যেমন, তেমনই ‘পরিপার্শ্ব চাপ তৈরি করে’। হয়তো বা সেই চাপ থেকেই শক্তি ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন তাঁরই ‘সন্তান প্রতিম সহোদর’দের প্রতি। ১৯৮৭ সালে ২৫ অক্টোবর তিনি লিখেছিলেন: ‘প্রতিটি আঘাত থেকে আঘাতের বাহিরে দাঁড়ালে/লাগে না আমার ভাল। অনেকে তো বলেছে দুষমন!/ পদ‌্য লেখে? কিংবা পদ‌্য ফিরি করে দরজায় দরজায়’, যারা বলছে, তাদের তো তিনি বলতেই পারেন, ‘কিছুতে একটি পঙক্তি সাজাতে পারলে না।’ ‘সিঁথিপথ বেয়ে আমি যেতে পারি, তোমরা পারবে না’ আর শেষ পর্যন্ত: ‘কীভাবে কী লিখে তুমি উঠে এলে জানলার ওপাশে/নখরে ঠোক্কর দেবো, খসে যাবে, বাঁচাতে পারবো না।’

সেই নখরের ঠোক্কর হয়ে এসেছিল ওই সাক্ষাৎকার আর ছোট্ট গদ‌্য ‘এত কবি কেন’। তাঁর অনুজ কবিরা একেবারে লিখিতভাবে প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন তারপর। যাঁরা একদিন তাঁরই কবিতায় মুগ্ধ, তাঁরাই লিখলেন শক্তি, দীর্ঘদিন নিঃশেষিত প্রায়, অথচ আত্মতুষ্টির কারণে অনুসন্ধিৎসাহীন। তিনি ‘কবি পরিচয় পাচ্ছেন বলেই বাকিদের সাহস হয়েছে।’ ‘আর কী আত্মসন্তোষ! কী আত্মম্ভরিতা! কী তরুণ নিন্দা! কী লেখেন তারা এখন? পাতায় পাতায়? কাগজে?’। এইরকম অজস্র ছোট কাগজে যিনি হয়ে উঠলেন আক্রমণের লক্ষ‌্য। তাঁকেই একদিন বলা হত ‘লিটল ম‌্যাগাজিনের রাজা’! তাঁর ছন্দ ব‌্যবহার, শব্দ বিন‌্যাস, গদ‌্য আর যত যা আয়ূধ সবই সেদিন পড়ে গেল সমালোচনার মুখে। শক্তি যথার্থ দাঁড়িয়ে রইলেন নিজেরই কারণে ‘অস্ত্রের গৌরবহীন একা’, লিখলেন ‘মুখে তার কালি পড়ে গেছে’। তাঁর নতুন বইগুলো সেদিনের তরুণদের হাত থেকে দূরে পড়ে রইল। তাঁর আর্তস্বর পৌঁছল না কোথাও:
ডান হাতে বাঁ হাতে ক্ষত, বাহুর পেনসিল লিখে চলে
যতদূর লিখতে চাই, বাংলা ভাষা যেন কথা বলে।

এইরকম একটা পরিবেশেই, এর এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ‘অগ্রন্থিত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়’। যে-বই আমার মতো সদ‌্য কবিতা পড়তে আসা অনেকের কাছে হয়ে এসেছিল শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের নতুন কবিতাবই। যে নতুন কখনও তাঁর প্রতি ধেয়ে আসা অভিযোগগুলির প্রতি বারবার সপ্রশ্ন তাকাতে বলে। বারবার প্রশ্ন করতে শেখায় সম্পূর্ণতাকে।

কবির অভিভাবকত্বে বন্ধু সমীর সেনগুপ্ত সাজিয়েছিলেন বইটি। সম্পাদনার ইতিহাসেও এরকম বাংলা কবিতাবই খুব বেশি পাওয়া যাবে না। গভীর মনোযোগে কবিতা সম্পাদনার একটা মানদণ্ডই প্রায় তৈরি করেছিলেন সমীর সেনগুপ্ত। তবু তাঁর সম্পাদকীয় অভিপ্রায়টুকুই সেখানে বড় হয়ে ওঠেনি। তিনি চেয়েছিলেন এক ধারাবাহিক শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের ইতিহাস তৈরি করতে। আর কবিতা বারবার ভেঙে দিয়েছে নিরবচ্ছিন্নের ধারণা। এই গ্রন্থ বস্তুত কবির যথার্থ অপরাহ্নের উপহার। এক উত্তর, আমরা বুঝতে পারব কবিতাকে কীভাবে বুঝতেন শক্তি। সন্দেহ হবে, তিনি কি অর্জুনের মতো তাঁর শেষ জীবনে ভুলে গিয়েছিলেন অস্ত্র আবাহন, না কি ভুলেছিলেন তাঁর নিজেরই কবি-প্রতিভার সত্যিকারের চেহারা। যা শুধু ছন্দ, শব্দ, আর টেকনিক কুশলতা নয়। অথবা ভোলেননি কিছুই। শুধু ‘ভক্তের পায়ের স্পর্শে ধর্মের সোপানগুলি’ কিছুটা কেঁপে উঠেছিল, ‘কবিত্ব অসুখে ভুগে’ ধর্ম থেকে সরে এসেছিলেন একটু। এই স্বধর্ম ছাড়ার যন্ত্রণা শেষ জীবনের লেখায় ছড়িয়ে আছে, আর একইসঙ্গে আছে সেই ধর্মের দিকে তীব্র টান। সর্বাঙ্গ রঙিন সব পথের টান। যার কোনও আদি-অন্ত বর্ণনা হয় না।

কবিতা নানারকম শুধু নয়, সত্যিকারের কবিরাও নানারকম। তাদের মগ্নতা, লেখার ধরন, সাড়া দেওয়া আর নীরবতার কোনও একটাই নিয়ম হয় না। একটাই কোনও এস্থেটিকস দিয়ে পড়া যায় না তাঁদের বইগুলো– শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়, আর শঙ্খ ঘোষের কবিতা-প্রতিভা একটাই নন্দনতত্ত্বের ভেতর থেকে উঠে আসে না। অথচ আমরা সেইভাবেই দেখতে চাই। শব্দ ব‌্যবহার, ছন্দ কুশলতা, রাজনীতি, সমসময়, ইতিহাস আর নানারকম টেকনিকের ক্রমপরিণতির সূত্রে আমরা পড়তে চাই কবিতা। কবিতা নানারকম বলেও একইরকম অভ‌্যাসে আমরা পড়ি নানাজনের কবিতা। কিন্তু যখন অনেক দিন পার হয়ে যায়, জল সরে যায় যখন– এই পড়াটাই হয়ে দাঁড়ায় হাস‌্যকর, তখন এক এক পদচিহ্নে ডাক দিতে পারেন এক-একজন কবি। পরম্পরা মেনে অথবা কেউ হতে পারেন সর্বতঃ পারম্পর্যহীন। তাঁদের প্রতিভার সামনে মুগ্ধ দাঁড়িয়ে পড়ি আমরা।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

এই অগ্রন্থিত চেহারায় শক্তি চট্টোপাধ‌্যায় তাঁর সম্বন্ধে প্রচলিত যারতীয় ধারণাকে একটা চ‌্যালেঞ্জের মুখোমুখি যেমন দাঁড় করিয়েছিলেন, তেমনই এমন জল্পনারও জন্ম হয়েছিল যে ওই ১৯৮০-’৮১ পর্যন্তই তিনি ছিলেন সমহিমায়। কিন্তু কোথাও কি এই প্রশ্ন উঠল যে, কেমন ছিল তাঁর প্রতিভা? কেমন ছিল তাঁর ভূতে-পাওয়া মুহূর্তগুলো। সেই প্রশ্নে পৌঁছনোর আগে একটু দেখা যাক, কীভাবে নিজেরই মূর্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন শক্তি। কীভাবে ভেঙেছিলেন নিজেরই সুভাষিত রত্নকোষ!

মৃত্যুর আগে ‘অগ্রন্থিত’-ই তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ‌্য নতুন কবিতাবই। আর মাত্র দু’টি বই তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাদের সুর বিষাদের। কিন্তু যদি ফিরে যাই ‘অগ্রন্থিত’-র পাতায়, তাহলে দেখতে পাব অন্তত একশোখানা পথ নিজের কবিতায় মেলে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন শক্তি। সেই সব রাস্তায় একটু ঘুরলেই আমরা দেখি:
‘ব‌্যাপারটা হল মাঝে মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার ইচ্ছেটা মরেনি আর কী। ইচ্ছেটা কখন ইতিহাসের মতো শরীরের ভাঙা অভাঙা প্রত্নের সঙ্গে জড়িয়েছে আপনাকে।’
শরীরের ভাঙা-অভাঙা আর প্রত্নে একইসঙ্গে এখানে ভেসে আসে নিজেরই নানা টুকরো। অনেকটা ছেঁড়া টুকরো আত্মপরিচয়ের মতো। অনেক বৈপরীত‌্য নিয়েও তারা একটাই শরীরের অংশ। যেমন:
নদীর ভিতরে ডুবে আছে শান্ত বাইশটি পুকুর
বাইশ বছর ধরে আমি এই সব দেখিয়াছি
মেয়ে দেখিয়াছি খুব। মেয়েদের বাবাদেরও দেখিয়াছি;
পার্থক‌্য যথেষ্ট।

শান্ত পুকুর আর নদীর ছবি যে ওই মর্মান্তিক মশকরায় পৌঁছবে, কে জানত। ১৯৬২ সালের কবিতায় একটিমাত্র বছরে শক্তি যা লিখেছিলেন, ছাপা বইয়ের বাইরে তার তুলনা বাংলা কবিতায় আর নেই। ওঁর প্রিয় সনেটের আঁটসাঁট গড়নের পাশাপাশি পাচ্ছি একেবারে হালকা চালে:
‘বাড়ি যেতে হয়।/ময়লা পুরনো হাতা গুটিয়ে নে/থাবা পেট পোঁদ
তোর মুটিয়ে নে/নিদেন চারটি বিড়ি জুটিয়ে নে/ চ’ বাড়ি চলিরে ভাই, চলি,’
ঝাঁপিয়ে আসে এইরকম অজস্র লাইন:
‘স্টেশনে সবজির ট্রেন রাখে তার চাকা চাকা পা’
কিংবা:
‘সাজায় কাচের চুড়ি, নস্যি সজনে ডাঁটা আর সরা
সবাই সংসারে ফেরে লোকটারই হয় না ঘর করা।’
অথবা সেই ভালোবাসার স্বর:
ভুলে গেলাম তোমার নাম ভুলে গেলাম কুড়িয়েছিলাম কবে
শহরে কটি শত্রু গাছে ফুল ধরেছে তোমার মনে হবে।

স্কেচ: প্রকাশ কর্মকার

এই সময়েই তো তাঁর মনে হবে– ‘মুঠোর মধ্যে সকাল হচ্ছে সন্ধ‌্যা হচ্ছে’। শব্দ নিয়ে, ছবি নিয়ে, যে-পথেই যাচ্ছেন শক্তি খুলে যাচ্ছে দুয়ার। ‘মুখ‌্যমন্ত্রীর প্রতি, সীমান্ত প্রস্তাব’-এ তিনি বে-বলগা বলে ফেলছেন: ‘কবিতা ভাতের মতো কেন লোকে নিতেই পারছে না।’ বলছেন: ‘ঈগলের অতিক্রূর পাখার ভিতরে আমি দেখেছি স্বদেশ।’ ভৌতিক এক আবহে বাটা কোম্পানির আলোর তলা থেকে শুরু হয়ে যাচ্ছে কবিতা, যেখানে: ‘মারাত্মক হয়ে গেছে কল্পনা ও কপালের ভার/আপন কপালখানি হয়ে গেছে আপনাবিরোধী।…’ ‘পৃথিবীর শেষ দিনে’ দীর্ঘ কবিতার মতো ওই রকম আশ্চর্য পরীক্ষার কথা যদি ভাবি, শেষ অংশে হাঁ করে দাঁড়িয়ে পড়া ছাড়া কোনও গতি থাকে না আর:
‘এ‌্যালেন তোমার ফোন ৺২৪২৪৯০ কিংবা বদলে যাবে?
দীপেনের সঙ্গে দেখা হলো না তো? ৺দীপেন
হয়তো ওখানে গিয়ে লিখে যাবে পৃথিবীর ধ্বংসের সংস্কৃতি!
৺শীলাকেও কিছু চিঠি লেখা যাবে পাবো সমীরের দেখা
বোম্বেতে সকলে থাকবো বছরে তিনমাস শুয়ে বসে
অর্থচিন্তা শূন‌্যভাবে বের করবো ওঁ কৃত্তিবাস
ওঁ শান্তি কৃত্তিবাস ওঁ হাংরি জেনারেশন ওঁ বিশ্বসাহিত্যের
ওঁ একা এবং কয়েকজন ওঁ বিজনের রক্তমাংস
ওঁ হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য ওঁ ঝর্নার পাশে শুয়ে আছি
ওঁ কুয়োতলা ওঁ ক‌্যাড্ডিকা ওঁ সোনার হরিণ
ওঁ আশুর স্কুটার ওঁ ক্রীতদাস ক্রীতদাসী ওঁ অন্তর্জলি যাত্রা…’

এই বই হাতে নিলেই যে-কোনও পাতা থেকে উঠে আসবে এমন সব কবিতা, যা সর্বক্ষণই পড়ে শোনাতে ইচ্ছে করবে। সেই লোভ থেকে সরে এসে আপাতত কিছু প্রশ্নে মন দিই। বাইরে থেকে নয়, শক্তি নিজেই কি তাঁর চারপাশে বানিয়ে তুলেছিলেন ‘কবি’র বিশেষ সব ভঙ্গি, যে ভঙ্গিতে, গল্পে তাঁর চারপাশের জগৎ দেখতে চায় তাঁকে? আর সেই মূর্তির সঙ্গেই কি তাঁর নিজের মূল লড়াই? অগ্রন্থিত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায় সেইসব মূর্তি প্রতিমাকে সরিয়ে, অনেকদিন পর আবার সামনে এনেছিল অজস্র পথে সঞ্চারমান এক রাধেশ‌্যাম যাত্রীকে। এক আবির্ভাবই বলা যায় একে।

এই বইটিকে তাই আমি কোনও অগোছালো মানুষের সুসম্পাদিত ধারাবাহিক ইতিহাস হিসেবে পড়ি না। বস্তুত তাঁর মতো প্রতিভার ক্ষেত্রে ওই ক্রমিক এক অন্তঃশায়ী ‘আমি’র বিবরণ খুঁজতে চাওয়া মস্ত বড় ভুল। একই সামান‌্য তাঁর কবিতায় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন, যে তাঁর কবিতার ভেতরকার অনুভবী শরীরটিকে শুধুমাত্র অপত‌্য স্নেহ, গৃহটান কিংবা যৌন অনুভূতি দিয়ে বোঝা যায় না সবটা। সেই চর্চার পাশাপাশি এও খেয়াল রাখা দরকার তিনি তাঁর সমস্ত শরীর মনে যে কোনও অনুভব দিব‌্যদর্শনে এক মুহূর্তে বুঝেছেন! যেমন লিখছেন: সবার বয়স বাড়ে আমার বালক বয়স বাড়ে না কেন’, তেমনই মাত্র তিরিশেই লিখতে পারেন: ‘বোধহয় জীবনের অপরাহ্ন কালের বাতাস/লেগেছে মেধায়/কাছের পুকুর থেকে/ চল্লিশ পঙক্তির রাজহাঁস/শূন্যে যেতে চায়।’ আবার ১৯৯০-এর নভেম্বরে লেখেন: ‘‘শীতের জাতক আমি দু’হাতে শূন‌্যতা।’’ একে রিপিটেশন বলা অন‌্যায়। কারণ একজন কবির কবিতাকে কোনও ধারাবাহিকে রেখে দেখা যায় তখন, যদি তাঁর প্রতিভা কোনও ক্রমপরিণতিকে সমর্থন করে। যেমন রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ অথবা টি.এস.এলিয়ট। কিন্তু র‌্যাঁবোর ক্ষেত্রে এই বিচার কি ঠিক হবে? শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের সত্যিকারের জীবন যদি তাঁর কবিতাই হয় তাহলে এই অগ্রন্থিত কবিতাটি আমাদের সাহায‌্য করবে খানিকটা: “একটি কবিতা যেন মারা গেছে অর্থাৎ ক্রমিকে/সাজানো হয়নি তাকে/ফেলে আসা পার্থিব যেমন/ গাছ যায় মুন্ডে মাটি, শিকড় হয়েছে ঊর্ধ্ব বাহু/ তেমনি, কবিতা যেমন মারা গেছে অর্থাৎ শুরুর সাধ‌্য মোটে পারেনি গোছাতে শেষ/… সত্যি শেষ আছে কবিতার?/ সবারই আগের জ্ঞান গড়িমসি বদলে বদলে যায়/ শুধু কবিতার মৃত্যু দেখে কবি আরেক বিমূঢ়/ শব্দের প্রকাণ্ড তাল নিয়ে বসে, কাটাকুটি খেলে/…”

এই খেলার ভিতর কিন্তু একটা নিঃসময়ের আভাস আছে। আছে ঐশ্বরিক সৃষ্টি মুহূর্তের পুরাণ লেশ। তাঁর প্রতিভার চরিত্র এইরকমই। ‘এই শহরের রাখাল’ প্রবন্ধে কবি শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন গঙ্গা অবতরণের গল্পের সঙ্গে কীভাবে যেন মিলে যেতে চায় শক্তির কবিতার প্রকৃতি। অব‌্যর্থ মন্তব‌্য। আর ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে যদি পৌঁছে যান কেউ, মহাদেবের জটার জটিল আবর্তে, সেই প্রত্নস্মৃতি বিদুৎ-চমকে বুঝিয়ে দেবে তাঁর প্রতিভা ছিল ধ‌্যানীর। এক ত্রিকালজ্ঞের প্রতিভা। অনেকটা বজ্রের মতো চৈতন্যে-অবচেতনে হানা দিত তাঁর নন্দন। গাঢ় অন্ধকারে যেমন বৈদ্যুতিক স্পর্শে এক মুহূর্তের জন‌্য জেগে ওঠে জগৎ, যেমন মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফেলে মানুষ দেখতে পায় এক অলৌকিক বিন‌্যাস। শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের প্রতিভা তেমন মহামুহূর্তের। বারবার মৃত্যুলগ্ন জীবনটান। এক ফিয়ারফুল সিমেট্রির নন্দন। তার কোনও ধারাবাহিক বহিঃইতিহাস হতে পারে, অন্তবর্ণনা হয় না।

শক্তি তাঁর প্রতিভার ধরনটা জানতেন। সেই খ্যাপা প্রত্ন-প্রতিভার প্রতি তিনি অবিচার করেছিলেন। সকলের চেয়ে বড় এক অহংকারে একাকী তিনি হতে পেরেছিলেন, কিন্তু ওই ‘একাকী’র ভেতর ‘সকল’কে এড়াতে পারেননি সবসময়। কবিখ‌্যাতি, যশ, নিজেকে নিয়ে তৈরি হওয়া মিথ থেকে যদি তিনি সরে আসতেন তাঁর প্রিয় শিল্পী রামকিংকরের মতো, তাহলে হয়তো বাইরের দিক থেকে আসা স্তুতি-নিন্দা তাঁকে স্পর্শ করতে না। ১৯৬৪ সালে লিখেছিলেন:
‘উপুড় হয়ে আছি যেন প্রণাম আসবে ভেতর থেকে
কলসি থেকে জলের মতন, উদর থেকে যেন বা স্রাব
গভীর গোপন সারেঙ্গী নয় একরোখা সে নবীন রবাব
উপুড় হয়ে থমকে আছি পূজার জলে প্রশ্ন ঢেকে
সত‌্যমিথ‌্যা বেড়ার গায়ে আলোকলতা বুনেছে জাল
খেতে আমার সর্বনাশা শস‌্য উঠলে শিশির মেখে
জাতক যতই দীর্ঘজীবী সঙ্গে আছে পোড়াকপাল
উপুড় হয়ে আছি যেন প্রণাম আসবে ভেতর থেকে’

নিমাই ঘোষের ক্যামেরায় রামকিঙ্কর বেজ

দীর্ঘজীবন তাঁর কাঙ্ক্ষিত ছিল না, তাই সহজেই লিখতে পারতেন ‘অধিক বৎসর বেঁচে লাভ’, লিখতে পারতেন ‘আমি কবরের মধ্যে দিয়ে গান গাইতে গাইতে চলে যাব’। এই শেষ কিন্তু যে কোনও মুহূর্তের অবসানেই আসতে পারে। তাঁর ভেতর থেকে যে শরীর জেগে উঠতে– অন্ধকার এক স্রোতের ভেতর থেকে, সেইটেই তার জীবন। আর যখনই সেই উৎসাহ হারিয়ে যেত, মৃত্যুবোধ তৎক্ষণাৎ। ওঁর শেষ বই ‘জঙ্গল বিষাদে আছে’ অনেকগুলো কবিতায় ধরে রেখেছে কবিতা ছেড়ে যাওয়ার বিষাদ, কিন্তু একে অন‌্য কোনও কবিদের মতো নিরবচ্ছিন্নতার নিয়মে পড়তে গেলে, পরিণতি দিয়ে পড়তে গেলে ভুল হবে। কেন না ১৯৯৪ সালেই তিনি লিখছেন:
‘শব্দ নিয়ে খেলা আমি করেছি একদা
তাই আজ ছেড়ে চলে গেছে–’

শক্তি লিখেছিলেন এই অগ্রন্থিত কবিতায় ‘তোমার কথা স্তব্ধ হলেই ফোটে’ কারণ ‘পূর্ণতা নয়, পূর্ণতা কি পাবার’। এই পূর্ণতা, ধারাবাহিক শক্তির প্রতি মূলত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের কবিতার প্রতি যে পরিপাটি ধারণা তৈরি হয়েছিল, এমনকী, কবির নিজের কাছেও তাঁর অজান্তে– সেই সবকিছুর প্রতি ‘অগ্রন্থিত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়’ ছিল এক নৈরাজ্যের আঘাত। এক নতুন আত্ম-আবিষ্কার হয়তো বা। ‘সমস্ত বিষ নিজের ভিতর নিতে পারার’ শক্তি আর নীল পথ, কালো পথ, সবুজ, হলুদ সর্বাঙ্গ রঙিন পথগুলিতে ‘সিঁথি পথে’ চলতে পারার শক্তি এক হয়ে দেখা দিন এই বইটিতে। রিল্‌কের দুইনো এলিজি অনুবাদ করেছিলেন শক্তি। সবাই জানেন রিল্‌কে তাঁর প্রিয়তম কবি, অনুবাদে ৬ নং এলিজির এক টীকা লিখেছিলেন শক্তি:

জীবনকে …. প্রয়োজন। কবিতাটিতে রিল্‌কে লিখেছিলেন ডুমুর গাছের কথা। যে-গাছ টেনে নেয় এই পৃথিবীর সমস্ত রূপ-রস। শরীরে ঝর্নার মতো প্রবাহিত করে একদিন। প্রকাশ করে সম্পূর্ণ এক ফল। তার ফুলের প্রহর নেই, পুষ্পিত ইমেজ, নেই কুসুমের মাস নেই। ফুল থেকে ফলে পৌঁছনোর কোনও ধারাবাহিকতা নেই। তার প্রকাশ সম্পূর্ণ। জন্ম-মৃত্যুর অখণ্ড প্রকাশ।

শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের কবিতা ওই ছয় নং এলিজির সূত্র ধরে পড়লে হয়তো নতুন এক আর্ত কবিত্বের কাছে আমাদের পৌঁছে দেবে। যা প্রতিটি সম্পূর্ণ মুহূর্তে এক-একটি কবিতা সূত্রে কবি-চৈতন‌্যকে নির্দেশ করে। তাঁর অনুবাদ বইটিতে আশ্চর্যজনভাবে ওই ছয় নং এলেজির জায়গায় ছাপা হয়েছিল অস্থির প্রথম বলেছি: ‘কে, যদি আমি চেঁচিয়ে উঠি, দেবদূত-অনুশাসনের মধ্যে আমার কথা শুনবে?’ ভয়ঙ্কর দেবদূত আর ভয়ঙ্করের সঙ্গে সৌন্দর্য মিলিয়ে নিয়ে শক্তিকে পড়েছি আমরা।

কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ষষ্ঠ এলেজিটি ছড়িয়ে আছে তাঁর সমস্ত কবিতাবইয়ের অন্তর্দেশে। ভালোবাসা দিয়ে লুকনো। ভালোবাসার কথা যদিও বলা হল না আজ, ওঁর কবিতা সামনে রেখে সেই মহাভারত আমরা নিজেদের মনে শুরু করি।

‘জীবনকে পরিস্ফুটিত করা ঠিক সময়টিতে, অর্থই হল তার ফল অর্থাৎ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়া, ঠিক বিপরীত অর্থে নয়, কতকটা যেন বা জীবনের, অন্যদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটি মাত্র। এই কবিতার নায়ক অথচ শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য ব্যস্ত নয়, বরং সে স্থায়িত্বের কথা চিন্তা করে, যে স্থায়িত্বের সঙ্গে স্থান কালের, সময়ের কোন সম্বন্ধ নেই। জীবনের পরিস্ফুট অবস্থা সঠিক মৃত্যু কবির কাছে এটি সন্তর্পণ গোপন রহস‌্য। মানুষের অন্য সমস্ত রহস‌্য যেখানে ইতিমধ্যেই নির্মমভাবে উন্মোচিত, যখন আর কোন লুকোন বিস্ময় নেই তাই অখণ্ডতার প্রয়োজন উপলব্ধির জন্য জীবনের সেই মহান পরিস্ফুট, পরিণতিতে প্রবেশ করার প্রয়োজন।’

‘স্বভাবতই আমি খুব অগোছালো। এমনকী পদ‌্যও, যথাযথ, গুছিয়ে রাখতে পারিনি। বেশ কিছু খাতাপত্র তো ট‌্যাক্সিতে হারিয়েছে। বাড়িতে যা ছিল তা এককাট্টা করে মীনাক্ষী রেখে দিয়েছিল। সেই পাণ্ডুলিপির অধিকাংশ কোনও পত্র-পত্রিকাতে ছাপাই হয়নি, গ্রন্থে সন্নিবেশিত হওয়া তো আরও বড় কথা।’ এইরকম এক স্বীকারোক্তি নিয়ে ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে হাজির হয়েছিল ‘অগ্রন্থিত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়’। বইমেলায়, কবির প্রিয় বন্ধু শ্রী সমীর সেনগুপ্ত-র সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল সম্পূর্ণ নতুন এই কবিতাবই, কারণ ‘কবিতাসমূহ অন‌্য কোনও কাব‌্যগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত নয়, এবং এর বেশিরভাগ কবিতাই কোনও পত্রিকাতেও ইতোপূর্বে প্রকাশিত হয়নি।’ এই ‘সম্পূর্ণ নতুন’ বইটি প্রকাশ করেন ‘প্রতিক্ষণ’ প্রকাশনার তরফে শ্রী প্রিয়ব্রত দেব। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ, শিল্পী প্রকাশ কর্মকার। দাম ৬০ টাকা। রচনাকাল: ১৯৫৫-১৯৮২। ২৭ বছর।

প্রচ্ছদে কচিকলাপাতা রঙের ওপর কালো জলরঙে আঁকা এক আত্মভূক অশ্ব আর পেছনের মলাটে কবির এক উদ্দীপ্ত প্রতিকৃতি বইটির ভেতরের খবর ইশারায় আনতে পেরেছিল। আকার ছিল সাধারণ কবিতাবইয়ের থেকে অনেকখানি ভিন্ন। স্বয়ং কবির ‘পদ‌্য লেখকের নিবেদন’ ছাড়াও ‘অগ্রন্থিত শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়’-এর দু’টি কথামুখ লিখেছিলেন সম্পাদক। একটি সম্পাদনা বিষয়ে, অন‌্যটি ভূমিকা। দু’হাজার সালের জানুয়ারি মাসে এই গ্রন্থ শক্তি চট্টোপাধ‌্যায় ‘পদ‌্যসমগ্র’-র শেষ খণ্ডে সংযোজিত হয়। পদ‌্যসমগ্রে এই গ্রন্থের এক দীর্ঘ পরিচয় লেখেন সম্পাদক কবি-পত্নী মীনাক্ষী চট্টোপাধ‌্যায়। বইটির আর কোনও সংস্করণ হয়নি।

কবি শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের সমগ্র লেখায় অত‌্যন্ত মূল‌্যবান এই বইয়ের তেমন উল্লেখযোগ‌্য কোনও সমালোচনা চোখে পড়ে না।

এক, দুই, আড়াই-এর অন্যান্য পর্ব …

১৫. ঋতুপর্ণ, অন্তরমহল আর রবীন্দ্রনাথ

১৪. জয় এখন শেষজীবনের বুদ্ধদেব বসুর মতোই প্রশ্নাতুর

১৩. নকশাল পর্বের হত্যা-প্রতিহত্যার পরিবেশে কলকাতায় এসেছিল মারি ফারার

১২. এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়

১১. গুরুদত্ত চেয়েছিলেন, বিজয়ের চলে যাওয়া দিয়ে শেষ হবে ‘পিয়াসা’

১০. কবির বিশ্রাম

৯. গত ২০ বছরে নস্টালজিয়ার এত বাড়বাড়ন্ত কেন?

৮. কলকাতার মূর্তি-আবর্জনা কি বাড়ছে?

৭. ভাবা প্র্যাকটিস করা, কঠিন এখন

৬. লেখার অত্যাচার, লেখার বাঁচা-মরা

৫. বিশ্বকর্মা পুজোর সন্ধেবেলাটার মতো বিষাদ আর হয় না

৪. কথা শেষ হতে পারে, ‘শেষ কথা’ বলে কিছু হয় না

৩. দেখা হলে বলে দিও, আজও বেঁচে আছি

২. ফুলের রং শেষ পর্যন্ত মিশে যায় নন্দিনীর বুকের রক্তের ইমেজে

১. আমাদের বিস্মৃতিশক্তির কথা বলে গিয়েছেন ভাস্কর চক্রবর্তী