
কেউ আঁকেন মায়ের নাম, কেউ প্রিয় কবিতার পঙ্ক্তি, কেউ আবার নিজের ক্ষত ঢাকতে আঁকেন অর্থহীন নকশা। এ কি সংস্কৃতি, না কি পণ্য? যখন এই শিল্প হয়ে ওঠে ভাবনার বাহক, তখন তা সংস্কৃতি। কিন্তু যখন তা কেবল নকল, কেবল চমক, কেবল ‘ভাইরাল’ হওয়ার হাতিয়ার, তখন তা অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। একই নকশা হাজার শরীরে, একই অর্থহীন চিহ্ন। যেন শিল্পের ক্লোনিং।
২১.
আমার প্রিয় একজন আমেরিকান শিল্পী, নরম্যান রকওয়েল-এর একটি ছবির বর্ণনা দিয়ে এবারের পর্ব শুরু করব। ছবিটির নাম ‘দ্য ট্যাটুয়িস্ট’ মানে ‘উলকি শিল্পী’। রকওয়েল প্রায় পাঁচ দশক ধরে ‘দ্য স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট’ পত্রিকার জন্য দৈনন্দিন জীবনের যে প্রচ্ছদ চিত্রগুলো তৈরি করেছিলেন, তার জন্যই তিনি বিখ্যাত। সেকালের সমাজব্যবস্থা, জীবনযাপন এবং সর্বস্তরের মানুষের চরিত্র চিত্রায়ণই মুখ্য বিষয়।
‘দ্য ট্যাটুয়িস্ট’, ছবিখানি নরম্যান রকওয়েলের বিশেষ পরিচিত আর রসিকতাপূর্ণ যুদ্ধকালীন কভার চিত্রগুলোর একটি। ছবিটির কৌতুক একেবারেই সরল, সংবাদপত্রের কার্টুনের মতো। কিন্তু রকওয়েল ছবিতে তাঁর দুই চরিত্র, একজন নাবিক এবং উলকি শিল্পীকে এমন ব্যক্তিত্ব দিয়েছেন যে এটি নিছক চোখে পড়ার মতো হাস্যরসেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যতবারই দেখি মুগ্ধ হই।

নাবিকটি রকওয়েলের বন্ধু ও সহশিল্পীকে মডেল করে আঁকা। একেবারে শক্তসমর্থ, চেহারায় খাঁটি সমুদ্রযোদ্ধা। তার মুখে লেগে আছে নৌ-যুদ্ধের স্মৃতি, উত্তাল সমুদ্রের ঝড় আর সান দিয়েগো থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত অসংখ্য বন্দরশহরের পানশালার ঝগড়ার ছাপ। সে যেন সেই সময়কার যুদ্ধের চলচ্চিত্রে অভিনীত চরিত্রগুলোর মতো, রুক্ষ অথচ প্রাণবন্ত। আর এই ট্যাটু-শিল্পীকেও অন্য যে কোনও শিল্পীর মতোই সম্মানের চোখে দেখিয়েছেন রকওয়েল। তার পেশা হয়তো খুব উঁচু মর্যাদার নয়, তবু সে হয়ে উঠেছে গভীর মনোযোগে নিমগ্ন এক কারিগর, নিজের দক্ষতায় গর্বিত, জীবন্ত ক্যানভাসে ব্যস্ত এক শিল্পী।
নাবিকের হাঁটুর ওপর ছড়িয়ে রাখা জ্যাকেটটি আমাদের তার স্বভাব সম্পর্কে দু’-একটি ইঙ্গিত দেয়। সেখানে আটকানো রিবনগুলো তার সাহসিকতার প্রমাণ বহন করছে। আবার পকেট থেকে উঁকি দেওয়া চিরুনিটি বুঝিয়ে দিচ্ছে সব রুক্ষতার মধ্যে সামান্য হলেও সাজগোজের প্রতি তার দুর্বলতা আছে। সবচেয়ে মজার এই ক্ষতবিক্ষত সমুদ্রসৈনিকের প্রশস্ত বাহুতে অসংখ্য উলকির নক্সাঘেরা, খানিক খালি জায়গায় স্যাডি, রোজিয়েটা, মিং ফু, মিমি, ওলগা, সিং লি আর বেটি-র মতো মেয়েদের নামের তালিকা। শেষটি ছাড়া উলকির নামগুলো আবার লিখে কেটে দেওয়া। হয়তো এই মেয়েগুলোর সংস্পর্শে এসেছিল নাবিক অথবা এ সমস্ত নারীদের সঙ্গে প্রেমালাপের নিছক কল্পনা মাত্র। সবমিলিয়ে যথেষ্ট মজার।

ট্যাটু এখন কোনও নিষিদ্ধ বিষয় নয়। প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন আমেরিকান এখন অন্তত একটি ট্যাটু করিয়েছেন। আমি ভাবছি, আজও আমার শরীরে কোনো উলকি নেই। তবে উলকির ভাষা আমাকে ভাবায়। মনে পড়ে প্রথম যখন পাসপোর্ট করাতে যাই তখন সেখানে একটি জায়গায় লিখতে হত, শরীরে শনাক্তকরণের চিহ্ন। আমি লিখেছিলাম, গালে তিল আছে। আসলে প্রাকৃতিক নিয়মেই বোধহয় আমাদের প্রত্যেকেরই শরীরে কোনও না কোনও নিজস্ব চিহ্ন থাকে। কিছু স্মৃতি, যেগুলো শরীরের ভেতরে এমনিই খোদাই হয়ে থাকে। আর কিছু স্মৃতি, যাদের বাঁচিয়ে রাখতে মানুষ বেছে নেয় কালি।
আমি খুব কাছ থেকে প্রথম উলকি দেখেছিলাম, কোনও শহুরে স্টুডিওর আধুনিক পরিবেশে নয়, গ্রামের সাধারণ কুঁড়েঘরে, আমার মায়ের হাতে। কবজি আর কনুইয়ের মাঝখানে, নিজের দিকে, নীল কালিতে একটা অক্ষর। মায়ের নামের প্রথম অক্ষর। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা এটা করেছিল এবং এ-ও শুনেছি যে সাধারণ সেলাইয়ের সূঁচ আর কলমের নীল রঙের কালি দিয়েই উলকিটা করা হয়েছিল। সূঁচ ফুটিয়ে ওটা করার সময় বারবার না কি সেটা একটা প্রদীপের আগুনে পুড়িয়ে নিয়েছিল। কারণটা আর কিছু না হোক, বাবা যেহেতু শিক্ষক মানুষ, তার মধ্যে একটা সাধারণ বিজ্ঞানচেতনা, ভাবনা থাকবেই। আরও একটা সহজ প্রশ্ন পরে বড় হয়ে মাথায় এসেছিল– যখন একটা অক্ষর লিখতে হবে সেটা মায়ের নামের আদ্যক্ষর কেন? বাবার নামের অক্ষরও তো হতে পারত! মনে হয় সেসময় ওই অজ-পাড়াগাঁয়ের মানুষের কাছে ব্যাপারটা যতটা কারিগরি দিকটা দেখানোর লোভ, ততটা হাসি-ঠাট্টার পাত্র হতে চায়নি বাবা।
বিজ্ঞানচেতনা, ঠিক আছে, কিন্তু ভুল হলে তা থেকে আপদবিপদের ব্যাপার থাকতে পারে ততটা গভীরে কি ভেবেছিল বাবা? নিদেনপক্ষে শরীরের চামড়ার প্রধান স্তর, মানে এপিডার্মিস, ডার্মিস এবং হাইপোডার্মিস– যা আমাদের বাইরের পরিবেশ থেকে সুরক্ষা দেয়, চামড়ার দৃঢ়তা ও পুষ্টি জোগায়– এমন কোনও তথ্যও তো বাবার কাছে থাকার কথা নয়। এটা একেবারে এখন আমার মাথায় আসছে কারণ, শরীরে কালি ঢোকানো যেহেতু আরও সহজ হয়ে উঠছে, তাই এর সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো আরও নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করার সময় এসেছে। বৈজ্ঞানিক সচেতনতাও সমান তালে বেড়েছে, তবুও সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্বেগজনক শিরোনামে ট্যাটু এবং লিম্ফোমার মধ্যে একটা যোগসূত্রের কথা বলা হচ্ছে। এই ভীতিজনক খবরগুলো এসেছে লিম্ফোমা-আক্রান্ত এবং ক্যান্সারবিহীন মানুষের উপর করা একটি গবেষণার উপর ভিত্তি করেই।

গবেষণাটি দেখিয়েছে যে ট্যাটু করালে ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু তাদের ডেটা আসলে ইঙ্গিত দেয় যে কোনও পার্থক্যই পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। যদি ট্যাটুর কালি ক্যান্সার সৃষ্টি করত, তবে আপনি আশা করতেন যে যাদের শরীরের বেশি অংশে ট্যাটু করা আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি হবে। গুরুত্বপূর্ণভাবে, গবেষকরা এমনটি খুঁজে পাননি। ভালো কথা।
উলকি করানোর ব্যাপারে এই শিল্পের অন্যান্য দিকগুলো থেকেও কিছু প্রশ্ন আসতে পারে। যেমন কালি। আমাদের ত্বকে উলকির কালি কোথায় থাকে? চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বলছেন, এটি ত্বকের উপরের স্তর, এপিডার্মিসের নিচে ডার্মিস স্তরে কিন্তু ত্বকের চর্বি স্তরের উপরে থাকে। ডার্মিসের কোষগুলো এপিডার্মিসের তুলনায় অনেক ধীরে ধীরে বদলায়। আর একারণেই ত্বকের কোষ ঝরে গেলেও উলকি বিবর্ণ হয় না।
আমরা এখন সবাই জানি, উলকি হল শরীরের স্থায়ী অলংকরণের এক বিশেষ শিল্পরূপ। সূচের সাহায্যে ত্বকের সাধারণত ০.৫ থেকে ২ মিমি গভীরে স্থায়ী রং প্রবেশ করিয়ে তৈরি করা হয় উলকি। শিল্পীরা বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫০ থেকে ৩০,০০০ বার পর্যন্ত ত্বকে সূচ প্রবেশ করান। নানান শৈলী ও ডিজাইনের মাধ্যমে এর সম্ভাবনা কার্যত অন্তহীন। রিয়ালিজম, ট্র্যাডিশনাল, ক্যালিগ্রাফি, ট্রাইবাল, মিনিমালিস্ট, ফাইন-লাইন থেকে শুরু করে গাঢ়, বোল্ড, ঐতিহ্যবাহী, আধ্যাত্মিক এমনকি ওয়াটারকালার ইত্যাদিতে পোর্ট্রেট, প্রকৃতি, অ্যাবস্ট্রাক্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। শৈল্পিক দক্ষতা, স্থান এবং শরীরের ত্বকের গঠনের উপর মৌলিকত্বের সুযোগ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সৃজনশীলতার সীমানা প্রসারিত করছে।

উলকি শিল্পে প্রধান দিকগুলো খেয়াল রাখার ব্যাপারে সংক্ষেপে বলি। সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, ত্বকের যন্ত্রণা এবং খুব কম ক্ষেত্রে হলেও এমআরআই পরীক্ষার সময় ব্যথা বা জ্বালাভাব। কিছু উলকির রঙে ভারি ধাতু বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানও থাকতে পারে।
খুব কম গভীরে রং দিলে উলকি ফিকে হয়ে যেতে পারে, আর অতিরিক্ত গভীরে গেলে ‘ব্লো-আউট’, অর্থাৎ রং ছড়িয়ে গিয়ে নকশা নষ্ট হয়। উলকি শরীরের কোন স্থানে করা হচ্ছে, তার ওপর ব্যথা ও আরোগ্য নির্ভর করে। পাতলা ত্বকের অংশে, যেমন গোড়ালিতে সূচের গভীরতা কম রাখতে হয়, আর উরুর মতো মোটা ত্বকের অংশে তুলনামূলক গভীরে কাজ করা যায়।
আমার শরীরের উলকি না থাকলেও আমার মায়ের ছিল সেকথা আগেই বলেছি। পরপ্রজন্মে অর্থাৎ আমার সন্তানদের শরীরে দেখছি উলকি ফিরে এসেছে। আমার ছেলে, শাপলার হাতে দেখলাম মায়ের মতো কনুই থেকে কবজির মাঝখানে প্রায় পুরোটা অংশ জুড়ে তিব্বতি ভাষায় এবং তিব্বতি হরফে একটি বাণী। বাংলায় যার মানে, তোমার কর্মফলের ওপর নির্ভর করে তোমার পরিচয়। আর মেয়ে, ঝিনুকের হাতে দেখলাম, কবজিতে মায়ের হাতে ওই একটা অক্ষরের মতো ছোট সাইজের কিন্তু এটা একটা ছবি। অরিগামি থেকে নিজের বানানো এক পাখির অববয়ব। আশ্চর্য! তিনজনের হাতের উলকি কিন্তু নিজেদের দিকে ফেরানো। শরীরের ভেতরের দিকের অংশে করা, অর্থাৎ বাইরের লোক দেখানোর জন্য নয়। এইটা আমার কাছে একটা নির্দিষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উলকি যেন সাহিত্য, যেখানে ভাষা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, সত্যি বলার জন্য। শরীরের উপর লেখা এই ভাষা চুপচাপ কথা বলে, কিন্তু গভীরভাবে। কখনও তা ইতিহাস, কখনও ব্যক্তিগত ডায়েরি, কখনও নিঃশব্দ প্রতিবাদ। উলকি, এক প্রাচীন ভাষা। যে ভাষা কখনও পবিত্র, কখনও নিষিদ্ধ, আবার কখনও নিছক ফ্যাশন। এই ভাষার অক্ষর কালি দিয়ে লেখা হয় না কাগজে, লেখা হয় মানুষের শরীরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যার অর্থ বদলায়, কিন্তু দাগ মুছে যায় না সহজে। শরীর এখানে শুধু মাংস আর রক্তের আধার নয়, এ এক চলমান পাণ্ডুলিপি, যেখানে ব্যক্তি নিজের গল্প নিজেই লিখে রাখে।
প্রাচীন সভ্যতায় উলকি ছিল বংশপরিচয়, সাহস, সামাজিক অবস্থানের চিহ্ন। কোথাও দেবতার আশীর্বাদ, কোথাও যোদ্ধার সম্মানচিহ্ন। তবে সময় বদলালে ভাষাও বদলায়। এক সময় এই শরীরী ভাষাই হয়ে ওঠে নিষিদ্ধ। তথাকথিত সভ্যতার দোহাই দিয়ে একে ঠেলে দেওয়া হয় সমাজের প্রান্তে। ধর্ম বলল, শরীর ঈশ্বরের দান, তাতে কালি ঢোকানো পাপ। সমাজ বলল, এ দাগ ভদ্রতার নয়। উপনিবেশিক শাসন আর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা একে জুড়ে দিল অপরাধ, নাবিক, কয়েদি আর পতিতালয়ের সঙ্গে। শরীরের শিল্প তখন রূপ নিল সামাজিক সন্দেহে। শরীরের উপর লেখা গল্প তখন আর গর্বের নয়, লজ্জার। যেন শরীরের ভাষা রাষ্ট্র আর সমাজের অনুমতি ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর তখনই সামনে আসে একটা বড় প্রশ্ন। শরীর কার? রাষ্ট্রের? ধর্মের? পরিবারের? না কি তোমার নিজের?

আধুনিক সময়ে উলকি আবার ফ্যাশন। সেলিব্রিটির শরীরে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের ফিডে। ট্যাটু এখন স্টাইল স্টেটমেন্ট। ভালোবাসার নাম, জীবনের মন্ত্র, কিংবা নিছক নান্দনিক নকশা– সবই শরীরের ক্যানভাসে আঁকা হচ্ছে। এখন উলকি মানে আত্মপ্রকাশ। কেউ আঁকেন মায়ের নাম, কেউ প্রিয় কবিতার পঙ্ক্তি, কেউ আবার নিজের ক্ষত ঢাকতে আঁকেন অর্থহীন নকশা। এ কি সংস্কৃতি, না কি পণ্য? যখন এই শিল্প হয়ে ওঠে ভাবনার বাহক, তখন তা সংস্কৃতি। কিন্তু যখন তা কেবল নকল, কেবল চমক, কেবল ‘ভাইরাল’ হওয়ার হাতিয়ার, তখন তা অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। একই নকশা হাজার শরীরে, একই অর্থহীন চিহ্ন। যেন শিল্পের ক্লোনিং।
সমাজে উলকি মানে পরিচয়ের চিহ্ন। আফ্রিকার উপজাতি সমাজে, পলিনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জে কিংবা উত্তর ইউরোপের যোদ্ধাদের শরীরে ট্যাটু ছিল বংশ, বীরত্ব কিংবা দেবতার সঙ্গে সম্পর্কের সাক্ষ্য। জাপানের ইরেজুমি কখনও ছিল সাহসের অলংকার, আবার কখনও অপরাধীর গায়ে আঁকা সমাজবিরোধীর দাগ। ভারতীয় উপমহাদেশেও গ্রামীণ সমাজে নারীরা শরীরে ধারণ করেছে দেবদেবীর নাম, সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিশ্বাসের আশ্রয়ে।

আদিম সমাজের উলকি প্রসঙ্গে সবশেষে আসি বহু যুগ আগের এক বিস্ময়কর রূপকথার মতো পরিবেশে। সে এক ‘হিমায়িত সাইবেরিয়ান রমণী’র কাহিনি। তাঁর অঙ্গাভরণ নতুন করে ভাবাচ্ছে আমাদের।
রহস্যময় চরিত্রটি, ‘সাইবেরিয়ান আইস মেইডেন’। তাঁকে ‘উকোকের রাজকুমারী’ নামেও ডাকা হয়, তিনি এক বিস্ময়করভাবে সংরক্ষিত প্রায় ২,৫০০ বছরের পুরোনো মমি। ১৯৯৩ সালে রাশিয়ায়, মূলত দক্ষিণ সাইবেরিয়ার আলতাই পর্বতমালার কাছে উকোক মালভূমি থেকে তাঁর দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। তিনি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর পাজিরিক সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পাজিরিকরা ছিল যাযাবর যোদ্ধা। তারা ঘোড়া পালন করত এবং স্থান পরিবর্তন করে জীবনযাপন করত।


চিরহিমায়িত বরফের গভীরে সমাধিস্থ থাকার ফলে তাঁর দেহ, পোশাক ও অলংকার অসাধারণভাবে অক্ষত ছিল। তাঁর শরীরে খোদাই করা ছিল জটিল ও পৌরাণিক নকশার উলকি, পরনে ছিল সুসজ্জিত পোশাক, এবং সমাধির সঙ্গে রাখা হয়েছিল ছ’টি ঘোড়া, যা তাঁর উচ্চ সামাজিক মর্যাদার ইঙ্গিত দেয়। গবেষকদের মতে, তিনি সম্ভবত একজন মহিলা পুরোহিত ছিলেন এবং আনুমানিক ৫০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল স্তন ক্যানসারের কারণে।
ঘটনাটি জানার পরে বিভিন্ন সূত্র ঘাঁটাঘাটি করতে এবং সবশেষে BBC-র একটি তথ্যচিত্র দেখতে দেখতে অন্তত তিনটি বিষয় মাথায় রীতিমতো চেপে বসেছে। প্রথমটা একটা পুরনো সময়ের অদ্ভুত ঐতিহাসিক এবং যাযাবর জীবনযাপনের সাংঘাতিক উদাহরণ। প্রাকৃতিক পরিবেশ আর তাদের সংস্কৃতির অপরূপ বর্ণনা শুনে মুগ্ধ হতে হয়।

দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের দিচ্ছে হাই-রেজোলিউশন ছবি এবং সূক্ষ্ম কাজের উপলব্ধির টেকনোলজিক্যাল সুযোগ। গবেষকদের মতে, আড়াই হাজার বছর পুরোনো সাইবেরীয় মমি-র উপর পাওয়া উলকির হাই-রেজোলিউশনের চিত্র থেকে এমন কিছু জটিল নকশা প্রকাশ পেয়েছে, যা খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। এমনকী, কী বস্তু দিয়ে উলকি তৈরির একমুখী এবং বহুমুখী সূচ ইত্যাদি তৈরি করেছিল তার একটা স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে। কালি কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং শিল্পীদের মানসিকতা কীভাব কাজ করত তারও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। মমির দু’ হাতে দু’ ধরনের শিল্পের নমুনা দেখে গবেষকরা এটাও আন্দাজ করতে পেরেছেন যে কাজটির জন্য একাধিক শিল্পী নিযুক্ত ছিল। এসব দেখে মনে হচ্ছে আধুনিক উলকি-শিল্পীদের পক্ষেও নাকি অমনতর নকশা করা কঠিন হবে।
সর্বোপরি শিল্পের আঙ্গিকে অসামান্য রূপ। মমির শরীরে থাকা চিতাবাঘ, হরিণ, মোরগ এবং পৌরাণিক আংশিক-সিংহ ও আংশিক-ঈগল জাতীয় প্রাণীর জটিল উলকিগুলো একটি প্রাচীন যোদ্ধা সংস্কৃতির চিহ্ন। অলংকরণের নকশায় প্রাণী দেহের আকার সংকর জাতের। নানা জাতের প্রাণীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জুড়ে তৈরি। অর্থাৎ আলংকারিক দিকটাতে শিল্পী স্বাধীনতা নিয়েছে এবং মোটিফ তৈরির বেলাতে প্রায় আমাদের আলপনার মতো মণ্ডনধর্মিতা বা একটা বিমূর্ত সৌন্দর্যের আশ্রয় নিয়ে তৈরি হয়েছে আলাদা ধরন, একটা আলাদা শিল্পশৈলী। যা মনস্তাত্ত্বিক এবং শিল্প-বিশেষজ্ঞদের কাছে এক অপার বিস্ময়।
…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…
পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প
পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন
পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না
পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন
পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি
পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!
পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ
পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম
পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়
পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ
পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?
পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা
পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার
পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ
পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা
পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?
পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!
পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved