Robbar

বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 1, 2026 6:00 pm
  • Updated:February 1, 2026 6:00 pm  

মিউজিয়ামে শিল্পকলার স্টুডিও ছাড়াও সত্যি সত্যি ছিল একটা বড়সড় রান্নাঘর। সেখানে দেখেছিলাম কয়েকটা বিশাল বড় কড়াই। সেগুলোতে কোনও জন্তুকে গোটা সেদ্ধ করা হয়, যাতে হাড়গুলো অক্ষত থাকে। শুনেছিলাম ওখানে কিছুদিন আগে নাকি একটা হাতি সেদ্ধ করা হয়েছে। মাংসগুলোকে নরম করে হাড়গুলোকে বেছে নিয়ে জুড়ে জুড়ে জন্তুটার একটা কাঠামো তৈরি করা হয়। এই সময় জন্তুটার একটা শারীরিক ভঙ্গিমা দেওয়া হয়। তারপরে কৃত্রিম জিনিস দিয়ে ভরাট করে ওর প্রসেস করা নিজের চামড়াটা পরিয়ে, কাচের চোখ ইত্যাদি লাগিয়ে তৈরি হয়ে যায় সত্যিকারের মতো দেখতে একটা জন্তু।

সমীর মণ্ডল

২০.

সেইবার আমরা শিল্পী বন্ধুরা মিলে গিয়েছিলাম ‘সাংহাই বিয়েনাল’ দেখতে, চিনে। এই দ্বিবার্ষিকীগুলোতে সারা পৃথিবীর বাছাই কাজ দেখার একটা সুযোগ হয় এবং সমকালীন শিল্পকলার হাল-হকিকত বুঝতে সুবিধা হয়। চোখ ছুঁয়ে গেল কিছু সমকালীন শিল্পকর্মে, যেগুলোতে ছিল অতি সূক্ষ্ম গাছের ডালপালা বা প্রাকৃতিক উপাদান। মিনিয়েচারের মতো ছোট সাইজের পদার্থগুলোকে জড়ো করে, তারই সমষ্টিতে তৈরি হয়েছে এক একটি দেওয়ালে লাগানো ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম। আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো দ্বিমাত্রিক ফ্রেমবিহীন ছবি বলেও ভুল হয়। দ্বিমাত্রিক এবং ত্রিমাত্রিকের ম্যাজিক ভাঙার আর এক ম্যাজিক।

সাংহাই বিয়েনাল-এ আর এক জায়গায় দেখলাম প্যাকিং বাক্স, অর্থাৎ দৈনিক জীবনে কেনাকাটার বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে আসে যে প্যাকিং বাক্স সেগুলোর গায়ের রং, তার শরীরের টেক্সট এবং সেগুলোর মধ্যেকার কোনও ছবি ইত্যাদি থাকলে তারই ফাঁকে ফাঁকে শিল্পী নিজের ইচ্ছামতো করেছেন পেপার কাটিং, মানে বাক্সের কাগজ কেটে কেটে অদ্ভুত সব ছবি। এগুলোর কিছু কিছু কখনও ভাঁজ করে বাক্সের ভেতরে ঢোকানো; আবার কখনও কখনও ভাঁজ করে ওপরে দাঁড় করানো। কনজিউমারিজমের সঙ্গে আত্মীয়তা। চারুকলা আর কারুকলার সীমারেখা ভেঙে দিচ্ছে। আমি ফিরে ফিরে যাচ্ছি পিছনে। আমাদের জুতোর বাক্স কেটে সৈনিকদের মূর্তির কাট্আউট করে পাহাড়ের মাথায় যুদ্ধের দৃশ্য তৈরি করার ঝুলন যাত্রা সাজানোয় ফিরে যাচ্ছি।

‘সাংহাই বিয়েনাল’

ছোটবেলায় ঝুলন সাজানোর সময় কত কাণ্ডটাই না করেছি। শুকনো ডালপালা, ফুল, পাথরকুচি, পাটকাঠি, দেশলাই কাঠি, ডাল, চাল, ঘাস এবং কাঠের গুঁড়ো আর রং। মনে পড়ছে দু’-তিনটে প্লাস্টিকের হাঁস পাওয়া গেল পুতুলের দোকানে। তাদেরকেও রেখেছিলাম ঘাসের জমিতে। পেটের তলায় তলায় রেখেছিলাম বড় বড় দানার চারটে, পাঁচটা করে সাবুদানা। সেগুলো ওদের ডিম। কে জানত যে ওই সাবুদানাটাই একটি সাইজের অনুপাত বোঝাচ্ছে, আর কেই বা জানত সেই ঝুলন সাজানোর পর আমার জীবনের সিংহভাগ কেটে যাবে সায়েন্স মিউজিয়ামের এক্সিবিশন ডিজাইনে।

এই যে খুঁজে বেড়ানো, এই যে কুড়িয়ে বেড়ানো অথবা ফেলনা জিনিসের খেলনা বানানোর মধ্যে বিজ্ঞান থাকতে পারে সেটা আমরা বুঝতে পারিনি ছোটবেলায়। একদিকে যেমন সমকালীন শিল্পকলা, উর্বর মস্তিষ্কের একেবারে হাল আমলের প্রকল্প এবং পরিকল্পনা, অন্যদিকে মিলেমিশে যাচ্ছে সেকাল-একাল। মিলে যাচ্ছে ঘরে-বাইরে, মিশে যাচ্ছে সাধারণ জীবনযাত্রার পদার্থের সঙ্গে শিল্পকলার সমকালীন বুদ্ধিমত্তার। জীবনে দীর্ঘ সময় বিজ্ঞান মিউজিয়ামে কাজ করার কালে এমনই খেলা খেলা মজা কত যে ঘটেছে তা বলে শেষ করা যাবে না। গল্পের ছলে টুকিটাকি দু’-চারটে ঘটনা বলি যা থেকে বোঝা যাবে মজাটা কোথায়।

সাংহাইতে রিৎস-কার্লটন, শহরের সবদিকে সহজে যাতায়াত করার মতো জায়গায়, বড়সড়ো একটা হোটেল। হোটেলটার মধ্যে ছিল নানা রকমের দোকান, যেমন হয় বড় হোটেলগুলোতে। তেমনই ছিল আমার প্রিয় ছোটখাটো একটা বিচিত্র জিনিসপত্রের দোকান। যেখানে অদ্ভুত পুরনো কিছু হস্তশিল্প জাতের জিনিসের আয়োজন। হঠাৎ চোখ চলে গেল একটা গয়নার দিকে। দেখলাম অদ্ভুত ধরনের নীল রঙের, বরং বলা ভালো নীল সবুজের খেলা। অনেকটা ময়ূরের গলার কাছাকাছি যেমন ঘন নীল আর সবুজ মাঝে মাঝে রং বদল করে সেইরকম। গহনাতে ব্যবহার করা হয়েছে কম দামি ধাতু, কিন্তু তার ওপরে রং করার বদলে লাগানো হয়েছে সত্যিকারে পাখির গায়ের পশম। পশম বললাম এই কারণে সেটা কিন্তু ডাঁটাওয়ালা পালক নয়। ইংরেজিতে বলে ‘প্লুমিজ’। যেটা পেটে বা গলার কাছে থাকে পাখিদের।

গয়নার উপরে ব্যবহৃত মাছরাঙার পালক

পুরনো দিনের কোনও চাষি বা জেলে মাছ ধরতে গিয়ে ধরে এনেছিল মাছরাঙা। বাড়িতে এসে সে মাছরাঙার গলার রঙিন পশম কেটে, অলংকারে আঠা দিয়ে সেঁটে তৈরি করল তার শিশু সন্তানের গলার হার; কিংবা শুধুই একটা লকেট। এই যে প্রকৃতি থেকে কম দামি শিল্প, বেশি দামি শিল্প এবং মানুষের মানসিকতা, পছন্দ, বাছাই, অনুসন্ধান, সংগ্রহ একসঙ্গে কাজ করেছে তখনকার দিনে, তা একসঙ্গে কাজ করছে এখনও। পরে চিন দেশের বড় মিউজিয়ামে রাজা-রাজড়াদের, রানিদের অলংকারের নিদর্শন দেখে অভিভূত হয়েছি। সোনার মতো দামি ধাতুর উপরে মাছরাঙার প্লুমিজ লাগিয়ে গয়না রয়েছে বহুমূল্যের।

মাছরাঙার গায়ের রঙিন রোঁয়াগুলো গয়নার গায়ে পাশাপাশি সাজিয়ে যে সূক্ষ্ম কাঠামো আর টেক্সচার তৈরি হয়, তার ওপর আলো ঠিকরে বিচ্ছুরিত হয় অসাধারণ রং। ঠিক যেমনটা দেখেছিলাম বেঙ্গালুরুর সদাশিব নগরে, রমন রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। মিউজিয়ামের কর্মসুবাদে বেঙ্গালুরুতে বসবাসে কয়েকবার যেতে হয়েছিল RRI-তে। দেখেছিলাম সি ভি রমনের অসংখ্য নানা রঙের প্রজাপতির পাখনার সংগ্রহ।

রমন রিসার্চ ইন্সটিটিউট, বেঙ্গালুরু

পদার্থবিজ্ঞানে এশিয়ার প্রথম নোবেল পুরস্কার-বিজয়ী স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন প্রকৃতির রং, রূপ, শব্দ ও আলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। করেছেন খোদ কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’-এ। নোবেল পুরস্কারের ‘রমন ইফেক্ট’ আলোর প্রকৃতির গবেষণায় ব্যবহৃত হয়, আর প্রজাপতির ক্ষেত্রে এটি তাদের ডানার সূক্ষ্ম গঠন ও রঙের রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করে।

স্যার সি ভি রমন

বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের নানারকম নিজের পছন্দমতো প্রাকৃতিক জিনিসপত্র খুঁজে পাওয়ার গল্পও অনেক। কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দিরের (বোস ইনস্টিটিউট) ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’ যন্ত্রটির প্রাথমিক চেহারা দেখে অবাক হয়েছিলাম। জগদীশচন্দ্র বসু, স্থানীয় উপকরণ এবং প্রাকৃতিক বস্তু ব্যবহার করে এমন যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যা উদ্ভিদের জীবন ও সংবেদনশীলতার বৈপ্লবিক প্রমাণ। উদ্ভিদের ডগা বা শিকড়ের নড়াচড়া এটা কালি পড়ানো কাচের দেওয়ালে গ্রাফে রেকর্ড করা হত। যন্ত্রে একটা কাঁটার ব্যবহার ছিল। বিস্ময়কর, সেটা ছিল জগদীশচন্দ্র বসুর পছন্দের একটা শজারুর কাঁটা।

জগদীশচন্দ্র বসু

প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার বাইরে মিউজিয়ামে প্রদর্শনী সাজাতে গিয়ে শুরুতে দুটো জিনিস খুব মজার লেগেছিল। ‘ডায়োরামা’ আর ‘ট্যাক্সিডার্মি’। ডায়োরামা একেবারেই নাটকের একটা মঞ্চের মতোই। কখনও তা খুব ছোট আকারে হয়, কখনও মাঝারি বা বেশ বড়সড়ো, যাকে আমরা বলি, লাইফ সাইজ। অর্থাৎ তার মধ্যে আয়োজন, কোন অঞ্চলের বা সময়ের মানুষ, ঘরবাড়ি এবং ব্যবহারের জিনিসপত্র ইত্যাদি তাদের নিজস্ব সাইজের।

আপনাদের সবারই নিশ্চয়ই মিউজিয়াম দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং এই ডায়োরামা প্রায় প্রতিটি মিউজিয়ামেই দেখে থাকবেন। মিউজিয়ামের দুটো দিক। একটা হচ্ছে সংগ্রহের জিনিসপত্র কাচের বাক্সে রক্ষণাবেক্ষণ এবং তার পরিচয়। আর একটা হচ্ছে এই ডায়োরামা, যার মধ্যে দিয়ে কোনও কোনও অঞ্চল, পরিবেশ বোঝানোর জন্য একটা অদ্ভুত নাটকের পরিবেশ তৈরি করা হয় যেটা ওই বিষয় সম্পর্কে গল্প বলে।

ডায়োরামা বানানো একটা স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম। যখন এটা লাইফ সাইজের তখন একরকম, কিন্তু যেই তার চেয়ে ছোট কিংবা বড় হয় বা খুব ছোট হয় তখন এটার কাজগুলো হয়ে যায় অনেক জটিল এবং কঠিন। ত্রিমাত্রিক এই ক্ষুদে মঞ্চটাই ধরা যাক শিল্পীর কাজের ক্যানভাস। নিচের জমিটা আস্তে আস্তে সামনে থেকে পেছনের দেওয়াল পর্যন্ত একটু একটু করে উঁচু করে পেছনে দেওয়ালের সঙ্গে গোল করে কোণটা মিলিয়ে দেয়া হয়। তেমনভাবে ওপরেও ছাদের এবং অন্যান্য কোনাগুলোও গোল করে মিলিয়ে দিলে পুরো পরিবেশটা একটা অদ্ভুত ধরনের দৃষ্টিভ্রমের কাজ করে। মানে আগেপিছে অনেকটাই হারিয়ে যায় এবং সুন্দর নাটকের মঞ্চ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন মতন সামনে যে জিনিসটাকে দেখাব, মানুষজন হোক কিংবা জন্তু-জানোয়ার অথবা ঘরবাড়ি, ব্যবহৃত জিনিসপত্র, সেগুলোকে মডেল করে সামনে রাখা হয়। আস্তে আস্তে জমিটাকে পরিবেশ তৈরি করার মতো কিছু উঁচু এবং কিছুটা অল্প উঁচু রেখে মাটি বা প্লাস্টার ইত্যাদি দিয়ে বানিয়ে নেওয়া শেষ দেয়ালটা পর্যন্ত। পরে দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি করতে রং-তুলি দিয়ে এঁকে দেওয়া একেবারে আকাশ পর্যন্ত। এতে করে কাছ থেকে দূরে ত্রিমাতৃক আর দ্বিমাত্রিক গুলিয়ে গিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে।

ইন্ডিয়ান সায়েন্স মিউজিয়ামের ডায়োরামা

কোনও জিনিসকে ছোট থেকে বড় করা কিংবা বড় থেকে ছোট, সেটারও কৌশল শিখতে হয়। ধরা যাক, একটা মশা, মাছি বা আরও ছোট কীটপতঙ্গ কিংবা ব্যাকটেরিয়াকে আমরা যদি মডেল দেখাতে চাই, তাহলে একটি ছোট জিনিসকে অনেক বড় করে দেখাতে হবে আর বড় জিনিসকে, মানে বিশাল বড় একটা জাহাজকে যদি দু’-চার ফুটের সাইজে করি, কিংবা বিশাল মাপের কোনও ব্রিজকে যদি দু’ ফুটের মধ্যে করতে হয় তাহলে একটা মাপের গণিতকে মেনে চলতে হবে।

বিড়লা মিউজিয়ামে এসেই সহকর্মী, প্রখ্যাত ভাস্কর মাধব ভট্টাচার্যকে একটা মস্ত জাহাজের রেপ্লিকা ছোট করে করতে দেখেছিলাম। আর মজা পেয়েছিলাম হাওড়া ব্রিজটাকেও ছোট মডেলের আকারে দেখে। হাওড়া ব্রিজের লোহার কাঠামোতে তাদের খুঁটি ইত্যাদি যেমন ছোট আকারে করতে হবে একটা অংক মেনে, তেমনই তার নাট-বল্টুগুলোও। আপনারা যারা হাওড়া ব্রিজ দেখেছেন, তারা লক্ষ করবেন যে, নানারকম লোহার পাতগুলো জোড়ার নাটবল্টুগুলো কিন্তু খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। আসলে ওগুলো নাটবল্টু নয়। নাট বলতে আমরা বুঝি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টাইট বা ঢিলা করার একটা বস্তু। হাওড়া ব্রিজে যেগুলো আছে তার নাম ‘রিভেট’। মাথাটা অর্ধগোলাকৃতি। মাধবদা নরম কাঠে মাপজোক ঠিক রেখে তৈরি করেছিলেন সেই পুরো হাওড়া ব্রিজটা। সমস্যা হচ্ছিল ওই রিভেটগুলোকে নিয়ে। মাথা গোলওয়ালা কাঠের ছোট জিনিসগুলো তৈরি করতে অনেক সময় লাগবে। মাথায় খেলে গেল, ভাঙা মুসুর ডাল। সেটার সাইজটা ওই স্কেলের সঙ্গে বেশ ভালোই খেটে গেল দেখে, মাধবদা মুসুর ডাল আঠা দিয়ে রিভেটের জায়গাগুলোতে লাগিয়েছিলেন। একরঙা ধাতুর রঙ স্প্রে-পেন্টিং করে দেওয়ার পরে দারুণ সুন্দর মানিয়ে গেল।

মিউজিয়াম ছাড়াও ফিল্ম ইনস্টিটিউটে সিনেমা তৈরিতে অনেক সময়েই কোনও কোনও বড় জিনিসকে ছোট আকারে করে শুটিংয়ের কাজে লাগানো হয়। যেমন কোনও একটা ঐতিহাসিক বিল্ডিং কিংবা ব্রিজ ধ্বংস করার ছবি তোলার কাজ। পুনার ফিল্ম ইনস্টিটিউটে গিয়ে এই কর্মকাণ্ডটি দেখেছিলাম। সিনেমার নেপথ্যের গল্পও প্রচুর। অন্য পর্বে কখনও বলার ইচ্ছে রইল।

জার্মানির ব্রেমেন শহরের মিউজিয়ামে সবচেয়ে সুন্দর ‘ডায়োরামা’ আর ‘ট্যাক্সিডার্মি’ তৈরি হয়। সেখানে শিক্ষামূলক কাজে গিয়ে সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখেছি। এখানে তার ছোটখাটো কিছু ধারণা দেব। গিয়েছিলাম ট্যাক্সিডার্মি তৈরিটা হাতেকলমে শিখতে। কোনও জন্তু-জানোয়ারের তার নিজস্ব লোমওয়ালা চামড়াটা ব্যবহার করে, ভেতরে খড়কুটো বা তুলো ভরে সেটাকে সত্যিকারের সাইজে তৈরি করার নাম ট্যাক্সিডার্মি।

ব্রেমেন মিউজিয়ামে ট্যাক্সিডার্মি তৈরি করা হচ্ছে

মিউজিয়ামে শিল্পকলার স্টুডিও ছাড়াও সত্যি সত্যি ছিল একটা বড়সড় রান্নাঘর। সেখানে দেখেছিলাম কয়েকটা বিশাল বড় কড়াই। সেগুলোতে কোনও জন্তুকে গোটা সেদ্ধ করা হয়, যাতে হাড়গুলো অক্ষত থাকে। শুনেছিলাম ওখানে কিছুদিন আগে নাকি একটা হাতি সেদ্ধ করা হয়েছে। মাংসগুলোকে নরম করে হাড়গুলোকে বেছে নিয়ে জুড়ে জুড়ে জন্তুটার একটা কাঠামো তৈরি করা হয়। এই সময় জন্তুটার একটা শারীরিক ভঙ্গিমা দেওয়া হয়। তারপরে কৃত্রিম জিনিস দিয়ে ভরাট করে ওর প্রসেস করা নিজের চামড়াটা পরিয়ে, কাচের চোখ ইত্যাদি লাগিয়ে তৈরি হয়ে যায় সত্যিকারের মতো দেখতে একটা জন্তু। পৃথিবীর প্রায় সব মিউজিয়ামেই এই ট্যাক্সিডার্মির প্রয়োজন হয়, কারণ জীবজন্তুর ইতিহাস বোঝাতে এটি একটি খুবই জনপ্রিয় জিনিস।

প্রসঙ্গত মুম্বইয়ের একটা খবর শোনাই। বিখ্যাত প্রিন্স অফ ওয়েল্‌স মিউজিয়ামে শুনলাম, ওখানকার বড় বড় বাঘ-সিংহগুলো নাকি গ্যালারির বাইরে বের করে মাঠে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পশুপ্রেমীদের কোনও প্রতিবাদ? না, একটা অদ্ভুত ধরনের পোকা না কি নষ্ট করে দিচ্ছে সেগুলো। পোকা মারার কোনও ওষুধপত্রের তেমন ব্যবস্থা করা যাচ্ছিল না। সত্যি করে ওদের কাছে ছিল বেশ সুন্দর কিছু ট্যাক্সিডার্মি। পরে হাতেনাতে বুঝেছি, মিউজিয়ামের নানারকম জিনিসপত্রের রক্ষণাবেক্ষণের কাজটাও খুব কঠিন।

বিভিন্ন বিখ্যাত মিউজিয়াম দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। রেল মিউজিয়ামে বিশাল বড় মাপের অজস্র রেলগাড়ির শরীর যেমন, তেমনই মাটির নিচে কয়লাখনি, সোনার খনির পাশে সোনার মিউজিয়াম। জাহাজ মিউজিয়ামে জাহাজ দেখে অভিভূত হয়েছি বন্দর শহর ‘ব্রেমারহাফেন’-এ। সেখানে আছে জল-সংক্রান্ত যানবাহনের, মেরিটাইম মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের সংগ্রহে আছে উদ্ধার করে আনা অনেক জাহাজডুবির জাহাজ।

ব্রেমারহাফেন-এর জাহাজ মিউজিয়ামের প্রদর্শনী

জাহাজডুবির খুঁজে পাওয়া পুরনো জাহাজগুলোর অংশ সমুদ্রের তলা থেকে নিয়ে এসে সেগুলো জুড়ে জুড়ে আবার তৈরি করছে পুরোটা। সময়ের ব্যবধানে পুরনো শুকিয়ে যাওয়া কাঠ এবং সদ্য আনা ভিজে কাঠ ম্যাচ করবে না বলে সমস্ত জোড়ার কাজগুলো করা হচ্ছে অদ্ভুতভাবে বিশাল সাইজের একটা অ্যাকোয়ারিয়ামে। শিল্পীরা ডুবুরির মতো জলের মধ্যে কাজ করছে দেখলাম। অভাবনীয়।

মিউজিয়ামের মধ্যে ডায়োরামা ছাড়াও এক্সিবিট হিসেবে রাখা আছে নানা রকমের সত্যিকারের ছোট জাহাজ। এমনকী একটি ছোট জাহাজে একটা চমৎকার রেস্তোরাঁও আছে জলে। আর আছে ‘সাবমেরিন’। জীবনে প্রথম সাবমেরিনের মধ্যে ঢোকার অভিজ্ঞতা এই মিউজিয়ামে। পরবর্তীকালে সাবমেরিনে চড়ে সমুদ্রের তলায় জাহাজডুবির ধ্বংসাবশেষ দেখাও ভাগ্যে জুটেছে।

‘মিউজিয়াম’ শব্দটার অর্থ হল জাদুঘর বা সংগ্রহশালা। আমাদের বিজ্ঞান মিউজিয়াম, যেখানে আমি কাজ করতাম– সেটা না জাদুঘর না সংগ্রহশালা। তবে জাদু, মানে ম্যাজিক ছিল ক্ষণে ক্ষণে। অন্য ধরনের মিউজিয়াম। বেশিরভাগ মিউজিয়ামে যেটা দেখানো হচ্ছে সেটা কাঁচের বাক্সে কিংবা ক্যাবিনেট-এর মধ্যে রাখা হয়। এক্সিবিটের সামনে ‘ডু নট টাচ’ লেখা একটা বোর্ড লাগানো থাকে। আমাদের মিউজিয়ামে এই বোর্ডটা কোথাও কখনও নেই। পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে বিনোদন বেশি। তাই প্রদর্শনী সাজানোর ব্যাপারে কর্মক্ষেত্রটাই আমাদের শিক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।

জাহাজের মডেল

শুরুতে ডায়োরামা বোঝাতে যেমন সেগুলোকে নাটকের মঞ্চ বলেছি, তেমনই এই বিজ্ঞান মিউজিয়ামে নাটকের আয়োজনও খুব কম হয়নি। ম্যাজিক দেখতেই বিড়লা মিউজিয়ামে মানুষ আসত দলে দলে। কলের নিচে হাত পাতলে জল পড়ে, ‘হ্যালো’ বললে দরজা খুলে যায়, ভেতরে ঢুকলে আলো পাখা চলতে থাকে। এরকম আশ্চর্য ব্যাপারের জন্যই বা জনপ্রিয়তা আনার জন্য আমাদের অনেক রকমের নতুন নতুন নাটক এবং গল্প বিজ্ঞানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

একটা মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল একবার। রাখা হয়েছিল রিসেপশন হলে। নড়েচড়ে কথা বলে। তার নামও ছিল একেবারেই ঘরোয়া, ‘খগেন বাবু’। অনেকদিন ধরে খগেনবাবু দর্শক টেনেছিল খুব। সেকালে যন্ত্রমানবের একটা ধারণা দেওয়ার জন্য সেটা করা হয়েছিল। মোটেই কোনও সেন্সর দিয়ে কাজ হত না। পুতুলটির পেছনে গাছপালা দিয়ে ঘিরে তার পেছনে কিছু অভিজ্ঞ সহকর্মী লুকিয়ে বসে থাকতেন নানা বইপত্র নিয়ে। সামনে দর্শকরা প্রশ্ন করলে মাইকে সে প্রশ্নের উত্তর দিতেন আসলে আমাদের সহকর্মীরা। প্রশ্ন শুনে নিজেরাই বইপত্র থেকে অথবা বানিয়ে বানিয়ে উত্তর দিতেন ওঁরা। একসময় দেখা গেল, প্রশ্নগুলোর চেহারা বদলে যেতে থাকল। ব্যবসায় লাভ হবে কি না, পরীক্ষায় আমার ছেলে-মেয়ে পাস করবে কি না, অসুখ-বিসুখ কবে সারবে কিংবা আমার মেয়ের বিয়ে কবে হবে– এ জাতীয় প্রশ্নে ভরে যেতে লাগল।

টেলিফোনের ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল তখন অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের মতোই। সেখানে দুটো বাক্সের এপিঠে ক্যামেরা আর নিচে ছবির মনিটর, তার উল্টোদিকের বাক্সে ক্যামেরা এবং তার নিচে মনিটর। ওদিকের মানুষের ছবি এই মনিটারে আর এদিকের ছবি ওই মনিটারে দেখা যেত। বলা হত যে, এমন দিন আসবে যখন এই টেলিফোনের অন্য প্রান্তের মানুষের ছবি দেখা যাবে। লাট্টু হাতে মিথ্যে কথা বলা যাবে না যে, আমি এখন হোমওয়ার্ক করছি বা আমি খেতে বসেছি।

ডায়োরামার পাশাপাশি ট্যাক্সিডার্মি

ছলনা অনেক সময় বিজ্ঞানের বাইরে নয় যেমন, তেমন হাঁড়ির খবর সবসময় বলতেও নেই। দেখতে দেখতে কেটে গেল পঞ্চাশটা বছর। আর্ট কলেজের শিক্ষার পরপরই চাকরিতে যোগ দিই। সেই থেকে বিজ্ঞানসেবার কাজে ছিলাম টানা ২০ বছর। কতরকম দেখা হল, কত দূরদূরান্তে যাওয়া হল। আজ মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। দুনিয়াটা কী সাংঘাতিকভাবে দ্রুত বদলে গেল চোখের সামনে। এখন এ.আই-এর যুগে এসে পড়েছি। এরই মাঝে বিজ্ঞান পরিবেশনার রান্নাঘরের না বলা গল্প রয়ে গেল অনেক।

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?