Robbar

দক্ষতার যান্ত্রিকতা নয়, প্রেম এবং উপলব্ধির আলোই অর্ঘ্য সেনের গান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 16, 2026 4:57 pm
  • Updated:January 16, 2026 5:01 pm  

অর্ঘ্য বলেছেন, প্রথম দিকে একবার জর্জদা এক অদ্ভুত কথা বলেছিলেন তাঁকে, ‘তুমি আমারে ভ্যাঙাও, তুমি তো ছোটো, তোমার নিজস্ব কোনও গায়কী নাই। আমারে ভ্যাঙাইতে ভ্যাঙাইতে একটা পথে আসবা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমারও একটা বোধ আসবো, তহন তোমার একটা নিজস্ব গায়কী সৃষ্টি হইবো।’ অর্ঘ্য সেনের গানে দেবব্রতর কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাব মিলবে না। দেবব্রতর শেখানো পথেই অর্ঘ্য তাঁর স্বকীয়তা গড়ে তুলেছিলেন। তৈরি করেছিলেন গানের নিজস্ব ভুবন।

স্বপন সোম

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর, তাঁর গান জোড়াসাঁকো-শান্তিনিকেতনের সীমানা ছাড়িয়ে দ্রুত প্রসারিত হতে থাকে, বিশেষত রেকর্ডে, চলচ্চিত্রে। তবে রবীন্দ্রচর্চায় সব-ছাপানো জোয়ার এল ১৯৬১-তে, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান-পরিবেশনে। দেবব্রত বিশ্বাস, শান্তিদেব ঘোষ, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়রা তখন দেদীপ্যমান। একঝাঁক তরুণ শিল্পী উপস্থিত হলেন তুমুল সম্ভাবনা নিয়ে। ‘মেগাফোন’ কোম্পানি প্রকাশ করলেন চার-পাঁচজন প্রতিশ্রুতিময় নবীনের গান– অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋতু গুহ, সাগর সেন এবং অর্ঘ্য সেন। এঁরা ক্রমশ বিকশিত হলেন নিজস্ব বিভায়। এঁদের মধ্যে একজনই আমাদের মাঝে ছিলেন এতদিন, গত ১৪ জানুয়ারি তিনিও বিদায় নিলেন– অর্ঘ্য সেন (১৯৩৫-২০২৬)। রবীন্দ্রগানের এক মরমি শিল্পী। দরদি রূপকার।

যুবক অর্ঘ্য সেন
জন্ম কলকাতায়, তারপর চলে যান অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরে মামার বাড়িতে। ছোটবেলা কেটেছে খুলনার দৌলতপুরে। বাবা হেমেন্দ্রকুমার সেন দৌলতপুরের কৃষি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল পদে আসীন ছিলেন। মা বিন্দু দেবী গান করতেন। মায়ের কাছেই গানে প্রাথমিক দীক্ষা তো বটেই, গানে আকর্ষণও তৈরি হয়েছিল। যদিও মা বেশিদিন বাঁচেননি। দৌলতপুরের কৃষি কলেজের প্রিন্সিপ্যাল এসেছিলেন শ্রীনিকেতন থেকে। তাঁর স্ত্রী হাসি বসু শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের পরিবেশে মানুষ, ফলে বেশ কিছু রবীন্দ্রসংগীত জানতেন। অর্ঘ্যরা তাঁকে ‘বোসদিদি’ বলে ডাকতেন। তা বোসদিদি ছোটদের উপযোগী গান (‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা’, ‘আমরা চাষ করি আনন্দে’, ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’) তাদের শিখিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করাতেন। অর্ঘ্যও শিখেছিলেন, অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। বাল্যবয়সে রবীন্দ্রনাথের গানই তাঁর প্রথম ভালোবাসা হয়ে দাঁড়াল। শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রধান ভালোবাসাও তাই।
দেশভাগের প্রতিক্রিয়ায় খুলনা, দিনাজপুর, বেনারস হয়ে অর্ঘ্যরা শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছলেন কলকাতায়, সে বছরই দেশ স্বাধীন হল। কলকাতায় তাঁদের প্রথম ঠিকানা দক্ষিণ কলকাতার হাজরায়। যে-বাড়িতে আশ্রয় পেলেন সেখানে রেডিও ছিল। রেডিওতে পঙ্কজকুমার মল্লিকের ‘সংগীত শিক্ষার আসর’ তখন জনপ্রিয় ছিল, অর্ঘ্য এই অনুষ্ঠান নিয়মিত শুনতেন। এইভাবে কিছু গান শেখাও হয়ে গেল। এদিকে পড়ছেন বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। গানে প্রচণ্ড ঝোঁক, দশম ক্লাসে পড়ার সময় অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গান শিখতে শুরু করেন। কিন্তু ম্যাট্রিকের জন্য কিছুদিন অশোকতরুর কাছে যাওয়া বন্ধ রাখেন। পরীক্ষার পর অশোকতরুর ক্লাসে গিয়ে দেখেন সে-ক্লাস উঠে গিয়েছে।
দেবব্রত বিশ্বাস ও অর্ঘ্য সেন
যে-বাড়িতে এই ক্লাসটি হত, তার মালিকের সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসের খুবই চেনাশোনা ছিল। তাঁরই মাধ্যমে অর্ঘ্য শিখতে শুরু করলেন দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে, ১৯৫১-তে। আর দেবব্রতর কাছে এই তালিমই অর্ঘ্যর সংগীতজীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়াল। এদিকে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিলেন। চাকরি হল প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট’-এ। যে-বিভাগে কাজ করতেন সেটি পরে ‘ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশন’-এ পরিণত হয়, এখান থেকেই অবসর নেন অর্ঘ্য।
অর্ঘ্য বলেছিলেন, ‘জর্জদা আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি।’ জর্জদা অর্থাৎ দেবব্রত বিশ্বাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ, স্নেহময় সান্নিধ্য অর্ঘ্যকে পথ দেখাল। দেবব্রতর কাছেই শিখলেন– কীভাবে শব্দ উচ্চারণ করতে হবে, কোথায় কীরকম অভিব্যক্তি হবে। শিখলেন মডিউলেশন। সর্বোপরি দেবব্রত অর্ঘ্যর কাছে মেলে ধরলেন রবীন্দ্রগানের অন্তর্জগৎ। দেবব্রতর কাছেই জানলেন রবীন্দ্রসংগীত সাধারণ শিল্প মাত্র নয়, এ গভীর ভাবের সাধনা। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তাভাবনা করার বিষয়টিও দেবব্রত ঢুকিয়ে দেন ছাত্রের মধ্যে। অর্ঘ্য এই সার্বিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর অর্জনকে প্রয়োগও করেছিলেন রবীন্দ্রগানের রূপায়ণে।
তবে মাঝে একবার জর্জদার ক্লাসে যাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কেননা ক্লাসের ফি মাসিক পাঁচ টাকা দেওয়ার ক্ষমতা অর্ঘ্যর ছিল না। গুরুকে বলতে দেবব্রত তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বাঙাল ভাষায় বলেছিলেন, ‘আগেকার গুরুরা খাওয়াইয়া-পরাইয়া শিক্ষা দিত, আমি তোমাকে খাওয়াইতে-পরাইতে পারুম না; তুমি শিক্ষ্যা যাও, যহন পারবা দিবা।’ অতএব দেবব্রতর কাছে শেখার আর কোনও বাধা রইল না।
গুরু সান্নিধ্যে অর্ঘ্য সেন
প্রথম ক্লাসে শিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের বর্ষার একটি গান, ‘কখন বাদল ছোঁয়া লেগে।’ তিনি শেখানোর সময় এক্সপ্রেশন, শব্দ উচ্চারণ, দম নেওয়ার জায়গা, লয় সবই নানাভাবে বোঝাতেন। কীভাবে বোঝাতেন? অর্ঘ্য নিজেই দেবব্রতর কথা উদ্ধৃত করে বলছেন, ‘তুমি যহন একটা গাছের ছবি আঁকবা, তহন কী একরকমের সবুজ দিয়াই আঁকবা? বিভিন্ন রকমের সবুজ শেড দিয়া আঁকলে তবেই একটা গাছের ছবি পরিপূর্ণ হয়। একটা পাতার মধ্যেও দুই রকমের সবুজ আছে।’ এইভাবে নানা ভাবনা ধরিয়ে দিতেন দেবব্রত। ফ্ল্যাট, প্রাণহীন গান একদম পছন্দ করতেন না। বলতেন, ‘পাঁচালি পইড়ো না, পাঁচালি পইড়ো না।’ গানে গলায় মডিউলেশন কোথায়, কীভাবে আনতে হবে দেখিয়ে দিতেন, বুঝিয়ে দিতেন এই জায়গায় গলা নরম করতে হবে, এই জায়গায় গলায় জোর দিতে হবে। তাঁর ক্লাসের কতকগুলো নিয়ম ছিল, সেসব মানা বাধ্যতামূলক ছিল– ঠিক সময়ে আসতে হবে, খাতা দেখে গান গাওয়া চলবে না, গান মুখস্থ থাকতে হবে।
অর্ঘ্য বলেছেন, প্রথম দিকে একবার জর্জদা এক অদ্ভুত কথা বলেছিলেন তাঁকে, ‘তুমি আমারে ভ্যাঙাও, তুমি তো ছোটো, তোমার নিজস্ব কোনও গায়কী নাই। আমারে ভ্যাঙাইতে ভ্যাঙাইতে একটা পথে আসবা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমারও একটা বোধ আসবো, তহন তোমার একটা নিজস্ব গায়কী সৃষ্টি হইবো।’ অর্ঘ্য সেনের গানে দেবব্রতর কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাব মিলবে না। দেবব্রতর শেখানো পথেই অর্ঘ্য তাঁর স্বকীয়তা গড়ে তুলেছিলেন। তৈরি করেছিলেন গানের নিজস্ব ভুবন।
শুভ গুহঠাকুরতা
প্রথম রেকর্ডে শুভ গুহঠাকুরতার প্রশিক্ষণে গেয়েছিলেন– ‘এই শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে’ আর ‘ছিন্নপাতার সাজাই তরণী’। শেষের গানটি তাঁর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে রইল। রবীন্দ্রনাথের বলা ‘চিরদিন আমি পথের নেশায় পাথেয় করেছি হেলা’ তাঁর জীবনেও সত্যি। গান নিয়ে পথ চলেছেন, পাথেয় নিয়ে কোনও দিন ভাবেননি। রবীন্দ্রনাথ যে-কথা বলছেন গানে, সে যেন আমারও বলার কথা, মনের কথা– এই ভাবনা নিয়ে গাইলে তবেই তো সে-গান শ্রোতাকে স্পর্শ করবে। রবীন্দ্রনাথের গান কীভাবে গাইব– এ-ব্যাপারে অর্ঘ্য যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করেছেন। নিজেই বলছেন: ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান আমরা কীভাবে শোনাবো? রবীন্দ্রনাথের কথাগুলি প্রায় সকলজনকেই এমনভাবে স্পর্শ করে যেন মনে হয় কথাগুলি শুধু রবীন্দ্রনাথেরই নয়, আমাদের নিজেদেরও। তাই আমি যখন গান করি তখন আমার নিজের মনের কথা ভেবেই গাইবার চেষ্টা করি। ফলে কী যেন একটি বেশি হয়ে যায় যা স্বরলিপিতে থাকে না। এমনকী স্বরলিপির মাত্রাভাগেরও এদিক ওদিক হয়। ফল কী হয়, জানি না। তবে গাইতে ভালো লাগে। এখন এই বেশির মাত্রা কীরকম হওয়া উচিত সেটাই ভাববার কথা। অনেকে বলেন কথার ভাবপ্রকাশে গানের সুরই যথেষ্ট। স্বরক্ষেপণের কম-বেশি করাটা বাহুল্য। কিন্তু অত্যন্ত সুরেলা কণ্ঠের শিল্পীকেও ব্যর্থ হতে দেখেছি শুধু স্বরলিপি পাঠের ফলে।… আমার মনের কথা বোঝাতে আমি রং লাগাবই, কম বা বেশি সেটা নির্ভর করবে আমার ভাবনা ও শিক্ষার উপর।… রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া সহজ, কিন্তু তাই সবাই গান। কিন্তু ভালো গাওয়া কঠিন।’ এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি থেকে অর্ঘ্য সেনের সংগীত চিন্তাটি স্পষ্ট। কীভাবে তিনি স্বকীয় গায়ন গড়ে নিয়েছিলেন, তাও অপ্রকাশ্য থাকে না। তবে এই যে তিনি স্বরলিপির মাত্রাভাগের‌‌‌ এদিক-ওদিক হওয়ার কথা বলেছেন সেটা তাঁর মঞ্চানুষ্ঠানে আমরা মাঝেমধ্যে পেয়েছি, কিন্তু রেকর্ডে নয়। কোনও কোনও গানের অন্তর্লীন নাটকটাকে তিনি যেভাবে প্রকাশ করতেন, তাতে অতিরেক কিছু ছিল না– ‘খোলো খোলো দ্বার রাখিও না আর’, ‘আর নহে আর নয়’, ‘দ্বারে কেন দিলে নাড়া ওগো মালিনী’, ‘পাছে সুর ভুলি এই ভয় হয়’ ইত্যাকার গান শুনলে তা বোঝা যাবে। শরত আকাশ সত্যি ম্লান হয়ে আসে তাঁর ‘আরো কিছুক্ষণ না হয় বসিও পাশে’ গানে। গহন মেঘমায়ার অবগুণ্ঠন খোলার কথা এল ‘এবার অবগুণ্ঠন খোলো’ গানে। ‘কী পাইনি তারি হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি’– রবীন্দ্রনাথ এ-কথা বললেও এর ভিতরে একটা বিষাদ আছে, অর্ঘ্য তাঁর গায়নে তাকে ছুঁতে পারেন। ‘সানাই’-এর ‘আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে’-তে বেদনা অনেক প্রত্যক্ষ, অর্ঘ্য সেইভাবেই প্রকাশ করেন। ‘যে আমি ওই ভেসে চলে’ বা ‘জানি জানি গো দিন যাবে’ অর্ঘ্যর কণ্ঠে একটা অন্য মাত্রা পায়। প্রকৃতির গানে বর্ষা-বসন্ত ছাপিয়ে জেগে থাকে শীতের দু’টি গান: ‘শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে বলে’ আর ‘এলো যে শীতের বেলা’। ‘স্বদেশ’ পর্যায়ের ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে তা বলে ভাবনা করা চলবে না’– তাঁর এই প্রত্যয় নিশ্চিত ভরসা জোগায়। একইরকম প্রাণবান ‘ফল ফলাবার আশা’, ‘আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান’, ‘ওহে সুন্দর মরি মরি’ বা ‘কবে তুমি আসবে বলে’। হৃদয়স্পর্শী নিবেদন– ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’, ‘কূল থেকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে’। কণ্ঠস্বর, শব্দোচ্চারণ, সুষম নাটকীয়তা, মগ্নতা– সব মিলেমিশে অর্ঘ্য সেন একেবারেই স্বতন্ত্র।
অর্ঘ্য সেন
গুরুর সব ব্যাপারই যে ছাত্র অনুসরণ করেছেন, তা নয়। দেবব্রত তাঁর গানে যেভাবে যন্ত্রের ব্যবহার করেছেন, অর্ঘ্য কিন্তু সেভাবে করেননি। অর্ঘ্যর রেকর্ডে যন্ত্রায়োজন অনেক পরিমিত। সুচিত্রা মিত্রর পরিচালনায় অনেক গান রেকর্ড করেছিলেন অর্ঘ্য, সুচিত্রা খুবই পছন্দ করতেন অর্ঘ্যর গান। এক রেকর্ডে দু’জনে যুগ্মকণ্ঠে শুনিয়েছিলেন ‘ওগো কিশোর আজি তোমার দ্বারে’ আর ‘নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জ ছায়ায় সম্বৃত অম্বর’। একটিতে যদি বসন্তের অনুষঙ্গ, অন্যটিতে সঘন বর্ষার ছবি। পাশাপাশি নবীন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গেও দ্বৈত কণ্ঠে গান গেয়েছেন অর্ঘ্য। শ্রীনন্দা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘এ শুধু অলসমায়া’, দেবারতি সোমের সঙ্গে ‘আলোকের এই ঝরনাধারায়’। রবীন্দ্র গীতিনাট্যের দীর্ঘবাদন রেকর্ডে তিনি অংশ নিয়েছিলেন, ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’-য়। আর মঞ্চে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের ‘ড্যান্সার্স গিল্ড’, শান্তি বসুর ‘নৃত্যাঙ্গন’-এর বিভিন্ন নৃত্যনাট্য প্রযোজনায় তিনি নিয়মিত শিল্পী ছিলেন।
পূর্বা দামের সঙ্গে যৌথ গানের রেকর্ড
একবার ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার সাহায্যকল্পে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মজার ঘটনা ঘটল। অনুষ্ঠানে গানে আছেন দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, অর্ঘ্য সেন, নাচে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার। দেবব্রত ঠিক করেছিলেন মঞ্জুশ্রী চাকীর নাচের সঙ্গে ‘নৃত্যের তালে তালে’ গানটি অর্ঘ্য গাইবেন। অর্ঘ্যর একদিকে জর্জদা, অন্যদিকে সুচিত্রা মিত্র। অর্ঘ্য গাইতে বসে কীরকম নার্ভাস হয়ে প্রথম লাইন গাওয়ার পর দুটো লাইন বাদ দিয়ে গাইলেন। মঞ্জুশ্রী স্টেজে ম্যানেজ করে নিলেন। অনুষ্ঠানের পর সুচিত্রা দেবব্রতকে জিজ্ঞেস করলেন, অর্ঘ্য এইরকম বাদ দিয়ে গাইল কেন! জর্জদা বলেছিলেন, ‘কী জানি, অগো বোধহয় পছন্দ হয় নাই!’ উদয়শঙ্করের দলেও এক সময় গান গেয়েছেন অর্ঘ্য।
নক্ষত্রভরা মঞ্চ
জর্জদার পাশাপাশি সন্তোষ সেনগুপ্তের গান খুবই ভালো লাগত অর্ঘ্যর। অর্ঘ্য বলছেন, ‘জর্জদার মতোই সন্তোষ সেনগুপ্তের গানের মধ্যে একটা বুদ্ধির ছাপ মেলে।… গান শুনলেই বোঝা যায় নিছক স্বরলিপির প্রতিলিপিই পরিবেশিত হচ্ছে না, রীতিমতো মেহনত করে, বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছেন। এই কিছু করাটাই মনে ধাক্কা দেয়। কারণ এই পরীক্ষা নিরীক্ষায় টেকনিক দক্ষতার যান্ত্রিকতা নেই, আছে প্রেম এবং উপলব্ধির আলো।’ এই বিশেষ পছন্দের মানুষটির কাছেও গান শিখেছেন অর্ঘ্য। মনে হয় অতুলপ্রসাদী।
শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, সমসময়ের অন্যান্য কাব্যগীতির দিকেও অর্ঘ্যর নজর ছিল। বিভিন্ন ধরনের গান শিখেছিলেন সন্তোষ সেনগুপ্ত ছাড়া সুপ্রভা সরকার, মঞ্জু গুপ্ত এবং রজনীকান্ত-দৌহিত্র দিলীপকুমার রায়ের কাছে। একটা সময় কলকাতা বেতারে রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি নজরুলগীতিও গাইতেন। রেকর্ড করেছিলেন রজনীকান্তের গান, অতুলপ্রসাদী। তাঁর কণ্ঠের কান্তগীতি ‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব’ বা ‘যদি মরমে লুকায়ে রবে’ মনে রাখতেই হবে। এখানেই উল্লেখ্য, অর্ঘ্য ভয়েস ট্রেনিং নিয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের কাছে যা বিশেষ কার্যকর হয়েছিল।
‘বহুরূপী’ নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কাজ করেছেন শম্ভু মিত্র, কুমার রায়দের সঙ্গে ‘রক্তকরবী’, ‘চার অধ্যায়’, ‘দশচক্র’ প্রভৃতি প্রযোজনায়। কাজ করেছেন ‘পঞ্চম বৈদিক’ দলের সঙ্গেও।
রবীন্দ্রসংগীতে সার্বিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছিলেন ‘সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার’ যা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের মধ্যে আর পেয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। টেগোর ফেলো নির্বাচিত হন। গানের পাশাপাশি সূচিকর্মে তাঁর ভালোবাসা ও পারদর্শিতা ছিল। এ-কাজে আনন্দ পেতেন।
শর্বরী রায়চৌধুরী ও অর্ঘ্য সেন
শান্তিনিকেতনে ফুলডাঙায় এক জমির এধারে বাড়ি করলেন কুমার রায়, অন্যদিকে অর্ঘ্য। নিজের মতোই অর্ঘ্যর বাড়িও অন্যরকম, আগাগোড়া কালো রঙের, নাম– ‘অর্ঘ্য সেনের কালো খোঁয়াড়’। সে-বাড়ি অবিশ্যি অর্ঘ্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। কলকাতায় সন্তোষপুরে একটা ফ্ল্যাটে বোনকে নিয়ে থাকতেন তিনি। যে কোনও কারণেই হোক একটা হতাশা গ্রাস করেছিল তাঁকে। গলা ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও মঞ্চ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের গান শেখানোর মধ্যেই গানের সঙ্গে যেটুকু যোগ ছিল। বরাবরই অবিশ্যি প্রচারের আলো থেকে দূরেই থাকতেন। তাঁর মতো নির্লোভ, প্রচারবিমুখ শিল্পী এখন বিরল।
শেষদিকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একটু অভিমান নিয়েই চলে গেলেন বুঝি। সত্যিই তো, কতটুকু স্বীকৃতি, সম্মান আর আমরা তাঁকে দিতে পেরেছি? তবে শিল্পী অনিঃশেষ। তাঁর কৃতিই তাঁর পরিচয়। মৃত্যুর পর বোঝা যাচ্ছে, তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। তৃষিত এ মরু ছেড়ে তিনি চলে গেলেন সব ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, কিন্তু ‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে’!
………….
লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত ছবিগুলি ‘অর্ঘ্য সেন ফ্যান ক্লাব’ ফেসবুক পেজের সূত্রে প্রাপ্ত