Robbar

রসবোধে রামকৃষ্ণের যোগ্য শিষ্য ছিলেন বিবেকানন্দ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 10, 2026 9:40 pm
  • Updated:January 11, 2026 12:25 am  

শ্রীরামকৃষ্ণ আবার জিলিপি খেতে খুব ভালোবাসতেন। ভরপেট খাওয়ার পরেও জিলিপি খেয়ে নিতেন। কেউ যদি বলতো– আপনি এই বললেন আর কিছু পেটে ঢুকবে না, তা জিলিপি খেলেন কী করে? শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে বলতেন, ‘কী জানো, পুলিশ হাত দেখালে সব গাড়ি থেমে যায়, কিন্তু লাটসাহেবের গাড়ি থামে না। জিলিপি লাটসাহেবের গাড়ি।’ নিঃসন্দেহে রসবোধে যথা গুরু তথা শিষ্য– কেউ কম যাননি।

কোহিনূর কর

রামকৃষ্ণদেবের প্রধান শিষ্য ও সারদা দেবীর স্নেহধন্য নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি জগৎশ্রেষ্ঠ সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ হিসাবে বিশ্বনন্দিত। পাশাপাশি এটুকু কারও অজানা নয় যে, স্বামীজি একজন বুদ্ধিমান, শক্তিমান ও তেজস্বী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তবে তাঁর মধ্যে যে রসবোধও কম কিছু ছিল না, সেই পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর সহজাত অনেক রসিকতার গল্প পড়ে। শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন অবতার-বরিষ্ঠ হয়েও নানারকম রসিকতার ছলে সবাইকে সদুপদেশ দিয়ে ঈশ্বরমুখী করে তুলতেন, স্বামীজিও মোটেই নীরস প্রকৃতির মানুষ ছিলেন না।

স্বামী বিবেকানন্দ

স্বামীজি কখনও সদানন্দ শিশু, কখনও কৌতুকপরায়ণ দুষ্টু ছেলে, আবার কখনও বা মজাদার হুল্লোড়ে কিশোর হিসাবে পরিচিত ছিলেন। শিশুকালে স্বামীজি তাঁর ভাই-বোনদের রাতে ঘুমনোর আগে গল্প বলতেন। এরকমই একটা গল্প ছিল এক বাগদী-বুড়িকে নিয়ে।

একদিন সেই বুড়ি তার পোষ্য ছাগলটাকে খুঁজে পাচ্ছে না। জানা গেল, একটা দুষ্ট লোক ছাগলটা চুরি করে সাবাড় করে দিয়েছে। বুড়ি সেই দুষ্ট লোকটাকে জিজ্ঞেস করে উত্তর পেল, ছাগলটা উদ্ধার হয়ে মানুষ হয়েছে, তারপর সে কাজী হয়ে এজলাসে বসে। বুড়ি তখন ছাগলের দড়িটা নিয়ে এজলাসে গিয়ে হাজির হয়ে দেখে, সত্যিই তো ছাগলটার যেমন দাড়ি ছিল কাজীরও তেমন দাড়ি, ছাগলের রং কালো ছিল আর কাজীর গায়ের রঙও খুব কালো। সব মিলে যাচ্ছে! বুড়ি তখন ছাগলের দড়িটায় একটা ফাঁস দিয়ে বারবার কাজীর দিকে দেখিয়ে দেখিয়ে কিছু একটা বলতে লাগল। প্রথমে চাপরাশিকে দিয়ে খবর নিয়ে কোনও লাভ হল না দেখে কাজী নিজে এজলাস থেকে নেমে বুড়ির কাছে গিয়ে কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করল। বুড়ি একটুও দেরি না করে কাজীর গলায় দড়িটা পরিয়ে দিয়ে বলতে লাগল, ‘আরে বাবা, তুই আমার ছাগল। তোকে আর এদের বাড়ি থাকতে হবে না, নিজের বাড়ি চল।’ কাজী তো অবাক, এজলাসের লোকজন হইচই করে উঠল। বুড়ি তখন বলল, ‘কাজী হয়ে বিচার করতে বসেছিস তাতে আমই খুব সুখী। তাই বলে কি এই বুড়িকে ভুলে যেতে হয়?’ কাজী ব্যাপারটা বুঝেশুনে দোষীকে খুঁজে বার করে শাস্তি দিল।

স্বামীজি শিশুদের মন ভালো বুঝতেন। গৌর নামে একটি ছেলে অল্প বয়সেই বখাটে হয়ে যাচ্ছে দেখে তার মা ছেলেটিকে মঠে দিয়ে এলেন। কিন্তু ওখানে গিয়ে গৌর রাখাল-মহারাজের পকেট থেকে টাকা-পয়সা চুরি করতে লাগল। রাখাল-মহারাজ গৌরকে ধরে নিয়ে সোজা স্বামীজির কাছে হাজির করলেন আর বললেন, তিনি নাকি গৌরকে আশকারা দিয়ে এরকম করে দিয়েছেন!

গৌর তো ভয়ে কাঠ। স্বামীজি গৌরকে একটুও বকাবকি না করে উল্টে রাখাল-মহারাজকে বললেন, ‘তুই মোহন্ত, সবার দেখার ভার তোর ওপর। ও ছেলেমানুষ, ইস্কুলের টিফিনে অবাক-জলপান, নকুলদানা, ঘুগনিদানা এসব খাওয়ার শখ– যেমন তোর-আমার ছেলেবেলায় ছিল। মাঝেমধ্যে দু-চার আনা দিয়ে দ্যাখ চুরি বন্ধ হয় কি না।’ শোনা যায়, এই গল্পটা গৌরবাবু বৃদ্ধ বয়সে নিজেই বলেছিলেন।

প্রয়োজনে স্বামীজি মজা করে সাজাও দিতে পারতেন। তিনি তখন আমেরিকায় বিনা পারিশ্রমিকে বক্তৃতা দিতে গিয়েছেন; খুব সামান্যভাবেই থাকতেন। ছোট একটা ঘরে কিছু খাওয়ার জিনিস আর মশলা রাখা ছিল। এক সাহেব ঘরে ঢুকে প্রত্যেকটা জিনিস কী জিজ্ঞাসা করে চেখে দেখতে লাগল। ভদ্রতার খাতিরে স্বামীজি সাহেবকে কিছু বলতেও পারছেন না। কী করেন? একটা পাত্রে অনেকগুলো গোটা গোটা লঙ্কা ছিল। সাহেব সেগুলো কী জিজ্ঞেস করতেই স্বামীজি বললেন, ‘এগুলো ভারতীয় কুল’– বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সাহেব তো এক মুঠো মুখে নিয়ে ঠ্যালা বুঝল। সে আর কোনওদিন ওই ঘরে ঢোকেনি।

খাদ্যাভ্যাস নিয়ে স্বামীজি খুব মজার কথা বলতেন, ‘যার দুপয়সা আছে আমাদের দেশে, সে ছেলেপিলেগুলোকে নিত্য কচুরী-মন্ডা-মেঠাই খাওয়াবে! ভাত রুটি খাওয়া অপমান! এতে ছেলেপিলেগুলো নড়ে-ভোলা পেট-মোটা আসল জানোয়ার হবে না-তো কী! এতবড় ষণ্ডা জাত ইংরেজ– ওরা ভাজাভুজি মেঠাই মণ্ডার নামে ভয় খায়– যাদের বরফান দেশে বাস, দিনরাত নিত্য কসরত। আর আমাদের অগ্নিকুণ্ডে বাস, এক ঘর থেকে আর এক ঘরে নড়ে বসতে চাই না– আহার লুচি-কচুরী-মেঠাই, ঘিয়েভাজা, তেলেভাজা! সেকেলে পাড়াগেঁয়ে জমিদার এক কথায় দশ ক্রোশ হেঁটে দিত, একশো বছর বাঁচতো। তাদের ছেলেপিলেগুলো কলকেতায় আসে, চশমা চোখে দেয়, লুচি-কচুরী খায়, দিনরাত গাড়ি চড়ে, আর প্রস্রাবের ব্যামো হয়ে মরে। কলকত্তাই হাওয়ার এই ফল।’

দ্য আর্ট ইনস্টিটিউট অফ শিকাগো, ইলিনয়। ছবি: কোহিনূর কর

এখানে উল্লেখ করা ভালো, শ্রীরামকৃষ্ণ আবার জিলিপি খেতে খুব ভালোবাসতেন। ভরপেট খাওয়ার পরেও জিলিপি খেয়ে নিতেন। কেউ যদি বলত– ‘আপনি এই বললেন আর কিছু পেটে ঢুকবে না, তা জিলিপি খেলেন কী করে?’ শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে বলতেন, ‘কী জানো, পুলিশ হাত দেখালে সব গাড়ি থেমে যায়, কিন্তু লাটসাহেবের গাড়ি থামে না। জিলিপি লাটসাহেবের গাড়ি।’ নিঃসন্দেহে রসবোধে যথা গুরু তথা শিষ্য– কেউ কম যাননি।

কুসংস্কার নিয়ে স্বামীজি ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘মানুষের স্বভাবই এই– তারা তোমাকে যত কম বুঝবে, ততই তোমাকে মহৎ ও বৃহৎ মনে করবে। একদা জ্যামিতি সকল বিজ্ঞানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল। আর অধিকাংশ লোক জ্যামিতির বিষয়ে অনভিজ্ঞ ছিল। তারা মনে করত, জ্যামিতিবিদ একটি সমচতুর্ভুজ এঁকে তার চার কোণে জাদুমন্ত্র বললেই সমগ্র পৃথিবী ঘুরতে শুরু করবে, স্বর্গের দ্বার খুলে যাবে, আর ভগবান নেমে পড়ে লাফাতে শুরু করবেন ও মানুষের ক্রীতদাস হয়ে পড়বেন।’

স্বামীজি যেমন খুব লঙ্কা খেতে ভালোবাসতেন, শোনা যায় তিনি আইসক্রিম খেতেও খুব পছন্দ করতেন। আমেরিকায় থাকতে এক প্রচণ্ড শীতের রাতে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছেন। সেদিনও তিনি আইসক্রিম ছাড়লেন না। খাওয়ার শেষে বিল দেওয়ার সময় ওয়েটার স্বামীজিকে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে বলে একটা ফোন ধরতে গেলেন। স্বামীজি হাঁক মেরে বললেন, ‘ম্যাডাম দেরি করবেন না যেন– যদি করেন, ফিরে এসে দেখবেন আইসক্রিমের ঠোঙার পাহাড়।’

মানুষের বিচিত্র বাসনার ফল কী হতে পারে, তা নিয়ে স্বামীজির করা একটা মজার গল্প আছে।

একজন গরিব লোকের ব্যাকুল প্রার্থনায় খুশি হয়ে ভগবান তাকে বর দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই নাও পাশা। যে কোনও প্রার্থনা করে তিনবার এই পাশা ফেললে তা পূরণ হবে, কিন্তু মনে রেখো মাত্র তিনবারই।’ সে তো আহ্লাদে আটখানা হয়ে স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলো– কী বর চাওয়া যায়। স্ত্রী বলল, ‘ধনদৌলত চাও!’ সে বলল, ‘দ্যাখো, আমাদের দুজনেরই নাক খ্যাঁদা, লোকজন বড্ড ঠাট্টা-তামাশা করে। প্রথমে সুন্দর নাক চাই!’ স্বামী-স্ত্রী দু’জন অনেক তর্কাতর্কির পর লোকটা রেগেমেগে বলল, ‘আমি আর কিছু চাই না, আমাদের কেবল সুন্দর নাক হোক।’ এ-কথা বলে যেই না সে পাশা ফেলল অমনি দু’জনের সর্বাঙ্গে রাশি-রাশি নাক গজাল। এ তো মহা বিপদ! তাড়াতাড়ি করে দ্বিতীয়বার পাশা ফেলে সে বলল, ‘সব নাক চলে যাক!’ অমনি সব নাক চলে গেল, আর পুরনো খ্যাঁদা নাকও তাদের রইল না। সর্বনাশ! ওরা তখন ভাবল এবার যদি পাশা ফেলে সুন্দর দুটো নাক চেয়ে নেয়, লোকে জিজ্ঞেস করবে কী করে পেল। সব কথা বললে লোকজন ওদের গর্দভ ভাববে যে, তিন-তিনটে বর পেয়েও নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে পারল না! কাজ নেই বাবা সুন্দর নাকে, আগের অবস্থায় ফেরাই ভালো। তখন তারা তৃতীয়বার পাশা ফেলে নিজেদের হারানো খ্যাঁদা নাক ফিরিয়ে আনল।

স্বামীজির পদধূলি-ধন্য শিকাগো শহরের যে প্রতিষ্ঠানে তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল, একজন ভারতীয় ছাত্র হিসেবে জায়গাটি বহু বছর আগে নিজের চোখে দেখার ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছিলাম। ১৮৯৩ সালের স্থাপত্য এখনকার মতো ছিল না; তা সত্ত্বেও সেদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়।

দ্য আর্ট ইনস্টিটিউটের মিশিগান এভিনিউ-এর সামনে দেওয়া সান্মানিক স্ট্রিট সাইন ‘স্বামী বিবেকানন্দ ওয়ে’। ছবি: কোহিনূর কর

আর্ট ইনস্টিটিউটের সামনের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভিতরে একটু এগলেই বিশাল এক লেকচার হল। সেখানে পৌঁছেই কল্পনা করলাম অসম্ভব প্রতিভাদীপ্ত গেরুয়াধারী সেই হিন্দু সন্ন্যাসীর কথা। আমার সারা গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠল। যাঁরা স্বামীজির সেই ভুবনভোলানো বক্তৃতা সরাসরি নিজের কানে শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন তাঁরা কতটা ভাগ্যবান ছিলেন, তা বলাই বাহুল্য।