Robbar

ফ্লপ ছবি, হিট গান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 12, 2026 3:56 pm
  • Updated:April 12, 2026 5:46 pm  

‘বান্ধে হাত’। ১৯৭৩ সালের ছবি। অমিতাভ-মুমতাজ। একেবারেই চলেনি। সিনেভাষায় বললে: ‘ফ্লপ’। কিন্তু ছবির গান? ‘ও মাঝি রে, যায় কাহা’? চূড়ান্ত হিট করে। ফ্লপ ছবি, কিন্তু হিট গান, সে তো আশাজির জন্যই। এখনও আমি যেখানে শো করতে যাই, এই গানের রিকোয়েস্ট আসে। আশাজির গানটা হিন্দি, আমি এই গানের বাংলা করেছিলাম। এখন বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে গাই।

ইন্দ্রাণী সেন

লতা না আশা? এ প্রশ্ন বারেবারেই গানের পৃথিবীতে উচ্চারিত হয়। মানুষজনকে দ্বিধাবিভক্ত হতে দেখি। অথচ আমি, সেই ছোটবেলা থেকেই এ-প্রশ্ন নিয়ে দ্বন্দ্বে থাকিনি। আমি আশাজির ভক্ত, লতাজির তুলনায় কম। ছোট থেকেই আশাজির গান শুনেছি। গান তুলেছি। পাড়ার মাইকে গেয়েওছি সে গান। হাততালি পেয়েছি। ছোটবেলায়, সদ্য গানবিশ্বে ঢুকে পড়ে এই হাততালি পাওয়া, সে তো আশাজির জন্যই।

আশা ভোঁসলে

কীরকম গান গেয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন আশা ভোঁসলে? সে গানের কি নির্দিষ্ট কোনও ধরন রয়েছে? আমি বলব, আশাজির গানের মধ্যেকার বৈচিত্রই মূল কথা। ভজন, ধ্রুপদী, গজল, মরাঠি গান তো গেয়েছেনই, কিন্তু পাশাপাশি ‘হুলালা’ গানও গেয়েছেন, মানে যে-গান জনপ্রিয় রুচির গান, যে-গানে বিসর্জনের নৃত্যগীত। আশা ভোঁসলের এই ব্যাপারটাই আমাকে খুব আকর্ষণ করেছিল। পরে, রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে যখন জোট বাঁধলেন, ওই ১৯৫৯ সালের আশপাশ হবে, তখন বহু রেকর্ড প্রকাশিত হতে শুরু করল একের পর এক। সব রেকর্ডই কিনতাম। আশাজির মতো আমি বোধহয় আর একজনেরই ফ্যান, তিনি অবশ্য বঙ্গবাসী– খাস উত্তরের মান্না দে।

আশা ভোঁসলে ও রাহুল দেব বর্মন

সাতের দশক, সিনেমার দশক, গানের দশকও। দারুণ সব ছবি এসেছিল পর্দায়। সেই ছবির গানে, বিশেষ করে সুধীন দাশগুপ্তর সুরে আশাজির প্রচুর বাংলা গান রয়েছে। সঙ্গে আর ডি বর্মন তো ছিলেনই। তবে অবাক লেগেছিল, আশাদি সারাজীবন সলিলদার সুরে কোনও গান করেননি। আটের দশকের শেষদিকে, আমার প্রত্যেকটি রিমেক অ্যালবামে আশাজির একটা করে গান থাকতই।

’৯৩ সালে একটা ঘটনা ঘটল আমার গানজীবনে। আর ডি বর্মন তাঁর সুরে আমার দুটো গান তৈরি করতে রাজি হলেন। তিনি কলকাতায় এলেন। আলাপ হল। আমরা বেশ কিছুদিন একসঙ্গে কাটালাম গানের সুবাদেই। পরে জেনেছিলাম, আমার গানগুলো আশাজিকে শুনিয়েছিলেন। এবং আশাজি প্রশংসা করেছিলেন! আর ডি বলেছিলেন, আমার গান শুনে উনিও খুব ইমপ্রেসড। এমনকী, বোম্বেতে কাজের একটা কথাও হয়েছিল, কিন্তু পরের বছরই জানুয়ারিতেই চলে যান আর ডি।

ইন্দ্রাণী সেন ও রাহুল দেব বর্মন

অদ্ভুতভাবে, আশাজির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। এমনকী, কলকাতায় অনেকবার অনুষ্ঠান করলেও আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু আমি ওঁর অসম্ভব ফ্যান। আমি আজ যতটুকু গান গাইতে পারি– আধুনিক, হিন্দি বা গজল– আমার পরোক্ষ গুরু হচ্ছেন আশাজি। নয়তো এতরকম দিকে আমি গান নিয়ে যেতাম না।

আশাজির গলায় আমার প্রিয় গান: ‘জীবন গান গাহে কে যে’। আমার অ্যালবামে রেখেছিলাম এই গান। আবার সেই ক্যাসেটে ‘যাব কি যাব না’-ও ছিল। বরাবরই আমি চেয়েছি আশাদির বিভিন্ন জঁরকে ধরতে। শেষের দিকে তো উনি আগের মতো অত সংখ্যায় গাইতেন না। কিন্তু যখন গাইছিলেন– বহু ভালো হিন্দি গান, বিশেষ করে, গুলাম আলির সুরে হিন্দি গজল– সেগুলো অনবদ্য লেগেছিল শুনে। সে গান শুধু নিজে তুলিনি, ছাত্রীদেরও শিখিয়েছি।

মনে পড়ে, ‘দিল পড়োশি হ্যায়’ অ্যালবামের কথা। ততটা বিক্রিসফল নয় হয়তো। গুলজার, আর ডি বর্মন এবং আশা ভোঁসলের যৌথতায় কী অপূর্ব অ্যালবাম ওটা! যাঁরা গানের দরদী, তাঁদের কাছে অবশ্য এই অ্যালবাম ছিলই।

মনে করে দেখুন ‘বান্ধে হাত’। ১৯৭৩ সালের ছবি। অমিতাভ-মুমতাজ। একেবারেই চলেনি। সিনেভাষায় বললে: ‘ফ্লপ’। কিন্তু ছবির গান? ‘ও মাঝি রে, যায় কাহা’? চূড়ান্ত হিট করে। ফ্লপ ছবি, কিন্তু হিট গান, সে তো আশাজির জন্যই। এখনও আমি যেখানে শো করতে যাই, এই গানের রিকোয়েস্ট আসে। আশাজির গানটা হিন্দি, আমি এই গানের বাংলা করেছিলাম। এখন বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে গাই।

মনে পড়ে, ‘ইজাজত’ (১৯৮৭) ছবির সবকটা গানই তো আশাজির। ওই ছবির ‘খালি হাত সাম আয়ি হ্যায়’– আমার খুব প্রিয় গান। গানটার বাংলা করেছিলাম ১৯৯৭ সালে: ‘যেতে যেতে নিভে আসা আলোকে যে বলে যায়’। একটা অ্যালবামের জন্যই। এই সময়টায় সিডি এসে গিয়েছে।

আশাজির প্রয়াণে, তাঁর গানের বৈচিত্রের কথা আরও নিবিড়ভাবে মনে পড়ল।  মুসলিম বাইজির গান থেকে শ্রীকৃষ্ণের ভজন– সবেতেই তাঁর অনায়াস যাতায়াত। আশাজি প্রয়াত হয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর গান রয়ে গেল।