Bibha Sengupta: A Life in Rabindra Sangeet। Robbar
Robbar
  • ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ৬ অক্টোবর ২০২৬

সারাজীবন সুরজীবী

সুর লাগানোর যে তরিকায় একচুলও এদিক-ওদিক হয় না, অর্ধমাত্রা-সিকি মাত্রার তফাত আলাদা করে চেনা যায়, গমক-গিটকিরির গয়না পরানো গানকেও শেষমেশ রবীন্দ্রসংগীত বলেই চেনা যেত, সেই ঘরানার সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন বিভা। তবে যে স্বতঃস্ফূর্তি ওঁকে বিশিষ্ট করে তুলছিল তার মূলে বুঝি দেবব্রতই ছিলেন। আয়োজনের বাহুল্য নেই। একরত্তি দেখনদারি নেই। নিখাদ গান। নির্মেদ গায়ন। 

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১৫:৪৩   
Facebook WhatsApp Messenger

‘চলে গেলেন বিভা সেনগুপ্ত। আমাদের শ্রদ্ধা জানাই।’ সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ রবীন্দ্রচর্চা ভবনের সম্পাদক অয়নেন্দ্রনাথ বসুর কাছ থেকে খবরটা পেতেই ছ্যাঁত করে উঠেছিল বুকটা। 

৯৪ বছর। জীবৎকাল হিসেবে দীর্ঘই। কিন্তু বেশ তো ছিলেন বিভা। নবতিপর বয়সে যে খ্যাতির বলয় ওঁকে ঘিরে ক্রমে প্রসরমাণ ছিল, তার মাঝখানটিতে স্থিতধী হয়ে উজ্জ্বল একটি অবস্থান তৈরি হয়েছিল ওঁর। গান শেখাচ্ছিলেন। গান গাইছিলেন। এখনই চলে যাবেন– এমন কোনও প্রস্তুতি আমাদের মনে তৈরি হয়নি। 

আজকাল সোশাল মিডিয়ার দৌলতে ওঁর গান ঘুরে-ফিরে আসত। দাদরা-কাহারবা-তেওড়ায় বাঁধা গানে ওঁর প্রজন্মের যা সিদ্ধি, তাতে একটু এদিক-ওদিক হওয়ার জো থাকে না। কিন্তু টপ্পাঙ্গের কোনও কোনও গান এমন অনায়াসে গেয়ে দিচ্ছিলেন বিভা, আর সেইসব গায়ন কারওর মোবাইল ফোন মারফত এমন তুরন্ত আমাদের নাগালে আসছিল যে, অবাক না-হয়ে উপায় থাকছিল না! মনে পড়ে যাচ্ছিল গাঙ্গুবাই হাঙ্গলকে। নবতিপর গাঙ্গুবাইকে শুনেছে কলকাতা। বেশ কয়েকবার। ওই বয়সেও কিরানা ঘরানার খেয়ালের প্রাণপ্রতিমা হয়ে উঠতে দেখেছি ওঁকে। আর মনে মনে ভেবেছি আবদুল করিম খানকে। গাঙ্গুবাইয়ের মতো ওজনদার গলা হলেও যাকে বলি ‘সাধা গলা’ সেইটে বিভার ছিল না। তবে রবীন্দ্রসংগীতের গায়কদের ভয়েস ট্রেনিং যে ধরনের, যাতে স্বরস্থানের উপর যেটুকু নিয়ন্ত্রণ থাকলে কাজ চলে যায়, তার চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশিই ছিল বিভার। হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল গানের ভিত মজবুত ছিল। অবলীলায় গাইতে পারতেন যে কোনও পর্যায়ের গান। ১৯৮০-র দশক থেকে ২৫ বৈশাখের ভোরে কবিপ্রণামের অনুষ্ঠানে কবিপক্ষের সন্ধ্যায় অনেক বছর শুনেছি ওঁকে। রবীন্দ্রসদনে, জোড়াসাঁকোতে। নির্ভার কিন্তু নিখুঁত গান। নিপাট এবং নির্ভরযোগ্য। মনে পড়ে, ২০০০ নাগাদ গীতবিতানের একটি অনুষ্ঠানে কমলা বসুর রবীন্দ্রসংগীত শুনে বুঝে পাচ্ছিলাম না কীভাবে ওঁর গুণপনার কদর করব। অধ্যাপক যশোধরা বাগচী আমায় বলেছিলেন, ‘ওঁর গায়কি শোনো। ওটাই আসল।’ 

zoom
ছবি: লেখক

বস্তুত, অপরাহ্নবেলার বিভা সেনগুপ্ত-র তুরুপের তাস ছিল ওঁর গায়কি। যে গায়কি শৈলজারঞ্জন মজুমদার হয়ে মায়া সেনের গলা ছুঁয়ে বিভার মধ্যে থিতু হয়েছিল– সেই গায়কি। দিনে দিনে বার্ধক্য তাতে জং ধরিয়েছিল, কিন্তু মরচে পড়া আলোতে যে আলো থাকে, তার দ্যুতি কিছু কম রমণীয় ছিল না।

ক’মাস আগে কালীঘাট পার্কে রবীন্দ্র চর্চা ভবনের বইমেলার উদ্বোধনে এলেন। সুমিতা চক্রবর্তী ও দেবাশিস মজুমদারের পাশে বসে কোনও যন্ত্রানুষঙ্গ ছাড়া একেবারেই খালি গলায় ‘তুমি কি কেবলই ছবি’ গাইছিলেন। আড়াই মিনিটের পরিবেশন। কী ঐশ্বর্যমণ্ডিত, যে, না-শুনলে বিশ্বাস করা যাবে না। কথার মর্মে পৌঁছে একেকটি অভিব্যক্তি। ‘ওই যারা দিনরাত্রি’ বলতে দিয়ে দি-ন-রা-ত্রি-র মধ্যবর্তী প্লুতস্বরগুলিকে মীড়ের দোলায় এমন করে নাড়িয়ে দিলেন, ‘হায় ছবি’-র মধ্যে যেভাবে হাহাকার ভরে দিলেন, মনে হল গানটির উৎসমূলে থাকা কাদম্বরী দেবীর প্রতিকৃতির সামনে বিহ্বল রবীন্দ্রনাথকে দেখতে পাচ্ছি! এমন গানের শেষে বিলিতি আদবের হাততালিকে বেয়াদবি মনে হয়, আপনা থেকেই সাধুবাদ উঠে আসে কণ্ঠে।

কার্যত শেষদিন অবধি গান যে তাঁকে ছেড়ে যায়নি, এর চাইতে বড় প্রসাদ আর কী-ই বা চাইতেন পারেন একজন শিল্পী? 

zoom
ছবি: লেখক

ওঁকে শেষ শুনলাম গেল ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে, মহাজাতি সদনে। সেদিন পয়লা আশ্বিন। শান্তিনিকেতন থেকে নাচ-গান-নাটকের দল ‘সুন্দর’ এসেছিলেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ করতে। মঞ্চায়নের আগে সম্মেলক গানের ক’টি অনুষ্ঠান হল। প্রথমটি বিভা সেনগুপ্তের নেতৃত্বে ওঁর কাছে তৈরি অমিতায়নের ছাত্রীদের। স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়াম হাতে মধ্যমণি স্বয়ং বিভা। পর্দা ওঠার আগে যে কোনও কারণে হোক মাইক্রোফোন খোলা ছিল। ওঁর গলা ভেসে আসছিল। আয়োজকদের কাউকে কাছেপিঠে দেখতে না-পেয়ে যেন মনঃক্ষুণ্ণ একটু। ‘কত্তাদের কাউকে দেখছি না!’ অভিমানী শোনাচ্ছিল ওঁকে। 

পর্দা উঠতে সে-সবের আর বালাই নেই। দু’টি শরতের গান গাইলেন ছাত্রীদল– ‘শরতে আজ কোন অতিথি’ আর যদ্দুর মনে পড়ছে ‘আমার নয়ন ভুলানো এলে’। গুরুর বয়স ৯৪। শিষ্যাদের গড় বয়স ষাটের আশপাশে। এসরাজ তবলা মন্দিরা কিবোর্ড সহযোগে নিপুণ নিপাট পরিবেশনা। দক্ষিণী গীতবিতান রবিতীর্থের উঁচু দরের কাছাকাছি মান। গান হয়ে যেতে আয়োজকদের প্রণাম আর প্রণামিতে খুশি হয়ে উঠে যাচ্ছিলেন বিভা। শ্রোতৃমণ্ডলী ওঁর গলায় রবীন্দ্রসংগীত শুনবার আবদার করলেন। আয়োজকদের সম্মতি মিলে গেল ইশারায়। এবং কী আশ্চর্য, কোনও পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই দু’টি গান গেয়ে দিলেন। ‘মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে’ গাইলেন একেবারে স্বপ্নোত্থিতের মতো। শুনতে ভালো লাগছে। এ-ও শুনতে বুঝতে পারছি যে, আর তিরন্দাজের মতো স্বরক্ষেপণ করছে না কণ্ঠ। দু’-তিনবার এক-আধ মাত্রা কম পড়ছে। তবলিয়া সামলে নিচ্ছেন। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে যা প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে দিচ্ছে, তা হল ভাব আর সেই ভাবের ভিয়েনে ঘনীভূত হওয়া রস। শারদীয়া সুবাস ম ম করছে মহাজাতি সদন জুড়ে। 

এরপরই এল টার্নিং পয়েন্ট। তৃতীয় গানের অনুরোধ। এবং ‘কৃষ্ণকলি’। মুক্তছন্দের গান। তালের ঝামেলা নেই। কলাপের মতো বিকাশ পেল ওঁর কণ্ঠ আর সেই কণ্ঠবাহিত কল্পনা। ‘কালো’ উচ্চারণের মধ্যে যে বিস্ময়ের যে বিস্ফোরণ হয়– যা শান্তিদেব ঘোষ-সুচিত্রা মিত্র ঘুরে আমাদের শ্রবণে পাকা আসন পেয়েছে– বিভার উচ্চারণে তার আসনটি একটু মেটে। অথচ মধুর। বিস্ময়ের মধ্যে অমন মধুর রসের আনাগোনা হয় না সচরাচর। সেদিন হল। পুরুষের মুগ্ধতার গান নারীর কণ্ঠে আরও একবার মোহন রূপ পেল। কী অপরূপ সেই বাণীরূপ ‘আমিই জানি আর জানে সেই মেয়ে’!

খবরের খাতিরে লেখা থাকুক যে আগরতলার মেয়ে বিভা। জন্মেছিলেন ১৯৩২-এর ১২ মে। ত্রিপুরা রাজদরবারের উঁচু চাকুরে ছিলেন বাবা। বাড়িতে গানবাজনার চল ছিল। কম বয়সে নানান রকমের গান শিখেছেন। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের এক শাগরেদ কৃষ্ণজিৎ দেববর্মনের কাছে তালিম পেয়েছেন। পরে ১৯৫৮-তে কলকাতায় এসে দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষা নিয়েছিলেন বিভা। এ নিয়ে মাঝেসাঝে দু’-চার কথা বলেছেনও নিজে, ‘জীবনের পরম প্রাপ্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু দেবব্রত নয়, ওঁর গায়কিতে মায়া সেনের প্রভাব ছিল বেশি। কলকাতায় আসার পর থেকে মায়ার কাছেই সবচেয়ে বেশি শিখেছেন। সুর লাগানোর যে তরিকায় একচুলও এদিক-ওদিক হয় না, অর্ধমাত্রা-সিকি মাত্রার তফাত আলাদা করে চেনা যায়, গমক-গিটকিরির গয়না পরানো গানকেও শেষমেশ রবীন্দ্রসংগীত বলেই চেনা যেত, সেই ঘরানার সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন বিভা। তবে যে স্বতঃস্ফূর্তি ওঁকে বিশিষ্ট করে তুলছিল তার মূলে বুঝি দেবব্রতই ছিলেন। আয়োজনের বাহুল্য নেই। একরত্তি দেখনদারি নেই। নিখাদ গান। নির্মেদ গায়ন। 

zoom
উত্তরাধিকারের হারমোনিয়াম

গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগে উজ্জ্বলা হয়ে ওঠেননি। যে যুগে সুচিত্রা কণিকা-নীলিমাদের হাতে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাটন, সুমিত্রা-ঋতু যেখানে সেকেন্ড লেগ দৌড়নোর জন্য প্রতীক্ষমাণ, সেখানে বিভা একটু পিছিয়েই শুরু করেছিলেন। কবে প্রথম গ্রামোফোন কোম্পানির দমদম গিয়েছিলেন জানি না, তবে ১৯৭০-তে রেকর্ড হওয়া ‘যায় দিন শ্রাবণ দিন যায়’ লং প্লেয়িং রেকর্ডের ডাস্ট জ্যাকেটে ওঁর নামটা দেখতে পেয়ে উদ্বেল হলাম। বিশাখাপত্তনম মেইন রোডের রেডিয়ো হোম থেকে এটি কিনেছিলেন আমার পিতা। নির্দেশনায় সন্তোষ সেনগুপ্ত, সহকারী মায়া সেন। তাতে কনিষ্ঠ গায়িকা বিভা। কোরাসে গলা দিয়েছিলেন। প্রথম গানটিই ছিল ‘বিশ্ববীণা রবে বিশ্বজন মোহিছে’। এখন শুনছি আর ভাবছি, এর মধ্যে কোনটি ওঁর গলা বের করা অসম্ভব!

zoom

রেকর্ড না। ক্যাসেট-সিডির যুগেও প্রথমাদের দলে ছিলেন না বিভা। শিল্পীর চেয়ে শিক্ষকের পরিচয়কেই শ্রেয় জেনেছিলেন। তবু অশীতিপর বিভাকে যে আসনে বসিয়েছিল বাঙালি সংগীতপিপাসুর দল, নবতিপর বিভাকে প্রাণের আহ্লাদে শ্রদ্ধা করেছিল, সেই বিভার চলে যাওয়া আমাদের মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি করল, তা ভরাট হওয়ার নয়। ইউটিউবে তাঁর সজাগ উপস্থিতি যেন ওই কাব্যে উপেক্ষিতার কাঙ্ক্ষিত মর্যাদাকেই সূচিত করছে।

Bibha Sengupta Bibha Sengupta obituary Debabrata Biswas Kolkata music Maya Sen Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar veteran Bengali singer

Share this article on