Robbar

এক বাঙালি গুপ্তচরের তিব্বত অভিযান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 5, 2026 8:42 pm
  • Updated:January 5, 2026 8:42 pm  

শরচ্চন্দ্রের গোয়েন্দাগিরি ছিল অত্যন্ত শৈল্পিক। তিনি জপমালার প্রতিটি দানা ব্যবহার করতেন পথ মাপার জন্য। সাধারণ জপমালায় ১০৮টি দানা থাকলেও তাঁর মালায় ছিল ১০০টি দানা; প্রতি ১০০ কদম হাঁটার পর তিনি একটি করে দানা সরাতেন। তাঁর প্রার্থনাচক্র বা জপযন্ত্রের ভেতরে পবিত্র মন্ত্রের বদলে লুকনো থাকত কম্পাস এবং জরিপের মানচিত্র। এমনকী তাঁর লাঠির খোপে লুকনো থাকত থার্মোমিটার, যা দিয়ে তিনি বিভিন্ন মঠ ও গিরিপথের উচ্চতা মাপতেন। তাঁর এই অসামান্য কৌশল আধুনিক গোয়েন্দা ইতিহাসের এক বিস্ময়।

দীপঙ্কর পাড়ুই

‘গরম লাগে তো তিব্বত গেলেই পারো।’

সুকুমার রায়ের সেই ‘হ য ব র ল’-র বেড়ালটার কথা মনে আছে? যে খুব সহজেই বলেছিল– ‘কলকেতা, ডায়মন্ড হারবার, রানাঘাট, তিব্বত। ব্যস্! সিধে রাস্তা, সওয়া ঘণ্টার পথ, গেলেই হলো।… গেছোদাদা যদি থাকত, তা হলে সে ঠিক ঠিক বলতে পারত।’

বাঙালির বরাবরই কোথাও না কোথাও একজন গেছোদাদা থাকবেই। যেমনটি ছিলেন মাগনদাস ওরফে পণ্ডিত শ্রী শরচ্চন্দ্র দাস। সুকুমার রায় মজা করে তিব্বত যাওয়ার যে ‘সওয়া ঘণ্টার পথ’ বাতলে দিয়েছেন– তা সওয়া ঘণ্টার পথ না হলেও, একথা সত্য যে সেইসময় ব্রিটিশদের তিব্বত অভিযানের খুঁটিনাটির খবর হয়তো তিনি রাখতেন।

শ্রী শরচ্চন্দ্র দাস

হিমালয়ের অপর প্রান্তে বরফাবৃত যে দেশ রয়েছে, তাকে বলা হয় ‘তুষার দেশ’ বা ‘গঙস-য়ুল’। তিব্বতি ভাষায় ‘গঙস’ কথাটির অর্থ হল তুষার আর ‘য়ুল’ অর্থ দেশ। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে এই দেশটি উল্লিখিত হয়েছে ‘ভোট দেশ’ নামে, যার বর্তমান নাম তিব্বত। রহস্যাবৃত এই তুষারদেশ দেশটিকে জানার অভিপ্রায়ে সেই দুঃসাহসী বাঙালি, রায়বাহাদুর শরচ্চন্দ্র দাস ঘর ছেড়েছিলেন।

১৮৪৯ সালে চট্টগ্রামের এক বৈদ্য পরিবারে তাঁর জন্ম। সেসময়কার ব্রিটিশ ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন বাঙালির পক্ষে হিমালয়ের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নিষিদ্ধ দেশ তিব্বতে প্রবেশ করা ছিল অকল্পনীয়। শরচ্চন্দ্র ভোটবিদ্যা বা তিব্বতবিদ্যার অন্যতম পথিকৃৎ, পরিব্রাজক, গবেষক ও আবিষ্কারক। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে প্রকৌশলবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে যন্ত্রপাতির দুনিয়া থেকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল হিমালয়ের রহস্যময় উপত্যকায়। স্বাস্থ্যগত কারণে এবং নির্মল বাতাসের খোঁজে তিনি দার্জিলিংয়ে চলে যান। ১৮৭৪ সালে সেখানে ‘ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তার প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন।

এই স্কুলই শরচ্চন্দ্রের জীবনের মোড় বদলে দিয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার সিকিম, ভুটান এবং তিব্বতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য এই স্কুলটিকে একটি অলিখিত ‘গোয়েন্দা ও ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করত। শরচ্চন্দ্র সেখানে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি স্থানীয় লামাদের কাছ থেকে তিব্বতি ভাষা ও সংস্কৃতিতে অসামান্য ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র এবং পরবর্তী জীবনে ছায়াসঙ্গী উগ্যেন গ্যাৎসো ছিলেন তাঁর তিব্বতি-শিক্ষার প্রধান শিক্ষক।

সেই সময়টি ছিল ‘গ্রেট গেম’-এর যুগ। মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে ব্রিটিশরা তিব্বতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহের জন্য মরিয়া ছিল। তিব্বত তখন বিদেশিদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনও শ্বেতাঙ্গ সেখানে প্রবেশ করলেই নিশ্চিত মৃত্যু। এই অবস্থায় ব্রিটিশরা শরচ্চন্দ্রের মতো ধীমান ও সাহসী বাঙালিদের বেছে নেয় ‘পণ্ডিত অভিযাত্রী’ হিসেবে। ১৮৭৯ এবং ১৮৮১ সালে শরচ্চন্দ্র দু’বার তিব্বত অভিযানে যান, ‘রতন প্রধান’ নাম নিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে। তাঁর এই যাত্রা ছিল পদে পদে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ভরা। হাড়কাঁপানো -৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, তিব্বতি প্রহরীদের তীক্ষ্ণ নজর এবং দুর্গম গিরিপথ– সব প্রতিকূলতাকে তিনি জয় করেছিলেন কেবল বুদ্ধিবলে।

শরচ্চন্দ্র দাস ও উগ্যেন গ্যাৎসো যে পথে তিব্বত গিয়েছিলেন তার মানচিত্র

উনিশ শতকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ কিংবা গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া একদল ভারতীয়কে গোপনে তিব্বত ও মধ্য এশিয়ায় পাঠাত, যাঁদের সাংকেতিক নাম ছিল ‘পণ্ডিত’। এই দলে যেমন ছিলেন বিখ্যাত নৈন সিং রাওয়াত বা কিষাণ সিং, তেমনই ছিলেন শরচ্চন্দ্র দাস। তবে শরচ্চন্দ্রের সঙ্গে অন্য পণ্ডিতদের একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। নৈন সিং বা কিষাণ সিং ছিলেন মূলত প্রশিক্ষিত সার্ভেয়ার বা মানচিত্রকার; তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ। কিন্তু শরচ্চন্দ্র ছিলেন একজন পুরোদস্তুর স্কলার। গবেষক। অন্যান্য পণ্ডিতরা যেখানে কেবল দড়ি দিয়ে পথ মেপেছেন, শরচ্চন্দ্র সেখানে তিব্বতের ইতিহাস, মঠের শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রাচীন পাণ্ডুলিপি উদ্ধারে বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। তিনি যখন জপমালার দানা গুনতেন, তখন তাঁর মাথায় কেবল পথের দূরত্ব ঘুরত না, বরং তিনি চিন্তা করতেন কীভাবে তিব্বতি ব্যাকরণের সাথে সংস্কৃত ব্যাকরণের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

পাণ্ডিত্যের কারণেই তিনি তিব্বতের সর্বোচ্চ ধর্মীয় মহলে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন, যা অন্য কোনও ভারতীয় বা ইউরোপীয় অভিযাত্রীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে তিব্বতিদের ‘স্কাই ব্যুরিয়াল’ বা আকাশ-সমাধি প্রথার কথা। মৃতদেহকে পাহাড়ের চূড়ায় খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে রাখা– যাতে শকুনরা তা খেয়ে ফেলে। বৌদ্ধ দর্শনের চরম ত্যাগ ও অনিত্যতার প্রতীক। উঠে এসেছে তিব্বতিদের চা পানের বিচিত্র ধরন (মাখন ও লবণ মিশ্রিত চা), তাদের পশমের পোশাক এবং ধর্মীয় উৎসবগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।

সমকালীন ভারতের তুলনায় তিব্বতের নারীরা যে অনেক বেশি স্বাধীন ছিল, সেকথা তিনিই প্রথম জানান। তিব্বতে মেয়েরা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করত এবং সমাজে তাদের বিশেষ মর্যাদা ছিল। শরচ্চন্দ্রের এই সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণগুলো তৎকালীন ইউরোপীয় নৃতাত্ত্বিকদের কাছে তিব্বত সম্পর্কে জানার প্রথম প্রামাণ্য দলিল হয়ে উঠেছিল। শরচ্চন্দ্র দাস সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও, তাঁর সংগৃহীত তথ্য ১৯০৪ সালের ব্রিটিশদের তিব্বত অভিযানের মূল ভিত্তি ছিল। কর্নেল ফ্রান্সিস ইয়ংহাজব্যান্ড যখন তিব্বতে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর হাতে ছিল শরচ্চন্দ্রের আঁকা লাসার মানচিত্র এবং তিব্বতের রাজনৈতিক কাঠামোর বিবরণ।

শরচ্চন্দ্রের ডায়েরি পড়ে ব্রিটিশরা জানতে পেরেছিল যে, তিব্বতিরা বহির্বিশ্বের প্রতি কতটা সন্দিহান। যদিও শরচ্চন্দ্র শান্তির উপাসক ছিলেন, কিন্তু তাঁর দেশাত্মবোধ ও গবেষণার নেশা তাঁকে ইতিহাসের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। শরচ্চন্দ্রের গোয়েন্দাগিরি ছিল অত্যন্ত শৈল্পিক। তিনি জপমালার প্রতিটি দানা ব্যবহার করতেন পথ মাপার জন্য। সাধারণ জপমালায় ১০৮টি দানা থাকলেও তাঁর মালায় ছিল ১০০টি দানা; প্রতি ১০০ কদম হাঁটার পর তিনি একটি করে দানা সরাতেন। তাঁর প্রার্থনাচক্র বা জপযন্ত্রের ভেতরে পবিত্র মন্ত্রের বদলে লুকনো থাকত কম্পাস এবং জরিপের মানচিত্র। এমনকী তাঁর লাঠির খোপে লুকনো থাকত থার্মোমিটার, যা দিয়ে তিনি বিভিন্ন মঠ ও গিরিপথের উচ্চতা মাপতেন। তাঁর এই অসামান্য কৌশল আধুনিক গোয়েন্দা ইতিহাসের এক বিস্ময়।

১৮৮১ সালের অভিযানে তিনি তিব্বতের রাজধানী লাসায় পৌঁছন এবং ত্রয়োদশ দালাই লামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিব্বতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ব্যক্তি সেনচেন লামার সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। শরচ্চন্দ্র তাঁকে আধুনিক ফটোগ্রাফি দেখান। গুটিবসন্তের টিকা দান করেন। এবং একসময় তাঁর আস্থা অর্জন করেন। তার বিনিময়ে সেনচেন লামা তাঁকে লাসা পরিদর্শনের অনুমতি ও বিরল প্রাচীন পুথিপত্র সংগ্রহের সুযোগ করে দেন। কিন্তু এই সফলতার পেছনে ছিল এক করুণ ট্র্যাজেডি। যখন তিব্বত সরকার জানতে পারে শরচ্চন্দ্র ব্রিটিশ চর ছিলেন, তখন তারা সেনচেন লামাকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়। লামার পরিবারকে কারারুদ্ধ করা হয়। এই ঘটনা শরচ্চন্দ্রকে সারাজীবন মানসিকভাবে দগ্ধ করেছিল।

শরচ্চন্দ্রের খ্যাতি কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৮৮৪ সালে তিনি বেঙ্গল গভর্নমেন্টের উপদেষ্টা হিসেবে জাপান সফর করেছিলেন। সেখানে জাপানি বৌদ্ধধর্মের সাথে ভারতীয় ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের তুলনামূলক গবেষণা করেন। তাঁর সঙ্গে জাপানি সন্ন্যাসী একাই কাওয়াগুচির গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিল; যিনি পরে দার্জিলিংয়ের ‘লাসা ভিলা’-তে থেকে তিব্বত ভ্রমণের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে ইংরেজরা বাঙালিদের কিছুটা নরম বা ঘরকুনো জাতি হিসেবে মনে করত। কিন্তু শরচ্চন্দ্র দাসের মতো একজন মানুষ যখন ছদ্মবেশে, মৃত্যুকে পরোয়া না-করে, হিমালয়ের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তিব্বত জয় করেছিলেন; তাঁর সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে চার্লস আলফ্রেড এলিয়ট বা মেকলে সাহেব তাকে ‘Hard Son of Soft Bengal’ শিরোপায় ভূষিত করেন। ভাইসরয় লর্ড কার্জন তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন এবং ১৯১২ সালে তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি দেন। লরেঞ্জো ফিনিশ এবং অন্যান্য পাশ্চাত্য গবেষকরা তাঁকে তিব্বতবিদ্যার আধুনিক পথিকৃৎ বলে স্বীকার করেন। ব্রিটিশ লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কিম’-এর ‘হুররি বাবু’ চরিত্রটি সম্ভবত শরচ্চন্দ্রের অদম্য চরিত্রের আদলেই তৈরি করেছিলেন।

শরচ্চন্দ্র দাস যখন তিব্বতে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কেবল একজন পর্যটক ছিলেন না, বরং এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক হিসেবে তিব্বতি মঠগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ লক্ষ করেছিলেন। তাঁর ‘Journey to Lhasa and Central Tibet’ বইটিতে তিনি ‘তাশিলুনপো’ মঠের এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে হাজার হাজার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা ‘লামা’ ভোরের আলো ফোটার আগেই মন্ত্রোচ্চারণে মঠের প্রাঙ্গণ মুখরিত করে তুলতেন। তিনি মঠের বিশাল গ্রন্থাগারগুলোতে রাখা হাজার বছরের পুরনো তালপাতার পুথিগুলো দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। লিখেছিলেন, তিব্বতের এই মঠগুলো কেবল ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, বরং একেকটি জ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয়। সামিয়ে মঠের স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হয়ে জানিয়েছিলেন, এই মঠটির নকশা ভারতের ওদন্তপুরী বিহারের অনুকরণে তৈরি। শরচ্চন্দ্রই প্রথম বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন, ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হলেও তিব্বতের এই মঠগুলোর শীতল প্রকোষ্ঠে সেই প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান আজও সজীব। তাঁর লেখায় মঠের ভেতরে মাখনের প্রদীপ বা ‘বাটার ল্যাম্প’-এর মৃদু আলোয় বুদ্ধমূর্তির বর্ণনা আজও পাঠকদের সেই রহস্যময় পরিবেশে নিয়ে যায়।

 

‘Indian Pandits in the Land of Snow’ নামক শরচ্চন্দ্রের বইটি ঐতিহাসিক গবেষণার এক অমূল্য সম্পদ। এতে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, তিব্বতের সংস্কৃতি আসলে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিরই এক প্রসারিত রূপ। এখানেই অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের তিব্বতযাত্রার রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা পাওয়া যায়। কীভাবে বিক্রমশীলা মহাবিহার থেকে একজন অশীতিপর বৃদ্ধ পণ্ডিত হিমালয়ের তুষারপাত উপেক্ষা করে তিব্বতে ধর্মপ্রচারের জন্য গিয়েছিলেন, তা শরচ্চন্দ্রের কলমে অমর হয়ে আছে। তিনি শান্তরক্ষিত এবং পদ্মসম্ভবের অবদান নিয়েও সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। এই বইটির গুরুত্ব এখানেই যে, এটি তিব্বতিদের চোখে হিন্দুদের প্রতি যে সম্মান ছিল, তা পুনরুদ্ধার করে। শরচ্চন্দ্র দেখিয়েছিলেন, তিব্বতিরা ভারতকে ‘আর্যভূমি’ বা পবিত্র দেশ হিসেবে গণ্য করত। তাঁর এই গবেষণা তিব্বত ও ভারতের মধ্যে হাজার বছরের হারানো সাংস্কৃতিক যোগসূত্রকে পুনরায় স্থাপন করেছিল।

দার্জিলিংয়ে শরচ্চন্দ্রের নিজস্ব বাসভবন ‘লাসা ভিলা’ ছিল সে সময়ের এক বৌদ্ধিক কেন্দ্র। তিব্বত থেকে ফেরার সময় তিনি সাথে করে শত শত দুর্লভ পুথি, থাঙ্কা চিত্র এবং মানচিত্র নিয়ে এসেছিলেন। ফলে বাড়িটি অনেকটা মিউজিয়ামের মতো হয়ে উঠেছিল। জাপানি সন্ন্যাসী একাই কাওয়াগুচি যখন তিব্বত যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি শরচ্চন্দ্রের কাছেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। কাওয়াগুচি শরচ্চন্দ্রের পাণ্ডিত্য দেখে অবাক হয়ে লিখেছিলেন যে, এমন তিব্বতি ভাষা কোনও অ-তিব্বতি মানুষের পক্ষে শেখা প্রায় অসম্ভব।

শরচ্চন্দ্র কেবল নিজে জানতেন না, তিনি অন্যকেও শেখাতেন। লাসা ভিলাতে বসে তিনি তাঁর বিখ্যাত অভিধান তৈরির কাজ করতেন। ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে তিব্বতি ভাষার প্রতি যে অনুরাগ তৈরি করেছিলেন, তারই ফসল ছিলেন উগ্যেন গ্যাৎসোর মতো বীর অভিযাত্রীরা। শরচ্চন্দ্রের সংগৃহীত তথ্য কেবল অ্যাকাডেমিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন যখন ফ্রান্সিস ইয়ংহাজব্যান্ডের নেতৃত্বে তিব্বতে সামরিক অভিযান পাঠান, তখন শরচ্চন্দ্রের তৈরি মানচিত্র এবং তিব্বতি কর্মকর্তাদের চরিত্র বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যদিও শরচ্চন্দ্র নিজে যুদ্ধ বা রক্তপাত পছন্দ করতেন না, কিন্তু তাঁর তথ্যগুলো ব্রিটিশ সরকারকে তিব্বতের রাজনৈতিক নাড়ি নক্ষত্র বুঝতে সাহায্য করেছিল।

হিমালয়ের অন্তর্গত ডোংখা পাস-এর পথে শরচ্চন্দ্র দাস

তিব্বতিদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পাহাড়ের গোপন পথ এবং কোন মঠের ক্ষমতা কতটুকু– এসব তথ্য ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ শরচ্চন্দ্রের ডায়েরি থেকেই প্রথম পেয়েছিল। মেকলে সাহেব তাঁর এই দক্ষতাকে সম্মান জানিয়েই বলেছিলেন, শরচ্চন্দ্রের ধমনীতে কেবল বাঙালির রক্ত নয়, বরং এক দুর্জয় সাহস প্রবহমান। শরচ্চন্দ্রের সফলতার অন্ধকার দিকটি ছিল তাঁর বন্ধুদের পরিণতি। সেনচেন লামা, যিনি শরচ্চন্দ্রকে বড় ভাইয়ের মতো আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং দালাই লামার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছিলেন, তাঁকে তিব্বত সরকার ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেয়। যখন তিব্বতিরা জানতে পারে যে শরচ্চন্দ্র একজন ভারতীয় (ব্রিটিশ প্রজা) এবং তিনি তথ্য পাচার করছেন, তখন সেনচেন লামাকে প্রকাশ্যে সাংপো নদীতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। শরচ্চন্দ্র যখন এই খবর পান, তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল এবং ব্রিটিশ সরকারের কাজ অজান্তেই তাঁর পরম বন্ধুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি যখন তাঁর আত্মজীবনী লিখছিলেন, তখন এই অপরাধবোধ তাঁকে তাড়া করে বেড়াত। তাঁর ‘Autobiography of a Buddhist Indian’ বইটিতে এই বেদনার সুর স্পষ্ট।

৫ জানুয়ারি ১৯১৭ এই মহান বাঙালি মনীষীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। শরচ্চন্দ্র দাস আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, গবেষণার সাথে দুঃসাহসিক অভিযানের সমন্বয় কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তিনি কেবল ব্রিটিশদের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করেননি, বরং প্রাচীন ভারতের যে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার তিব্বতের হিমালয়ে হারিয়ে গিয়েছিল, তা উদ্ধার করে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন। আজ যখন আমরা তিব্বত বা হিমালয় নিয়ে আলোচনা করি, তখন শরচ্চন্দ্র দাসের নাম গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। তিনি ছিলেন বাঙালির অদম্য মেধা ও হিমালয়প্রমাণ সাহসের এক অনন্য প্রতীক।

শরচ্চন্দ্রের সন্তানেরা তিব্বতবিদ না হলেও, তাঁরা প্রত্যেকেই সুশিক্ষিত এবং তৎকালীন সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। শরচ্চন্দ্র দাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র বিমলাচরণ দাস বাবার কর্মস্থল দার্জিলিংয়ের সাথেই যুক্ত ছিলেন। তিনি একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতেন। পিতার মৃত্যুর পর ‘লাসা ভিলা’ এবং শরচ্চন্দ্রের বিশাল ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর অন্য সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ চিকিৎসা ও আইনি পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। তবে শরচ্চন্দ্র তাঁর কাজের নেশায় এতটাই মগ্ন থাকতেন যে তাঁর সন্তানদের জীবন নিয়ে বিস্তারিত জীবনীমূলক তথ্য খুব একটা নথিবদ্ধ হয়নি। দার্জিলিংয়ের ‘লাসা ভিলা’ ছিল একটি অত্যন্ত বিদগ্ধ পরিবেশ। তাঁর সন্তানেরা ছোটবেলা থেকেই দেশি-বিদেশি বড় বড় পণ্ডিত ও অভিযাত্রীদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। জাপানি সন্ন্যাসী একাই কাওয়াগুচি যখন এই বাড়িতে ছিলেন, তখন তিনি শরচ্চন্দ্রের পরিবারের সদস্যদের সাথেও বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। শরচ্চন্দ্র দাসের পরিবারের বংশধরেরা এখনো কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় এবং বিদেশে ছড়িয়ে আছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো তাঁর সেই বিশাল লাইব্রেরি এবং তিব্বতি পাণ্ডুলিপি, যার একটি বড় অংশ পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গবেষণাগার এবং এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত হয়েছে।

শরচ্চন্দ্র দাসের অমর কীর্তি তাঁর ‘A Tibetan-English Dictionary with Sanskrit Synonyms’। এটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বা ‘ম্যাগনাম ওপাস’। তিব্বতি ভাষার প্রতিটি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ-সহ এই অভিধানটি আজও বিশ্বজুড়ে তিব্বতবিদ্যার গবেষকদের প্রধান আকর গ্রন্থ। ভাষা ও ব্যাকরণের প্রতি তাঁর এই টান থেকেই তিনি রচনা করেছিলেন ‘An Introduction to the Grammar of the Tibetan Language’। তিব্বতি ভাষার গঠন ও জটিলতা সাধারণ মানুষের কাছে সহজ করে তোলার জন্য এই ব্যাকরণ বইটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল শব্দের সংকলন নয়, বরং তিব্বতি সংস্কৃতির একটি কোষগ্রন্থ। ১৮৮১ সালে তিব্বত থেকে ফেরার পর তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর এই অভিধানের পেছনে ব্যয় করেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, তিব্বতি ভাষার অনেক শব্দ সরাসরি সংস্কৃত থেকে অনূদিত হয়েছে। তাই তিনি প্রতিটি তিব্বতি শব্দের সমার্থক সংস্কৃত শব্দ খুঁজে বের করেন। এই অভিধানটি তৈরির সময় তিনি তিব্বতি ব্যাকরণ নিয়ে যে গভীর গবেষণা করেছিলেন, তা আজও ভাষাবিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়কর। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে সংস্কৃত শব্দগুলো তিব্বতি উচ্চারণে ও লিপিতে পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর এই কাজের ফলেই তিব্বতে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং বৌদ্ধ দর্শনের বহু হারানো তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। জার্মান ও ফরাসি তিব্বতবিদরা আজও এই অভিধানকে তাঁদের গবেষণার ‘বাইবেল’ হিসেবে গণ্য করেন।

দার্জিলিং-এর হিমালয়ান টিবেটান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত তিব্বতি-ইংরেজি অভিধানের সংস্করণ

শরচ্চন্দ্রের বর্ণনায় তিব্বতি সমাজ ছিল এক জীবন্ত জাদুঘর। এছাড়া তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে The Hierarchs of Golden Tibet, The ‘Doctrine of Transmigratin’এবং তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ‘Autobiography of a Buddhist Indian’’ তিনি ১৮৯২ সালে কলকাতায় ‘Buddhist Text Society’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই নামে একটি বিখ্যাত জার্নালও প্রকাশ করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে শরচ্চন্দ্র দার্জিলিংয়ের তাঁর প্রিয় ‘লাসা ভিলা’-তেই সময় কাটাতেন। তাঁর সংগ্রহে থাকা তিব্বতি পুথিগুলোর গন্ধ এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য তাঁকে তিব্বতের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিত। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন যে, তাঁর আত্মা আসলে হিমালয়ের ওপারেই রয়ে গেছে।

জাপানি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী একাই কাওয়াগুচি যখন তিব্বত থেকে ফিরে আসেন, তখন তিনি শরচ্চন্দ্রের কাছেই তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন। বাঙালির এই মনীষী তখন এক বিশ্বজনীন বৌদ্ধিক সেতুর নাম হয়ে উঠেছিলেন। শরচ্চন্দ্র দাস আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নন। আধুনিককালে যখন তিব্বতের ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে, তখন তাঁর তৈরি অভিধান ও সংগৃহীত পুথিগুলোই প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, একজন বাঙালি কেবল কলম ধরতেই জানে না, প্রয়োজনে দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে অজানাকে জয় করতেও পারে। তাঁর ‘রতন প্রধান’ বা ‘মাগনদাস’ পরিচয়টি আসলে বাঙালির বহুমুখী প্রতিভার এক বহিঃপ্রকাশ। তিনি যখন জপমালার প্রতিটি দানায় এক একটি কদম মাপতেন, সেখান থেকে হয়তো তিনি আধুনিক ভারতের ভূগোলের ভিত তৈরি করছিলেন। তাই শরচ্চন্দ্র দাস বাঙালির বীরত্ব ও মেধার এক অমর সংমিশ্রণ।