
মাইক্রোস্কোপের নীচে আমাদের শরীরের ক্রোমোজমগুলোকে ছোট্ট এক-এক জোড়া মোজার মতো দেখতে লাগে। আর তাই ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত মানুষদের তৃতীয় ক্রোমোজমটিকে বোঝাতে তৃতীয় বা ‘মিসম্যাচড’ মোজার অবতারণা। সেখান থেকেই ‘রক ইয়োর সক্স’ ট্যাগলাইনটি তৈরি। একটি বাড়তি ক্রোমজোম নিয়ে জন্মানো মানুষদের সম্মন্ধে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতেই ‘লট্স অফ সকস’ ক্যাম্পেন। ভিন্নতা সত্বেও ওরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ণময় মোজা সেই একাত্মতার উদযাপনের কথা বলে।
আজ যদি রাস্তায় বেরিয়ে দেখেন দু’ পায়ে দু’রকম মোজা পরে চলেছে স্কুলের ছেলেমেয়েরা, রংচঙে, ডোরাকাটা দু’রকম মোজা বড়দের পায়েও, তবে আপনিও তা পরে নিন। মিল নয়, অমিল মোজা। এ বিশ্বসংসারের হাজারো বিভিন্নতার মতো আরও এক বৈচিত্রকে না হয় স্বাভাবিক বলে মেনে নিলেন। কারণ আজ ২১ মার্চ। বিশ্ব ডাউন সিন্ড্রোম দিবস। ২০১২ সাল থেকে রাষ্ট্রসংঘের জেনারেল অ্যাসেমব্লি এই দিনটিকে ‘ডাউন সিন্ড্রোম ডে’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতি বছর নতুন কোনও বিষয়কে বেছে নেওয়া হয় এই দিনটির বিশেষ বার্তা হিসেবে। এ বছরের বার্তা, ‘একাকিত্ব নয়, একসঙ্গে চলা’।

ডাউন সিন্ড্রোম এক জিনগত অবস্থা যেখানে ভ্রূণের কোষ বিভাজনে কিছু অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়। মানুষের শরীরে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থাকে। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে ২১-তম জোড়ায় ২টির বদলে ৩টি ক্রোমোজম থাকে। এই একটি বাড়তি ক্রোমোজমের উপস্থিতিই ডাউন সিন্ড্রোমের প্রধান কারন। ২১তম জোড়ায় ৩ টি ক্রোমোজম থাকার কারণেই যেহেতু ডাউন সিন্ড্রোম ঘটে থাকে, তাই ক্যালেন্ডারের পাতায় ২১/৩ তারিখটিকে উৎসর্গ করা হয় বিশ্বের সমস্ত ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত মানুষদের জন্যে। ব্রিটিশ চিকিৎসক ড. জন ল্যাংডন ডাউন প্রথম এই অস্বাভাবিকতার কথা তাঁর ১৮৬৬ সালের এক গবেষণাপত্রে লেখেন। তিনি এই অস্বাভাবিকতাগুলিকে বিভিন্ন জাতিগত বা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের নিরিখে শ্রেণীবিভাগ করেন। যেমন– মালয়, ককেশিয়ান, ইউরেশিয়ান, মঙ্গোলিয়ান ইত্যাদি। ড. জনের সেই গবেষণাপত্রের মূল বিষয় ছিল মঙ্গোলিয়ান টাইপ, যাকে তিনি পরবর্তীকালে নিজের নামে নামকরণ করেন ‘ডাউন সিন্ড্রোম’ হিসেবে। আজও ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত মানুষদের ‘মঙ্গোলয়েড’ বলে সমাজ চিহ্নিত করে। ড. জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তাঁর করা এই জাতিগত শ্রেণিবিভাগ আসলে বর্ণবিদ্বেষমূলক। তবে ডাউন সাহেবের যুক্তি ছিল, যদি একটি জিনঘটিত অসংগতির কারণে একজন সাদা চামড়ার মানুষের সন্তান অন্য এক জাতির চেহারাগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়, তবে তা প্রমাণ করে সমস্ত মানুষ একই প্রজাতির জীব। জাতিগত পার্থক্য আসলে মানুষের প্রজাতির অভ্যন্তরীণ তফাত মাত্র। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মানুষ বলে যে ধারণা তখন প্রচলিত ছিল, তার বিপক্ষে ড. ডাউন-এর এ এক সপাট যুক্তি।

পৃথিবীর গড়পড়তা হিসেব ধরলে, সাধারণত প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে একজন মানুষ ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত। ২০২৬-এর দেশভিত্তিক হিসেব বলছে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা মালটায়– প্রতি লাখে ৯৮.৮৬ জন। এরপর আছে ব্রুনেই (৯৭.২), আয়ারল্যান্ড (৯৩), ব্রিটেন (৮৩.৭৬), গ্রিস (৭৫.৬৪)। ভারতে জন্মানো প্রতি ৮৩০টি শিশুর মধ্যে একজন ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত এবং দিনে গড়ে প্রায় ৭০-৮০টি শিশু এই লক্ষণ নিয়ে জন্মায়। মাতৃত্বের বয়সের সঙ্গে সন্তানের এই রোগ প্রবণতা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। মহিলাদের সন্তান ধারণের বয়স বেশি হলে এই জিনগত অস্বাভাবিকতার ঝুঁকি বাড়ে।

ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুরা নানা শারীরিক মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। বাক, শ্রবণ, বৌদ্ধিক হরেক সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয় তাদের। সমস্যা হয় হার্ট এবং পাচনতন্ত্রেও। আর একটি শিশুর অসুস্থতা তার পুরো পরিবারটিকেই এক কঠিন টানাপোড়েনের মধ্যে ঠেলে দেয়। জন্মের পর থেকে শিশুটির বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে পরিবারটিকে মুখোমুখি হতে হয় নানা সমস্যার। চিকিৎসার জটিলতার থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক বর্জনের প্রবণতা। সমাজের মূল স্রোতের থেকে পিছিয়ে পড়া এই মানুষগুলিকে পিছনে রেখেই এগিয়ে যায় সমাজ। উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং সহযোগিতার অভাবে তারা পায় না গুণগতভাবে উন্নত শিক্ষার সুযোগ। খাতায় কলমে যতই ‘ইনক্লুসিভ এডুকেশন’-এর কথা বলা হোক না কেন, বাস্তবের ছবিটা কিন্তু অন্য কথাই বলে। তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবার গরজ দেখায় না বিশেষ কেউ। কেউ এসে আশ্বাসের হাতটা বাড়িয়ে দেয় না। খুব স্বাভবিকভাবেই একাকিত্বের বোধ গ্রাস করে তাদের এবং তাদের পরিবারটিকেও। সমাজের এক অপ্রয়োজনীয় অংশ হয়ে টিকে থাকার লড়াই চলতে থাকে।

মাইক্রোস্কোপের নীচে আমাদের শরীরের ক্রোমোজমগুলোকে ছোট্ট এক-এক জোড়া মোজার মতো দেখতে লাগে। আর তাই ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত মানুষদের তৃতীয় ক্রোমোজমটিকে বোঝাতে তৃতীয় বা ‘মিসম্যাচড’ মোজার অবতারণা। সেখান থেকেই ‘রক ইয়োর সক্স’ ট্যাগলাইনটি তৈরি। একটি বাড়তি ক্রোমজোম নিয়ে জন্মানো মানুষদের সম্মন্ধে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতেই ‘লট্স অফ সকস’ ক্যাম্পেন। ভিন্নতা সত্বেও ওরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ণময় মোজা সেই একাত্মতার উদযাপনের কথা বলে।

তবে শুধু একটা দিন নয়। এই একাত্মতা যদি নিত্যকার অভ্যাসে পরিণত করা যায়, তবেই আজকের দিনের বার্তাটি সার্থকতা পাবে। তাদের শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবন সবেতেই চাই আর একটু সংবেদনশীলতা। ওদের দিনযাপনের মান হোক আরও একটু উন্নত। পথেঘাটে, ট্রেনেবাসে ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত কোনও মানুষকে দেখলে, কৌতূহল নয়, অনুকম্পা নয়, বাড়িয়ে দিন বন্ধুত্বের হাত। হাজার প্রতিকূলতার মাঝে যে মা-বাবা তাকে বড় করছেন মনে মনে তাদের কুর্ণিশ জানান। আবারও, সহানুভূতি নয়, তাঁদের কাছে পৌঁছে দিন বন্ধুত্বের উষ্ণতা। নিঃসঙ্গতার অবসাদ থেকে তাদের বের করে আনতে বাড়িয়ে দিন সহমর্মিতার হাত। একাকিত্ব থেকে উত্তরণ হোক এক সাবলীল যৌথতায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved