
১৯৬৯ সালে বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের ধারা যখন ক্রমশ স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, সেই সময় পাকিস্তানি প্রশাসনিক শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পন্থা হিসেবে কথাসাহিত্যিক বিপ্লবী সত্যেন সেন, সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সারের নেতৃত্বে গড়ে উঠল ‘উদীচী’। স্বাধীনতা ও সাম্যের, সমাজ নির্মাণের এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম। বাঙালির সার্বিক মুক্তি চেতনাকে ধারণ করে শুরু হল সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। ‘উদীচী’ দোসর রূপে পেল ‘ছায়ানট’কে। ভাষা আন্দোলন থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন– সমগ্র দেশের মানুষের মুক্তির অধিকারকে প্রবল থেকে প্রবলতর রূপ দিল।
গত শতকের আটের দশকের সূচনায় শান্তিনিকেতনের গুরুপল্লিতে এক পৌষসন্ধ্যায় নির্বাপিত হল নিভৃত বিপ্লবী সত্যেন সেনের প্রাণপ্রদীপ। তাঁর চোখের আলো আগেই নিভেছিল, এবার তিনি যাত্রা করলেন পরমলোকে। শিয়রে ছিলেন অশীতিপর মেজদিদি প্রতিভা সেন; আর কিছু নিকট আত্মীয়স্বজন ছাড়া শান্তিনিকেতনে তাঁর আট বছর অবস্থানের কথা জানার চেষ্টা করেননি কেউ। অথচ উভয় বঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের, কৃষক আন্দোলনের অন্যতম রূপকার ছিলেন এই অকৃতদার মানুষটি– যিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং উত্তরকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।

জন্মেছিলেন বিশ শতকের সূচনায়, ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ বিক্রমপুর জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সোনারং গ্রামে। পিতা ধরণীমোহন সেন এবং মাতা মৃণালিনী সেনের চারটি সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ সত্যেন। সোনারং গ্রামের সেন পরিবারের ঔজ্জ্বল্য ছিল শিক্ষায়, মেধায়, স্বদেশ চেতনায়। শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্য আশ্রম গড়ে ওঠার কালে যিনি ছিলেন পাণ্ডিত্যে, অধ্যাপনায় গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের ঠিক পরেই, সেই আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন– সত্যেন সেনের পিতৃব্য। আরেক পিতৃব্য মনমোহন সেন ছিলেন শিশুসাহিত্যিক। ফলে পরিবারে শিক্ষা-সংস্কৃতি-সাহিত্যচর্চা ও মননের বিশেষ পরিবেশ ছিল।

বিদ্রোহ ও সংগ্রামের পাশাপাশি কথাশিল্পী সত্যেন সেনের সাহিত্যকর্ম সমানভাবে প্রবহমান ছিল। বাংলাদেশের শস্যশ্যামলা স্বরূপ আর স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট তাঁর উপন্যাসগুলিকে সাহিত্যরসে সমৃদ্ধ করেছিল। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ভোরের বিহঙ্গী’ প্রকাশিত হল ১৯৫৯ সালে। তারপর একে একে ‘রুদ্ধদ্বার মুক্ত প্রাণ’, ‘অভিশপ্ত নগরী’, ‘পদচিহ্ন’, ‘পুরুষমেধ’, ‘আল-বেরুনী’, ‘কারাজীবনের অভিজ্ঞতায় সাত নম্বর ওয়ার্ড’, ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’, ‘অপরাজেয়’, ‘মা’, ‘একুল ভাঙে ওকুল গড়ে’ প্রভৃতি উপন্যাস। পাশাপাশি ছোটগল্প রচনাতেও তিনি স্বাক্ষর রাখলেন। রচনা করলেন জীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বিপ্লবী রহমান মাস্টার’, ‘সীমান্তসূর্য আব্দুল গফফার’ প্রভৃতি গ্রন্থ। উভয়বঙ্গে সাহিত্যচর্চার মূল স্রোতের পাশাপাশি সত্যেন সেন দৃঢ়ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন– যে কথা আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকখানি অজ্ঞাত থেকে গিয়েছে।

১৯৬৯ সালে বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের ধারা যখন ক্রমশ স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, সেই সময় পাকিস্তানি প্রশাসনিক শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পন্থা হিসেবে কথাসাহিত্যিক বিপ্লবী সত্যেন সেন, সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সারের নেতৃত্বে গড়ে উঠল ‘উদীচী’। স্বাধীনতা ও সাম্যের, সমাজ নির্মাণের এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম। বাঙালির সার্বিক মুক্তি চেতনাকে ধারণ করে শুরু হল সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। ‘উদীচী’ দোসর রূপে পেল ‘ছায়ানট’কে। ভাষা আন্দোলন থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন– সমগ্র দেশের মানুষের মুক্তির অধিকারকে প্রবল থেকে প্রবলতর রূপ দিল। যেহেতু সত্যেন সেন কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাই গ্রামবাংলার পথেঘাটে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনের সহায়ক হয়ে উঠল। তারপর ‘উদীচী’র সেনানীরা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ঠাঁই করে নিল।

সত্যেন সেনের সৃষ্টিকর্ম ও সাহিত্য তার জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে সমাজ ও বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি রূপে বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাসে সংযুক্ত হল। মানুষের জীবন সংগ্রাম ও শ্রম সভ্যতার ইতিহাসই তাঁর সৃষ্টিকে পূর্ণতা দিয়েছিল।
সত্যেন সেন সংগীতেরও স্রষ্টা। মানুষের গণ সংগ্রামে তাঁর গান শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়, শোষণ মুক্তির আন্দোলনে অন্যতম আয়ুধ হয়ে উঠেছিল। তাঁর রচিত গণসংগীত ‘চাষি দে তোর লাল তোর সেলাম লাল নিশানা রে’ তৎকালীন শ্রমিক কৃষকদের জাতীয় সংগীত হয়ে উঠেছিল। সত্যেন সেন তাঁর নির্ভীক সাংবাদিকতা দিয়ে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। জীবনের সকল প্রতিকূলতা ও চড়াই-উতরাইকে অতিক্রম করে তিনি তাঁর লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। মানুষের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রামের দ্বারা বাঙালির জাতির ইতিহাসে বিশেষত বর্তমান আত্মঘাতী বাঙালির কাছে পথপ্রদর্শক।

সাতের দশকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পরেও সত্যেন সেন শান্তিনিকেতনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যখন তাঁর মেজদিদি প্রতিভা সেনের গৃহে ছিলেন, তখন সন্জীদা খাতুন তার গবেষণা-সন্দর্ভ ‘রবীন্দ্র সঙ্গীতের ভাব সম্পদ’-এর কাজে শান্তিনিকেতনে ছিলেন। নিয়মিত সত্যেন সেনের সঙ্গে দেখা করা এবং তাঁকে গান শোনানো সন্জীদা মাসিমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এ কথা আমি তাঁর মুখে বহুবার শুনেছি। সত্যেন সেন প্রয়াত হওয়ার পর আমি সন্জীদা মাসিমার সঙ্গে বেশ কয়েকবার প্রতিভা সেনের কাছে গিয়েছি। তাঁর মুখেই তাঁর ভাইয়ের কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। যিনি সমাজতন্ত্রের জন্য তাঁর জীবন এবং সৃষ্টিশীলতাকে উৎসর্গ করেছিলেন প্রয়াণ দিবসে তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved