
জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র বই ফরাসি কবিদের কবিতার অনুবাদগুচ্ছ– ‘আ শিফ গ্লিনড ইন ফ্রেঞ্চ ফিল্ড’ (A Sheaf Gleaned in French Fields)। যা স্বয়ং এডমন্ড গস, বিশিষ্ট লেখক, কবি ও বিদগ্ধ আলোচক প্রশংসা করেছিলেন। তাঁর অন্যান্য প্রকাশিত পুস্তক হল ফরাসি উপন্যাস ‘ল্য জুর্নাল দ্য মাদামোজায়েল দার্ভেয়ার’ (Le Journal de Mademoiselle d’Arvers), ইংরেজি অসমাপ্ত উপন্যাস ‘বিয়ংকা অর দ্য ইয়ং স্প্যানিশ মেডেন’ (Bianca, or the Spanish Maiden) এবং কবিতার বই ‘অ্যানসিয়েন্ট ব্যালডস অ্যান্ড লিজেন্ডস অফ হিন্দুস্থান’ (Ancient Ballads and Legends of Hindustan)। এর বাইরেও তরুর লেখা প্রবন্ধ এবং ইংরেজি ও ফরাসিতে লেখা অজস্র চিঠিপত্র রয়েছে।
আজ আমার জন্মদিন। আমার বয়স এখন ১৫, পাঁচ বছর পর হবে ২০! সময় উড়ে চলেছে। মাম্মা ভীষণ ব্যস্ত। আমার জন্মোৎসব, তাই তিনি সব ব্যবস্থা করছেন। এত বছর আমি যে কুভাঁয় কাটালাম, সেই কুভাঁ, এবার আমায় ছেড়ে যেতে হল। কাল আমি এখানে এসেছি।
এতদিন বিচ্ছেদের পর আমায় কাছে পেয়ে মাম্মা-পাপার আর আনন্দের সীমা নেই। রান্না ঘরে মাম্মার সঙ্গে আমায় দেখে পাপা আমায় বললেন কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নিতে। ‘তোর জন্যই তো উৎসব’, পাপা বললেন।
কয়েকটি ভালো ভালো খাবার তৈরি করতে রান্না ঘরে আমি মাম্মার সঙ্গে ব্যাস্ত। কাছাকাছি ভালো রাঁধুনি পাওয়া বড় মুশকিল। আজ বিকেলে কত লোক আসবে আমাদের বাড়িতে।
প্রায় বিকেল ছ’টা, মাম্মা গেলেন কাপড় ছাড়তে। সাতটার সময় ভোজ আরম্ভ। এলো চুলে আমি একটি চেয়ারের ওপর বসে ছিলাম। আমায় সে অবস্থায় দেখে মাম্মা আমার চুলের ভেতরে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, ‘‘কী করছিস মা! সময় নষ্ট করিস নে। সত্যি মাগো তোর এই চুলের গোছাকে গুছিয়ে নিতেই অন্তত দু’টি ঘণ্টা সময় লাগবে।’’
এই কথা বলে তিনি তাঁর হাতে করে আমার চুলের গোছা তুলে ধরলেন। মেয়ের এত চুল!–মায়ের বুক গর্বে ভরে উঠল। তিনি আমার কপালে চুম্বন করলেন।
–ভালো করে সেজে নে, মাথায় নীল ফিতে বেঁধে নিস। তোর পাপা ভালোবাসেন তোকে নীল ফিতেয় দেখতে।
–আর সাদা মসলিনে, নয় মাম্মা?
–হ্যাঁ।
আবার তিনি আমায় চুম্বন করলেন। সাড়ে ছ’টা বাজল, আর নয়।
কাল বিকেলটা কী আনন্দেই না আমার কেটেছে। সকলের মুখেই আমার প্রশংসা। সকলেই আমার স্বাস্থ্যপান করলেন শঁপাঁইয়েতে চুমুক দিয়ে।
তরু দত্ত-র (৪.৩.১৮৫৬ – ৩০.৮.১৮৭৭) জন্মের ১৭০ বছর এবং মৃত্যুর ১৫০ বছর আগতপ্রায়। মাত্র ২১ বছর ছয় মাস আয়ুষ্কাল নিয়ে পৃথিবীতে এসে তরু দত্ত যে বিস্ময়কর প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আমাদের এখনও মুগ্ধ করে। ফরাসি ও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত তরু নিজের দেশ ভারতের অন্তঃস্থল বুঝতে শিখেছিলেন সংস্কৃত ভাষাও। জানতেন জার্মান ভাষাও। ফরাসি কবিতার ইংরেজি রূপান্তরের পাশাপাশি লিখেছেন সংস্কৃত কাব্যের কাহিনি নিয়ে নিজস্ব কবিতা। তাঁর রচনায় মিশে গিয়েছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য।

১৮৫৬ সালের ৪ মার্চ তরুলতা দত্তের জন্ম হয় ১২ নম্বর মানিকতলা স্ট্রিটের বাড়িতে কলকাতার বিখ্যাত রামবাগানের দত্ত পরিবারে। তরুর ছ’বছর বয়সে অর্থাৎ ১৮৬২ সালে রামবাগানের দত্ত পরিবারের একটি অংশ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন, যার মধ্যে ছিলেন তরু দত্তের পিতা গোবিন্দ্রচন্দ্র দত্তর পরিবারও। একমাত্র পুত্র অব্জু-র মৃত্যুর পর, ১৮৬৯ সালে দুই কন্যা অরু ও তরু এবং স্ত্রী ক্ষেত্রমণিকে নিয়ে প্রথমে ফ্রান্স ও পরে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে পাড়ি দেন গোবিন্দ দত্ত। দক্ষিণ ফ্রান্সের নিস-এ একটি আবাসিক স্কুলে (পঁসিওনা) ভর্তি থেকে কয়েকমাস পড়াশোনা করেন অরু ও তরু। সেই তাঁদের একমাত্র প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া। এরপর পুরোটাই প্রাইভেট টিউটরের কাছে পিতা ও কন্যাদের ফরাসির তালিম নেওয়া। বছর খানেক পরে ইংল্যান্ডে এসে কেমব্রিজের সদ্য গঠিত মহিলাদের নিউহ্যাম কলেজে ‘হায়ার লেকচার ফর লেডিজ’-এর দ্বিতীয় দলের ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হন। ইংল্যান্ডের আবহাওয়া তরু এবং অরুর– বিশেষত অরুর একেবারেই সহ্য হচ্ছিল না। তিনি বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় গোবিন্দ দত্ত কিছুটা বাধ্য হয়েই ১৮৭৩ সালের শেষের দিকে দেশে ফিরে আসেন। কলকাতায় ফেরার পর ১৮৭৪ সালের ২৩ জুলাই যক্ষ্মায় মারা যান অরু। তরুও ভুগছিল একই অসুখে। তবু নিজের লেখালেখি, অনুবাদ, আর বই পড়ায় নিজেকে গভীরভাবে ডুবিয়ে রেখেছিলেন তিনি। আসন্ন মৃত্যুকে যেন হাসিমুখেই অগ্রাহ্য করেছিলেন তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে।
জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র বই ফরাসি কবিদের কবিতার অনুবাদগুচ্ছ– ‘আ শিফ গ্লিনড ইন ফ্রেঞ্চ ফিল্ড’ (A Sheaf Gleaned in French Fields)। যা স্বয়ং এডমন্ড গস, বিশিষ্ট লেখক, কবি ও বিদগ্ধ আলোচক প্রশংসা করেছিলেন। তাঁর অন্যান্য প্রকাশিত পুস্তক হল ফরাসি উপন্যাস ‘ল্য জুর্নাল দ্য মাদামোজায়েল দার্ভেয়ার’ (Le Journal de Mademoiselle d’Arvers), ইংরেজি অসমাপ্ত উপন্যাস ‘বিয়ংকা অর দ্য ইয়ং স্প্যানিশ মেডেন’ (Bianca, or the Spanish Maiden) এবং কবিতার বই ‘অ্যানসিয়েন্ট ব্যালডস অ্যান্ড লিজেন্ডস অফ হিন্দুস্থান’ (Ancient Ballads and Legends of Hindustan)। এর বাইরেও তরুর লেখা প্রবন্ধ এবং ইংরেজি ও ফরাসিতে লেখা অজস্র চিঠিপত্র রয়েছে।
কেমন কাটত তাঁর জন্মদিনগুলো, তার কিছু কিছু আভাস পাওয়া যায় বন্ধু মিস মার্টিনকে লেখা তাঁর চিঠিতে আর তাঁর ফরাসি উপন্যাস মাদামোজায়েল আর্ভেয়ার-এর দিনলিপিতে তাঁর নিজস্ব বর্ণনায়। হয়তো ফরাসি দেশের দক্ষিণে নিস শহরে এমনই একটা জন্মদিন কাটিয়েছিলেন তরু নিজে।

কলকাতায় ফিরে আসার পর তরু নিয়মিত চিঠি লিখতেন কেমব্রিজের বন্ধু মিস মেরি মার্টিনকে। মেরি ছিলেন কেমব্রিজের সিডনি সাসেক্স কলেজের রেভারেন্ড জন মার্টিনের কন্যা। সেই চিঠিগুলির কোনও কোনও অংশ থেকে তাঁর জন্মদিনগুলোর কথা জানতে পারা যায়। ফিরে এসে ১৮৭৪ সালের জন্মদিনটা কেটেছিল খুব অসুস্থতায়। তবে এই জন্মদিনে অরু শেষ তাঁর সঙ্গে ছিলেন এবং তাঁকে একটি বেড়ালছানা উপহার দিয়েছিলেন। যার নাম তরু রেখেছিলেন, ‘ব্যাগেত’। ফরাসি একটি গানের কথায় ‘রোজেত’ (Rosette)-এর বদলে তার নাম বসিয়ে গুণগুণ করতেন তরু–
‘Baguette,
Si bien faite,
Donne-moi ton cœur,
On je vais mourir!’
[‘ব্যাগেত,
ভারি সুন্দর করে সৃষ্ট,
তোমার হৃদয়টা দাও আমারে,
না হলে আমি যাব যে মরে!’]

এই জন্মদিনের প্রসঙ্গে তরু লিখছেন,
১০ মার্চ, ১৮৭৪
৩০ ডিসেম্বর, ১৮৭৩ আর ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৪-এর দুটো চিঠি পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম। তাড়াতাড়ি উত্তর না-দেওয়ার জন্য আমায় ক্ষমা করো, কারণ একটা বিচ্ছিরি জ্বর আর কাশিতে ভুগছিলাম। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলাম আর একমাসেরও বেশি হবে শোয়ার ঘরের বাইরেই পা রাখিনি। গত চার-পাঁচদিনে অনেকটা ভালো বোধ করছি আর একটু-আধটু ঘোরাঘুরির অনুমতি পেয়েছি। গরম পড়ে গেছে, আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যেই বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠব।
আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য অঢেল ধন্যবাদ।

এরপরের জন্মদিনগুলোতে তিনি তুলনায় সুস্থ। বই পড়ছেন কী চিঠি লিখছেন বন্ধুকে। আর শেষ জন্মদিনে বন্ধুকে জানাচ্ছেন তাঁর অন্যতম প্রিয় একটি বই ভিক্তর হুগো-র ‘লে মিজেরাবল’ শেষ করে ওঠার আনন্দের কথা।
১৪ মার্চ, ১৮৭৫
৪ মার্চ আমার জন্মদিন। মাম্মা দিয়েছেন ডিকেনস-এর বার্নাবি রাজ, আর পাপা, মিসেস ব্যারেট ব্রাউনিং-এর সুন্দর কবিতার বই। ইতিমধ্যে দুটোই পড়া হয়ে গেছে, দুটোই খুব ভালো লেগেছে।
আশা করছি বৃহস্পতিবারের মধ্যে লন্ডন থেকে আমাদের বইগুলো এসে যাবে; আমি পথ চেয়ে আছি।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৬
৪ মার্চ। আজ আমার কুড়ি বছরের জন্মদিন: বয়স হয়ে যাচ্ছে, তাই না? লা ফ্যাম দ্য লঁদ অঁতিক আজ সকালে এসে পৌঁছেছে; এটাকে আমার জন্মদিনের উপহার বলেই গ্রহণ করেছি। এটা বেশ মোটাসোটা আর মনে হয় খুব আকর্ষণীয়। আমি পাতা উলটে-পালটে দেখছিলাম।
৫ মার্চ, ১৮৭৭
গতকাল আমার জন্মদিন ছিল। পাপা সান্ত ব্যভ-র ফ্যাম সিলেব-এর অসাধারণ স্টিল খোদাই-সহ অপূর্ব একটা সংস্করণ দিয়েছেন। মাম্মা খুব সুন্দর সেন্টের একটা শিশি দিয়েছেন, ছোট্ট বাক্স-সহ, বাক্সটা ভেড়ায় টানা একটা ছোট গাড়ির মতো দেখতে।
এই সপ্তাহের সবচেয়ে বড় খবর হল– লে মিজেরাবল শেষ করেছি! আমি যে কী খুশি! ইতিমধ্যেই সান্ত ব্যভ-র ফ্যাম সিলেব থেকে কয়েকজনের জীবনী পড়েছি, বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে।

তরু দত্তের মৃত্যু হয়েছিল যক্ষ্মায়। ১৮৭৭ সালের ৩০ অগস্ট, রাত আটটায়, কলকাতার বাড়িতেই। অসংখ্য পড়া আর না-পড়া বই এবং সমাপ্ত ও অর্ধসমাপ্ত লেখা রেখে নীরবে চলে গিয়েছিলেন তিনি। তারপরেও ১৫০ বছর পেরিয়ে এসেছে।
চিরতরুণী তরুর শেষশয্যা পাতা রয়েছে উত্তর কলকাতার মানিকতলার কবরখানায়। ঘাস গজিয়েছে ধুলোয় ঢাকা কবরে। তরু দত্তের স্মৃতি বুকে নিয়ে এখনও যত্নে রয়েছে রমেশ দত্ত স্ট্রিটের ১২ এ নম্বর বাড়িটির দোতলায় ওঠার কাঠের সিঁড়িটি, ঘরের কাঠের দরজা আর কড়ি-বরগার ছাদ। তবে কতদিন এসব রাখা যাবে, তাই নিয়ে অনিশ্চিত বর্তমান স্বত্বাধিকারীরা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved