
অবন ঠাকুর এই বিখ্যাত চিত্রটি আঁকেন তার রবিকা-র ছায়ায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, সচেতনভাবে এমন এক ছবি নির্মাণ, যা মূলত উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে সমর্থন জোগাবে। সুনয়না ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের কন্যা, চিত্রটির মুখাবয়বের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু দ্রুতই সিস্টার নিবেদিতার চোখে পড়ে এই চিত্র এবং তার প্যাকেজিংয়ে এই চিত্রটিই ‘ভারতমাতা’ নামে পরিচিতি লাভ করে, যা উদীয়মান ভারতীয় জাতির আগমার্কা প্রতীক হয়ে ওঠে।
২০০৩ সাল, কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে সেবার এলেন জাফর পানাহি। শান্ত ইন্ট্রোভার্ট স্বল্পভাষী মানুষটি ঘুরে বেড়াচ্ছেন নন্দন চত্বর। কেউই প্রায় চেনে না ‘হোয়াইট বেলুন’, ‘ক্রিমসন গোল্ড’ কিংবা হাসপাতালের মেটারনিটি ওয়ার্ড থেকে জেলখানা পর্যন্ত কয়েকটি নারী ‘বৃত্ত’ আবর্তিত পানাহিকে। শুধু সঞ্জয়দার, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ওপর দায়িত্ব পড়ল তাঁকে কফি হাউজ থেকে কালীঘাট ঘোরানোর। তখনও কিন্তু ফুটবল-পাগল মেয়েটি স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখতে না-পেয়ে উল্টে পুলিশের হাতে আটকে পড়েনি এবং ইরানে মেয়েদের লিবার্টির প্রশ্নে জেলও হয়নি পানাহির। তা ছিল এক বেটার পৃথিবী।

সেই নভেম্বরের দুপুরে আমি ছিলাম আমার মিস্টিমামার সঙ্গে পাবলিকেশনের স্টলে। মিষ্টিমামা অর্থাৎ, গৌতম হালদারকে তখন কলকাতার তাবড় আইকনরা একডাকে চেনেন। বিদ্যা বালন এবং মিষ্টিমামার প্রথম বাংলা ছায়াছবি নিয়ে মিষ্টিমামা তখন দারুণ ব্যস্ত। রিলিজের মুখে ‘ভালো থেকো’।
বিদ্যা আমাদের পাবলিকেশনের স্টলে বসে আড্ডা মারছে সারাদিন। যথারীতি পানাহির মতোই বিদ্যাকেও কেউই চেনে না। আমার থেকে বছর দুয়েকের বড় বিদ্যা। সিগারেট খেত টুকটাক। মামা তখন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কমিটিতে খুব ব্যস্ত মুখ, আর আমি, বাপ্তু, দেবলীনা, দীপ্তদা আর বিদ্যা মিলে নন্দনের পানের দোকানওয়ালার গাছের পিছনে সিগারেট ফুঁকতে যেতাম, ফাঁক পেলেই।

নন্দনের ভিড়, আলো-ছায়া, ম্যাট পোস্টার, ফরাসি প্রেমিকা আর বিদ্যার সিগারেটের ধোঁয়া আকাশের দিকে মুখ করে মিলিয়ে যাচ্ছে আসন্ন শীতের পড়ন্ত বিকেলের রোদে। অদূরেই ইরানজাত জাফর পানাহি হয়তো অবাক চোখে তাকিয়ে, খুঁজছেন লিবারেল হওয়ার ভারতীয় সংজ্ঞা।
বিকেলের দিকে ফেস্টিভ্যাল স্টলে বসত আড্ডা। সেই সন্ধেয় মিষ্টিমামা আমাকে শেখাচ্ছিলেন, নারী স্বাধীনতা আর অবন ঠাকুরের ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’, নির্যাস ১৯০২-এর বঙ্গমাতা টু ১৯০৫ সালের ‘ভারতমাতা’র গল্প।
গৌতম হালদার ছিলেন পণ্ডিত মানুষ। প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যেতে মুহূর্ত লাগত। বিদ্যাকে, বাংলার নারী নিয়ে প্রসঙ্গে এল বঙ্গমাতা এবং এক্সটেনশন, ভারতমাতা। ভারতমাতার চার হাতে ধরা রয়েছে বাংলাদেশের অন্ন বা ধান, বস্ত্র বা জ্ঞান, পাণ্ডুলিপি ও ভক্তি।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই চিত্রটির শিরোনামটি– ‘বঙ্গ মাতা’, যার অর্থ, বাংলার মা হিসেবে ভেবেছিলেন তিনি, কারণ তিনি সাধারণ, চিরন্তন এক বাঙালি নারীর উপর ভিত্তি করে তার উপস্থাপনা করেছিলেন।
গৌতম হালদার তখন ডুবে রয়েছেন বাংলার মেয়েটিকে নিয়ে। যার আঁচলে ধানের গন্ধ, চোখে বিপ্লবের আগুন, প্রেমে গাছের গল্প আর যাপনে এক নিছক বঙ্গনারীর ভালো থাকা।
রিলিজ ছিল ২৫ ডিসেম্বর, ২০০৩। সেদিন বিদ্যা, আমি, বাপ্তু, দেবলীনা, চাদুমামা আর ছোট্ট রাই, আমার মামাতো বোন তখন বিদ্যার ছায়াসঙ্গী, সবাই মিলে গোল করে বসে শুনছি বাংলার নারী-স্বাধীনতার গল্প, আর অবন ঠাকুরের সেই ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’র ইতিহাস।
সঞ্জয়দা আর পানাহি তখন অবাধ্য নন্দন চত্বরে, মহাকালের রথের ঘোড়ার মতো ‘তুরিন হর্স’-এর লাগাম ছেড়ে দিয়েছে। বিশ্ব চলচ্চিত্র তখন কলকাতার কেয়ার অফ নন্দন।
অবন ঠাকুর এই বিখ্যাত চিত্রটি আঁকেন তার রবিকা-র ছায়ায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, সচেতনভাবে এমন এক ছবি নির্মাণ, যা মূলত উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে সমর্থন জোগাবে।
সুনয়না ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের কন্যা, চিত্রটির মুখাবয়বের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু দ্রুতই সিস্টার নিবেদিতার চোখে পড়ে এই চিত্র এবং তার প্যাকেজিংয়ে এই চিত্রটিই ‘ভারতমাতা’ নামে পরিচিতি লাভ করে, যা উদীয়মান ভারতীয় জাতির আগমার্কা প্রতীক হয়ে ওঠে–
“From now on, let the mother be the center of our worship… I would reprint it by the tens of thousands and scatter it over the land, till there was not a peasant’s cottage that did not have it.”
জাপানি ‘ওয়াশ’ পদ্ধতিতে আঁকা, ভারতমাতা ভারতীয় চিত্রকলার নবজাগরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই চিত্রকর্মটি কিন্তু প্রথমেই এত জনপ্রিয় শিরোনাম ছিল না। সমসাময়িক শিল্প ও সংস্কৃতির বিখ্যাত সাময়িকী, ‘প্রবাসী’ ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। ম্যাগাজিনে ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল– মাতৃমূর্তি। বাংলার জনগণের প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও ১৯০৫ সালে কার্যকর হল বঙ্গভঙ্গ। আর এই বঙ্গভঙ্গ ঘিরেই বাংলার বুকে জোরালো হল স্বদেশি আন্দোলন।

বঙ্গভঙ্গের দিনে বাংলার ঘরে ঘরে অরন্ধন। রবীন্দ্রনাথ বাংলার বুকে ছুরি চালানোর বিরুদ্ধে করলেন রাখিবন্ধন উৎসব। বাংলার হিন্দু-মুসলিম ভাইদের মধ্যে যদি শান্তি সম্প্রীতি না-থাকে, তবে তারা হাতে হাত মিলিয়ে বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে লড়বে কেমন করে! আর এই কাজে দোসর তাঁর বিশ্বস্ত ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ। আমাদের অবন ঠাকুর।
অবনীন্দ্রনাথ এ-প্রসঙ্গে রানী চন্দকে বলেছেন, ‘আমি আঁকলুম ভারতমাতার ছবি। হাতে অন্নবস্ত্র বরাভয়। এক জাপানি আর্টিস্ট সেটিকে বড়ো করে একটা পতাকা বানিয়ে দিলে। রবিকাকা গান তৈরি করলেন, দিনুর উপর ভার পড়ল, সে দলবল নিয়ে সেই পতাকা ঘাড়ে করে সেই গান গেয়ে গেয়ে চোরবাগান ঘুরে চাঁদা তুলে নিয়ে এল।’
চিত্রটি অন্যান্য শিল্পী নকল করেন, স্বদেশি তহবিল সংগ্রহের পোস্টারের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং জনপ্রিয় ‘ভারতী’ পত্রিকায় ছবিটি পুনর্মুদ্রিত হয়।
১৯০৬ সালে এক স্থানীয় পত্রিকা ‘ভারতমাতা’, আবার পুনর্মুদ্রণ করে শিরোনাম দেয়– ‘The Spirit of the Motherland’ (মাতৃভূমির আত্মা), যা ভবিষ্যতে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে এ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইকনিক ভূমিকা।

প্রসঙ্গত, শোভন সোম এই ছবির ভাবনার উৎস বলে নির্দেশ করেছেন বিখ্যাত শিল্পী ইউজিন ডেলাক্রোয়া-র একটি ছবিকে। ১৮৩০-এ আঁকা সেই ছবিতে স্বাধীনতার দেবী এগিয়ে নিয়ে চলেছেন জনগণকে। স্বদেশি আন্দোলনের আবহাওয়ায় এই ছবিটি দিয়েই পতাকা তৈরি করেছিলেন জাপানি শিল্পী টাইকান। শান্ত মেয়েটি কখনও অস্থির হয়ে যায়, মরিয়া হয়ে যায় পানাহির লেন্স জুড়ে। তিনটি মুখের আদলে সেলিব্রিটি থেকে প্রেমিকা কিংবা ছোট্ট মেয়েটির আশ্রয়ে শুধু মেয়েদের হয়ে কথা বলার জন্য স্বর তোলার জন্য গৃহবন্দি পানাহি মেয়েদের গল্প বলবেন বলে… আরও ১৫ বছর পর, যাবেন ইরানের প্রত্যন্ত গ্রামে। কিংবা ২২ বছর পর, জাস্ট প্রতিশোধের জন্য হাইজ্যাক করে কাউকে নিয়ে যাবেন, মরুভূমিতে, মহিলা ওয়েডিং ফটোগ্রাফার সিগারেট ধরিয়ে বলবেন, দিস ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট!

‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥’
যে দেবী সকল জীবের মধ্যে শক্তিরূপে অবস্থান করেন, তাঁকে বারবার প্রণাম।
এবার আসবে ভারতের ইতিহাসের সেই সেই মহার্ঘ সময় যেই সময়ে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সেই বাংলার কোমল তথা ভারতমাতার রূপকে আরও আক্রমণাত্মকভাবে পরিবর্তন করে তাঁকে সিংহের উপর আরোহী, হাতে ত্রিবর্ণ পতাকা ধারণ করা এক যোদ্ধা দেবীরূপে চিত্রিত করে ফেললেন অনায়াসেই।
২০২৬-এর আগ্রাসী মানুষ চিৎকার করে আকাশ-বাতাসকে জানান দেয়, ‘ভারত মাতা কি জ্যায়’। রক্ত, ধর্ম আর অর্থর সঙ্গে ক্ষমতার দম্ভে প্যাকেজিং করে বঙ্গমাতার রিফর্মড রূপ ছড়িয়ে যায় ভারতের কোণে কোণে। যদিও অবন ঠাকুরের আঁকা ভারতমাতার রূপটিই সবচেয়ে ‘মানবিক’ এবং শান্তিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয় এখনও, যেখানে একজন মা, কিংবা কন্যা, যিনি যুদ্ধ নয়, বরং জীবনধারণের উপকরণ প্রদান করেন ভারতভূমির মানুষশাবককে।

শেষ বিকেলের আলো ধরে দীর্ঘ সময়ে গৃহবন্দি, জেলে থাকা ভবিষ্যতের জাফর পানাহি চললেন কফি হাউজের দিকে। তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর আগামী ২৫ বছরের চিত্রবিপ্লবের রসদ। পানাহি ২০০৩-এর কলকাতার বুকে, বাংলার মাটির মেয়ের পাল্টে ফেলা ছায়ায়, দাঙ্গাবাজ মানুষের প্রচারের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন হয়তো। আর আবার তিনি হাঁটবেন কান থেকে বার্লিন, অফসাইডে গোল করে আবার কারাগারের পথে। অবন ঠাকুর তাকিয়ে থাকবেন রিভার্স বঙ্গভঙ্গের এক ডিসটোপিয়ান ইতিহাসের দিকে।
আমি আর আমার বিজ্ঞাপনের সহকর্মী দেবলীনা সদ্য মিলিয়েনিয়াম পার করা মধ্যরাতের কলকাতায়, নিশ্চিন্তে যে-যার বাড়ি ফিরে যাই।
নির্ভয়ে।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন অভ্রদীপ ঘটক-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved