
গদারের ‘লে মেপ্রি’ গ্রিক পুরাণের ওডিসিকে আধুনিক পুঁজিবাদী চলচ্চিত্রশিল্পের ভেতর পুনঃস্থাপন করে। দেবতাদের পরিবর্তে জায়গা নেয় প্রযোজক, বাজার ও ক্ষমতার নগ্ন হিসাব। ব্রিজিট বার্দোর ক্যামিল চরিত্রটি প্রেম, নির্ভরতা ও আত্মসম্মানের দ্বন্দ্বকে দৃশ্যমান করে তোলে। অথচ পল আপসের পথে হেঁটে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে পেশাগত সুবিধার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় প্রেম ক্রমে লেনদেনে পরিণত হয়, নৈতিকতা পিছিয়ে পড়ে। পেনেলোপির প্রতীক্ষা তার গৌরব হারিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে। অপেক্ষা নয়, সিদ্ধান্তই গদারের আধুনিক নায়িকার রাজনৈতিক ভাষ্য।
ব্রিজিট বার্দো যখন খ্যাতির শিখরে, ফরাসি নবতরঙ্গের প্রণেতা জাঁ-ল্যুক গদারের ছবি ‘লে মেপ্রি’– স্বভূমিকায় ফ্রিৎজ ল্যাং, মার্কিন প্রযোজক প্রকশ্কের সঙ্গে ‘ওডিসি’-র চিত্রগ্রহণে ব্যস্ত। পল লেখক, ডাক পেয়েছে চিত্রনাট্য লিখতে। ক্যামিল– বার্দোর চরিত্রটা– পলের স্ত্রী।

তৎকালীন সাক্ষাৎকারে গদারের প্রতি বার্দোর উপস্থিতির বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ‘চোখের বালি’-র ক্ষেত্রে যেমন। গদার অস্বীকার করেননি। ‘স্টারডম’ পণ্যই বটে। কিন্তু এই ছবিতে বার্দোর আরও ভূমিকা ছিল।
ক্যামিল পলকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আয়নায় আমার পায়ের পাতা দেখতে পাচ্ছ? আমার পা-দুটো তোমার সুন্দর লাগে? আমার মুখ? আমার চোখ?’ দৃশ্যপটে কোনও আয়না নেই। আসলে, পলের চোখের আয়নায় ক্যামিল নিজেকেও যাচাই করে নিতে চায়। এই মানসিক নির্ভরশীলতাকে যদি প্রেম বলি, তার সত্তা সেই প্রেমে সপ্রতিবন্ধ।
দশকব্যাপী ট্রয়ের যুদ্ধ-ফেরত ওডিসিউসের জাহাজগুলো পড়েছিল সমুদ্রদেবতার রোষের মুখে। ছেঁকে ধরা রাজা-অমাত্যদের পেনেলোপি আপ্রাণ ঠেকিয়ে রাখে ২০ বছর। পেনেলোপির নিষ্ঠা গ্রিক চারণদের গানে বহুবার উদ্যাপিত হয়েছে, ‘ওডিসি’-তে হোমারের কণ্ঠেও। এ যেন লক্ষ্মণের কর্মযোগের সমান্তরালে ঊর্মিলার অপেক্ষা, আরও প্রতিকূল।
ফ্রিৎজ্ ল্যাঙের তোলা ছবির রিলগুলো প্রক্শক ছুড়ে ফেলে দেয়। নাৎসি জার্মানির শিল্প-নির্দেশক হতে অস্বীকৃত ল্যাং, বার্ধক্যে পুঁজিবাদীর ত্যাঁদড়ামির কাছে অসহায়। ওডিসিউসের ভাগ্যনির্ধারক অলিম্পাসের অধিষ্ঠাতাদের সঙ্গে প্রক্শকের তুলনা চলে– যাঁদের বর্ণনায় হোল্ডারলিন বলেছিলেন, ‘মানুষের সততা বা ছলনা কাজে দেবে না, যতক্ষণ না দেবতার অনুপস্থিতি তার পক্ষে উপকারী হয়।’ তুলনাটা গদারই করেছেন।

ওডিসিউসের দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী রুষ্ট দেবতা পসেইডন, প্রসন্না অ্যাথেনা– পসেইডনের সঙ্গে যাঁর ছিল অভিমানের সংঘাত। নাকি মাইসিনি ও স্পার্টা-র আধিপত্য, যাদের অপহৃত রানিকে ফিরিয়ে আনতে বাকি গ্রিক জনপদগুলি বাধ্য হয়ে বিপদসংকুল সমুদ্রযাত্রার মধ্যে পড়ে। এ যুগে ক্যাপিটালিস্টরা সেই ভূমিকায় নেমেছে। আর পেনেলোপি? তার দুর্ভোগ অকিঞ্চিৎকর কোল্যাটেরাল ড্যামেজ, সেদিনও ছিল আর, এখনও।
ইয়েটস লিখেছেন, ‘থাকত ওদের কামনার সমান মনোবল’, আজকের ওডিসিউসরাও তেমনই মহৎ সর্বনাশ ঘটাত– কিন্তু না, ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা কোনওক্রমে জীবনধারণে ব্যস্ত।
প্রথম চেকটা পকেটস্থ করে পল। প্রক্শক টু-সিটার গাড়িতে ক্যামিলকে নিয়ে চা খেতে যাবে। পল ‘না’ বলে না। প্রক্শক ক্যামিলের প্রতি আকৃষ্ট, পল প্রযোজককে খুশি রাখতে চায়। ‘নায়ক’-এ কামু মুখোপাধ্যায় অভিনীত প্রীতীশ, ট্রেনের আলাপে হরেন বোসের কাছে বিজ্ঞাপন বাগানোর ধান্দায় স্ত্রীকে বলে, ‘বি আ লিটল্ নাইস টু হিম। একটু কাছে গিয়ে বসা, হেসে দুটো মিষ্টি কথা বলা…’ ওইটুকু আলগা তোষামোদ, কার্যসিদ্ধি পর্যন্ত। পল ইচ্ছা করে দেরি করে। ফ্র্যান্সেস্কা বাইসাইকেল চড়ে গাড়ির পিছনে ধেয়ে যায়, একা পল স্টুডিওর পথে-পথে ‘ফ্লোটিং স্ট্রেট, ওবিডিয়েন্ট টু দ্য স্ট্রিম’– যেন ওডিসিউসের প্রতিচ্ছবি। নেপথ্যচারী বা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে তার আর কিচ্ছু করার নেই।
উতরাই পথে পল আর ল্যাঙের আলোচনা হয়, সরল বুদ্ধিমান সবল ওডিসিউস যদি ১০ বছরের চেষ্টা সত্ত্বেও ঘরে ফিরতে না পেরে থাকে– তার কি আদৌ ফেরার ইচ্ছা ছিল? প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা।

ব্রেখট্-কে উদ্ধৃত করেন ল্যাং, ‘প্রতিদিন সকালে উপার্জনের চেষ্টায় আমি বাজারে যাই, যেখানে মিথ্যা বেচা হয় এবং আশাপ্রদ আমি অন্য পসারিদের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ি।’ চিত্রনাট্যের টাকা দিয়ে ফ্ল্যাটের কিস্তি শোধ করবে পল। সে তো ক্যামিলের জন্যই। প্রক্শকের আবাহনে তাদের লিভিং রুমের ফোন ঝনাৎ করে বেজে ওঠে, তাদের উদ্যত ঠোঁটের মধ্যে তখন ইজিয়ান সাগরের ব্যবধান। শুটিংয়ের মাঝখানে প্রক্শক ক্যামিলের সঙ্গে আড্ডা দেবে বলে উঠে পড়তে চায়। ক্যামিল বলে, স্বামীর সঙ্গে শুটিং শেষেই বেরবে। পল বলে, ‘আমার আপত্তি নেই।’
ইথাকায় একা ফিরে ওডিসিউস যেমন পাণিপ্রার্থীদের উপহারগুলি পেনেলোপিকে নিতে বলেছিল। তাতে বিধ্বস্ত ইথাকার আর্থিক লাভ, সম্মুখ সমর হতে নিষ্কৃতি। এই হিসাবের বাইরে সে ক্রমে বোঝে– এতে পেনেলোপির নারীত্বের গর্ব আহত হয়েছে, এতকালের সংরক্ষিত ভালোবাসা সে হারিয়েছে। আদিম পৌরুষে প্রতিযোগীদের হত্যা দ্বারা তা পুনরায় অর্জন করতে হবে।
ক্যামিলও ক্রমশ পলের প্রতি তার সমর্পণ হারিয়ে ফেলে। একা রোমে চলে যাবে স্থির করে। ফ্রিৎজ ল্যাং প্রথমেই মনে করিয়ে দেন, ওডিসি প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতির বৃহত্তম সংগ্রামের দলিল– একা কুম্ভের দায় সভ্যতার বুঁদিগড় রক্ষার। যুদ্ধ ঘোষণা দেবতাদের বিরুদ্ধে, অভিযাত্রিক নায়ককে দুর্দৈব পদে পদে বিব্রত করেছে। সেই সংগ্রামের অন্য প্রান্তে পেনেলোপিই তার সতীর্থা। তার বন্ধন ওডিসিউস, তার মুক্তি ওডিসিউস।
নোলানের ‘ওডিসি’-র ট্রেলারে দেখছি, পেনেলোপির ভূমিকায় অ্যান হ্যাথওয়ে ওডিসিউসকে বলছে, ‘আমায় কথা দাও, তুমি ফিরে আসবে।’ ওডিসিউস উত্তরে মনে করিয়ে দিচ্ছে– ‘যদি না ফিরতে পারি?’ এই অন্য সম্ভাবনাটা পেনেলোপি মাথাতেই আনেনি; পাণিপ্রার্থীদের বলেছিল কাফন বোনা শেষ হলে সে স্বয়ম্বরা হবে, এবং যতটুকু দিনে বুনত রাত্রে আবার রাখত খুলে। ওডিসিউসের প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই। আদিম যুগে সতীত্বের সেই সংজ্ঞাই প্রচলিত ছিল– কী প্রাচ্যে, কী গ্রিসে।

……………………..
সিমন দ্য ব্যোভয়র যাঁকে বলেছেন, ‘যতটা সে হরিণী ততটাই ব্যাধ’– সেই ব্রিজেট বার্দোর চেয়ে যথার্থ ক্যামিলের চরিত্রে গদার আর কাউকে পেতেন না। হলিউডের মাপদণ্ডে আকর্ষিকা– ‘পুরুষের কাছে সে যতটা অবজেক্টিফায়েড, পুরুষও তার কাছে ততটাই।’
……………………..
কিন্তু গদার কলিযুগের মানুষের গল্প বলেছেন, ‘দেবতাদের সাহায্য ছাড়াই যাকে আপন ভাগ্য জয় করতে হবে।’ তাই গদারের ওডিসির নায়িকা প্রথমেই স্বামীকে প্রশ্ন করে বসে, ‘তোমার কেন দেরী হল?’ পল ক্যামিলকে তার ব্যবসার পণ্য করছে? ক্যামিলের সতীত্ব স্বামীর কল্যাণের বা অনুমোদনের সঙ্গে অসম্পৃক্ত, তার ব্যক্তিগত সত্তার প্রশ্ন। পতির পুণ্যের উচ্ছিষ্টে এ বিবর্তিত মানবসমাজে সতীর পুণ্যসাধন হতে পারে না। তার সিদ্ধান্ত প্রতিদান-নির্ভর, এক-তরফা ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ নয়।
য়ুগ্যামনের হারানো মহাকাব্য ‘টেলিগনি’ বা সফোক্লিসের ‘অডিসিউস অ্যকান্থোপ্লেক্স’ এক অন্য লোকগাথা। ঘুরপথে যাত্রাকালে ইয়া দ্বীপে-জাত মোহিনী সার্সি ও ওডিসিউসের ছেলে টেলিগনাস ইথিকা আক্রমণ করে– তার হাতেই ওডিসিউসের মৃত্যু হয়। সে পর্যন্ত পেনেলোপি তার কথা জানতে পারেনি। আজকের মাপদণ্ডে বলা যায়, পেনেলোপির পতিব্রত প্রতিদত্ত হয়নি, তবু সে তার দায়ে আবদ্ধা ছিল। শুধু বিপুল সমুদ্রের আড়ালে ওডিসিউসের সঙ্গে সার্সির সম্পর্কের কথা তার অগোচর ছিল বলেই নয়, সে-যুগের তাই দস্তুর ছিল বলে। কিন্তু গদার ছবির শুরুতেই এম্ফ্যাসাইজ করেছেন, ‘এটা ১৯৩৩ নয়, ১৯৬৩’। এই ৩০ বছরে মানবতার সংস্থিতি আমূল বদলে গেছে। বিশ্বযুদ্ধ, ব্যোভয়র, উইমেনস্ সাফ্রেজ। আজ তার নিষ্ঠা অপাত্রে ন্যস্ত না করাও পেনেলোপির অধিকারগত।
সিমন দ্য ব্যোভয়র যাঁকে বলেছেন, ‘যতটা সে হরিণী, ততটাই ব্যাধ’– সেই ব্রিজেট বার্দোর চেয়ে যথার্থ ক্যামিলের চরিত্রে গদার আর কাউকে পেতেন না। হলিউডের মাপদণ্ডে আকর্ষিকা– ‘পুরুষের কাছে সে যতটা অবজেক্টিফায়েড, পুরুষও তার কাছে ততটাই।’ পৌরুষের অধৈর্য– যাকে ‘চিত্রাঙ্গদা’র অর্জুন তার একার গৌরব, একার অধিকার বলে গর্ব করেছিল– ‘সেই গর্বকে তা আঘাত করে।’
ব্রিজেট ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি চাই না প্রেম নিয়ে কোনও দ্বিচারিতা, কোনও অর্থহীনতা থাক।’ তাঁর পাবলিক ইমেজে ছিল চার্বাক হেডোনিজম-এর অনুশোচনাহীন স্পষ্ট স্বীকৃতি।

চলচ্চিত্রপটে, রজার ভাদিমের বোধে, ‘অভিনয়হীনা, সে শুধু অধিষ্ঠিতা।’ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর লেখিকার ভাষায়, ‘তার সাবলীলতা যেন ছলনার চেয়ে অধিক ভ্রষ্ট।… তার অভিব্যক্তিতে বহির্জগৎ প্রতিবিম্বিত হয় না আর অন্তঃস্থিত বিক্ষোভ প্রকাশিত হয় না।’ সে ‘আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা’। আত্মমগ্নতার মধ্যে যে-টুকু পরিস্থিতির ছায়া ঘনায়, তাও ছাপিয়ে ওঠে প্রায় অসম্পৃক্ত নিজস্বতা। গদারের ছবির সেটাই ছিল মূলধন।
ব্রিজেটের মধ্যে মূর্ত পেনেলোপি আজ ওডিসিউসকে উপেক্ষা করতে পারে তার প্রতিক্রিয়ায়। ওডিসিউসের যুদ্ধ ও যুদ্ধবিমুখতা– দুটোরই দায় সে একলা বইবে না।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved