
সদ্য-কিশোর আমি আমার ক্লাস নাইনের বন্ধুর দিদির বিয়েতে এক আত্মীয়াকে উপহার দিতে দেখেছিলাম ‘পার্সোনালাইজড’ এক সেট রান্নার বাসনপত্র, যার মধ্যে একটি লোহার খুনতিতে খোদাই করে লেখা ছিল, ‘স্বামী সুধরানোর চাবুক’। দেখে খুব চমক লেগেছিল, ‘দন্ত্য স’-এর ব্যবহারের জন্য এখনও লাইনটির দৃষ্টি-স্মৃতি মনের মধ্যে অক্ষয় হয়ে আছে। ওই বয়সেই একদিন আমার মফস্সল শহর থেকে কলকাতা আসার সময় ট্রেনে এক মলিন মুখের হকার ভদ্রলোককে দেখেছিলাম, চেঁচিয়ে বিক্রি করছেন, ‘নিজে পড়ুন, অন্যকে পড়ান, নবদম্পতিকে উপহার দিন আমার এই দু’টি ক্ল্যাসিক বই, ‘স্বামীকে বশ মানানোর ১০৮ উপায়’, আর ‘ঝগড়া হলে কীভাবে জিতবেন’। বইগুলি যে বেস্টসেলার, বা ভদ্রলোক নিজেও সেগুলি পড়ে উপকৃত হয়েছে, সেটা তাঁর মলিন মুখ দেখে মনে হয়নি, কিন্তু সে বই হয়তো অনেক যুগলকে নির্বিঘ্নে জীবনযুদ্ধের বৈতরণি পেরতে সাহায্য করেছে, এমন ভাবনা মাথায় এসেছিল।
প্রতিদিন ‘রোববার.ইন’-এর একটা বেয়াক্কেলে ব্যাপার হল, লেখার থিমের প্রম্পট হল, যাকে বলে মিনিমালিস্ট – ‘বিয়ের বিচিত্র উপহার’, এরকম দু’-তিনটি শব্দ শুনিয়েই, আর দু’দিনের ডেডলাইন বলেই, সম্পাদক বেপাত্তা! বোঝো ঠ্যালা– এবার তুমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে গল্পের গরু গাছে তোলো গে। ভারি মুশকিল– আমি ইতিহাসের বেভুল ছাত্র, তা-ও আবার সাবজেক্টটা পড়েছি পুরনো কেতায়। মহাফেজখানার খড়ের গাদায় ছুঁচ-রূপী ‘তথ্য’-কে খুঁজে খুঁজে, তাই এই হ্রস্বতা আর দ্রুতির যৌগপদ্যে আমি খানিক বেসামাল হয়ে পড়ি। ‘বিয়ের উপহার’ মানে কী? দিচ্ছেটা কে? যৌতুক, তত্ত্ব, এ-সবের মধ্যে ‘উপহার’-এর ছদ্মবেশে যে পণপ্রথা গোপনে উল্লাস করে চলে, সেসব কী আসবে? নাকি শুধুই বিবাহ-অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত-অভ্যাগতরা যে উপহার দিয়ে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানান, তা-ই একমাত্র বিচার্য? তা ছাড়া, ‘বিচিত্র উপহার’ মানে কি শুধু অদ্ভুতুড়ে উপঢৌকন, নাকি ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে উপহারের বৈচিত্রের দিকে? সাত-পাঁচ ভেবে আমি ঠিক করে নিই, মোটামুটি এই সামান্য জীবনে যে ধরনের বিয়ের উপহার পেয়েছি, দেখেছি, বা উপহার সম্পর্কে পড়েছি, সে নিয়েই লিখব, অদ্ভুতরসের খানিক কমতি হলেও।
মফস্সলে ছেলেবেলা কাটিয়েছি, সেখানে বেশ কিছু বিয়েতে মা-বাবার সঙ্গে হাজির ছিলাম আমিও, কিন্তু নেমন্তন্নের খাওয়ার দিকেই আমার নজর ছিল পূর্ণভাবে সন্নিবিষ্ট, নবদম্পতি কী উপহার পাচ্ছেন, আমার নিম্ন-মধ্যবিত্ত মা-বাবাই বা রঙিন, রাংতা-কাগজে মোড়া কীসের প্যাকেট নিয়ে যাচ্ছেন, যুগলের পিছনেই বা সিল্কের শাড়ি-পরা এক গুরুগম্ভীর মহিলা কীভাবে অতি সতর্কতায় সব প্যাকেট এক জায়গায় ডাঁই করে রাখছেন, আবার একটা ছোট নোটবইয়ে সাঁ-সাঁ করে স্তূপীকৃত উপহারের একটা ‘রানিং ইনভেন্টরি’-ও বানিয়ে ফেলছেন, সেসব তত নজরে পড়েনি।

কিন্তু সদ্য-কিশোর আমি আমার ক্লাস নাইনের বন্ধুর দিদির বিয়েতে এক আত্মীয়াকে উপহার দিতে দেখেছিলাম ‘পার্সোনালাইজড’ এক সেট রান্নার বাসনপত্র, যার মধ্যে একটি লোহার খুনতিতে খোদাই করে লেখা ছিল, ‘স্বামী সুধরানোর চাবুক’। দেখে খুব চমক লেগেছিল, ‘দন্ত্য স’-এর ব্যবহারের জন্য এখনও লাইনটির দৃষ্টি-স্মৃতি মনের মধ্যে অক্ষয় হয়ে আছে। ওই বয়সেই একদিন আমার মফস্সল শহর থেকে কলকাতা আসার সময় ট্রেনে এক মলিন মুখের হকার ভদ্রলোককে দেখেছিলাম, চেঁচিয়ে বিক্রি করছেন, ‘নিজে পড়ুন, অন্যকে পড়ান, নবদম্পতিকে উপহার দিন আমার এই দু’টি ক্ল্যাসিক বই, ‘স্বামীকে বশ মানানোর ১০৮ উপায়’, আর ‘ঝগড়া হলে কীভাবে জিতবেন’। বইগুলি যে বেস্টসেলার, বা ভদ্রলোক নিজেও সেগুলি পড়ে উপকৃত হয়েছে, সেটা তাঁর মলিন মুখ দেখে মনে হয়নি, কিন্তু সে বই হয়তো অনেক যুগলকে নির্বিঘ্নে জীবনযুদ্ধের বৈতরণি পেরতে সাহায্য করেছে, এমন ভাবনা মাথায় এসেছিল।
১৯২৫ সালে তরুণী রাণু অধিকারী যখন স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে বীরেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে লেডি রাণু মুখোপাধ্যায় হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ালেন, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর লেখায় পড়ি যে, সেই বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ সশরীর উপস্থিত না থাকলেও নবদম্পতিকে উপহার হিসেবে পাঠান– এক আলমারি-ভর্তি এবং একই ভাবে বাঁধানো নিজের লেখা সমস্ত বই (ইংরেজি অনুবাদ-সহ), এবং তৎসহ– অসমর্থিত শ্রুতি অনুযায়ী– একটি সোনার বাক্সে নিজের কর্তিত কেশদাম। এক শোকার্ত বাইশে শ্রাবণ নিমতলা শ্মশানঘাটে রবীন্দ্রনাথের মরদেহ নিয়ে শেষযাত্রার সময় বাষ্পাকুল, উন্মত্ত জনতা তাঁর চুল ও দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছিল বলে শোনা যায়। কিন্তু তাঁর জগদ্বিখ্যাত কেশরাজির এক অণু-অংশ তিনি যে স্বেছায় বিয়ের উপহার হিসেবে দান করেছিলেন, তার অন্য কোনও দৃষ্টান্ত আছে বলে আমি জানি না।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকৃতি অবশ্য শুধু রাণু ও বীরেন্দ্রনাথেরই নয়, সুরভিত করেছিল অনেক বাঙালির বিবাহবাসরকেই। ১৯৩১ সালে প্রকাশিত নির্বাচিত রবীন্দ্রকবিতাগুচ্ছ ‘সঞ্চয়িতা’, আর কবির জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত নির্বাচিত গদ্যরচনা-সমাহার ‘বিচিত্রা’ যে বিয়ের জনপ্রিয় উপহার ছিল, তা আমি আমার মফস্সলি ছেলেবেলায় সম্যক দেখেছি, বস্তুত ওই বইগুলির অন্তত দু’-তিনটে করে কপি নব্যযুগলের বাড়িতে জমে যাওয়া ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। বইপ্রীতি বাঙালির রুচি ও বিশ্ববীক্ষার পরিচায়ক, তার মধ্যে আবার কবিতার স্থান সর্বাগ্রে, তাই ঘুরেফিরে নবদম্পতির হাতে পড়ত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’, ‘হাজার বছরের প্রেমের কবিতা’, বা ‘সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত’ ধরনের কাব্য সংকলন, অথবা জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল-শক্তি, বা নীরেন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কবিতা। আমরা, যারা মোটামুটি এ দেশের ‘বেবি বুমার’ প্রজন্ম, যারা বিবাহোপলক্ষে এই সব কাব্যগ্রন্থ উপহার হিসেবে পেয়েছে, পেতে দেখেছি, যারা আমাদের প্রৌঢ়ত্ব আর বার্ধক্যের সন্ধিলগ্নে পৌঁছে আমাদের চেনা দুনিয়াকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে দেখি, তারা সেই দুনিয়ার সমস্ত অনাচারের বিরুদ্ধে আমাদের প্রাত্যহিক হতাশাকে উগরে দিই হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে ওই সব অবিনশ্বর কবিতাগুচ্ছকেই একটু নিজেদের মতো করে সাজিয়ে।


তবে কবিতার বই সচরাচর ক্ষীণতনু, তাই বিয়ের উপহারকে ‘ওজনদার’ করে তোলার জন্য প্রায়ই ডালি সাজাতে হয় বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থকে একসঙ্গে নিয়ে। গদ্যের ব্যাপারে সে সমস্যা নেই, যদিও অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন যে বেশ উঁচুদরের বিয়ের উপহারের উপযোগী করে তোলার জন্য ঔপন্যাসিককে অনেক সময়েই লিখতে হয় অতিকায় উপন্যাস। বস্তুতই, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের বইয়ের সংগ্রহ ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখে পড়েছে নবদম্পতির জন্য শুভেচ্ছাবার্তা বা আশীর্বাণী লিখে-দেওয়া, বৃহদায়তন ‘সাহেব-বিবি-গোলাম’ বা ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ অথবা ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’, আর ‘বকুলকথা’-র মিলিত, অখণ্ড সংস্করণ। তবে এসব তো যাকে বলে ‘লেজিট’ উপহার, বিমল করের লেখায় পড়েছি, বিয়ের বিচিত্র উপহারের মধ্যে কখনও কখনও থাকত ধ্রুপদী, কিন্তু এই শুভক্ষণের পক্ষে ভীতিপ্রদ নামসম্পন্ন, উপন্যাসও, যেমন ‘গৃহদাহ’ কিংবা ‘চরিত্রহীন’। এইসব কূটনাম উপহারের প্রাপকদের বিবাহিত জীবন কোন পথে এগিয়ে গেছে, তা অবশ্য জানার উপায় নেই। বইয়ের পাশাপাশি কলম, কিংবা বোন চায়নার চা বা ডিনার সেট দেওয়ার প্রচলন ছিল, সে দিন এখন অস্তমিতপ্রায়। পিতৃব্যসম, শুভানুধ্যায়ী এক মানুষ আমাদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের কাগজে সাক্ষী হিসেবে সই করেছিলেন যে শেফার্স কলমটি দিয়ে, সেটি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন, আমাদের অযোগ্যতায় পরে হারিয়ে ফেলি সেই অমূল্য উপহার।

সাহানা দেবী তাঁর ‘স্মৃতির খেয়া’ নামের সুখপাঠ্য আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে তাঁর অল্পবয়সে বাঙালি বিয়েতে রুপোর ছাতার হাতল উপহার দেওয়ার খুব চল ছিল, এবং সে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশাও হত কম নয়, কারণ পয়সা বাঁচানোর জন্য অনেকেই অন্যের বিয়েতে সেই হাতল চালান করে দিতেন, অতএব বোঝার উপায় ছিল না কতবার হাত-ফেরতা হয়ে সেই ছত্রধারণ-যন্ত্রটির অকুস্থলে আগমন।

বাঙালির বিয়ের উপহারের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে অবশ্যই ধরা পড়ে বঙ্গগৃহের প্রযুক্তির বিবরণও। টর্চ থেকে আরম্ভ করে ফ্লাস্ক, টোস্টার, ইলেকট্রিক কেটলি, রাইস কুকার, এয়ার ফ্রায়ার হয়ে আজকের ‘স্মার্ট’ দুনিয়ার হাজার দাবিকে ঘায়েল করার হরেক হাতিয়ার– ফিটবিট, ট্যাব, আইফোন, অ্যামাজন ইকো, গুগল নেস্ট ছুঁয়ে অবশেষে নানান ডিজিট্যাল সাবস্ক্রিপশন, নেটফ্লিক্স, মুবি থেকে চ্যাটজিপিটি। বিবাহিত জীবনের হাজার প্যাঁচপয়জার সামলানোর সঠিক অ্যালগরিদমটি এখন আর আমাদের নিজেদের সীমিত বুদ্ধির জোরে ঠাহর করা ঠিক সম্ভব হয় না, তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্যাকেজের শরণাপন্ন হতে হয়। নতুন বিয়ে যদি পরে ভেঙে যায়, তখন পারস্পরিক পাওনাগণ্ডার হিসেবনিকেশের সুবিধের জন্য অনেকেই যেমন আগেভাগেই ‘প্রি-নাপশিয়াল’ চুক্তিপত্র সেরে রাখেন, তেমনই এআই প্যাকেজও বিয়ের যৌতুক বা উপহারের মধ্যে ঢুকে পড়লে মন্দ হয় না।

খানিক ভাসা ভাসা ভাবে আজকাল দেখি, বিরল হলেও, আস্তে আস্তে বাড়ছে হানিমুন প্যাকেজ, ক্রুজের টিকিট, ইউরেলপাস উপহার দেওয়ার চল, কিংবা নগদ টাকা বা আঠা দিয়ে এক টাকার কয়েন-সাঁটানো খামের মধ্যে গিফট চেকের পরিবর্তে নবদম্পতির হানিমুন কন্ট্রিবিউশন ফান্ডে অনলাইন টাকা পাঠানোর রীতি। এক নিকটজনের বিয়েতে ওই ধরনেরই কিছু অপশন গুগলে সার্চ করেছিলাম, প্রথমেই নব্য এআই-বলে বলীয়ান গুগল যা জবাব দিল, তা এরকম:
‘একটি রোমান্টিক গেটওয়ে (গেটঅ্যাওয়ে?): এটা যে কোনো নবদম্পতির জন্য একটি চমৎকার উপহার! একটি ঐতিহাসিক হোটেলে একটি আরামদায়ক অবকাশ বা একটি বনভূমির পশ্চাদপসরণ এই জুটির জন্য আপনার উদ্বেগ প্রদর্শন করবে। এটি একটি বিচ্ছিন্ন জায়গায় একটি সৈকত অবলম্বনও হতে পারে যেখানে এই জুটি একসাথে মানসম্পন্ন সময় কাটাতে পারে। লক্ষ্য হল এই জুটিকে শিথিল ও বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কিছু মানসম্পন্ন সময় দেওয়া।’
এই পর্যন্ত পড়ে প্রায় চার দশক ধরে বিবাহিত জীবনের কুলকুণ্ডলিনীচক্রে খাবি-খেতে-থাকা আমার মনটা খচখচ করতে থাকে। অসূয়ায় নাকি আশঙ্কায়, ঠিক বুঝতে পারি না। ‘বনভূমির পশ্চাদপসরণ’? না! মনে হয়, ‘হাজার বছরের প্রেমের কবিতা’ বা ‘রাইস কুকার’ই ভাল ছিল।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved