Robbar

নর্তকশ্রেষ্ঠ শ্রীচৈতন্যদেব

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 3, 2026 3:41 pm
  • Updated:March 3, 2026 11:20 pm  

চৈতন‌্যদেব কৃষ্ণ উপাসকদের ধারাকেই সঞ্জীবিত করলেন। তিনি স্বয়ং ছিলেন নৃত‌্য-গীত ও অভিনয়ের পারদর্শী শিল্পী। তিনি আখ‌্যাত হয়েছিলেন– সংকীর্তন রসনৃত‌্যবিহার নামে। চৈতন‌্যদেব নবদ্বীপ লীলায় আপামর জনসাধারণের সঙ্গে নদীতীরে-পথে-প্রান্তরে কীর্তনানন্দে মত্ত হয়েছিলেন। সম্মিলিত ভক্তিরসের আস্বাদনে কীর্তনের সঙ্গে নৃত‌্য-গীত ও অভিনয়ে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীবাসের বাড়িতে কোনওদিন, কোনওদিন মেসো চন্দ্রশেখর আচার্যের বাড়িতে নিশাকীর্তন হত। সে কীর্তনগীতের সঙ্গে নৃত‌্য, বাদ‌্য এবং বাদ‌্যকরদের নৃত‌্য ছিল অপরিহার্য।

মহুয়া মুখোপাধ্যায়

‘আমরা’ কবিতায় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন–

‘বাঙালির হিয়া       অমিয় মথিয়া
নিমাই ধরেছে কায়া’

শ্রীচৈতন‌্যদেবের অভ্যুদয় বাংলায় যুগান্তর আনল। বাংলার বৈষ্ণব কবিতার উৎস অনুসন্ধানে আমরা সহজেই লক্ষ্মণ সেনের দরবারের অন‌্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জয়দেবের পদপ্রান্তে উপস্থিত হই। যা পদাবলী কীর্তনের উৎস থেকে মহীরূহ স্বরূপ। জয়দেব নিজেই নিজের পদকে বলেছেন– ‘কোমলকান্ত পদাবলী’।

গীতগোবিন্দের এই গীতধ্বনির অনুরণন তুলল সারা ভারতবর্ষে। যে পদাবলির সঙ্গে পদ্মাবতী নাচতেন এবং জয়দেব মৃদঙ্গ বাজাতেন। এই গীতগোবিন্দের অমৃত মন্দাকিনী দু’টি প্রবাহে বিভক্ত হয়ে গেল। এই দু’টি ধারার নাম চণ্ডীদাস ও বিদ‌্যাপতির গীতি স্রোতস্বিনী। এই ত্রিধারার মিলিত সংকীর্তনের মূর্ত বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণচৈতন‌্য, বাংলার গৌরাঙ্গ, নিমাই পণ্ডিত, বিশ্বম্ভর। আমি আজকে প্রায় সম্পূর্ণ অজানা, অনালোচিত, অনালোকিত দিকটি নিয়ে আলোচনা করব। সেই দিকটি হল নর্তকশ্রেষ্ঠ শ্রীচৈতন‌্যদেব। আমাদের গৌড়ীয় নৃত্যের অন‌্যতম শ্রেষ্ঠপুরুষ। যিনি ভারতীয় নৃত‌্য আন্দোলনের একজন পুরোধা ব‌্যক্তিত্ব। শ্রীচৈতন‌্যদেবের নৃত‌্য-সংক্রান্ত আলোচনা করতে গেলে ওঁর অবদান অনেকগুলি ভাগে ভাগ করা যায়–

১. ব‌্যক্তিগতভাবে ওঁর নাট‌্য বা নৃত‌্যচর্চা অর্থাৎ গৌড়ীয় নৃত্যের মধ‌্যযুগের শ্রেষ্ঠ নর্তক শ্রীচৈতন‌্যদেব।

২. সর্বভারতীয় স্তরে ভারতীয় নৃত্যে শ্রীচৈতন‌্যদেবের অবদান।

৩. শ্রীচৈতন‌্য অনুগামীদের দ্বারা রচিত সাহিত্যগ্রন্থ।

৪. শ্রীচৈতন‌্য অনুগামীদের দ্বারা রচিত শাস্ত্রগ্রন্থ।

৫. শ্রীচৈতন‌্যদেবের প্রভাব মন্দির-ভাস্কর্য-চিত্রকলায়-পটচিত্র।

টেরাকোটায় ষড়ভুজ চৈতন্য, ঋণ: লেখক

এক. ব‌্যক্তিগত নাট‌্য বা নর্তক– সারা ভারত পরিভ্রমণ করে আধুনিক ভারতের যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর প্রভাব সম্পর্কে বলেছেন– ‘The influence of Shri Chaitanya is all over India, wherever the Bhakti-Marga is known, there he is appreciated, studied and worshipped, most of his so called disciples in Bengal do not know how his power is still working all over India.’

ভারতীয় সংগীতে বিশেষত নৃত‌্যকলায় শ্রীচৈতন‌্যদেবের অবদান অপরিসীম। কৃষ্ণ-প্রেমিক, দার্শনিক, সাধক-পণ্ডিত হিসেবে শ্রীচৈতন‌্যদেব বিশ্ববাসীর কাছে যতখানি পরিচিত, নৃত‌্যশিল্পী হিসেবে সে তুলনায় একেবারেই পরিচিত নন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’-এ লিখেছেন– 

‘বাংলাদেশ আপনাকে যথার্থভাবে অনুভব করিয়াছিল বৈষ্ণবযুগে। সেইসময় এমন একটি গৌরব সে প্রাপ্ত হইয়াছিল যাহা অলোকসামান‌্য, যাহা বিশেষরূপে বাংলার। যা এদেশ হইতে উচ্ছ্বসিত হইয়া অন‌্যত্র বিস্তারিত হইয়াছিল। বৈষ্ণবযুগে অযাচিত ঐশ্বর্যলাভে সে আশ্চর্যরূপে চরিতার্থ হইয়াছে।’

চৈতন‌্যদেবের জন্মের আগেই জয়দেব, চণ্ডীদাস ও বিদ‌্যাপতির পদাবলি দ্বারা রাধামাধবরূপ কল্পনায় জনচিত্ত জয় শুরু হয়। চৈতন‌্যদেব কৃষ্ণ উপাসকদের ধারাকেই সঞ্জীবিত করলেন। তিনি স্বয়ং ছিলেন নৃত‌্য-গীত ও অভিনয়ের পারদর্শী শিল্পী। তিনি আখ‌্যাত হয়েছিলেন– সংকীর্তন রসনৃত‌্যবিহার নামে। চৈতন‌্যদেব নবদ্বীপ লীলায় আপামর জনসাধারণের সঙ্গে নদীতীরে-পথে-প্রান্তরে কীর্তনানন্দে মত্ত হয়েছিলেন। সম্মিলিত ভক্তিরসের আস্বাদনে কীর্তনের সঙ্গে নৃত‌্য-গীত ও অভিনয়ে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীবাসের বাড়িতে কোনওদিন, কোনওদিন মেসো চন্দ্রশেখর আচার্যের বাড়িতে নিশাকীর্তন হত। সে কীর্তনগীতের সঙ্গে নৃত‌্য, বাদ‌্য এবং বাদ‌্যকরদের নৃত‌্য ছিল অপরিহার্য।

পটচিত্রে নৃত্যরত চৈতন্যদেব

অভিনয়ভেদ চারপ্রকার– আঙ্গিক, বাচিক, আহার্য ও সাত্ত্বিক।

আঙ্গিক: একদিন শ্রীবাসের অঙ্গনে কীর্তনের সময় শ্রীমহাপ্রভু তিনটি সম্প্রদায় গঠন করে গেয়েছিলেন ও নেচেছিলেন। (চৈতন্যভাগবত মধ‌্যখণ্ড)। পায়ে আলতা ও নূপুর পরে, গদাধরের কাঁধে হাত দিয়ে মৃদঙ্গ-করতাল-মন্দিরার সঙ্গে নাচতেন। সকলেই চৈতন‌্যদেবকে প্রণাম করত।

শ্রীহরিবাসরে হরিকীর্তন বিধান।
নৃত‌্য আরম্ভিলা প্রভু জগতের প্রাণ॥
পুণ‌্যারম্ভে শ্রীবাস অঙ্গ যে শুভারম্ভ।
উঠিল কীর্ত্তনধ্বনি গোপাল গোবিন্দ॥
ঊষাকাল হৈতে নৃত‌্য করে বিশ্বম্ভর।
যূথে যূথে হৈল যত গায়ক সুন্দর॥
শ্রীবাস পণ্ডিত লয়া এক সম্প্রদায়।
মুকুন্দ লইয়া আর জন কত গায়॥
লইয়া গোবিন্দ দত্ত আর কতজন।
গৌরচন্দ্র নৃত্যে সবে করেন কীর্ত্তন॥

কাজী দলনের দিনেও অদ্বৈত আচার্য, হরিদাস এবং শ্রীবাসকে নিয়ে তিনটি সম্প্রদায় গঠিত হয়েছিল। চৈতন‌্যদেব তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক নাট‌্যাভিনয় করেছিলেন, মেসো চন্দ্রশেখর আচার্যের বাড়িতে। নাট‌্য-প্রযোজক ছিলেন বুদ্ধিমন্ত খান। অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন– অদ্বৈত, হরিদাস, নিত‌্যানন্দ, শ্রীবাস, গদাধর, ব্রহ্মানন্দ, শ্রীমান পণ্ডিত, মুরারী প্রমুখ। চৈতন‌্যদেব গদাধরের স্ত্রীর ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। নিত‌্যানন্দ ও ব্রহ্মানন্দ হয়েছিলেন বড়াইবুড়ি। দর্শকদের মধ্যে শচীদেবী ও বিষ্ণুপ্রিয়াও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরাও চৈতন‌্যদেবকে চিনতে পারেননি। কবি কর্ণপুর (পরমানন্দ সেন) এবং বৃন্দাবন দাস যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে চৈতন‌্যদেব– কৃষ্ণ, রুক্মিণী-গোপী-লক্ষ্মী, ভগবতী, পার্বতী-আদ‌্যাশক্তি ইত‌্যাদি নানা ভূমিকায় নৃত‌্য করেছিলেন। একদিন চন্দ্রশেখরের গৃহে কীর্তনাদি হওয়ার পর তিনি বললেন– ‘আজি নৃত‌্য করিবায় অঙ্কের বিধানে’। ‘অঙ্কের বিধানে’ অর্থাৎ নাট্যের আকারে। নাট‌্যশাস্ত্রে ১০ প্রকার নাট‌্য বা রূপকের একটি রূপক ‘অঙ্ক’। তিনি যে নাট‌্যশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন এর থেকেই বোঝা যায়।

যামিনী রায়ের ছবিতে গীতবাদ্য সহযোগে চৈতন্যের নৃত্য

শ্রীচৈতন‌্যচরিতামৃতেও নৃত‌্য-সংকীর্তনের বর্ণনা আছে–

চারিদিকে চারি সম্প্রদায় করে সংকীর্ত্তন।
মধ্যে নৃত‌্য করে প্রভু শচীর নন্দন॥
অষ্টমৃদঙ্গ বাজে বত্রিশ করতাল।
হরিধ্বনি দেয় বৈষ্ণব কহে ভাল ভাল॥

তবে প্রভু জগন্নাথের মন্দির বেড়িয়া।
প্রদক্ষিণ করি বুলে নর্ত্তন করিঞা॥ 

(অন্তর্ভ্রমরী ও বাহ‌্যভ্রমরী)

পুরীতে রথযাত্রায় বিরাট কীর্তননৃত্যের সমারোহ করেছিলেন। নৃত‌্য কীর্তনীয়াদের তিনি সাতটি সম্প্রদায়ে ভাগ করেছিলেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়ে একজন করে নর্তক, একজন মুখ‌্য গায়েন, পাঁচজন পালি গায়েন অর্থাৎ দোহার এবং দু’জন মৃদঙ্গবাদক– অর্থাৎ চৌদ্দ মৃদঙ্গ এবং বত্রিশ জোড়া করতাল বেজেছিল। মহাপ্রভু ছিলেন মধ‌্যমণি। শ্রীগৌরাঙ্গ লাঠিনৃত্যেও অত‌্যন্ত দক্ষ ছিলেন। অদ্বৈত আচার্য মহাপ্রভুকে বলে ছিলেন– ‘তুমি যদি লাঠি ঘোরাতে পার তবেই বুঝবো তুমি গোপ।’ চৈতন‌্যচরিতামৃতে আছে–

‘তবে লগুড় লইয়া প্রভু ফিরাইতে লাগিলা।
বারে বারে আকাশে ফেলি লুফিয়া ধরিলা॥
শিরের উপরে পৃষ্ঠে সম্মুখে দুই পাশে।
পাদমধ্যে ফিরায়ে লগুড় দেখি লোক হাসে॥’

চৈতন্য কীর্তন, শিল্পী: ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার

তিনি কৌতুক রসাত্মক হাস‌্যরসের ভূমিকাতেও বিজয়া দশমীতে হনুমান সেজে অভিনয় করেছেন–

‘হনুমান বেশে প্রভু বৃক্ষশাখা লইয়া।
লঙ্কার গড়চড়ি ফেলে গড় ভাঙ্গিয়া॥’

সংক্ষেপে আঙ্গিক অভিনয় সম্পর্কে বলা যায়–

১. কাঁধে হাত দিয়ে নাচতেন।
২. দশ রূপক– অঙ্ক রূপক
৩. নানা ভূমিকায়– শৃঙ্গাররসযুক্ত কৃষ্ণ, লক্ষ্মী, রুক্মিণী, ভগবতী, পার্বতী…
৪. বেড়াকীর্তন করেছিলেন
৫. লাঠি নাচ
৬. হাস‌্য কৌতুকের নাচ।
৭. উচ্ছ্রিত বাহু
৮. ভক্তিরস
৯. যুথবদ্ধ অর্থাৎ Group dance– তিন সম্প্রদায়, সাত সম্প্রদায়।
১০. বিষম সঙ্কট তাল
১১. উচ্চণ্ড ও মধুর।

বাচিক: শ্রীহরি নামাকৃত ব‌্যাকরণের টীকাকার শ্রীজীব গোস্বামী সাহিত্যের ব‌্যাখ‌্যা প্রসঙ্গে বলেছেন– “সহিতা অর্থে ভগবদ্ভক্তি। সেই ‘সহিতা’ থেকে সাহিত‌্য শব্দ নিষ্পন্ন। বিভিন্ন চরিত্র রূপায়নে বিভিন্ন সাহিত্যের প্রয়োগ। ব্রজবুলি ভাষার উদ্ভব। তাঁর ভক্ত গোস্বামীদের হাতে সংস্কৃত নাটকের পুনরুদ্ভব হয়।” 

নন্দলাল বসুর ছবিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু

আহার্য: পুস্ত, অলঙ্কার, অঙ্গরচনা, সঞ্জীব।– শ্রীবাসের গৃহে সারারাত্রি কীর্তননৃত্যে পায়ে আলতা, নূপুর পরেছিলেন। স্ত্রীর ভূমিকায় অংশগ্রহণের সময় তাঁর মা শচীমাতা ও স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়াও চিনতে পারেননি। কবি কর্ণপুর বর্ণিত নাটক থেকে জানা যায় ওঁর make-up man বা রূপসজ্জা-বেশভূষার পরিচারক ছিলেন বাসুদেব আচার্য (‘বাসুদেবাচার্য নামা নেপথ‌্য রচনা করঃ’)। আহার্য অভিনয়ের মধ্যে বাদ‌্যযন্ত্র– মৃদঙ্গ, মন্দিরা, করতাল, শংখ, নূপুর, ছত্র, চামর ইত‌্যাদির ব‌্যবহার জানা যায়।

সাত্ত্বিকভাব: শ্রীবাসের বাড়িতে যে কীর্তন হত সেখানে জানা যায় নানাবিধ সাত্ত্বিক ভাব লক্ষণ, অষ্টসাত্ত্বিকভাব– লালা, ঘর্ম, কম্প, অশ্রু, পুলক, স্তম্ভ, রোমাঞ্চ, প্রলয় ইত‌্যাদি দেখা দিত। অষ্টসাত্ত্বিক ভাব এতটাই প্রবল হত যে, শ্রীচৈতন‌্যদেব শেষ করতে পারতেন না মূর্ছা যেতেন (বাউলে একে জ‌্যান্তে মরা বলে)।

চন্দ্রশেখর আচার্যের গৃহে নাট্যমঞ্চ তৈরি করে অপরাহ্ন বেলায় নাট‌্যাভিনয় হয়েছিল, এর মধ্যে কয়েকটি প্রসঙ্গ লক্ষ‌্যণীয়–

১. এই অভিনয়ের মধ্যে নৃত‌্য একটি প্রধান দিক ছিল। লক্ষ্মীবেশে চৈতন‌্যদেবের নৃত‌্যই ছিল মূল বিষয়।
২. ‘কাচ’ বা ‘রূপসজ্জা’ গ্রহণ করা হয়েছিল।
৩. পুরুষরাই নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
৪. সংস্কৃত নাটকের বিশেষত্বগুলির অনেকাংশ মিল পাওয়া যায় এই নাট‌্যাভিনয়ে।
৫. অন‌্যান‌্য পার্ষদরা– বড়াইবুড়ি, সখী, কোটাল, বিভিন্ন সামাজিক চরিত্র এতে অংশগ্রহণ করেন
৬. চৈতন‌্যদেবের এই প্রকার নাট‌্যাভিনয়ের পর থেকেই বাংলার লোকনাট্যের এক বিশেষ দিক তথা ভক্তিভাবের উদ্বোধন ঘটে।

নৃত্যরত চৈতন্য, ছাপাই ছবি

অভিনয়ের সঙ্গে চৈতন‌্যদেবের যে আত্মিকসম্পর্ক ছিল সেটি ‘গৌরচন্দ্রিকা’ পদটি উদ্ভবের দ্বারা সহজেই অনুমেয়। একনজরে যদি তাঁর অবদান ব‌্যাখ‌্যা করা যায়–

১. বাংলা (তথা মণিপুর, ওড়িশা, আংশিকভাবে অসম), যাত্রা– নাটক ও অভিনয় ধারার মূল উৎস ও প্রেরণা ছিলেন চৈতন‌্যদেব। তিনি নিজে ভক্তদের নিয়ে অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে লোকাভিনয় জনগণের মধ্যে ব‌্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। তাঁর প্রবর্তিত গৌড়ীর বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে কৃষ্ণযাত্রার প্রচলন হয়।

২. তাঁর জীবনলীলা পরবর্তীকালে যাত্রাভিনয়ের এক প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

৩. চৈতন‌্যদেবের প্রভাবে তাঁর ভক্ত গোস্বামীদের হাতে সংস্কৃত নাটকের পুনরুদ্ভব হয়।

৪. চৈতন‌্য আধারিত এবং ভক্তিধর্ম-বিষয়ক নাট‌্যগুলি দেশের মধ্যে এক প্রবল ধর্ম-উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলেছিল।

৫. সর্বভারতব‌্যাপী সংগীত (গীত-বাদ‌্য-নৃত‌্য) ও নাট‌্যজগতে ওঁর ব‌্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। 

৬. তাঁকে– ‘নটরাজ ও রঙ্গচূড়ামণি’, ‘সর্বরঙ্গ চূড়ামণি’, ‘নটবর গৌরকিশোর’, ‘গৌরনটরাজ’ নামে অভিহিত করা হত।

৭. সংস্কৃত নাট‌্যশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন তা সহজেই অনুমেয় ‘অংক’ বিধান অনুসারে নৃত‌্য করার ইচ্ছা প্রকাশে।

৮. উচ্চণ্ড-মধুর নৃত্যে পারদর্শী ছিলেন।

রূপ গোস্বামীকে প্রয়াগে মহাপ্রভু সযত্নে দশ দিন ধরে ভক্তিরসের লক্ষণ সম্বন্ধে আলোচনা করে সমৃদ্ধ করেন। তার ফলস্বরূপ রূপ গোস্বামী উজ্জ্বল নীলমণি, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ইত‌্যাদি গ্রন্থ রচনা করেন। সনাতন গোস্বামীকে পুণ‌্যতীর্থ কাশীধামে দুইমাস ব‌্যাপী ভক্তিসিদ্ধান্ত শিক্ষা দান করেন। তার ফলস্বরূপ সনাতন গোস্বামী বৃহদ্‌ভাগবদামৃত, হরিভক্তি বিলাস, লীলাস্তব ইত‌্যাদি গ্রন্থ রচনা করেন। হরিভক্তিবিলাসে প্রতিমালক্ষণ বা Iconography বলা আছে।

রূপ গোস্বামীর ভক্তিরসামৃতসিন্ধু এবং সনাতন গোস্বামীর হরিভক্তি বিলাস

চৈতন‌্য অনুগামীরা সংগীত শাস্ত্রগ্রন্থ লেখেন– ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, আনন্দবৃন্দাবনচম্পূ, গোবিন্দলীলামৃতম, শ্রীশ্রীভক্তিরত্নাকর ইত‌্যাদি।

শ্রীচৈতন‌্যদেবের প্রভাব মন্দির-স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা ও পটচিত্রে– দ্বাদশ শতকের পর অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ পেরিয়ে পঞ্চদশ শতকে নতুন করে বাঙালি সংস্কৃতির উদ্ভব বা পুনজার্গরণ ঘটল। মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠার অভিঘাত পড়েছিল মন্দির স্থাপত্যেও। এই সময় নবউদ্ভাবিত ‘চালা’– একচালা, দোচালা, চারচালা, আটচালার প্রবর্তন ঘটে। চৈতন্যোত্তর যুগে ‘রত্ন’ মন্দিরের উদ্ভব এক যুগান্তকারী ঘটনা। পটচিত্রেও চৈতন‌্যদেব ছিলেন মূল প্রেরণা, এক কথায় মহাপ্রভু গৌড়ীয় নৃত্যের মধ‌্যমণিস্বরূপ।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: কীর্তনাচার্য গুরু নরোত্তম সান্যাল, মৃদঙ্গাচার্য ব্রজরাখাল দাশ, অধ্যাপক ড. মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, পণ্ডিত অমিতাভ মুখার্জি, মধুসূদন মহারাজ