Robbar

ভিখারির বীণা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 2, 2026 9:22 pm
  • Updated:March 2, 2026 9:39 pm  

আপাত শান্তিনিকেতনী সাজ আর আচার দিয়ে তো দিন শেষে দেখি রং হল, গান হল, পলাশও হল কিন্তু বাঙালির প্রাণ, রবিঠাকুর কোথায় যেন অন্তর্হিত হলেন! তিনি তো আহ্বান জানিয়েছিলেন, দ্বার খোলার আহ্বান। ভিতরের সেই দরজা দিয়ে স্থলে-জলে-বনতলে যে-দোল লেগেছে, তার স্পন্দন এসে লাগবে প্রতিটি হৃদয়ে। ওদিকে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় নররূপে যে-দেবশিশু আবির্ভূত হলেন তাঁর সাধন এবং জীবন যাপনের উদারনৈতিকতাকেও বাঙালি ধারণ করতে পারেনি। ভারতবর্ষের প্রথম সার্থক মানবতাবাদী নেতার রহস্যঅন্তর্ধানই তার প্রমাণ।

প্রচ্ছদ শিল্পী: ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার

ঋতচেতা গোস্বামী

১.
হোলি খেলে শ্যাম চিকন কালিয়া
আবীর কুমকুম ঢালিয়া।

গানে, গল্পে, ভারতের সংস্কৃতিতে এই ছবিটি চিত্রিত হয়ে রয়েছে অনপনেয় কালির আঁচড়ে। শাস্ত্রীয় সংগীতের বন্দিশ হোক কিংবা মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিং– সর্বত্রই এই চিত্র উজ্জ্বল। কখনও শ্রীকৃষ্ণ আবিরে রাঙিয়ে দিচ্ছেন শ্রীরাধিকার কপোল। কখনও পিচকারি ভরে রঙিন জলে ভিজিয়ে দিচ্ছেন পরনের চেলি। রাধিকা কপট অনুযোগে বলছেন, ‘মোহে ছেড়ো না গিরিধারী’। তাই বলে তিনি যে-একটুও রাগ করছেন, তা মোটেই নয়। রাধার সখীরা রং নিয়ে প্রস্তুত হয়েই এসেছেন। তাঁরাও আজ নন্দের নন্দনটিকে শায়েস্তা না-করে ছাড়বেন না। যুগ যুগ ধরে রাধাকৃষ্ণের এই লীলাখেলা রঙের ঋতুতে এদেশের অন্যতম পরিচয়। ভক্ত বৈষ্ণবের আনন্দোৎসব।

রাধাকৃষ্ণ। শিল্পী: নন্দলাল বসু

এদেশে কানু বিনা গীত নাই। কিন্তু এই ‘কানু’ লোকটা কে? লোকগাথার নায়ক? প্রজাবৎসল রাজা? গোপিবল্লভ প্রেমিকশ্রেষ্ঠ? বহুগামী লোলুপ পুরুষ? নাকি অবতার? আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই সবক’টি রূপ প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও ভারতীয় উপমহাদেশে তার জনপ্রিয়তা এতটুকু টাল খায়নি, বরং তিনিই সকলকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এহেন কৃষ্ণের সমস্ত জীবনটাই লীলাময়। পৌরাণিক কৃষ্ণ জগৎ উদ্ধারে আবির্ভূত হন। তারপর মা যশোদার বাৎসল্যরস উথলে সমস্ত মায়ের কোলের শিশুকে গোপালের রূপ দান করেন। তিনি জন্মের অব্যবহিত পরেই পুতনা রাক্ষসীকে হত্যা করেন, কালীয়-দমন করেন এমনকী, কংসবধও তিনিই করেন। অথচ এরই মাঝে গোষ্ঠ, রাস, দোলযাত্রা– কোনওটাই তাঁর বাদ যায় না। বৃন্দাবনের দোল তাই আজও কৃষ্ণপ্রেমীদের আদর্শ। তবুও ভক্তের ভগবানকে প্রত্যক্ষ করার জন্য যে-আয়োজন, মনে রাখতে হবে তা কিন্তু কখনও ‘সর্বজনীন’ হতে পারে না। ধর্মীয় পরিচয়ে সে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উৎসবে পরিণত হয়।

শ্রীচৈতন্য। শিল্পী: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

অরগানাইজড রিলিজিয়নের বাধাটুকু বাঙালিকে পার করিয়ে দিয়েছিলেন যিনি, তিনি শ্রীচৈতন্যদেব। আজ থেকে ৫০০ বছরেরও বেশি আগে নবদ্বীপের মাটিতে জন্মেছিলেন সেই অনেক কিছু ধুয়ে-মুছে দেওয়া বাঙালি যুগনায়ক। সে দিনটাও ছিল ফাল্গুনী পূর্ণিমা। উপরন্তু সেদিন ছিল চন্দ্রগ্রহণ। বৃন্দাবন দাস তাঁর শ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থে লিখছেন, 

অনস্ত ব্রহ্মা, শিব, আদি করি যত দেব,
সবেই নররূপ ধরি।
গায়েন হরি হরি,  গ্রহণ ছল করি,
লখিতে কেহ নাহি পারে ॥
দশ দিকে ধায় লোক নদীয়ায়,
বলিয়া উচ্চ হরি হরি ।
মানুষ দেব মেলি একত্র হঞা কেলি,
আনন্দ নবদ্বীপ পুরি।।
শচীর অঙ্গনে সকল দেবগণে,
প্রণাম হইয়া পড়িলা ।
গ্রহণ অন্ধকারে, লখিতে কেহ নারে,
দুর্জ্ঞেয় চৈতন্য খেলা ॥

সে সময়ে বোঝা সম্ভব হয়নি যে, তিনিই একদিন আদ্বিজচণ্ডালে শুধু প্রেম বিলিয়ে যাবেন। মিলিয়ে দেবেন আসমুদ্রহিমাচল। যাঁর কৈশোরের লেখাপড়া শেখা নবদ্বীপের টোলে, যা কিনা তখনকার ভারতবর্ষের অন্যতম জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। সেখানে শাস্ত্রশিক্ষা তাঁর কোন কাজে লেগেছিল? কৌতূহল জাগার অবকাশ নিশ্চয়ই আছে। টিকি-পইতেধারী আর পাঁচজন টুলো-পণ্ডিতের মতোই আরও একজন হয়ে উঠতে তাঁর আগ্রহ ছিল না। বিদ্যের বড়াই ছিল না কোনওকালে। বরং অনায়াসে তিনি নিজের সৃষ্টি ভাসিয়ে দিতে পারতেন গঙ্গার জলে। গঙ্গাস্নানের পুণ্য অভিলাষীদের গায়ে কুলকুচি করা জল দিয়ে মজা দেখতেন। এ যেন শুদ্ধ-অশুদ্ধের বিচার আর স্মার্ত-ব্রাহ্মণ্য শুচিতার মুখে সজোরে আঘাত।

রাম-কৃষ্ণ-চৈতন্যর মিলিত অবয়ব

২.
দোল উপলক্ষে ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ দিয়ে আরম্ভ করে ‘খোল দ্বার খোল’ পর্যন্ত পৌঁছে আজকের স্মার্ট বাঙালি ছোট্ট একটা হোঁচট খেয়েই খপ করে ধরে ফেলবে, ‘লঙ্গা ইলাচি কা…’    

শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবে এখন জমায়েত বিদেশিরাও

তবে চিরকালই দোল আর হোলি নিয়ে ‘শিক্ষিত’ বাঙালির মনে একটা দ্বিধা আছে। রাবীন্দ্রিক দোল তথা বসন্তোৎসব তাতে শিলমোহর দিয়েছে। দোল রাধাকৃষ্ণের লীলাখেলা। স্নান সেরে যুগলমূর্তিতে আবীর ছোঁয়ানো। বয়ঃজ্যেষ্ঠদের পায়ে আবীর দিয়ে প্রণাম করা। কপালে আর গালে আবীরের স্পর্শ। এখন তো ত্বকের সুরক্ষায় ফুলের আবীর, নানা রকম অর্গানিক আবীরও সুলভ হয়েছে। হোলিতে কিন্তু সে কৌলিন্য নেই। সেখানে আছে ঢোল, করতাল সহযোগে উচ্চস্বরে গান, বাঁদুরে রং আর ভাঙের কুলপি, শরবত। দোল বা হোলির এই উচ্চ-নীচের বাইনারিতে বাঙালি সদা দোদুল্যমান। মাঝখান থেকে জিতে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শান্তিনিকেতনে আশ্রমবালক-বালিকাদের মধ্যে যে বসন্তোৎসবের পরিকল্পনা করেছিলেন কবি, সেখানে ধর্ম আচরণের ঊর্ধ্বে এক বর্ণময় আনন্দোৎসবের ধারণাই বোধকরি প্রাধান্য পেয়েছিল। বসন্তের গানে, নাচের তালে, পলাশের রঙে রাঢ়ের রুক্ষ মাটি রাঙিয়ে দিয়ে শেষ হয় ঝরা পাতার খেলা। সেই সঙ্গে জীর্ণ জরা ঘুচিয়ে দিয়ে নতুনের আবাহন। আজ সেই উৎসব, পর্যটন ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। নাগরিক বাঙালির অন্যতম ডেস্টিনেশন আর পলাশ-নিধন যজ্ঞ।

বসন্তের মুদ্রা। শান্তিনিকেতন

৩.
অন্যদিকে নবদ্বীপে আজও দোল পূর্ণিমায় রং খেলার রেওয়াজ নেই। এই দিনটি গৌর পূর্ণিমা। শ্রীগৌরাঙ্গের জন্ম তিথি। নবদ্বীপ এক মন্দির নগরী। এই সুপ্রাচীন জনপদের প্রতি ঘরে মঠ। ঘরে ঘরে শ্রীচৈতন্যের আরাধনা, কীর্তন গান। পূর্ণিমার পর দিন শ্রীচৈতন্যের অন্নপ্রাশন। তারপর অর্থাৎ তৃতীয় দিন থেকে দোল আরম্ভ। তৃতীয় দোল, চতুর্থ দোল, এমনি করে দশম দোলে ধুমধাম করে দোল খেলা। এই দিনগুলোতে সারা দেশের নানা কোণ থেকে দলে দলে মানুষ এসে জড়ো হন নবদ্বীপে। সারাদিন ধরে চলে ছোট-বড় দলে ভাগ হয়ে নগর সংকীর্তন। 

শ্রীচৈতন্যের নগর-সংকীর্তন। ঋণ: দীনেশচন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গ (দ্বিতীয় খণ্ড)

কেউ বলছেন, খ্রিস্টপূর্ব যুগের ভারতেও রং খেলার অভ্যাস ছিল। তবে মোঘল দরবারের রং খেলার রীতি এবং পৃষ্ঠপোষকতা বসন্তের উৎসবকে আরও রঙিন করেছিল, সন্দেহ নেই। যার ফলে আজ  পাড়ায় পাড়ায় দোকানে দোকানে দেখি ছোট ছোট রঙের পুটুলি। চুরো করে রাখা নানা রঙের আবীর আর প্লাস্টিকের রংচঙে পিচকারি। বাজার অর্থনীতির এ-ও এক রঙিন অস্তিত্ব। প্রৌঢ়দের স্মৃতিতে হোলিকা দহনের প্রতীক হিসেবে ন্যাড়াপোড়া এখনও উজ্জ্বল। সেই ন্যাড়াপোড়ার ভুষো কালি আর কাদাগোলা জলই তখন ছিল রংখেলার দুপুরের শেষ দান।

হোলিকা দহন

২০২৬ সালের দোল পূর্ণিমায় এক অদ্ভুত সমাপতন। এবারও পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণ। এবার কি কিছু অন্য রকম ঘটতে চলেছে?  শ্রীচৈতন্যদেব, নিত্যানন্দ এবং অন্যান্যদের সঙ্গেই যবন হরিদাসকেও নিয়েছেন পথপরিক্রমায়, সংকীর্তনে। উচ্চনীচের কথা না-ভেবে সবাইকে এক ছাতার তলায় আনতে চেয়েছেন। তাঁর জন্মতিথিতে পালিত বসন্তোৎসবের ধর্মীয় অভ্যাসগুলোর মধ্যেও একটা সহজ পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। এই ভাবনার নেপথ্যে কতটা সমাজ, কতটা গুরুর বাণী, কতটা সন্ত কবীর আর গুরু নানকের সঙ্গে দেখা হওয়ার ফল তা অবশ্যই ভেবে দেখার। যেখানে ভালোবাসার ভগবানের নামগানই পূজার মূল উপকরণ সেখানে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সামূহিক নগর সংকীর্তনই দোল উৎসব পালনের একমাত্র রাস্তা হতে পারত। তাতে সামাজিক এবং আত্মিক– দু’দিকেই বাঙালি শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে পারত। আরও ধনী হতে পারত কীর্তন গান। 

চৈতন্য মিছিল

এখন কিন্তু শহুরে বাবু-বিবি সপরিবার বসন্তোৎসবে শান্তিনিকেতনে যাওয়াকে মনে করেন স্টেটাস সিম্বল। সারাদিন টোটো কোম্পানি ভরসা করে ভুল তথ্যের ভাণ্ডার পূর্ণ করে রাত্তিরে এক পাত্তর হাতে নিয়ে বসে বাউল গান শোনেন। অজস্র সেলফিতে ফোনের মেমরি ‘ফুল’ হয়ে যায়। এরই মধ্যে সোনাঝুরির হাট থেকে বাউলের ছবি আঁকা পাঞ্জাবি পরে নিয়েছেন। হাতে, গলায়, মাথায় পলাশের সজ্জা। ‘বাউল-ফকিরের রবীন্দ্রনাথ’ অ্যালবামের প্রস্তুতি পর্বে বীরভূমের বর্ষীয়ান বাউল শিল্পীর আক্ষেপ শুনেছিলাম, রবীন্দ্রনাথের ভূমিতে থেকে তাদের সেই সম্মান নেই। কেন নেই? বাউল গান আজ খোলা বাজারের পণ্য। বাংলার সংস্কৃতি দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণে রফতানি হচ্ছে। আমবাঙালি নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে গাঁটের কড়ি খরচ করে সম্বৎসর বসন্তোৎসব করতে জমায়েত হচ্ছেন। শান্তিনিকেতনে না-হলে শহরেরই কোনও পার্ক কিংবা কমিউনিটি হলে। এই আপাত শান্তিনিকেতনী সাজ আর আচার দিয়ে তো দিন শেষে দেখি রং হল, গান হল, পলাশও হল কিন্তু বাঙালির প্রাণ, রবিঠাকুর কোথায় যেন অন্তর্হিত হলেন! তিনি তো আহ্বান জানিয়েছিলেন, দ্বার খোলার আহ্বান। ভিতরের সেই দরজা দিয়ে স্থলে-জলে-বনতলে যে-দোল লেগেছে তার স্পন্দন এসে লাগবে প্রতিটি হৃদয়ে। ওদিকে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় নররূপে যে-দেবশিশু আবির্ভূত হলেন তাঁর সাধন এবং জীবন যাপনের উদারনৈতিকতাকেও বাঙালি ধারণ করতে পারেনি। ভারতবর্ষের প্রথম সার্থক মানবতাবাদী নেতার রহস্যঅন্তর্ধানই তার প্রমাণ। 

বাঙালি শ্রীচৈতন্যের  সেকুলারিজমকে হজম করতে পারেনি, সোশাল রিফর্মেশনকেও না। আজ আবারও এক দোলপূর্ণিমায় বসে ভাবছি যখন দেশজুড়ে ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত দ্বিধাবিভক্ত করা হচ্ছে তখন শ্রীচৈতন্য এবং রবীন্দ্রনাথ– আমাদের দুই প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠতে পারতেন। অথচ নিয়মিত শান দিয়ে তাকে ধারালো করে তোলার বদলে আমরা জংধরা এক নাগরিক বুদ্ধিজীবিতার পায়ে নিজেদের জলাঞ্জলি দিয়েছি।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন লহ গৌরাঙ্গ-এর অন্যান্য লেখা

……………………..