
বাংলাভাষা আমাকে সব ধরনের সাহস দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাহ্য করার সাহস। যে-পথে আগে হাঁটিনি সে-পথে হাঁটার সাহস। যে-কাজ আগে করিনি, সে-কাজ করার সাহস। কারও অধীনে না-থেকে একার জগৎ তৈরি করার সাহস। হয়তো ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু সেই ব্যর্থতার মধ্যেও কোথাও সেই স্বাধীনতা লুকিয়ে আছে। এই আশ্বাসটুকুও লুকিয়ে আছে যে, কারও হুকুমে ব্যর্থ হইনি। নিজের ইচ্ছেয় ব্যর্থ হয়েছি। ফলে বাংলাভাষা আমাকে আমার জীবনে সবকিছু দেওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে-উপহার দিয়েছে, তা হল বেঁচে থাকার সাহস। বাংলাভাষা আমাকে রুজি দিয়েছে, রুটি দিয়েছে, পারিশ্রমিক দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে, পুরস্কার দিয়েছে, তিরস্কারও দিয়েছে। কিন্তু দিয়েছে।
প্রতিকৃতি শান্তনু দে
বাংলাভাষার থেকে আমি কী পেলাম– এ প্রশ্নের উত্তরে যে-তালিকা করতে হবে, তা সম্ভবত ফুরবে না কোনও দিনই। এ জীবনে, যা কিছু পেয়েছি, তা স্পর্শযোগ্য হোক বা স্পর্শাতীত– বাংলা ভাষার মারফতই পেয়েছি, ফলে এ তালিকা অনিঃশেষ। বরং, একটি বিষয়ে থিতু হয়ে কথা বলা যেতে পারে, যা নিশ্চিতভাবেই আমি বাংলাভাষার থেকে পেয়েছি। তা হল: স্বাধীনভাবে বাঁচার সাহস।

একটু খোলসা করে বলি। স্নাতক স্তরে পড়ছি তখন। বিষয়: ভূগোল। ভূগোল আমার ভীষণ প্রিয় বিষয় ছিল, এখনও আছে। কিন্তু স্নাতক পড়তে পড়তেই মনে হতে থাকল যে, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে পাশ করে শিক্ষকতা বা ভূগোল-সংক্রান্ত কোনও চাকরি করা আমার জীবন হতে পারে না। কিন্তু কীরকম হতে পারে আমার জীবন? এর কোনও স্পষ্ট উত্তর আমার কাছে ছিল না।

একটা পথ ছিল বইকি। আমাদের বাড়িতে শাস্ত্রীয় সংগীতের ‘মাহোল’ ছিল। ছোটবেলা থেকে গান-বাজনা শুনেছি। মামাকে, মাকে, গানবাজনা করে উপার্জন করতে এবং সম্মান পেতে দেখেছি। তালিমও নিয়েছি দীর্ঘদিন। তাই পেশা হিসেবে গানবাজনাকেই বেছে নেব– এমন একটা বিশ্বাস আমার চারপাশের মানুষজনের ছিল, আমারও ছিল। কিন্তু বয়স যত বাড়তে লাগল, যত যৌবনকে ছুঁতে লাগলাম– তত মনে হতে লাগল হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীত আসলে সুরের প্রকাশ, সুরের কারিগরি। ভাষার তেমন বড় একটা শাসন সেখানে কায়েম হয়নি বহুদিন। এদিকে আমার চারপাশটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একটা নতুন পৃথিবীতে আশঙ্কা এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পা রাখছি যখন, তখন রাগ ইমনের বা রাগ ললিতের কোনও বন্দিশ আমার মনের কথা বলে উঠতে পারছে না। অর্থাৎ ‘সখি এরি আলি পিয়া বিনা’ বা ‘জাগো ভোর ভঈরে’– একথা আমার বলতে ইচ্ছে করছে না। তাই খুঁজতে শুরু করলাম কথা। কীভাবে কথা বলা যায় তাহলে? নিজের কথা? একমাত্র বলা সম্ভব– নিজের লেখালিখি দিয়েই।

আরও একটি মৃদু ভূমিকা করে রাখি। তা হল, আমাদের বাড়িতেই, আমাদের ছোট্ট সংসারে বাবা খুব গোপনে কবিতা লিখতেন। বাবার বেশ কিছু লুকিয়ে রাখা খাতা ছিল। সেখানে পাথর-কাটা হরফের মতো স্পষ্ট অক্ষরে তিনি নিজের কথা কবিতায় লিখে রাখতেন। কচ্চিৎ-কদাচিৎ আমাকে ডেকে শোনাতেন, আমার মত জানতে চাইতেন। এইটা জেনেই যে, কবিতার প্রতি আমারও একইরকম ভালোবাসা আছে। তখন বাবার গোপনীয়তার পাল্টা এক গোপনীয়তা আমিও চালাচ্ছি। লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করছি। যদিও সে সমস্ত লেখা বাবাকে শোনানোর সাহস আমার হয়নি। ইচ্ছেও হয়নি। কেবল মনে হত, যে-প্রকাশ আমি গানে পাচ্ছি না, যে-প্রকাশ আমি ভূগোলের মধ্য দিয়ে পাচ্ছি না, যে-প্রকাশ আমি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডায় পাচ্ছি না, সে-প্রকাশ অন্তত এই গোপন খাতাগুলোয় ধরা থাকুক।

দিন কাটছিল এভাবেই। আরেকটা বিষয় আমাকে বড্ড বেশি আকর্ষণ করত। তা হল, বাবার অস্ত্রখানি। বাবা ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে, সংগীত সমালোচক হিসেবে দীর্ঘদিন নিযুক্ত ছিলেন। বাবা একটা সুতির সাধারণ পাঞ্জাবি আর আটপেড়ে ধুতি পরতেন। কিন্তু বাবা যখন কাজে যেতেন বা কাজ থেকে ফিরতেন– পকেট থেকে একটা কলমের ডাঁটি বেরিয়ে থাকতে দেখা যেত। আমার গোটা পাড়ায়, একমাত্র মানুষ, যাঁর পকেটে একটা কলম অস্ত্রের মতো জেগে থাকত। আমার খুব লোভ হত, মনে হত– কী চমৎকার পেশা! যে-পেশায় কলমকে নিজের বুকে আটকে রেখে ঘুরে বেড়ানো যায়। এমনটা কি আমার কখনও হতে পারে? এই অবধিই ভাবতাম। এর থেকে বেশি ভাবতে পারিনি কোনও দিন!

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভূগোল পড়তে পড়তে আমার একসময় পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করল। বলে রাখি, যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলের প্রতি আমার এক ধরনের অনাসক্তি বা অস্বস্তি আছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন: প্রতিষ্ঠান ভেঙে যায় বহুদিন, সুসময় লেগে। হয়তো সেই ‘সুসময়’ আমার সহ্য হত না। তাই বারে বারে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতাম। ভূগোলের দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিলাম স্নাতক স্তরে আর ফলাফল যখন মন্দ হল না, তখন আমি যে-অধ্যাপকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পড়তে যেতাম, তিনি বললেন, তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা যদি এমনই ভালো হয়, প্রথম শ্রেণিতে যদি উত্তীর্ণ হতে পারি, তাহলে দেশের বাইরে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়তে যেতে পারি। তারপর সেখানেই কাজকর্ম করার একটা পরিসরও পাওয়া যেতে পারে। আমার প্রতি তাঁর এই প্রত্যয় আরও একবার প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি ভয় জাগিয়ে তুলল। মনে হল, তাহলে তো সারাজীবনের মতো একই কাজে বাঁধা পড়ে যেতে হবে! তা তো আমি করতে চাই না।

তাহলে কী উপায়? বাড়িতে বিদ্রোহ জারি করলাম। তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেব না। তখন সে বছরের বেশ কিছু পরীক্ষা দেওয়া হয়ে গিয়েছে, কেবল দুটো পরীক্ষা বাকি। দুটোই প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। সে দুটো দিলেই আমার স্নাতক স্তর শেষ। অতঃপর স্নাতকোত্তরে প্রবেশ করতে পারি। স্বভাবতই এরকম লাগামছাড়া ঘোষণায় আমাদের মতো সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার– যাঁদের একদিকে সম্বল সাদামাটা একখানা চাকরি, আরেকদিকে গানবাজনার টিউশনি ও কিছু অনুষ্ঠান, সেই পরিবার ভেঙে পড়ল। আশঙ্কিত হয়ে উঠল। আমার মা-বাবা আমাকে বহু বোঝালেন, বারণ করলেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, তাঁদের অভিভাবকরাও এই পন্থার বিরোধিতা করলেন। কিন্তু আমার মনে হল, এই পালিয়ে যাওয়াটুকু ‘প্রতীকী’ বিদ্রোহ নয়। সত্যিকারের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে গেলে, এখানে থেকে পালিয়ে যেতে হবে। তার কারণ আমি মনে করেছি, প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে প্রতিষ্ঠানকে ভাঙা যায় না। যদি সত্যিই কোনও প্রতিষ্ঠান গলার ফাঁস হয়ে ওঠে, তবে তাকে ত্যাগ করাই মঙ্গল। প্রথাগত পড়াশোনা আমার কাছে তেমনই এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিল তখন। যদিও যাঁরা পড়াশোনা মন দিয়ে করেছেন, পড়াশোনাকে বেছে নিয়েছেন, তাঁদের প্রতি তখন এবং আজও আমার অগাধ শ্রদ্ধা জারি আছে। কিন্তু যে-মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম যে, পড়াশোনা আমার পথ হতে পারে না– তখন সে-পথে ক্রমাগত হেঁটে চলা অপচয় বলেই মনে হয়েছিল।
একমাত্র আমার ছোটমাসি, আমার কথায় বিশ্বাস করেছিলেন। দিয়েছিলেন প্রশ্রয়। তিনি আর তাঁর বর তাঁদের দুই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন জামশেদপুরে। আমি জেদ ধরলাম তাঁদের বাড়িতে চলে যাব। তাঁরা সবাইকে বোঝালেন– ও যখন বলছে, নিশ্চয়ই ওর মাথায় কোনও পরিকল্পনা আছে। পরিকল্পনা একটা ছিল বটে, কিন্তু সে-পরিকল্পনা সকলের সামনে ফাঁস করলে ভারি হাস্যকর শোনাত।

কী সেই পরিকল্পনা? তা হল– আমার মাথায় গিজগিজ করা কবিতার লাইন একের পর এক লিখে ফেলা। তার জন্য দরকার পরীক্ষার বাইরের এক উন্মুক্ত পরিসর। শেষমেশ এক প্রায়-বসন্তের ভোরবেলা, ঠিক যেদিন দুপুরে আমার পরীক্ষা, সেদিনই মাসির সঙ্গে জামশেদপুরগামী ট্রেনে চড়ে বসলাম। বাড়িতে আগেকার দিনের সাহিত্যের মতো ‘কান্নার রোল’ উঠল বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। নেহাত আমার বাবা-মা নরম মনের মানুষ, নইলে এরকম হঠকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করতেও বাধত না। সবার কান্না, শাসন, বারণ, অনুরোধ ঠেলে ফেলে রেখে আমার সেই যাত্রা। এই কলকাতায় আমি ফিরিনি প্রায় চারমাস। চারমাস কি আমার কোনও পরিকল্পনা ছিল? হ্যাঁ, ছিল। বাংলাভাষায় লেখালিখি করা। কিন্তু এই যে আমি ভূগোল পড়া ছাড়লাম, অধ্যাপনার একটা পথ খুলে যেতে পারত, এই যে এতদিনকার সংগীতের তালিম– তা এগিয়ে নিয়ে গেলে একটা উপার্জন বা পরিচিতি হতে পারত, ছাড়লাম তো সেই পথকেও। কিন্তু তার বিকল্প কোনও পথ কি এই লেখালিখির মধ্য দিয়ে খুঁজে পাব? উল্টোদিকে আমি জানতাম, লিখে বাংলাভাষায় টাকাপয়সা রোজগার করা যায় না। স্বাধীন থাকা যায় না। এমন একটা বোধ আমাদের চারপাশে চারিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের ভাষার এবং সমাজের ইতিহাসও তো আমাদের তাই-ই শেখায়। তা সত্ত্বেও তখন আমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা কবিতার স্রোতকে আটকাতে পারছিলাম না বলেই, প্রতিষ্ঠানকে বিদায় জানিয়ে চড়ে বসেছিলাম ট্রেনে।
৪ মাস পর যখন গুটিগুটি পায়ে কলকাতায় এসে পড়লাম। বাড়িতে ফিরে দেখলাম, আমার এই সিদ্ধান্তের ফলে আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারটা আরও একটু কুঁকড়ে, ভেঙেচুরে, মুখচোরা হয়ে গিয়েছে। তখন আমার ব্যাগে সাত ডায়েরি-ভর্তি কবিতা। সে-কবিতার কোনও গন্তব্য আছে কি না, জানি না। সে-কবিতা, বাংলা ভাষার এতদিনকার কবিতা প্রবাহ থেকে কোথাও স্বতন্ত্র হয়ে আছে কি না, জানি না। সে-কবিতা কেউ ছাপবেন কি না, জানি না। তেমন জানার ইচ্ছেও নেই। কিন্তু বাংলাভাষা আমাকে শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার সাহসটুকু দিয়েছিল। ভাষা আমার পিঠে হাত রেখে বলেছিল, তোমার যা ইচ্ছে, তাই-ই করো। হতে পারে পাগলামি, কিন্তু পাগলকেই বা কতজন প্রশ্রয় দেয়? আমার মতো পাগলকে বাংলাভাষা রুখে দাঁড়ানোর, যুঝে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছিল।

এই সিদ্ধান্তকে এতটাও হয়তো হঠকারি দেখাত না, যদি না আমার এই সিদ্ধান্তের বেশ কিছু বছর আগে বাবার কোম্পানি লক-আউট হয়ে যেত। বাবা কাজ করতেন ‘যুগান্তর’ সংবাদপত্রে। মালিকের সঙ্গে ইউনিয়নের দীর্ঘ ঝামেলা। বিরাট আর্থিক প্রবঞ্চনা এবং ধর্মঘট। অফিসের দরজায় তালা। রাতারাতি একজন তরতাজা ভাষাপ্রেমী মানুষকে আমি ভেঙে পড়তে দেখেছিলাম। বাবা চেষ্টা করেছিলেন, টুকটাক অন্য জায়গায় কাজ জুটিয়ে নেওয়ার। পেয়েওছিলেন। কিন্তু আস্তে আস্তে সে কাজগুলোও বন্ধ হয়ে গেল। আসলে মানুষও খানিকটা পুতুলের মতোই। একবার বন্ধ হওয়ার তকমা তার গায়ে পড়ে গেলে, অন্য কেউ তাকে নিতে চায় না। আমার বাবা ছিলেন ওই রকম দমবন্ধ হওয়া একজন পুতুল। সারাদিন সিঁড়ির ধারে চুপ করে বসে থাকতেন। সেই পাঞ্জাবিগুলো আর পরা হত না। বুকপকেটে সেই গর্বিত অস্ত্র– কলমটাকে আর গুঁজে রাখা হত না। এক-দু’জন বাবাকে বলেওছিলেন, ‘তপন, অন্য কোনও কাজ কি হয় না?’ বাবার তখন ৫৩-৫৪ বছর বয়স। আজ আমি যা, তার থেকে কয়েক বছরের মাত্র বড় তিনি। বাবাকে বলতে শুনতাম, ‘কী করে অন্য কোনও কাজ করব? আমি তো বাংলাভাষায় লেখা ছাড়া আর কিছু পারি না।’ আমার মনে তখন একই সঙ্গে দুঃখ, কষ্ট, ক্ষোভ আর রাগও হত এই ভেবে যে, নিজের ভাষায় লেখা ছাড়া অন্য কিছু পারেন না যিনি, তাঁকে কেন নিজের মাটিতে কাজ খুঁজে বেড়াতে হবে? তাঁকে কেন কাজ দেওয়া যাবে না? যেন-বা নিজের ভাষায় চমৎকার লিখতে পারা এক ধরনের খামতি। যেন-বা বাংলাভাষায় কাজ করে বেঁচে থাকা এক ধরনের দুরাশা। বাবাকে দেখে বুঝতাম যে, লিখে টিকে থাকা, এমনকী, লিখে, চাকরি করেও টিকে থাকা সেই বাজারে কত দুর্মূল্য একটি বিষয়! সেই কারণেই আমার গৃহীত সেই পন্থা আরও বেশি করে আশঙ্কার মেঘ ডেকে এনেছিল আমাদের ওই ছোট্ট ছাদের চারপাশে।
বাবা না-হয় চাকরি করতেন। আমি তো পড়াশোনাটাও করলাম না। গানবাজনাও। আর এই সাত ডায়েরি কবিতারই বা কী ভবিষ্যৎ! অর্থাৎ বাবা যদি-বা এতদিন চাকরি করেছেন, আমি তো বঞ্চনার শিকার হওয়ার মতো কয়েক বছর চাকরিও করতে পারব না। তাহলে আমাকে দিয়ে কী কাজ হবে? সত্যি বলতে কী, আমাকে দিয়ে অনেক দিন কোনও কাজ হয়নি। বাবা-মা’র হতাশা, দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তখনকার বেকার আমি, যুবক আমি কলকাতার এ-গলি সে-গলি ঘুরে বেড়াতাম। আর গোপন ডায়েরির সংখ্যা বাড়িয়ে চলতাম পড়ার ঘরের টেবিলে।

একটা সময় এল। একটা চাকরি জুটল। তখনও মাথায় কবিতার ভূত। কয়েক মাস চাকরি করার পর কৃত্তিবাসের একটা সংখ্যা এনে আমার বস বললেন, ‘তুমি যে কবিতা ছাপাচ্ছ বড়?’ ততদিনে টুকটাক এদিক-সেদিক নানা কাগজে, পত্রপত্রিকায় আমার কবিতা ছাপা শুরু হয়েছে। আমি তাঁকে বললাম যে, ‘হ্যাঁ, কবিতা আমি লিখি তো।’ তিনি তখন বললেন, ‘এই পত্রিকায় কাজ করলে অন্য কোথাও লেখা যাবে না।’ পত্রিকাটি ছিল খবরের পত্রিকা। তাঁকে আমি বলেছিলাম, ‘কিন্তু, আমাদের পত্রিকায় তো কবিতা ছাপা হয় না। তাহলে আমি কবিতা কোথায় ছাপাব?’ তিনি তখন বলেছিলেন, ‘এর সহজ উত্তর হল: কবিতা ছাপাবে না, কারণ তুমি এখানে চাকরি করো।’

তখন ওই চাকরিটা আমার ভীষণ দরকার। দূর্বা আর আমি তখন সদ্য-বিবাহিত। দূর্বা তখন পোস্ট ডক্টরেট করছে। সেই সংক্রান্ত একটা বৃত্তি পায়। কিন্তু চাকরি জীবন শুরু করেনি। আজকের মতো এত চমৎকার করে ছড়িয়ে পড়ে সমাজের জন্য কাজ করা তার শুরু হয়নি। বাবা ততদিনে আরও ভেঙেচুরে একজন প্রায়-নিশ্চিহ্ন মানুষ হয়ে বাড়ির এককোণে পড়ে আছেন। মায়ের গানবাজনা অল্পস্বল্প চলছে। সে কারণেই সেসময় ওই ক’টা টাকার চাকরি আমার ভারি দরকার। কিন্তু সেই যে, প্রাতিষ্ঠানিকতার ফাঁস সেদিনও সন্ধেবেলায় আমার গলায় চেপে বসল। সেদিন সন্ধেয় অফিস থেকে বেরনোর সময় একটা ছোট্ট পদত্যাগপত্র বসের টেবিলে গিয়ে রাখলাম। আর বললাম, ‘যে-চাকরি আমাকে আমার কবিতা প্রকাশ করতে দেবে না, সে-চাকরি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

এত ঘূর্ণির মধ্যে দাঁড়িয়ে এই বাক্যটুকু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলার সাহস আমায় কে দিল? আমি তো তখনও বাবা-মার সঙ্গে, দূর্বার সঙ্গে, কাছের বন্ধুদের সঙ্গে– কারও সঙ্গে কথা বলিনি। পরামর্শ করিনি। এই সাহস আমাকে দিল বাংলাভাষা। বাবার এত দুর্দশা দেখার পরেও, চারপাশের উপকথাগুলিতে বাঙালি কবি-লেখকদের এমন দুর্দিনের ইতিহাস শোনার পরেও, বাংলাভাষাই আমাকে এই উত্তর দেওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। তিনি চিঠিটা নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছিলেন, ‘এখান থেকে কোথায় যাবে?’ আমি তাঁকে স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিলাম, ‘বাড়ি যাব।’ বেরিয়ে এসে দূর্বাকে ফোন করি। দূর্বা আমাকে একটাই কথা বলেছিল, ‘ঠিক করেছিস। কোনও কিছুর জন্যই কবিতাকে কোনও দিন ছাড়বি না।’ এই জোরটা আমি চিরকাল দূর্বার থেকে, আমার বাড়ির কাছের মানুষদের থেকে পেয়েছি।

ছেড়ে দিলাম চাকরি। কী করব, জানি না। এরপর আরও এক জায়গায় চাকরি হল। সেখান থেকে আরেক জায়গায়। কিন্তু সব সময়ই এটা মনে হত, আমি যে-সময়টা ‘খবর’ লিখছি, যে-সময়টা হেডলাইন লিখছি, যে-সময়টা অন্যান্য কিছু লিখছি– সেসময় আমার নিজের কিছু লেখা উচিত। শেষমেশ একদিন চাকরি ছাড়লাম এবং স্বাধীনভাবে কিছু করার চেষ্টা করলাম। ততদিনে আমার বন্ধু– সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং বিরসা দাশগুপ্ত ওদের আদরে-আহবানে-আমন্ত্রণে ডাকে। ওদের ছবিতে একটা-দুটো গান লেখার সুযোগ পেয়েছি। সেই একটা-দুটো গান মানুষের পছন্দ হয়েছে। ধীরে ধীরে অন্যান্য লেখালিখির সুযোগও আসছে। আলাপ হল রিনাদির সঙ্গে। রিনাদি একটা পত্রিকা করছেন। সেখানে আমাকে সহ-সম্পাদক হিসেবে আমন্ত্রণ জানালেন। চাকরির তখন দরকার নেই, বলব না। খুবই দরকার। তার চেয়েও বড় লোভ হল অপর্ণা সেনের সঙ্গে এক অফিসে রোজ যাতায়াত করা। তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া। ওঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। চাকরির ভেতরে এবং বাইরে, জীবনের শিল্পের বিষয়েও। ওই চাকরি চলাকালীনই আমার মনে হল– এইবার একটা এসপার নয় ওসপার। জীবনে একটা চূড়ান্ত ঝাঁপ দিতেই হবে। তখনও জানি না, সামনে কী আছে। জানি, শুধু অতল খাদ বা প্রখর সমুদ্রই অপেক্ষা করে আছে। এ-ও জানি, ওই ঝাঁপ বা সাঁতার একেবারেই সহজ হবে না। স্রোতের বিরুদ্ধে যে কোনও কিছুই বড় কঠিন, আজও। কিন্তু ওই ঝাঁপের মধ্যে, সমুদ্রস্রোতের মধ্যে, এক ধরনের ঝুঁকির আনন্দ আছে। সে-নেশার কোনও তুলনা নেই। রিনাদিকে গিয়ে বললাম। তিনি আমাকে দু’-একবার অনুরোধ করলেন ঠিকই। কিন্তু তিনি নিজে এত বড়মাপের শিল্পী বলেই বোধহয় স্বাধীনতার প্রতি এই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মানও জানালেন। বলেছিলেন, ‘তুই তোর মতো চেষ্টা কর, কখনও যদি মনে হয় ফিরে আসবি, আমাদের দরজা তোর জন্য খোলা রইল।’
সেই যে আমি চাকরির গণ্ডির বাইরে পা বাড়ালাম, তারপর এতগুলো বছর কেটে গিয়েছে, আর চাকরির দিকে ফিরিনি। বুঝতে পারি, বাংলাভাষা আমাকে এই স্বাধীনতা অর্জন করার সাহস দিয়েছে। প্রত্যেক দিন ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে, একই জায়গায় গিয়ে, একই জায়গায় বসে, একই কাজ করার মধ্যে যে-একঘেয়েমি আছে, তাকে এড়িয়ে চলার সাহস আমাকে দিয়েছে বাংলাভাষা। আমার কথাগুলোর মধ্য দিয়ে যেন একবারও মনে না হয়, যাঁরা চাকুরিজীবী, তাঁদের কাজকে, জীবনযাত্রার ধরনকে আমি আঘাত করছি। কারণ প্রতিটি চাকরি গৌরবের, প্রতিটি চাকরি প্রয়োজনের। দীর্ঘদিন আমি চাকরি ও নানা অন্য কাজ করেছি। কিন্তু কোথাও আমার একটা জেদ ছিল নিজের কাছে এটা প্রমাণ করার, যে, বাংলাভাষায় লিখে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা ‘অপরাধ’ নয়। নিজের ভাষায় লিখতে পারলে, লিখতে চাইলে আমার বাবার মতো দুমড়ে-মুচড়ে শেষ হয়ে যাওয়ার নিয়তিই হবে একমাত্র পরিণতি– তা হতে পারে না। সেই উপপাদ্যের প্রতিস্পর্ধী একটি উপপাদ্য তৈরি করাই ছিল আমার জেদ।

আমার খুব আক্ষেপ, বাবা আমার এই স্বাধীন জীবনটুকু দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু আমার মনে হয়, আমার স্বাধীনতার জন্যই বোধহয় বাবা প্রাণ দিয়েছিলেন। যেমন দেশ স্বাধীন করার জন্য বহু মানুষ প্রাণ দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীন দেশটিকে তাঁরা দেখে যেতে পারেননি। আমি জানি, আজ যেমন দূর্বা খুশি, আমার মা খুশি ছিলেন যতদিন জীবিত ছিলেন– বাবাও আমাকে আমার মতো কাজ করে বেঁচে থাকতে দেখলে খুব খুশি হতেন। হয়তো কোনও নির্দিষ্ট একটি কাজে, নির্দিষ্ট মাসমাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে জীবনে অনেক কিছু উন্নতি হত। এবং সবচেয়ে বড় বিষয়, একটা নিশ্চয়তা আসত। যে-নিশ্চয়তা আমার থেকে বহু দূরে। কিন্তু বাংলা ভাষায় নানা কিছু লিখে নিজের মতো বেঁচে থেকে আমার মনে হয়েছে, নিশ্চয়তাও এক ধরনের ফাঁদ। তাতে ধরা দিলে সে পেয়ে বসে। নিশ্চয়তাও এক ধরনের নেশা। সে একবার পেয়ে বসলে তাকে কাটানো মুশকিল। বরং অনিশ্চয়তার মধ্যে এক ধরনের আশ্রয় আছে। ঝুঁকির আশ্রয়। আগামী দিনে কী হবে তা বুঝতে না-পারার মজা। যেখানে আমাদের গোটা গ্রহের এই ঘূর্ণন– এই আবর্ত, সেটাই অনিশ্চিত– সেখানে একজন মানুষের জীবন অনিশ্চিত হলে খুব কিছু যায় আসে না।
আজকে পিছন ফিরে তাকালে সেই দিনগুলো খুব মনে পড়ে। যখন ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে কত কত চাকরি করতে হয়েছে। এবং যতবার চাকরি ছাড়ার কথা ভেবেছি, সিঁড়ির পাশে, একলা, থুতনিতে হাত রেখে বসে থাকা আমার ভাঙাচোরা বাবার কথা মনে পড়েছে। আজ যখন নিজের কাজ করার জন্য কারও কথা শুনতে হয় না, যখন বাংলাভাষা আমাকে এইটুকু সাহস আর স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে, তখন বাবার কথা মনে হয় খুব। আর মনে হয়, সেই সময় আমার লেখা এত এত ডায়েরি-ভর্তি কবিতাগুলোর কথা। সেগুলো কিন্তু আজও কোথাও ছাপানো হয়নি। এই যে অসংখ্য কবিতা না-ছাপিয়ে লুকিয়ে রেখে দেওয়ার সাহস, বাবা ছাড়া আমাকে বাংলাভাষাই তা দিতে পারত।

আজ এই কথাটুকু আমি পরম ভালোলাগার সঙ্গে বলতে পারি যে, বাংলাভাষা আমাকে সব ধরনের সাহস দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাহ্য করার সাহস। যে-পথে আগে হাঁটিনি সে-পথে হাঁটার সাহস। যে-কাজ আগে করিনি, সে-কাজ করার সাহস। কারও অধীনে না-থেকে একার জগৎ তৈরি করার সাহস। হয়তো ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু সেই ব্যর্থতার মধ্যেও কোথাও সেই স্বাধীনতা লুকিয়ে আছে। এই আশ্বাসটুকুও লুকিয়ে আছে যে, কারও হুকুমে ব্যর্থ হইনি। নিজের ইচ্ছেয় ব্যর্থ হয়েছি। ফলে বাংলাভাষা আমাকে আমার জীবনে সবকিছু দেওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে-উপহার দিয়েছে, তা হল বেঁচে থাকার সাহস। বাংলাভাষা আমাকে রুজি দিয়েছে, রুটি দিয়েছে, পারিশ্রমিক দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে, পুরস্কার দিয়েছে, তিরস্কারও দিয়েছে। কিন্তু দিয়েছে। বাংলাভাষা ছিল বলেই আজ কারও কাছে হাত পাততে হয় না। কারও প্রতি নির্ভরশীল হতে হয় না। কারও তোয়াজ করে চলতে হয় না। আজ জানি, কেবল বাংলাভাষাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার সাহসটুকু জিইয়ে রাখতে হয়। আর বাংলাই বোধহয় একমাত্র ভাষা যেখানে ‘সাহস’ শব্দটাকে উল্টে নিলে ‘সহসা’ হয়। আমার জীবনের সব বড় সিদ্ধান্তই তো সহসা নেওয়া, আর সহসা নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর আড়ালে লুকিয়ে ছিল সাহস। আসলে দুটোই একই মুদ্রার এ-পিঠ আর ও-পিঠ।
যে-মুদ্রায় অঙ্কিত রানির মুখ আসলে বাংলাভাষারই প্রতিচ্ছবি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved