Robbar

বিরহর আসল মানে ‘রহো’

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 10, 2026 5:12 pm
  • Updated:February 10, 2026 5:12 pm  

আমার উনত্রিশতম বসন্তে বিক্রম চলে গেল। বিক্রমকে পুড়িয়ে যখন ওর বাড়িতে ফিরে মোমবাতির আগুন স্পর্শ করেছি পিয়ার্সনপল্লীর ভোরের আকাশ আলো করে ফুটেছে পলাশ। এই সেদিন আরমান খানের গলায় যখন শুনছি এক আশ্চর্য বসন্তগান, বুকের মধ্যে, এতদিন পরে, ডুকরে উঠল বিক্রমবিরহ, ওর আঁকা ভাজাইনা সিরিজ-এর ক্যানভাসের লাল রঙের মতো, সেই বসন্তেই মা-হারা চন্দনাদির ছবির আজও বয়ে-চলা ফাগমাখা রেবা নদীর মতো, আমার এই বাড়ির ঘরভরা শূন্যতার বুকের উপরে ফুটে উঠল কিংশুকরক্তিমরাগ…

শৈবাল বসু

বুড়ো আমার মাসতুতো ভাই। পোশাকি নাম ডক্টর সপ্তর্ষি মল্লিক, ভিয়েনায় এক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করে। ছেলেপুলেরা স্যরকে ভালোবাসে, প্রাণের কথা মনের কথা ভাগ করেও নেয় কেউ কেউ। বুড়োর মুখে শোনা গল্প। গল্প নয়, সত্যি। মাঝরাতে বুড়োর ফোনে এক ছাত্র, কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘ওহ স্যাপটোরসি, ক্যান আই গো টু ইউ!’ বাছার সেদিন ব্রেক-আপ হয়েছে, একা একা বিরহের ভার বইতে পারছে না, তাই মাস্টারের কাছে যেতে চায় অশ্রুমোচন করতে। বুড়ো বেচারি কী করে, বাড়িতে আসতে বললে তাকে। “বুঝলি তো দাদা, কেঁদে কেঁদে মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে, নাকের জল চোখের জল দু’-হাতে মুছেও জল কমছে না! আমি তাকে বললাম, ‘লুকাস, তুমি কিছু খেয়েছ?’ মাথা নেড়ে ‘না’ বলে আবার অঝোরঝরণ কান্না!” তো বুড়ো আর কী করে, সসপ্যানে চারটি গোবিন্দভোগ চাল ফুটতে দিল। একটু আলুভাতে আর ঘি দিয়ে নরম গোবিন্দভোগের ভাত মেখে প্লেটখানি ওর মুখের সামনে ধরল। তারপর? বুড়ো বললে, ‘লুকাস, একটু করে সেই অমৃত খাচ্ছে আর ওর কান্না কমছে। চেটেপুটে খেল, বুঝলে!’

আমি বললাম, ওরে বুড়ো, কান্না কেন থামল বল তো? বুড়ো বলল, ‘কেন আবার, ভাত গিলে! খিদে কমছে, আরাম হচ্ছে!’

শিল্পী: চন্দনা হোর

‘ওরে না রে ভাই’, আমি বলে উঠি, ‘ও যা খেল তার নাম গোবিন্দভোগ। শাস্ত্রে আছে, বিরহের বিপরীত হল সম্ভোগ। বৈষ্ণবমতে জগতে একজনই প্রেমনীয়, তিনি ওই গোপালগোবিন্দ কেষ্টঠাকুর, আর আমরা প্রত্যেকেই হলেম রাধা। আরাধিকা থেকেই তো রাধিকা। আরাধ্য প্ৰণয়ীর সম্ভোগেই বিরহজ্বালা দূর হয়, বুইলি না!’

ভাবি, বাঙালি বিধবার আলোচালের ভাত ‘গোবিন্দভোগ’ আর আমাদের রাধাস্বরূপ গোরাচাঁদের সাধের নোনতা ভোগ হল ‘রাধাবল্লভী’।

শুনহ সম্পাদকভাই, আমার বিরহ কি একমাত্রিক! আমায় বালকবয়সের পেরথম ক্রাশ আমার দিদা। আমার যখন ১৩ মাস বয়স, দিদার কংগ্রেসি বরকে খুন করেছিল সাতের দশক। আর আমার গরদরঙা দিদা ভিটেমাটি ক্রিশ্চান মিশনারিদের হাতে জলের দরে তুলে দিয়ে জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে কলকাতার ট্রেনে উঠল মাথায় হাত দিয়ে। রেলগাড়ি প্লাটফর্ম ছেড়ে চলে যাচ্ছে, আমি দেখলাম শেষ বগির কালচে পিঠে একটা বড় লাল ক্রস চিহ্ন। যেন একটা অবলম্বন কেটে দিল কেউ, ছিন্ন হল আমার আতপচাল চন্দন দোক্তা পানের নিরাপত্তা। তারপর থেকে যতবার হাহারবে তার ছিঁড়ে গিয়েছে সম্পর্কের, বুকে একটা লাল ক্রসচিহ্ন এঁকে দিয়েছে কেউ, আর সেই ভারি ক্রস বয়ে বয়ে চলেছি একা…

ক্লাস নাইন। সরকারি লটারিতে জিতেছি রবীন্দ্ররচনাবলি। ৮০ টাকা স্টেট ব্যাঙ্কে জমা দিলেই পেয়ে যাব পাঁচ-পাঁচটি খণ্ড। বৈশাখ মাস। গরমের ছুটি। সকালের অঙ্ক কষা শেষ করেই মায়ের কাছে হাত পাতলাম, ‘মা, ৮০ টাকা?’

শিল্পী: শৈবাল বসু

মা বলল, ‘তোর বাবা তো দিয়ে যায়নি।’ আমি পাশের বাড়ি থেকে বাবার অফিসে ফোন। ‘হ্যালো বাবাইয়া, আমার ৮০ টাকা রেখে যেতে ভুলে গেলে, এখন আমি কী করি!’

‘এখন ওই টাকা দেওয়া যাবে না।’ বাবার আশ্চর্য কণ্ঠ ভেসে এল লাল রিসিভার পার করে।
‘কেন? কেন বাবাইয়া?’

‘বলছি তো, অসুবিধে আছে’। রিসিভার ক্রেডল-এ রাখার শব্দ। আমার বাবা খুলনা হাই ইশকুলে ‘প্রশ্ন’ কবিতা আবৃত্তি করেছিল। দেশভাগের আগের কিশোরবেলায় ‘তুমি কি বেসেছ ভালো?’ প্রশ্ন করে সবচেয়ে গেরামভারি মাস্টারমশাইয়ের পকেটের দামি ঝরনাকলম প্রাইজ পেয়েছিল, আলোভরা মুখে কতবার শুনেছি সেই গল্প! সেই বাবা? 

সেইদিন থেকে আমার বাবা-বিরহ শুরু। অনেক পরে একান্তে বাবা লিখেছিল আমায়, মা না কি বাবাকে আড়ালে নিষেধ কিরছিল রবীন্দ্রনাথ কিনে দিতে। তাতে না কি পরীক্ষার পড়া হবে না, রেজাল্ট খারাপ হবে। আমার বিএড পাশ গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া মা! 

দিদা, আজ সকালে মামাবাড়ির উঠোনে বড়মাইমা পৌষ সংক্রান্তির আলপনায় ধানছড়া এঁকেছে জানো?  আসমানি রঙের ইনল্যান্ড লেটারে গাঢ় নীল কালিতে দিদা লিখল, ‘আমার সকাল কি আর তোর সকালের মতো সোনা…’

১৬ পার হতেই আমার আঙিনা দিয়েই আনমানুষে মন দিতে চলে গেল যে, তার জন্যই একশো আট নয়, নতুন শরীরের আবডালে রেখেছিলাম একটিই নীলপদ্ম।

একটি শ্যামলা মেয়ে গান শিখতে আসত শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায়, সুচিত্রাদির কাছে। বাংলার ছাত্রী, তার বাটিকের ওড়নার তারিফ করায় একদিন হঠাৎ এক কাগজের মোড়ক হাতে আমার হোস্টেলের দরজায়। ‘শৈবালদা, তোমায় এক সুন্দরপানা মেইয়ে ডাকতিছে।’ হোস্টেলের আবহমানের রক্ষী পূর্ণদার চোখে মৃদু কৌতুক। পাজামার উপরে একটা টি-শার্ট চড়িয়ে নিচে এসে দেখি সেই মেইয়ে। ‘এটা আপনার জন্য।’ কাঁচা হলুদ আর লাল বাটিকের একটা শার্ট। ‘গায়ে দেবেন,বুঝলেন?’ সুচিত্রা মিত্রের ‘কৃষ্ণকলি’ যাঁরা শুনেছেন, খেয়াল করবেন ওঁর গুরু শান্তিদেবের মতোই ওঁর ‘মেয়ে’ উচ্চারণটা অনেকটা ‘মেইয়ে’র মতো। দিন এমন কাটল কয়েক, সে আমিই জানি, আর জানে সেই ‘মেইয়ে’। তারপর, একদিন যথারীতি ভাঙল মিলনমেলা। স্থান কালোর দোকান। চৈত্রমাস। হলুদ কাপড়ের ঢাকা দেওয়া তানপুরা হাতে নিয়ে চলে গেল ধীরে। রতনপল্লী মোড় থেকে ধেনুয়াভাইয়ের রিকশা নিয়ে সোজা স্টেশন। ইন্টারসিটি ছাড়বে। সামনে যে কম্পার্টমেন্ট পেলাম উঠে বসলাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। কোনও সহযাত্রীর ওয়াকম্যান থেকে বেজে উঠল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। চলে যা আ আ আ য়। ট্রেন স্পিড নিল। মরি হায়, চলে যায়, হেমন্ত গাইছেন, বসন্তের দিন চলে যায়… চলে যা আ…

তারার কোমল রে। বুক খান খান করে দিচ্ছে। ট্রেন চলছে।

শিল্পী: বিক্রম সিং খাংগুরা

আমার উনত্রিশতম বসন্তে বিক্রম চলে গেল। বিক্রমকে পুড়িয়ে যখন ওর বাড়িতে ফিরে মোমবাতির আগুন স্পর্শ করেছি পিয়ার্সনপল্লীর ভোরের আকাশ আলো করে ফুটেছে পলাশ। এই সেদিন আরমান খানের গলায় যখন শুনছি এক আশ্চর্য বসন্তগান, বুকের মধ্যে, এতদিন পরে, ডুকরে উঠল বিক্রমবিরহ, ওর আঁকা ভাজাইনা সিরিজ-এর ক্যানভাসের লাল রঙের মতো, সেই বসন্তেই মা-হারা চন্দনাদির ছবির আজও বয়ে-চলা ফাগমাখা রেবা নদীর মতো, আমার এই বাড়ির ঘরভরা শূন্যতার বুকের উপরে ফুটে উঠল কিংশুকরক্তিমরাগ…

‘বিরহ’ মানে যে আসলে ‘রহো’, বহু বিরহের মাঝে আশৈশব বাস করে, এই এতদিনেও কি জানা হয়ে উঠল আমার?