
ভূতের ভাষা মৃতদের ভাষা নয়, জীবিতদের ব্যাখ্যা। ভূত কথা বলে প্রতিধ্বনিতে, স্মৃতিতে, বস্তুতে— চিঠি, গান, ডায়েরি, রেকর্ডে। তাদের ভাষা অসমাপ্ত, কারণ তারা অসমাপ্ত গল্পের প্রতিনিধি। তাই ভূতের কণ্ঠ সবসময় শব্দ ও নীরবতার মাঝখানে, স্মৃতি ও বর্তমানের মাঝখানে দুলতে থাকে। আর সেই কারণেই ভূতের ভাষা আমাদের এত টানে— কারণ ভাষা মানে শুধু কথা নয়, ভাষা মানে সময়ও।অনেক ভূতের গল্পে ভয় তৈরি হয় শব্দে নয়, শব্দের অভাবে।
সে এক দিন ছিল, ছিলই বা কেন? আছে— আজও প্রবল ভাবেই। শিশুকে ঘুম পাড়ানো বা ভূতের গল্প বলার সময়, ভূতের আগমনে বাবা বা মা সব কথার আগে চন্দ্রবিন্দু যোগ করে বলেন। নাসিক্যধ্বনির কারণ হয়তো ভূতেদের স্বরযন্ত্রের বৈকল্য যেমন সরলীকরণ, ঠিক অন্যভাবে দেখতে গেলে খানিক বাড়তি অভিনয়ও ভয়ের বা ভূতের গল্পে প্রয়োজন হয়। সেই কারণেই মৌখিক পরম্পরায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভূতের গল্পে কথনরীতিতে থেকে যায় চন্দ্রবিন্দুর প্রয়োগ।

“Who calls me from the corridor of sleep?”— the voice seemed to rise not from the throat of a body but from the folds of memory itself. “I have not forgotten the house, nor the lamp, nor the name by which you once knew me.” সাহিত্যে ভূতের ভাষা নিয়ে কথা শুরু করতে গেলে এই ধরনের সংলাপই যেন মানানসই। কারণ ভূতেরা সাধারণত কথোপকথন করে না, তারা ফিরে আসে, ফিরে এসে কিছু প্রশ্ন করে। কখনও জানান দেয়, নিজের সঙ্গে হয়ে যাওয়া অত্যাচারের গোপন জবানবন্দির। আর সেই ফিরে আসার সঙ্গে আসে কণ্ঠের এক অদ্ভুত সময়-দূরত্ব। যেন শব্দগুলো উচ্চারিত হওয়ার আগেই পুরনো হয়ে গিয়েছে। তাই ভূতের ভাষা কেবল শব্দের বিষয় নয়; তা স্মৃতি, ধ্বনি, নীরবতা ও মানুষের কল্পনার এক জটিল মিলনক্ষেত্র।

একটু বৈঠকিভাবে ভাবলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই ভূতের ভাষা নিয়ে আলাদা কৌতূহল আছে। কিন্তু সেই ভাষা কখনওই পুরো স্পষ্ট নয়। বরং ভাঙা, প্রতিধ্বনিময়, সময়বন্দি। ভাষাবিজ্ঞানের চোখে এটাকে ফসিলাইজড স্পিচ (fossilised speech) বলা যায় — এমন ভাষা যা চলমান সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সময়ের ভেতর স্থির হয়ে গিয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে আমরা তার অসংখ্য উদাহরণ পাই। রবীন্দ্রনাথের গল্পে ভূতেরা প্রায়ই আবহে কথা বলে। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এ প্রাসাদের অতীত যেন ফিসফিস করে ওঠে; ‘মণিহারা’-য় শব্দের পুনরাবৃত্তিই হয়ে ওঠে ভাষা। বিভূতিভূষণের লেখায় আবার ভূতের উপস্থিতি আসে অর্ধেক শোনা কণ্ঠে, পাতার শব্দে, দূরের ডাকে। এখানে ভূতের ভাষা ব্যাকরণে নয়, অনুভবে।

এই প্রবণতা কিন্তু শুধু বাংলার নয়। শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট-এ ভূতের প্রথম সংলাপই যেন তার ভাষার প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়: ‘Mark me.’
এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশের মধ্যেই রয়েছে তার ভয়াবহতা— সে কথা বলতে এসেছে, কিন্তু পূর্ণ গল্প নয়, কেবল দায়। আবার পরে সে বলে, “I am thy father’s spirit.” ভাষা গম্ভীর, আচারানুষ্ঠানিক, প্রায় ধর্মীয় — যেন সে ব্যক্তি নয়, ইতিহাসের প্রতিনিধি।
জাপানি লোককথায় ভূতের ভাষা আরও আলাদা। সেখানে আত্মারা প্রায়ই সংক্ষিপ্ত, কবিতার মতো বাক্যে কথা বলে। লাফকাদিও হার্ন জাপানের ভূতকথা নিয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, মৃতেরা নাকি মানুষের মতো দীর্ঘ কথা বলে না; তারা “speak as if memory itself were speaking.” এই ধারণা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ— ভূতের কণ্ঠ যেন ব্যক্তিগত নয়, স্মৃতিগত।

চিনা ক্লাসিক গল্পসংগ্রহ স্ট্রেঞ্জ টেলস ফ্রম আ চাইনিজ স্টুডিও-তে (Strange Tales from a Chinese Studio) (লিয়াওঝাই ঝিই) বহু ভূত মানুষের ভাষায় কথা বলে বটে, কিন্তু তাদের উচ্চারণে সময়ের ছাপ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরনো প্রবাদ, কাব্যপঙ্ক্তি বা আচারানুগ বাক্য ব্যবহার করে। ফলে ভাষাটি জীবিত সমাজের নয়, এক ধরনের সাহিত্যিক স্মৃতির ভাষা হয়ে ওঠে।
ইউরোপের গথিক সাহিত্যে আবার অন্যরকম ধারা। চার্লস ডিকেন্সের ‘দ্য সিগনাল ম্যান’ গল্পে ভূতের কণ্ঠ বারবার শোনা যায়— “Halloa! Below there!” এই পুনরাবৃত্তি ভয় তৈরি করে। কারণ ভূত যেন নতুন বাক্য তৈরি করতে পারে না; সে আটকে থাকে এক সতর্কবাণীতে। এখানেও ভাষা সময়ের লুপে বন্দি।

আইরিশ লোককথায় ‘ব্যানশি’-র কথা ধরা যাক। সে কথা বলে না, কাঁদে। তার কান্নাই ভাষা। এই উদাহরণ দেখায়, ভূতের ভাষা শব্দ ছাড়িয়েও হতে পারে— কেবল ধ্বনি, আর্তনাদ, বা সুর। স্কটিশ লোকবিশ্বাসে আবার মৃতের আত্মা স্বপ্নে এসে কথা বলে, কিন্তু খুব সংক্ষিপ্তভাবে— যেন দীর্ঘ ভাষণ দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও ভূতের ভাষার আলাদা ধরন আছে। বাংলায় যেমন উপভাষা গুরুত্বপূর্ণ, রাজস্থানের ভূতের গল্পে আত্মারা প্রায়ই লোকগানের ছন্দে কথা বলে। কেরলের কথায় কিছু আত্মা নাকি শ্লোকের মতো উচ্চারণে কথা বলে— ধর্মীয় সুর মিশে থাকে তাতে। উত্তর ভারতের বহু লোককথায় ভূতেরা মানুষের স্বর নকল করে ডাকে, কিন্তু শব্দে সামান্য টান থাকে— সেই সামান্য অস্বাভাবিকতাই ভয় তৈরি করে।

এই প্রসঙ্গেই আসে অভিনয়ের কথা। নাটক বা সিনেমায় ভূতের ভাষা দেখাতে অভিনেতারা সচেতনভাবে স্বরযন্ত্রের ব্যবহার বদলান। সাধারণ কথায় যেখানে কণ্ঠ খোলা থাকে, ভূতের সংলাপে তা অনেক সময় চাপা বা বাতাস-মেশানো হয়। এতে শব্দে দেহহীনতার অনুভূতি আসে। নাসিক্যধ্বনি একটু বাড়িয়ে দিলে কণ্ঠ যেন মাথার ভেতর থেকে বেরয় বলে মনে হয়। আবার অনেক অভিনেতা সংলাপকে পুরো গদ্য না রেখে সামান্য সুরে বলেন— যেন কথার সঙ্গে একটুখানি গানের রেখা লেগে আছে। এই আধা-সুর আসলে খুব তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মানুষের কণ্ঠ যখন সুরের দিকে যায়, তখন তা দৈনন্দিনতা ছাড়িয়ে কিছুটা অতিমানবীয় হয়ে ওঠে।
মনস্তত্ত্বও এই বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করে। আমরা যখন কাউকে হারাই, তার পুরো কথোপকথন মনে রাখি না; মনে থাকে তার ডাক, তার বিশেষ শব্দ, তার কণ্ঠের টান। সাহিত্য সেই স্মৃতিকেই অতিপ্রাকৃত করে তোলে। ফলে ভূতের ভাষা প্রায়ই ব্যক্তিগত— যেন সে শুধু একজনকেই ডাকছে।

বাংলা সংস্কৃতিতে ভূতের ভাষা আবার জায়গাভেদে বদলায়। গ্রামের ভূত গ্রামের টানে কথা বলে, জমিদারের ভূত ভদ্রলোকি ভাষায়, ঔপনিবেশিক সময়ের ভূত ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে। ফলে ভূতের ভাষা একধরনের ঐতিহাসিক ‘আর্কাইভ’ হয়ে ওঠে— যেখানে সময় জমা থাকে উচ্চারণে।
আর সবশেষে থাকে নীরবতা। অনেক ভূতের গল্পে ভয় তৈরি হয় শব্দে নয়, শব্দের অভাবে। ডাকার পর উত্তর না পাওয়া, পরিচিত শব্দ হঠাৎ থেমে যাওয়া— এই নীরবতাই ভাষা হয়ে ওঠে। ভাষাতত্ত্ব বলে নীরবতাও যোগাযোগ; ভূতের গল্পে সেটাই সবচেয়ে তীব্র সংকেত।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ভূতের ভাষা মৃতদের ভাষা নয়, জীবিতদের ব্যাখ্যা। ভূত কথা বলে প্রতিধ্বনিতে, স্মৃতিতে, বস্তুতে— চিঠি, গান, ডায়েরি, রেকর্ডে। তাদের ভাষা অসমাপ্ত, কারণ তারা অসমাপ্ত গল্পের প্রতিনিধি। তাই ভূতের কণ্ঠ সবসময় শব্দ ও নীরবতার মাঝখানে, স্মৃতি ও বর্তমানের মাঝখানে দুলতে থাকে। আর সেই কারণেই ভূতের ভাষা আমাদের এত টানে— কারণ ভাষা মানে শুধু কথা নয়, ভাষা মানে সময়ও। কখনও ভূতের ভাষা নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা দেখতে পাই কিছু ভাষাও যেন ভূত হয়ে গেছে। ফ্রোজেন-সময়ের কাছে জমাট বেঁধে থাকা। যা পরিত্যক্ত বা অব্যবহৃত, আজকের গতিময়তায় আর মানানসই নয়। তবুও কোনও স্মৃতির অতল থেকে উঠে আসে সে, আচমকা মুখোমুখি দাঁড় করায় শ্রোতাদের। এও এক ধরনের ‘রিটার্ন অফ দ্য রিপ্রেসড’।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved