
প্রশ্নটা আর বিজ্ঞান না কলা এই সরল দ্বন্দ্বে আটকে থাকে না। প্রশ্নটা হয়ে ওঠে, আমরা কেমন মানুষ গড়ে তুলতে চাই। এমন মানুষ, যে শুধু নিরাপদ পথে হাঁটতে শিখেছে, না কি এমন মানুষ, যে নিজের কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও বোধের আলোয় পৃথিবীকে নতুন করে চিনতে পারে? বিজ্ঞান আমাদের যুক্তির শৃঙ্খলা দেয়, কলা আমাদের অনুভবের গভীরতা। এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয় সম্পূর্ণ মানুষ। তাই কোনও একটি বিভাগকে শ্রেষ্ঠ, আর অন্যটিকে গৌণ বলে দেখার মানসিকতা শুধু শিক্ষার দিগন্তকেই সংকুচিত করে না, মানুষের সম্ভাবনাকেও ছোট করে দেয়।
প্রচ্ছদ: দীপঙ্কর ভৌমিক
বিজ্ঞান বিভাগ না কি কলাবিভাগ? কোন বিভাগে ভর্তি হলে জীবনের অগ্রগতি হবে? আজ থেকে বছর দশেক আগেও, মধ্যবিত্ত সমাজে একটা দ্বন্দ্ব ছিল, এখনও আছে অল্পবিস্তর। অনেকে মনে করতেন, বিজ্ঞান বিভাগে না গেলে জীবনে উন্নতি নেই। চাকরি নেই। সমাজের মানদণ্ডে বাহবা নেই। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেই বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতেই হবে। যেনতেনপ্রকারেন বিজ্ঞান বিভাগে ঢুকতেই হবে। বিজ্ঞানকে ভালবাসো কিংবা নাই বাসো, বিজ্ঞান তোমাকে পড়তেই হবে। অন্যদিকে কলাবিভাগ শুনলেই কেমন একটা নাক সিটকানো ব্যাপার চলে আসে! কেউ নেয় না কি এইসব বিষয়? কী হবে ইতিহাস, বাংলা, ভূগোল পড়ে? কে চাকরি দেবে? এইসব উদ্ভ্রান্ত ধারণা ছিল সমাজের একটা অংশের মানুষের।

ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা ভারতে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কাজে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। ফলে বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ এগুলো সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্র ও অবকাঠামো নির্মাণে সহায়ক ছিল। অন্যদিকে সাহিত্য, ইতিহাস বা দর্শনের মতো বিষয়গুলোকে তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহারিক হিসেবে দেখা শুরু হয়। পরবর্তীকালে শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানীদের মর্যাদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই পরিবর্তনের ঢেউ ভারতীয় সমাজেও এসে পৌঁছয়, যেখানে বিজ্ঞান ধীরে ধীরে সাফল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর দেশের উন্নয়নমূলক প্রয়োজনও এই মানসিকতাকে আরও দৃঢ় করে। একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত জরুরি, ফলে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রতি ঝোঁক বাড়তে থাকে। এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ধারণা। বেশি নম্বর পাওয়া ছাত্ররা সায়েন্স নেয়, আর বাকিরা আর্টস। ধীরে ধীরে এই ধারণা এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বিষয় নির্বাচন আর ব্যক্তিগত আগ্রহ বা দক্ষতার উপর নির্ভর না করে সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এভাবেই বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের মধ্যে এক অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়, যা আজও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে।
এই মানসিকতার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই। স্কুল ও কলেজে বিজ্ঞান বিভাগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভালো শিক্ষক, উন্নত ল্যাবরেটরি, সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের অগ্রাধিকার তৈরি হয়। অন্যদিকে, কলাবিভাগকে অনেক সময় বিকল্প পথ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বা সৃজনশীলতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সামাজিক ধারণা। এর ফলে একটি অদৃশ্য শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হয়, যা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, পছন্দ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অনেকেই নিজের প্রকৃত দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে না-পেরে হতাশায় ভোগে, আবার কেউ কেউ নিজের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না। সব মিলিয়ে, এই বিভাজন কোনও স্বাভাবিক বা স্বতঃসিদ্ধ বাস্তবতা নয়। বরং এটি একটি সামাজিক নির্মাণ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী হয়েছে। আজকের দিনে, যখন আন্তঃবিষয়ক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ছে এবং মানবিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সমন্বয়েই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, তখন এই পুরনো ধারণাকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।

আমাদের সমাজে মেধাকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তা অনেকটাই সংকীর্ণ এবং একপাক্ষিক। সাধারণত পরীক্ষার নম্বর, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও গণিতের দক্ষতাকেই মেধার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। ফলে একটি প্রচলিত ধারণা তৈরি হয়েছে, যে সায়েন্সে ভালো, সে-ই বেশি মেধাবী। অথচ বাস্তবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা একমাত্রিক নয়; ভাষাগত দক্ষতা, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সামাজিক বোধ প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদা ধরনের মেধা কাজ করে। একজন ভালো লেখক, ইতিহাসবিদ বা মনোবিজ্ঞানী যেমন গভীর চিন্তাশক্তির পরিচয় দেন, তেমনি একজন বিজ্ঞানী যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেন। দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, শুধু প্রকাশের ধরন ভিন্ন। কিন্তু এই বহুমাত্রিক মেধার ধারণাটি আমাদের পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট জায়গা পায় না। বরং অনেক সময় অভিভাবক ও স্কুল, অজান্তেই এই ভুল ধারণাকে আরও জোরদার করে তোলে। ছোটবেলা থেকেই ‘তুমি ভালো ছাত্র, সায়েন্স নাও’ বা ‘আর্টস নিয়ে কী হবে?’ এই ধরনের মন্তব্য একজন শিক্ষার্থীর মনে গভীর ছাপ ফেলে। শিক্ষকরা প্রায়ই বেশি নম্বর পাওয়া ছাত্রদের সায়েন্সে উৎসাহিত করেন আর তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া ছাত্রদের কলাবিভাগে যেতে বলেন, যেন এটি একটি স্বাভাবিক ক্রমবিন্যাস। ফলে মেধার প্রকৃত বৈচিত্র না বুঝেই, একধরনের লেবেলিং শুরু হয়ে যায়, যা অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ও নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এইভাবেই, মেধার ভুল সংজ্ঞা শুধু একটি ধারণা হয়ে থাকে না, বরং তা পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তব সিদ্ধান্তে রূপ নেয় এবং একটি প্রজন্মের ভাবনা ও ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করে।
বর্তমান সময়ে ‘বিজ্ঞান বনাম কলা’ এই পুরনো দ্বন্দ্ব যে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও বাস্তব প্রবণতায়। ভারতের শিক্ষামন্ত্রকের All India Survey on Higher Education (AISHE) ২০২১-২২ অনুযায়ী, স্নাতক স্তরে সবচেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে কলাবিভাগে, প্রায় ৩৪.২%, যেখানে বিজ্ঞান বিভাগে এই হার প্রায় ১৪.৮% এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-এ প্রায় ১১.৮%। অর্থাৎ, সমাজে যতই সায়েন্সকে প্রথম পছন্দ হিসেবে তুলে ধরা হোক না কেন, বাস্তবে শিক্ষার্থীদের বড় অংশই কলাবিভাগের দিকেই ঝুঁকছে। একইভাবে, ASER-এর ২০২৩ সালের রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, গ্রামীণ ভারতের ১৪-১৮ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৫৫% কলাবিভাগে পড়াশোনা করছে। এই তথ্যগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, বাস্তবতা সমাজের প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্রময়।

এই পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে আধুনিক চাকরির বাজার ও নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির বড়সড় রদবদল। আজকের বিশ্বে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত জ্ঞানই যথেষ্ট নয়। বরং সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এই গুণগুলোর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যা মানবিক শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ডিজিটাল যুগে কনটেন্ট ক্রিয়েশন, মিডিয়া, ডিজাইন, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি, এমনকী ইতিহাস বা দর্শনের মতো বিষয় থেকেও নতুন নতুন পেশার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে আধুনিক যুবসমাজ ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে যে সাফল্য কোনও একক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং ব্যক্তির দক্ষতা ও আগ্রহের ওপর নির্ভর করে। তবে এই পরিবর্তন সম্পূর্ণ সমানভাবে ঘটেনি। এখনও অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে নিরাপদ বা ‘প্রেস্টিজিয়াস’ পথ হিসেবে দেখা হয় এবং পরিবার বা সমাজের চাপ অনেক শিক্ষার্থীকে সেই দিকেই ঠেলে দেয়। তবুও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম এই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে শিখেছে। তারা শুধু কোনটা ভালো– এই প্রশ্নে আটকে নেই, বরং কোনটা আমার জন্য উপযুক্ত– এই প্রশ্নটিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই মনোভাবই ধীরে ধীরে বিজ্ঞান ও কলার পুরনো বিভাজনকে ভেঙে দিয়ে একটি আরও মুক্ত, বহুমাত্রিক এবং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষাচিন্তার দিকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে আর্থিক স্থিতিশীলতা এখনও অনেক পরিবারের কাছে প্রধান উদ্বেগ, সেখানে পেশা নির্বাচন প্রায়ই হয়ে ওঠে নিরাপত্তা বনাম স্বপ্নের লড়াই। অভিভাবকরা স্বাভাবিকভাবেই চান সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হোক। নিয়মিত আয়, সামাজিক সম্মান এবং স্থায়ী চাকরি। এই কারণেই তাঁরা প্রায়শই বিজ্ঞানভিত্তিক পেশা, যেমন ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রযুক্তিক্ষেত্রকে বেশি গুরুত্ব দেন, কারণ এই ক্ষেত্রগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও লাভজনক হিসেবে দেখা হয়েছে।

কিন্তু এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপেই অনেক সময় চাপা পড়ে যায় ব্যক্তির নিজস্ব আগ্রহ ও স্বাভাবিক দক্ষতা। যে ছাত্রটি হয়তো সাহিত্য, ইতিহাস বা শিল্পকলায় অসাধারণ, তাকেও বাধ্য হয়ে এমন একটি পথে হাঁটতে হয়, যা তার নিজের নয়। এর ফলে শুধু যে তার সৃজনশীল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে তার কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়, এমনকী মানসিক চাপ ও হতাশার জন্ম নেয়। অন্যদিকে, যখন কেউ নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে পথ বেছে নিতে পারে, তখন তার কাজে সন্তুষ্টি ও সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি হয়। যদিও সেই পথটি শুরুতে কম নিরাপদ মনে হতে পারে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তি ও সৃজনশীল স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজকের প্রেক্ষিতে প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে অর্থনীতি ও আগ্রহ দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। কারণ, শেষপর্যন্ত যে কাজ মানুষ ভালোবেসে করে, সেই কাজেই সে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সফল হতে পারে; আর সেই সাফল্যই ধীরে ধীরে আর্থিক স্থিতিশীলতার পথও তৈরি করে দেয়।

সবশেষে প্রশ্নটা আর বিজ্ঞান না কলা এই সরল দ্বন্দ্বে আটকে থাকে না। প্রশ্নটা হয়ে ওঠে, আমরা কেমন মানুষ গড়ে তুলতে চাই। এমন মানুষ, যে শুধু নিরাপদ পথে হাঁটতে শিখেছে, না কি এমন মানুষ, যে নিজের কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও বোধের আলোয় পৃথিবীকে নতুন করে চিনতে পারে? বিজ্ঞান আমাদের যুক্তির শৃঙ্খলা দেয়, কলা আমাদের অনুভবের গভীরতা। এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয় সম্পূর্ণ মানুষ। তাই কোনও একটি বিভাগকে শ্রেষ্ঠ, আর অন্যটিকে গৌণ বলে দেখার মানসিকতা শুধু শিক্ষার দিগন্তকেই সংকুচিত করে না, মানুষের সম্ভাবনাকেও ছোট করে দেয়। প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন আমরা এই কৃত্রিম বিভাজন পেরিয়ে বুঝতে শিখি– পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি পথই মূল্যবান, যদি তা মানুষকে তার নিজের সত্তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং তাকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved