Robbar

প্রতিটি মাসই আন্দোলন, প্রতিটি দিনই স্লোগান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 5, 2026 5:10 pm
  • Updated:January 5, 2026 5:10 pm  

এই ক্যালেন্ডারের উল্লেখযোগ্য একটি দিক হল, নারীমুক্তি আন্দোলন, ট্রান্স-কুইয়ার আন্দোলনের দিকগুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা। তাই কুর্দিশ নারীমুক্তি আন্দোলনের স্লোগান ‘জান, জিন্দেগি, আজাদি’ এবং ‘পিতৃতন্ত্রকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও’ মিলেমিশে গেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রূপান্তরকামী মানুষদের আওয়াজ, তাঁদের কন্ঠের সেই চিৎকার, ‘আমরা কুইয়ার, আমরা আছি– অভ্যস্ত হও’ কোথায় যেন আমাদের ভাবতে করেছে যে এই মানুষদেরও বাঁচার অধিকার আছে।

সুমন সেনগুপ্ত

নতুন বছর। আমাদের বাড়িতে, কাজের জায়গার টেবিলে এসে গিয়েছে বার্ষিক ক্যালেন্ডার। গত বছরের মতো কলকাতার বেশ কিছু মানুষ আবারও নিয়ে এসেছেন তাঁদের নতুন ‘ক্যানভাস অফ আনটোল্ড হিস্ট্রি’র ক্যালেন্ডার নিয়ে। গত বছরের এই ক্যালেন্ডারের বিষয় ছিল, আমাদের দেশের মানুষের খাবারের বৈচিত্র। ২০২৬ সালকে ধরলে, এই ক্যালেন্ডার পঞ্চম বছরে। অনেকেই এই ক্যালেন্ডার কিনেছেন, উপহার দিয়েছেন, তার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। মূলধারার ভাষ্য যে কথাগুলো উপেক্ষা করে, এই ক্যালেন্ডার সেই কথাগুলোকেই বেছে নিয়েছে এইবারেও। এই ক্যালেন্ডার শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের জীবন্ত গল্পগুলিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

‘ক্যানভাস অফ আনটোল্ড হিস্ট্রি’র ২০২৪ সালের ক্যালেন্ডার

ক্যালেন্ডারের ইতিহাস প্রাচীন সময় থেকে সমাজে চলে আসা অনুশীলনগুলিকে একত্রিত করার চেষ্টা করে, যখন মানুষ দিন এবং সময়ের বৃহত্তর বিভাজনের হিসাব রাখার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি তৈরি এবং ব্যবহার করত। ক্যালেন্ডার সাধারণত সাংস্কৃতিক এবং ব্যবহারিক– উভয় উদ্দেশ্যেই কাজ করে এবং প্রায়শই জ্যোতির্বিদ্যা এবং কৃষির সাথে যুক্ত থাকে। ক্যালেন্ডারের যেমন নিজস্ব ইতিহাস আছে, তেমনই কখনও কখনও কোনও কোনও ক্যালেন্ডার অন্য ইতিহাসও বলে। সাম্প্রতিক ইতিহাস ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই কলকাতার কিছু মানুষ এই ক্যালেন্ডারটি তৈরি করেছেন। মানবজাতির বেঁচে থাকার লড়াই দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। পরিচয়, মর্যাদা এবং আত্ম-সংরক্ষণের জন্য মানুষের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে– কখনও ব্যক্তিগতভাবে, কখনও সম্মিলিতভাবে– দেশ ও মহাদেশ জুড়ে, গ্রামে, শহরে, নগরে এবং নগর প্রান্তে, নদী, বন এবং সীমান্ত জুড়ে। মানুষের এই লড়াই কখনও বহুজাতিক কর্পোরেশনের বহুমুখী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে; কখনও জমি, বন এবং জলের দখলের বিরুদ্ধে; কর্তৃত্ববাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে; এবং ধর্ম, ভাষা, জাতিগততা, আঞ্চলিক পরিচয়, লিঙ্গ এবং যৌনতার ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের উপর অবিরাম নির্যাতনের বিরুদ্ধে। সেই সংগ্রামে নানা স্লোগান তৈরি হয়েছে, যা বিখ্যাত হয়ে উঠেছে, ছাড়িয়েছে দেশের সীমানা। গান, স্লোগান, পোস্টার এবং শিল্প সর্বদা এই সংগ্রামগুলিকে লালন ও শক্তিশালী করেছে। এই বছরের ক্যালেন্ডার সেই বিখ্যাত স্লোগানগুলির উপর আলোকপাত করা হয়েছে। যা মনে করিয়ে দেবে ঐ আন্দোলনগুলোর কথা। এই সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলির শক্তিশালী আহ্বান যা স্থানীয় বিদ্রোহ থেকে প্রতিরোধের সর্বজনীন কণ্ঠে পরিণত হয়েছে, তা সারা বছর ধরে প্রতি মাসে আমাদের মনে করাবে। যাঁরা এই ক্যালেন্ডারের কুশীলব, তাঁদের মনে হয়েছে এই ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে, এই আন্দোলনগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। মানুষের সংগ্রামের গল্প ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, অগণিত তরঙ্গ তৈরি করার জন্য যতটুকু করা সম্ভব, ততটুকুই চেষ্টা করেছেন এই ক্যালেন্ডারের কুশীলবেরা। তাঁদের আশা তাঁদের এই ছোট উদ্যোগ একটি অদম্য বিশ্বকে নাড়া দিতে পারে। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে হাতের কাছে, গত কয়েক বছরের মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস পেতে পারেন, সেই জন্যেই এই উদ্যোগ।

সারা বিশ্ব জুড়ে তাকালেই এখন একটাই দৃশ্য। একটি দেশ আরেকটি দেশকে আক্রমণ করেছে। মানুষ মারা যাচ্ছে, শুধু অস্ত্রের আঘাতে নয়, খাবার শেষ হয়ে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে। শুধু সাম্প্রতিক সময়ে নয়, এই দৃশ্য আমরা প্রায় এক দশক ধরে দেখছি। ইরাক যুদ্ধের সময়ের সেই দৃশ্যটা আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। সমুদ্রতীরে ভেসে আছে একটি শিশুর মৃতদেহ। তখন থেকে কি না জানা নেই, কিন্তু আওয়াজ বহুদিন ধরে উঠছিল, যুদ্ধ বন্ধ হোক। আজকে রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধ বা ইজরায়েলের প্যালেস্টাইনের ওপর আক্রমণের পর নাগরিক সমাজ থেকে এই স্লোগান আবার নতুন করে সামনে এসেছে। যুদ্ধ যে ক্ষতি করছে, যুদ্ধতে যে মানুষের মৃত্যু হয়, তা এখন সাধারণ যে কোনও মানুষ বোঝে। নিজের বা কাছের মানুষের মৃত্যু মানুষকে আজ বাধ্য করেছে এই স্লোগানকে সামনে রেখে রাস্তায় নামতে। সারা বিশ্বের সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছে। পরিবেশবিদ গ্রেটা থুনবার্গ, বাংলাদেশের ফটোগ্রাফার শহীদুল ইসলাম-সহ বহু মানুষ নেমে রাস্তায় বলা শুরু করেছে SAY NO TO WAR। ভারত-পাকিস্তানের সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আবার ঐ স্লোগান ধ্বনিত হয়েছে এই উপমহাদেশের মানুষের মধ্যেও। মানুষ যে যুদ্ধ চায় না, শুধু অস্ত্র ব্যবসায়ী ছাড়া কোনও মানুষের যে যুদ্ধে কোনও লাভ হয় না, তা মানুষ রাস্তায় নেমে প্রমাণ করেছে। তাই ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ হয়ে উঠেছে এই ক্যালেন্ডারের একটি পাতা। এর সঙ্গেই উঠে এসেছে আরো একটি স্লোগান– ‘From the rivers to the sea, Palestine will be free’ অর্থাৎ নদী থেকে সমুদ্র, প্যালেস্টাইন হবে মুক্ত। এই স্লোগানে যেমন আছে আশার কথা, তেমন আছে সাম্রাজ্যবাদের থাবা। দুটোই সত্যি হলেও, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা ঘুরে ফিরে এসেছে এই স্লোগানে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় ফিলিস্তিনের সংগ্রামের কথা

‘We are the 99%’ বা আমরাই ৯৯ শতাংশ এই স্লোগানের জন্ম Occupy Wall Street আন্দোলনে। পুজিবাদের সবচেয়ে লোভী ও শোষণমূলক দিককে কী করে প্রতিহত করা যায়, তা দেখিয়েছিল ঐ আন্দোলন। এই পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের অসম বন্টনের বিরুদ্ধে, হাজার হাজার মানুষ পথে নেমে ঐ আন্দোলন করেছিল। গত দশকে যেভাবে সাম্রাজ্যবাদের থাবায় আক্রান্ত হয়েছে আমাদের এই পৃথিবীর পরিবেশ, সেটাও উঠে এসেছে নানান পরিবেশ আন্দোলনে। আর কোনও দ্বিতীয় যে গ্রহ নেই এই পৃথিবী ছাড়া, যেখানে মানুষ বসবাস করতে পারে, তা বোধহয় আমরা ভুলতে বসেছি। সেই জন্যেই প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছি। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে ‘There is no Planet B’ স্লোগান। কীভাবে আমরা এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যেতে পারি, তা নিয়ে শুরু হয়েছে ভাবনা এবং সেখান থেকেই আবার শুরু হয়েছে বাঁচার লড়াই এবং তা নিয়ে স্বপ্ন দেখা।

আরও বেশ কিছু পাতা আছে, এই ১২ পাতার টেবিল ক্যালেন্ডারে যার প্রত্যেকটিই কোনও না কোনও লড়াইয়ের কথা বলেছে, তার কোনও কোনও প্রসঙ্গ কখনও আন্তর্জাতিক, আবার কোনও কোনও বিষয় আমাদের দেশের প্ররিপেক্ষিতে গত এক দশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জল জমি জঙ্গল বাঁচানোর লড়াই থেকে দেশের মানুষজন স্লোগান তুলেছিলেন ‘গাঁও ছোড়াব নেহি, জঙ্গল ছোড়াব নেহি’, অর্থাৎ যে জল, জঙ্গল, জমির ওপর মানুষের অধিকার, তাঁদেরই যদি উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে তাঁরা তো রুখে দাঁড়াবেন সেটাই স্বাভাবিক। সেই স্লোগান মুখে মুখে প্রচার হয়েছে, গান হয়ে মানুষের শিরায় শিরায় মিশেছে, তারপর সেই স্লোগান আজকে এই ক্যালেন্ডারের পাতা হয়ে উঠেছে। তারপর ধরা যাক, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলন যখন শুরু হয়, যখন দেশজোড়া নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামে, তখন সেই আন্দোলন থেকে একটা স্লোগান উঠে আসে। ‘কাগজ নেহি দিখায়েঙ্গে’, অর্থাৎ যাঁরা এই দেশের বাসিন্দা, তাঁদের কেন নথি দেখিয়ে প্রমাণ করতে হবে, যে তাঁরা এই দেশের নাগরিক?

কথা হয়েছে সংবিধান নিয়ে তাই সামনে এসেছে ‘জয় ভীম’ স্লোগান, অর্থাৎ ডা. ভীমরাও আম্বেদকর, যিনি ছিলেন সংবিধানের অন্যতম একজন প্রণেতা, সেই সংবিধানকেই আজ দেশের শাসকেরা বদল করতে চাইছেন। তাই ‘জয় ভীম’ স্লোগানকে আজ প্রতিটি গণতান্ত্রিক মানুষ আপন করে নিয়েছেন।

‘ক্যানভাস অফ আনটোল্ড হিস্ট্রি’র ক্যালেন্ডারের পাতায় ‘জয় ভীম’ স্লোগান

এই ক্যালেন্ডারের উল্লেখযোগ্য একটি দিক হল, নারীমুক্তি আন্দোলন, ট্রান্স-কুইয়ার আন্দোলনের দিকগুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা। তাই কুর্দিশ নারীমুক্তি আন্দোলনের স্লোগান ‘জান, জিন্দেগি, আজাদি’ এবং ‘পিতৃতন্ত্রকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও’ মিলেমিশে গেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রূপান্তরকামী মানুষদের আওয়াজ, তাঁদের কন্ঠের সেই চিৎকার, ‘আমরা কুইয়ার, আমরা আছি– অভ্যস্ত হও’ কোথায় যেন আমাদের ভাবতে করেছে যে এই মানুষদেরও বাঁচার অধিকার আছে।

মিতালী, সাগরিকা এবং আবিরের মূল ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বেশ কিছু শিল্পী। জিৎ নট্ট, শিবাঙ্গী সিং, অয়ন গোপ, বৈশালী-সহ অন্যান্যরা ফুটিয়ে তুলেছেন শিশু শ্রম, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার-এর মতো আরও সমস্ত বিষয়গুলো। এই স্লোগানগুলো আসলে শুধু কোনও একটি আন্দোলনের নয়। এই ক্যালেন্ডার আসলে সময়ের জলছবি, এই ক্যালেন্ডারের প্রতিটি মাসের প্রতিটি বিষয় এবং ছবি আসলে নিজেদের এই সমস্ত ভাবনায় একটি সদর্থক অংশগ্রহণের কথাও যেমন মনে করাবে, তেমনি অন্য মানুষদেরও ভাবাতে সাহায্য করবে, এবং তাই শুধু এই আগামী ২০২৬ সালের জন্য নয়, এই ক্যালেন্ডার অবশ্যই হয়ে থাকবে একটি সংগ্রহযোগ্য বস্তু।