Robbar

আপেল কেন আধখাওয়া?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 10, 2026 8:13 pm
  • Updated:April 10, 2026 8:25 pm  

রব জানফ অ্যাপল-এর লোগো তৈরি করতে গিয়ে বাজার থেকে কিনে নিয়ে এলেন এক ব্যাগ আপেল। সেগুলোকে বিভিন্নভাবে কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করলেন, যাতে আপেলের সঠিক আকৃতি ফুটিয়ে তোলা যায়। তিনি লক্ষ করলেন, একটি আস্ত আপেলের সাধারণ স্কেচ দূর থেকে দেখলে অনেকটা চেরি বা টমেটোর মতো মনে হতে পারে। তাই আপেলটিকে অন্য ফল থেকে আলাদা করে চেনানোর জন্য তিনি এতে একটি ‘কামড়’ (Bite) যোগ করেন। আর, তাতেই অ্যাপল-এর লোগো জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়, হয়ে একটি আইকনিক লোগো।

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

১৯৭৬ সালের গোড়ার দিকে ভিডিও গেম-এর পথিকৃত মার্কিন কোম্পানি ‘আটারি’র এক সাধারণ টেকনিশিয়ান  স্টিভ জোবস-এর ইচ্ছে হল, তিনি একটি কম্পিউটার তৈরির কোম্পানি খুলবেন। আসলে, তরুণ জোবস তখন একজন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করছিলেন।

স্টিভ জোবস

বন্ধুদের অনেকেই জোবসের কথা শুনে হাসাহাসি করলেন। কিন্তু জোবস তাতে একটুও দমলেন না। তিনি প্রস্তাবটি নিয়ে গেলেন পুরনো এক বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াকের কাছে। ওজনিয়াকের সঙ্গে জোবসের পরিচয় হয়েছিল কয়েক বছর আগেই, জোবসের হাইস্কুলের বন্ধু বিল ফার্নান্দেজের মাধ্যমে। ওজনিয়াক ছিলেন কারিগরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ। তিনি সেই সময়ে নিজেই কম্পিউটার তৈরিতে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

জোবস তাঁকে সেই কম্পিউটার কোম্পানির মাধ্যমে বিক্রি করে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখালেন। জোবসের দূরদর্শী ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হাত মেলালেন ওজনিয়াক। এগিয়ে এলেন জোবসের আরও এক পরিচিত সহকর্মী রোনাল্ড ওয়েন-ও। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, স্টিভ জোবস যখন ‘আটারি’তে একজন টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন, তখন রোনাল্ড ওয়েন সেখানে প্রধান ড্রাফটসম্যান হিসেবে কাজ করতেন। সেই সূত্রেই তাদের পরিচয়। এই তিনজন একসঙ্গে কম্পিউটার তৈরির একটি কোম্পানি গড়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার লস আল্টোস-এ ২০৬৬ ক্রিস্ট ড্রাইভে জোবসের বাবা-মায়ের বাড়ির নিচে গাড়ি রাখার একটি গ্যারেজ ছিল। সেখানেই এপ্রিল মাসের প্রথম দিনে শুরু হয় জোবসের স্বপ্নের কম্পিউটার তৈরির কোম্পানি– ‘অ্যাপল কম্পিউটার কোম্পানি’।


কোম্পানি তৈরি হল, কিন্তু টাকা আসবে কোথা থেকে? নিরুপায় জোবস কোম্পানির মূলধন সংগ্রহ করতে বিক্রি করে দিলেন নিজের সাধের ভক্সওয়াগেন ভ্যানটি। আর, ওজনিয়াক বিক্রি করলেন তাঁর প্রিয় এইচপি ক্যালকুলেটর। ওয়েন থাকলেন অনেকটা পরামর্শদাতার ভূমিকায়।

কোম্পানির লোগো আঁকার ভার পড়ল ওয়েনের ওপরে। ১৯৭৬ সালে ওয়েন কোম্পানির প্রথম যে-লোগোটি ডিজাইন করলেন, সেটি ছিল একটি হাতে আঁকা কলম ও কালির ছবি। লোগোটিতে দেখা গেল বিজ্ঞানী স্যর আইজ্যাক নিউটন একটি আপেল গাছের নিচে বসে বই পড়ছেন এবং তার মাথার ওপরে একটি আপেল ঝুলছে। সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে মনে রেখেই তৈরি হয়েছিল সেই লোগো। লোগোর ফ্রেমের চারপাশে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটি কবিতা লেখা ছিল: ‘Newton… a mind forever voyaging through strange seas of thought… alone.’

‘অ্যাপল’-এর প্রথম লোগো

কিন্ত, মাত্র ১২ দিনের মাথায় ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য ঋণের ভয়ে ওয়েন অ্যাপল থেকে সরে দাঁড়ালেন। স্টিভ জোবস এবং স্টিভ ওজনিয়াক– দু’জনেই তখন তরুণ, তাঁদের হারানোর কিছু ছিল না। কিন্তু তুলনায় বেশি বয়সের ওয়েনের নিজস্ব সম্পত্তি  ছিল অনেক। অ্যাপল ছিল একটি ‘পার্টনারশিপ’ কোম্পানি। ফলে, কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরাসরি ওয়েনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যেতে পারে, এই ভয়ে ওয়েন অ্যাপল ছেড়ে দিলেন!

স্টিভ ওজনিয়াক-স্টিভ জোবস-রোনাল্ড ওয়েন

অ্যাপল এগিয়ে চলে দুই বন্ধুর হাত ধরেই। ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসেই ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে অবস্থিত ‘হোমব্রু কম্পিউটার ক্লাব’-এ অ্যাপলের প্রথম কম্পিউটার ‘অ্যাপল ১’-এর প্রোটোটাইপ প্রদর্শন করলেন ওজনিয়াক। তিনি যখন তৈরি করেন, তখন এটিই ছিল প্রথম পার্সোনাল কম্পিউটার, যেখানে একটি সাধারণ কিবোর্ডের মাধ্যমে টাইপ করা যেত এবং ফলাফল একটি সাধারণ টিভি স্ক্রিনে দেখা যেত। কম্পিউটারটি একটি মাদারবোর্ড হিসেবে মাত্র ৬৬৬.৬৬ মার্কিন ডলার মূল্যে বাজারে বিক্রি শুরু হয়।

১৯৭৭ সালে অ্যাপল নিয়ে এল ‘অ্যাপল ২’ কম্পিউটার। ‘অ্যাপল ২’ ছিল সেই বৈপ্লবিক উদ্ভাবন, যা অ্যাপলকে একটি ছোট গ্যারেজ স্টার্টআপ থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল। ‘অ্যাপল ১’-এর মতো এটি শুধু একটি মাদারবোর্ড ছিল না, এটি ছিল কি-বোর্ড এবং প্লাস্টিক কেসিং-সহ একটি তৈরি কম্পিউটার। ‘অ্যাপল ২’ ছিল বিশ্বের প্রথম ব্যক্তিগত কম্পিউটারগুলোর একটি, যেটি রঙিন গ্রাফিক্স প্রদর্শন করতে পারত। এতে ৮টি এক্সপ্যানশন স্লট ছিল, যার ফলে ব্যবহারকারীরা সহজেই কম্পিউটারের সঙ্গে মেমরি বোর্ড বা প্রিন্টারের মতো নতুন হার্ডওয়্যার যুক্ত করে নিতে পারত।

১৯৭৭ সালেই স্টিভ জোবস মার্কিন বিজ্ঞাপনী সংস্থা সরেজিস ম্যাককেনার আর্ট ডিরেক্টর ও ডিজাইনার রব জানফ-কে অ্যাপল-এর নতুন লোগো তৈরির দায়িত্ব দিলেন। আসলে, ওয়েনের করা লোগোটি জবসের অত্যন্ত জটিল মনে হয়েছিল। লোগোটি ছোট আকারে প্রিন্ট করাও কঠিন ছিল। এই কারণেই নতুন লোগো তৈরির ভাবনা জোবসের মাথায় আসে। জোবস, জানফ-কে একটাই  নির্দেশ দিয়েছিলেন, লোগোটি যেন মোটেও ‘কিউট’ না-লাগে। লোগোটি যেন সহজবোধ্য আর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

রব জানফ অ্যাপল-এর লোগো তৈরি করতে গিয়ে বাজার থেকে কিনে নিয়ে এলেন এক ব্যাগ আপেল। সেগুলোকে বিভিন্নভাবে কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করলেন, যাতে আপেলের সঠিক আকৃতি ফুটিয়ে তোলা যায়। তিনি লক্ষ করলেন, একটি আস্ত আপেলের সাধারণ স্কেচ দূর থেকে দেখলে অনেকটা চেরি বা টমেটোর মতো মনে হতে পারে। তাই আপেলটিকে অন্য ফল থেকে আলাদা করে চেনানোর জন্য তিনি এতে একটি ‘কামড়’ (Bite) যোগ করেন। আর, তাতেই অ্যাপল-এর লোগো জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়, হয়ে একটি আইকনিক লোগো।


২০১৮ সালে ‘ফোর্বস’কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানফ জানিয়েছিলেন, তিনি কম্পিউটারকে মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও আনন্দদায়ক করে তুলতে চেয়েছিলেন। সেই কারণেই লোগোতে কামড়ের চিহ্নটি (বাইট) দেওয়া হয়েছিল, যাতে তা চেরির মতো না-দেখায়। মজার ব্যাপার হল, জানফ কিন্তু তখনও জানতেন না যে, কম্পিউটারের টার্মেও ‘বাইট’ শব্দটি রয়েছে!

কে জানত তখন, এই আধ-কামড়ানো আপেলই হয়ে উঠবে এত বিখ্যাত? আদম-ইভের আপেল, নিউটনের আপেলের পর এমন বিখ্যাত আপেল-কাণ্ড আর কি ঘটেছে? অ্যাপেলের এই লোগো অবশ্য এও মনে করিয়ে দেয়– পূর্ণতাই সব কিছু নয়। যা অপূর্ণ, যা খুঁতযুক্ত, যার গায়ে অতীতের ব্যথার কামড় লেগে আছে, তাও এমন সেলিব্রেটেড হতে পারে। অতএব, খানিকটা ভেঙেচুরে গেলেও, ভেঙে পড়ার কিছু নেই। অ্যাপেলকে দেখুন।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা

…………………….