Robbar

সব্বাই নয়, কেউ কেউ ‘বিয়ের গাড়ি’

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 19, 2026 7:41 pm
  • Updated:January 19, 2026 7:41 pm  

‘ওই পালকি-তে বউ চলে যায়…’। সে তো গানে। পালকি-তে বউ চলে যাওয়া আজকাল দেখা যায় না, তার দেখা মেলে বইয়ের পাতায়, গল্পে-সল্পে। বিয়ে মানে গেরস্তের মহাযজ্ঞ। আর সেখানে একটা চার-চাকা না থাকলে ‘পিকচার পারফেক্ট’ হয় নাকি! বর আনতে হোক কিংবা নতুন বউয়ের শ্বশুরবাড়ি ফেরার পালায়, ফুলে ফুলে সাজুগুজু করে রেডি থাকা একখান গাড়ি জৌলুস বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। সেই ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ তখন এক ঝটকায় পক্ষীরাজ, সকলের নয়নের মণি হয়ে ওঠে ‘বিয়ের গাড়ি’। বিবাহ অভিযান-এ সেই ‘বিয়ের গাড়ি’র কথা।

প্রচ্ছদ শিল্পী: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

শিলাদিত্য চ্যাটার্জি

‘আরে, এই ব্যালেনোর বাচ্ছা, দেখে চালা!’

দেখেছেন তো, কেন মটকা গরম হয়! শালা, ব্যালেনো নাকি ওভারটেক করছে আমায়! আমি তো ভালোবেসে হালকা টাচ মারলেই ‘ফাউল’, ‘ফাউল’ করে রাস্তায় নেতিয়ে পরে কাতরাবে। আসলে পাতি জেলাস বুঝলেন তো! হিংসে। বাপের জম্মে তো ওদের কেউ বর আনতে ডাকবে না। বিয়েবাড়িতে ওদের সাজগোজ হবে না। তাই আমাদের দেখলেই ওদের নিজেদের না পাওয়াগুলো মনে পড়ে। কিন্তু ওই যে, সবাই তো কবি নয়… কেউ কেউ কবি, তেমনই আমরা প্রত্যেকে ‘বিয়ের গাড়ি’ হতে চেয়েছি। কেউ কেউ পেরেছি আর বাকিরা– সব ব্যালেনোর বাচ্ছা!

ওই দেখুন, আমার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি।

আমি হুন্ডা। ভালোবেসে কারখানা নাম দিয়েছিল– ‘হিউন্ডাই আই টেন নিওস’। কিন্তু হাওড়ায় এসব চলে না। শিবপুর এলাকায় যখন গুল্লুর বাবা, মানে যে গুল্লুর বোনের আজকে বিয়ে, আমাকে আনল, আমি একা আমার কমিউনিটি থেকে। পাড়ায় তখন দু’-একটা হারগিলে ওয়াগনার। একটা সুজুকি। আর এক-আধটা সুইফট। তখনও টাটা মানে, আমি গুল্লুর বোন যেটা স্কুলে গেলে ওর বাবাকে করত, সেটাই জানতাম। তাই আমার এলাকায় হেব্বি নাম ফাটল। সে যদিও গুল্লুর বাবার দৌলতেই। আমি হয়ে গেলাম পাড়ার ‘মসিহা’। হসপিটাল টু হলদিরাম। সুবোধদার গাড়ি হাজির। মাঝরাতে ঝিনুকদির জল ভাঙল– মানে বাচ্চা হবে, আমি ছুটলাম। দাশ-জেঠুর নাতির মাথা ফাটল, আমি দৌড়লাম। আর একে-তাকে নামিয়ে দেওয়া, তুলে নেওয়া তো লেগেই আছে। তাই জন্যই তো, টুকাইদের বুড়ো ওয়াগনারটা আমাকে নাম দিল, ‘হুন্ডা… পাড়ার গুন্ডা!’

ব্যস্, সেই থেকে সার্ভিস দিচ্ছি। এই বোনির বিয়ের দু’-মাস আগে ১২-তে পড়লাম। দেখে কেউ বলবে!

নিজের ঢাক একটু পেটাচ্ছি বলে, কিছু মনে করবেন না। আসলে আজকে বোনির বিয়ে তো, হালকা লোড হয়ে গিয়েছি। সক্কালবেলাই ফুল ট্যাংক যা পেট্রোল খেয়েছি, কী বলব! তবে ধুনকিটা যেটা লেগেছে, সেটা পেট্রোলের জন্য না। ওটা আনন্দে। গুল্লুর বোনের বিয়ে বলে কথা। যে এদ্দিন অন্যদের বিয়েতে বরযাত্রী গিয়েছে, তার আজকে নিজের বাড়ির মেয়ের বিয়ে। মস্তি হবে না বলুন! এসব আজকালকার ইলেকট্রিক মালেরা বুঝবে না। ‘বিয়ের গাড়ি’ হওয়ার কী মর্যাদা। বিয়ের আগের হপ্তায় সার্ভিস সেন্টারে যখন আমায় দিয়ে আসে, উফ্ফ কী আহ্লাদ! গায়ে জল। সাবান। যাওয়ার আগে গাড়ির মালিক বলে দিয়ে আসে, ‘পরের সপ্তাহে বিয়ে আছে আসলে!’ বাকিটা ব্যক্তিগত! তারপর গোটা হপ্তা নো ডিউটি। কিংবা চালালেও তখন কী খাতির। কোনও ওভারটেকিং না। কোনও ওভারস্পিডিং না। পারলে গাড়িকে কাঁধে করে তুলে নিয়ে যায় বাড়ির লোক।

কোনও গাড়ির বাড়িতে যে পরের সপ্তাহে বিয়ে আছে, সেটা গাড়ির চলা দেখলেই যদিও বোঝা যায়। তখন সত্যি বলতে বাকি গাড়িরাও ‘কোওপেরট’ করে। এই তো আগের হপ্তায় ব্রিজে উঠলাম রাত বিরেতে। গুল্লুর বউ আর মেয়েকে বাপের বাড়ি থেকে আনার ছিল। গুল্লু একটু চিন্তায় ছিল। এত লরি। এত ট্রাক। আমি ঠিক হালকা বাঁ-দিক ঘেঁষতেই দেখলাম, সামনের মাহিন্দ্রাটা জায়গা দিয়ে দিল। আপনারা, মানুষেরা ভাবেন, লরিওয়ালা জায়গা করে দিল। আমরা টের পাই, কোন বাঁ-দিকটা ড্রাইভারের দেওয়া আর কোনটা গাড়ির! আপনারা বুঝবেন না। ওটা আমাদের চারপেয়েদের ব্যাপার। তবে এই বিয়ের আগের খাতির-যত্নের সময় সবচেয়ে ইঞ্জিন জ্বালায় ওই দুটো ডানা ঝাপটানো মাল– কাক আর পায়রা।

শিল্পী: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

উফ্ফ, বাপ রে বাপ! মাইরি, আমি মানুষ হলে না, সবক’টাকে গুলি করে মারতাম। এ কী ছোটলোক রে, ভাই! গোটা দুনিয়ায় এত ফাঁকা জায়গা। এত বেওয়ারিশ প্লট। হাগ না যত ইচ্ছে! না, মালেরা টার্গেট করে রেখেছে তো। কোন গাড়ি নতুন এসেছে মার্কেটে, কোন গাড়ি সবে সার্ভিস থেকে ফিরল, আর কোন গাড়ি ‘বিয়েবাড়ির গাড়ি’! এসব ওই মালেরা জানে। আর তাক করে থাকে। একবার তো নিজের চোখে দেখা, একটা মাল ঠিক বর-বউয়ের বেরনোর সময়, তারে বসে আমায় তাক করছে। আমার তো ভয়ে পেট্রোল বেরবে, বেরবে করছে। ঠিক মোক্ষম মুহূর্তে দিল কুকম্মটা করে! কিন্তু আমার গায়ে না। স্ট্রেট বরের মাথায়। জম্মে প্রথম মেয়েকে বাড়ি ছাড়ার সময় ও’রম হাসতে দেখেছিলাম মাইরি!

তো শেষমেশ ওই কাকপক্ষীদের থেকে নিস্তার পেলে, সেই দিনটা আসে যেদিন আমরা সাজার সুযোগ পাই। বিয়ের দিন সক্কালবেলা কোনও এক মাসতুতো, খুড়তুতো ভাই এর দায়িত্ব পড়ে আমায় ফুলের দোকানে দিয়ে আসার। যত ভোরে যাওয়া যায়, তত ভালো, জানেন তো। বেলা গড়ালেই দোকানির কাজে মন থাকে না। তবে আমাদের বাঁধা ফুলওয়ালা আছে। ঠিক লেক মলের সামনে। সন্তুদা। সন্তুদা আমায় চেনে। তাই আমি আসছি শুনলে, নিজে সাজাতে আসে। উফ্ফ! যা সাজিয়েছে না এবারে। নিজেরই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে ইচ্ছে করছে। গুল্লু বলে এসেছিল আসলে, ‘গোলাপে যেন কোনও কমতি না হয়! আমার বিয়েতে যা করেছিলে, তার চার ডবল চাই! বোনের বিয়ে বলে কথা।’

গুল্লুর কথা শুনেছে সন্তুদা। গোলাপে কোনও কমতি হয়নি। সবাই এসে এসে দেখে যাচ্ছে! মাইরি লজ্জাও লাগছে। ভালোও লাগছে। আর হালকা মনখারাপ তো লাগছেই। আজকে গুল্লুর বাবা থাকলেই একদম ষোলোকলা পূর্ণ হত। ওই আসলে এসব দিনে সুবোধদা, মানে গুল্লুর বাবাকে খুব মনে পড়ে। পাড়ার সব মেয়ের বিয়েতে আমায় নিয়ে সার্ভিস দিয়েছে। বিয়ে হচ্ছে মানেই, ঘোষবাবুর গাড়ি হাজির। শুধু নিজের মেয়ের বেলাতেই, দেড় বছর আগে টিকিট কেটে ফেলল। গেল, কিন্তু সেই আমার কোলে মাথা রেখেই। আমি ফুল স্পিডে ছুটেও ধরতে পারলাম না। ঠিকাছে! বেশিদিন না। একদিন ঠিক ধরে নেব! তবে এদিকে এখনও সার্ভিস দিতে হবে। কেউ জানুক না জানুক, আমি তো জানি, ‘ছোট গুল্লু’ আসছে।

আপাতত, সিগনালে দাঁড়িয়ে একটু গানই শুনি। চারপাশের সব গাড়ি আমায় দেখে যা ভাবছে, ঠিক সেটাই রেডিও-তে বাজছে। কোনও মানে হয় বলুন–

‘সামনে ইয়ে কৌন আয়া
দিল মে হুই হালচাল!
দেখকে বস এক হি নজর,
হো গয়ে হম পাগল!’

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন শিলাদিত্য চ্যাটার্জি-র অন্যান্য লেখা

………………….